| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
প্রকৃত নাম আবু রায়হান মোহাম্মদ ইবনে আহমদ আল বিরুনি। মধ্যযুগের বিশ্বখ্যাত আরবীয় শিক্ষাবিদ, গবেষক, অত্যন্ত মৌলিক ও গভীর চিন্তধারার অধিকারী ছিলেন তিনি। তিনি ছিলেন গণিত, জ্যোতিপদার্থবিদ, রসায়ন ও প্রাকৃতিক বিজ্ঞানে পারদর্শী। এছাড়াও ছিলেন প্রসিদ্ধ ভূগোলবিদ, ঐতিহাসিক, পঞ্জিকাবিদ, দার্শনিক, চিকিৎসা বিজ্ঞান, ভাষাতত্ত্ববিদ এবং ধর্মতত্ত্বের নিরপেক্ষ বিশ্লেষক। স্বাধীন চিন্তা মুক্তবুদ্ধি, সাহসিকতা, নির্ভীক সমালোচক ও সঠিক মতামতের জন্যই তিনি যুগশ্রেষ্ঠ বলে স্বীকৃত।
হিজরি সালের চতুর্থ শতাব্দীর শেষার্ধ ও পঞ্চম শতাব্দীর প্রথমার্ধকে আল-বেরুনির কাল বলে উল্লেখ করা হয়। তিনি একটি অতি সাধারণ ইরানি পারিবারে ৪ঠা সেপ্টেম্বর, ৯৭৩ খ্রিস্টাব্দে জন্ম গ্রহণ করেন। তিনি রুশীয় তুর্কিস্তানের খিওয়ায়, খাওয়ারিজিমের রাজধানীর কাছে অবস্থিত একটি শহরে জন্মগ্রহণ করেন। বর্তমানে শহরটি নদীতে বিলীন হয়ে গিয়েছে। তিনিই সর্বপ্রথম প্রাচ্যের জ্ঞানবিজ্ঞান, বিশেষ করে ভারতের জ্ঞানবিজ্ঞানের প্রতি মুসলিম মনীষীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন।
তিনি গণিতশাস্ত্র “আবু নাস”-এর ইবন আলি ইবন ইরাক জিলানি এবং তদ্রূপ আরো কিছু বিদ্বান ব্যক্তির কাছে শিক্ষা গ্রহণ করেন। অধ্যয়নকালেই তিনি তার কিছু প্রাথমিক রচনা প্রকাশ করেন এবং প্রখ্যাত দার্শনিক ও চিকিৎসাশাস্ত্রজ্ঞ ইবন সিনার সাথে পত্রবিনিময় করেন। আল-বিরুনির মাতৃভাষা ছিল খাওয়ারিজিম আঞ্চলিক ইরানি ভাষা। কিন্তু তিনি তার রচনাবলি আরবিতে লিখে গেছেন। আরবি ভাষায় তার অগাধ পান্ডিত্য ছিল। শেষের দিকে কিছু গ্রন্থ ফার্সিতে অথবা আরবি ও ফার্সি উভয় ভাষাতেই রচনা করেন। গ্রিক হিব্রু ও সিরীয় ভাষাতেও তার জ্ঞান ছিল।
তিনি ১০০৮ খ্রিস্টাব্দে নিজ দেশে প্রত্যাবর্তন করেন এবং শাহ আবুল হাসান আলি ইব্ন মামুন কর্তৃক সম্মানে গৃহীত হন। আলি ইব্ন মামুনের ইন্তেকালের পর অনেক নাজুক রাজনৈতিক কার্যকলাপ ছাড়াও রাজকীয় দৌত্যকার্যের দায়িত্বেও নিয়োজিত থাকেন। ১০১৬-১৭ খ্রিস্টাব্দে সুলতান মাহমুদ খাওয়ারিজম দখল করে নেন। তখন তিনি গণিতবিদ আবু নাসের মানসুর ইবন আলি ও চিকিৎসক আবুল খায়ের আল-হুসায়ন ইবন বাবা আল-খাম্মার আল-বাগদাদির সাথে গজনি চলে যান। এখানেই তার জ্ঞানচর্চার স্বর্ণযুগের সূচনা হয়। সেখানে তিনি গাজনি শাহী দরবারে রাজজ্যোতির্বিদ হিসেবে অবস্থান করতে থাকেন। তিনি কয়েকবার সুলতান মাহমুদের সাথে উত্তর-পশ্চিম ভারতেও গমন করেন। গজনির সুলতানের পৃষ্ঠপোষকতায় তিনি ভারতে প্রায় ১২ বছর অবস্থান করেন। এখানে সংস্কৃত ভাষা, হিন্দু ধর্ম, ভারতীয় সভ্যতা ও সংস্কৃতি, দেশাচার, সামাজিক প্রথা, রাতিনীতি, কুসংস্কার ইত্যাদি বিষয়ে গভীর জ্ঞান অর্জন করেন। তিনি তার অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান দ্বারা রচনা করেন তার বিশ্ববিখ্যাত গ্রন্থ কিতাবুল তারিকিল-হিন্দ।
ইউরো্পীয় পন্ডিতদের মতে, আল-বিরুনি ছিলেন স্বয়ং বিশ্বকোষ, যার প্রত্যেকটি গ্রন্থ ছিল জ্ঞানের আধার। ভারতীয় পন্ডিতরা আল-বিরুনিকে বলতেন জ্ঞানের সমুদ্র। কোনো অবস্থাতেই তাঁর এসব অমূল্য গ্রন্থের পরিচয় কম কথায় দেয়া সম্ভব নয়। আল-বিরুনির ভারত থেকে গজনি প্রত্যাবর্তন করার কিছু দিন পর সুলতান মাহমুদ ইন্তেকাল করেন। অতঃপর সিংহাসনে আরহণ করেন সুলতান মাসউদ। সুলতান মাসউদ আল-বিরুনিকে খুব সম্মান করতেন। আল-বিরুনি তার অনুরক্ত হয়ে তার সর্বশ্রেষ্ঠ গ্রন্থের নাম সুলতানের নামানুসারে রাখেন, কানুন মাসুউদী এবং তা সুলতানের নামে উৎসর্গ করেন। সুবিশাল গ্রন্থখানা সর্বমোট ১১ খন্ডে সমাপ্ত। গ্রন্থটির গুরুত্ব উপলব্ধি করে সুলতান মাসউদ অত্যন্ত খুশি হয়ে একটি হাতির ওজনের পরিমাণ রৌপ্য বৈজ্ঞানিক আল-বিরুনিকে উপহার করেন। কিন্তু তিনি তা গ্রহণ না করে বাহিক্য সন্তোষ প্রকাশ করে সব রৌপ্যই রাজকোষে ফিরিয়ে দেন। মন্তব্য করেন, তার এত ধন-সম্পদের কোনো প্রয়োজন নেই।
গ্রন্থটির প্রথম ও দ্বিতীয় খন্ডে জ্যোতির্বিজ্ঞান, তৃতীয় খন্ডে ত্রিকোণমিতি। এতে দু’টি তালিকা দেয়া হয়েছে। এখানে জ্যোতির্বিজ্ঞান আলোচনার সাথে ত্রিকোণমিতিকে উচ্চস্তরে উন্নীত করার প্রচেষ্টায় তিনি যে সফলতা লাভ করেছেন তা প্রশংসনীয়। মাসউদের অনুরোধে অতি সরল পদ্ধিতে সাধারণের বোধগম্য ভাষায় দিবা-রাত্রির পরিমণবিষয়ক একটি পুস্তকও তিনি প্রণয়ন করন। চতুর্থ খন্ডে গোলাকার জ্যোতির্বিদ্যা (Spherical Astronomy); পঞ্চম খন্ডে চন্দ্র, সূর্যের মাপ, গ্রহ এবং দ্রাঘিমা; ছষ্ঠ খন্ডে সূর্যের গতি প্রকৃতি; সপ্তম খন্ডে চন্দ্রের গতি প্রকৃতি; অষ্টম খন্ডে চন্দ্রের দৃশ্যমান ও গ্রহণ; নবম খন্ডে স্থির নক্ষত্র; দশম খন্ডে পাঁচটি গ্রহ নিয়ে এবং একাদশ জ্যোতির্বিজ্ঞান নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে এবং এখানে তিনি মূল্যবান অর্থ উপস্থাপন করেন।
বিভিন্ন সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য হতে প্রতীয়মান হয়, তার রচিত গ্রন্থের সর্বমোট সংখ্যা ১৮০টি। এগুলো তথ্য, তত্ত্ব ও পরিসরের দিকে হতে বিভিন্ন। কোনোটি পুস্তক, কোনোটি গবেষণামূলক সন্দর্ভ আবার কোনোটি বৃহদাকার গ্রন্থ, যাতে জ্ঞানের বিশাল ভান্ডার বিধৃত ধারণ করা হয়েছে।
K¨vckb : hyM‡kªô Avj-wei“wb
©somewhere in net ltd.