| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
এম টি উল্লাহ
উপন্যাস অসমাপ্ত জবানবন্দী, নিরু, গায়েবি শৃঙ্খল, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক উপন্যাস ‘মায়ের মুখে মুক্তিযুদ্ধ’ ও ‘একাত্তরের অবুঝ বালক’ এর লেখক। পেশায়-আইনজীবী। কর্মস্থল- হাইকোর্ট।www.facebook.com/mohammad.toriqueullah
নোয়াখালীর মুরব্বিরা পঞ্চাশের দশকের কোন স্মৃতিচারণ করতে গেলে বাদুরা জাহাজ ট্রাজেডির কথা টেনে আনতেন।যেমন; কারো বয়স জিজ্ঞেস করলে বলতো, যে বছর বাদুরা জাহাজ ডুবছে সে বছর জন্ম কিংবা বাদুরা জাহাজ ডুবার অত বছর আগে/পরে। এতোটাই আলোচিত ছিল সে ট্রাজেডি। লোকমুখে শোনা যায় ৫০১ জন যাত্রী নিয়ে জাহাজটি চট্টগ্রাম থেকে হাতিয়া অভিমুখে রওনা দিয়ে ঝড়ের কবলে পড়ে মাঝপথে ডুবে যায় এবং একজন মাত্র যাত্রী জীবিত উদ্ধার হন। তিনি হলেন হাতিয়া নিবাসী প্রিয় লাল বাবু।
অবশ্য যাত্রীর সংখ্যা নিয়ে List of Shipwrecks, 12 june, 1956 ও Sea Survival, The Straits Times. 9 June 1956 এবং Dictionary of Disaster in Sea, 1993, Hongkong এর মতে ২০২ জন যাত্রী ছিল তার মধ্যে ৬ জন বেঁচে ছিল। ইন্ডিয়া ডেইলি মেইল ৭ জুন, ১৯৫৬ এর মতে জাহাজে যাত্রী ছিল ৩০০ জন এবং জীবিত ছিল মাত্র ৪ জন। কিংস স্টোন ৭ জুন, ১৯৫৬ এর মতে যাত্রী ছিল ২০২ জন তার মধ্যে বেঁচে গেছে ৩ জন।
যেটা ২০০ হোক কিংবা ৫০০ হোক তা ছিল ভয়াবহ দুর্ঘটনায় বাদুরা জাহাজটি ছিল ২৭৯ টনের এবং এটি কয়লা দ্বারা চালিত বৃটিশ যুদ্ধ জাহাজ। যার নাম ছিল বাদুরা জাহাজ (BADORA)।যার ইঞ্জিন ছিল দুই চাকাওয়ালা ডুয়েল শিফট ২*২ সাইকেল কম্পাউন্ড বিশিষ্ট এবং শক্তি ছিল ৪৩ হর্স পাওয়ার।এটি ১০১০ ডক ইয়ার্ডে নির্মিত হয়, যার আইএমও নম্বর ছিল ১৩১৯১৩ এবং কল সাইন ছিল ভিজিটিএম। Royal Navy Support and Harbour Vessels of world war-1 এর জন্য স্কটিশরা নির্মান করেন ১৯১৪ সালে (The Histry of Shipbuilding in Scottland)।জাহাজের নির্মাতা হলেন William Denny & Bross, Dumberton।প্রথম বিশ্ব যুদ্ধের পর জাহাজটির প্রথম মালিক ছিল কলকাতার River Stream Navigation Co. Ltd ( Macneil & Co.)
জাহাজটি প্রতি শনি, সোম ও বুধবার চট্টগ্রাম হতে হাতিয়া এবং রবি, মঙ্গল ও বৃহস্পতিবার হাতিয়া হতে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্য সকাল ৯.৩০ মিনিটে ছেড়ে যেত বঙ্গোপসাগরের উপকূলে মেঘনা নদী দিয়ে।
দুর্ঘটনার দিন ছিল ১৯৫৬ সালের ২ জুন ১৯শে জৈষ্ঠ, শনিবার। সকাল থেকে গুটি গুটি বৃষ্টি হচ্ছিলো যার কারনে জাহাজের মাষ্টার রেডিও সংকেত ঠিকমত পাচ্ছিলেন না। তখন আবহাওয়া পূর্বাভাস পাওয়ার একমাত্র মাধ্যম ছিল রেডিও ওয়ার্লেস।এ পরিস্থিতিতে জাহাজের সারেং জাহাজটি ছাড়তে চাননি কারন তার আগের রাত্রে তিনি একটি দুঃস্বপ্নও দেখে ছিলেন।দুঃস্বপ্নটা ছিল এমন তিনি জাহাজ নিয়ে নদীর মাঝখানে গেলে জাহাজে আগুন লেগে যায়।যাত্রীরা তা দেখে তাকে হাত পা বেঁধে নদীতে ফেলে দেন।গভীররাতে দুঃস্বপ্ন দেখার পর সারেং ভয়ে আর ঘুমাতে পারেননি। তাই সকালে আবহাওয়া খারাপ দেখে তার দুঃস্বপ্নের কথা যাত্রীদের সাথে শেয়ার করেন এবং জাহাজ না ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন কিন্তু যাত্রীদের বিশেষ অনুরোধে একরকম দ্বিধা দ্বন্দ্বের মাঝে সকাল পৌনে দশটার দিকে চট্টগ্রাম থেকে ২০২ জন যাত্রী নিয়ে সন্দ্বীপ হয়ে হাতিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা করার নির্দেশ দেন জাহাজের মাষ্টার।
ভাগ্যের নির্মম পরিহাস জাহাজ যখন চট্টগ্রামের কুমীরা ও সন্দ্বীপ চ্যানেল পেরিয়ে সাগরের মাঝখানে আসে ঠিক তখনি যেন সারেং এর দুঃস্বপ্নটা বাস্তবায়িত হচ্ছে। আকাশ চারদিক থেকে অন্ধকার হয়ে যাওয়ার পর সারেং খুবই ভেঙে পড়েন এবং হাতিয়ার দিকে যাওয়া জাহাজের গতিপথ পরিবর্তন করে সন্দ্বীপের দিকে চালানোর শুরু করলেন। তিনি ভেবেছিলেন হয়ত ঝড়ের আগে তিনি সন্দ্বীপের কাছে পৌঁছে যাবেন। কিন্তু তিনি ঝড়ের বিপরীতে বেশি দূর যেতে পারেননি। তার বুঝতে বাকি থাকলনা কি হতে যাচ্ছে কারন তিনি কখন এমন আকাশের চোখ রাঙ্গানো ঝড়ের তান্ডব আর কখনও দেখেননি। ঝড়ের সাথে পাহাড় সমান একের পর এক ঢেউ এসে আঘাত হানতে থাকে জাহাজের উপর। তিনি প্রানপনে জাহাজ নিয়ন্ত্রনে আনতে চাইলেন এবং সকলকে অভয় দিলেন। এমন পরিস্হিতিতে যাত্রীরা ভয়ে ভীত হয়ে কান্নাকাটি করে ছুটোছুটি করতে থাকে। অনেক্ষন চলার পর ঝড়ের তান্ডবের কাছে পরাজয় বরণ করে”বাদুরা” নামের জাহাজটি
নিমেষেই সাগরের অতলে হারিয়ে যায়।
জাহাজটির পরিচালনায় ছিলেন তিনজন সারেং।হরনী ইউনিয়নের সারেং সোনামিয়া ও তার সহযোগী তমরুদ্দিন ইউনিয়নের ফজলুল করিম সুকানী এবং জৈষ্ঠ্য চেরাং হাবিব উল্ল্যাহ। যেদিন বাদুরা জাহাজ দুর্ঘটনায় পতিত হলো, সেই দিন হাবুল্লা চেরাং জাহাজে ছিলেন না। উনি তখন ছুটিতে ছিলেন।তার পুরো নাম হাজী হাবিব উল্লাহ্ মাস্টার (কথিত হাবুল্লা চেরাং)।আর হাবুল্লা চেরাং নামেই হাতিয়াতে পরিচিত ছিলেন পরে তিনিও নোয়াখালী যাওয়ার পথে নৌকা ডুবিতে মারা যান।জাহাজটিতে কোন লাইফ জ্যাকেট ছিলনা।জাহাজটিতে যাত্রীর পাশাপাশি হাতিয়া-সন্দ্বীপ ও চট্টগ্রামের মালামাল বহন করা হত।
অনেকে বলেন সারেং এর ভুলে জাহাজটি ডুবেছে কারন তার জাহাজটি উল্টো চালানোর দরকার ছিলনা আবার কেউ বলে গত রাতের দুঃস্বপ্ন তাকে তাড়িত করে দিশেহারা করে ফেলেছিল। সারেং বুঝে উঠতে পারেনি তার কি করা দরকার ছিল তখনি। নিয়তিটি হয়ত এমন ছিল তাই এমন ঘটনা ঘটেছে। উক্ত জাহাজডুবিতে হাতিয়ার তৎকালীন ম্যাজিস্ট্রেট কুমিল্লা নিবাসী জনাব মমতাজ উদ্দিন আহমদও ছিল। হেমিলটন ডেইলি নিউজ, জুন ৭, ১৯৫৬ এর তথ্য অনুযায়ী এতে যাত্রী ছিল ২০২ জন তার মধ্যে ৩০ জন ছিল জাহাজের ক্রু। জাহাজটিতে হাতিয়া, সন্দ্বীপ, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও কলকাতার লোক ছিল। কিছু যাত্রী বেঁছে ছিল এর মধ্যে একজন ১২ মাইল সাঁতরিয়ে হাতিয়া পৌঁছে আর বাকিরা চট্টগ্রামে পৌঁছে।
হাতিয়ার লৌকিক সূত্রে জানা যায় ভাগ্যক্রমে বেঁচে যাওয়া প্রিয় লাল বাবু সাতদিন সাগরে কাঠ ধরে ভেসে থাকার পর জেলেরা নৌকা করে তাকে উদ্ধার করে। বর্তমানে জীবিত নেই। তাকে দেখতে এবং জাহাজের কাহিনী শুনতে দূর দুরন্ত থেকে মানুষ জন ছুটে আসত। আর “বাদুরা” জাহাজ ডুবির ইতিহাস যেন আরেকটি টাইটানিকের ট্র্যাজিক ইতিহাস।
“বাদুরা” জাহাজ সন্দ্বীপ ও হাতিয়ার মানুষের কাছে কতটা প্রিয় ছিল তা প্রকাশ পেয়েছে বাদুরা জাহাজ নিয়ে অজস্র জারিগান ও পুঁথির মাধ্যমে। সন্দ্বীপ ও হাতিয়ার প্রতিটি ঘরে ঘরে কুপি জ্বালিয়ে সন্ধ্যার পর পুঁথি পাঠের মাধ্যমে স্মরন করা হত প্রিয় জাহাজ ও সাগরে সলিল সমাধিত জন যাত্রীদের।
পুঁথির কয়েকটা লাইন:-
“আহারে বাদুরা নামে খারা আর এস এন কোম্পানি,
বাদুরা ত ডুবল ভাইরে বুকে নাইতো কারো পানি,
আহারে বাদুরা।।”
“ইস্টিমার তো ডুবলো না রে, ডুবলো সোনার পুতুলা, হায়রে দ্বিতীয় কারবালা।”
“হায়রে বাদুরা! ভাতে মরে জাদুরা।”
(নেট থেকে প্রাপ্ত তথ্য সংকলনে লিখিত, ছবি- সংগৃহিত
মোহাম্মদ তরিক উল্যাহ (MT Ullah)
অ্যাডভোকেট
বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট

©somewhere in net ltd.