নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

সৌরভ উদয়

সৌরভ উদয় › বিস্তারিত পোস্টঃ

আমার কাছে বাবা এবং বাবা দিবস...

১৫ ই জুন, ২০১৪ দুপুর ১২:৩৬

আমার বড়

একটা সমস্যা হচ্ছে আমি আসলে বাবা কি

জিনিস বুঝিনা।

বাবাকে নিয়ে লেখা কথাগুলো আমার

কেমন যেন অচেনা মনে হয়।

বাবা শব্দটা আসলে হৃদয়ের কোন স্থান

থেকে আসে তা আমি জানিনা ।

আমি কোনদিন বাবা/পাপা/আব্বু/বাপি এই

শব্দ গুলোর সঠিক ব্যবহার করতে পারিনি।

বাবা/ আব্বু শব্দগুলোর ফিলিংস আমার

কেমন যেন ভাগ্নে ভাগ্নে মনে হয়।

আমার জীবনে আমি আব্বু

বলে যাকে সবচেয়ে বেশি ডেকেছি

সে হল Sabbir Awladআমার বোনের

(Cousin) ছেলে। আমার

ছেলেবেলা কেটেছে গ্রামে। আমার

আম্মু চাকরী করতেন সেখানে।

দোতালা সরকারী বাসা। আমি আর আম্মু।

মাঝে মাঝে আমার বড় ভাই Jahidur

Rashid Shajib আসত। আমার ভাইয়ু থাকত

যশোরে খালার বাসায়।

ওখানে থেকেই পড়াশুনা করত।

ছুটি পেলে বেড়াতে আসত। তাই আমার

জগতে আমার মা আর ভাই

ছাড়া আমি তেমন কাউকে দেখিনি।

আমি যেই গ্রামে বড়

হয়েছি সেখানে বিদ্যুৎ ছিল না।

পাকা রাস্তা ছিলনা।

প্রাইমারী স্কুলে আমার অনেক বন্ধু ছিল।

হাঁট বারে আমি দেখতাম ওরা খুব

আনন্দিত থাকত কারণ ঐদিন ওদের

বাবা ওদের মিষ্টি কিনে দিত।

বাচ্চাদের মিষ্টি কিনে দেওয়া, এই

'মিষ্টি' বলতে যশোর অঞ্চলে যেকোন

খাবার যেমন চকলেট, বাদাম, বিস্কুট,

চানাচুর ইত্যাদি কে বোঝায়।

মাঝে মাঝে কিনে না দিলে ওরা

ধুলায়

শুয়ে পড়ে বা বসে কান্না কাটি করত আর

ময়লা মাখত। আমার ঐ বয়সেই ভীষণ

লজ্জা লাগত। আমি বুঝতাম না আমার

বন্ধুরা কেন এই বিশেষ পুরুষ লোকটার

কাছে খাবার চেয়ে কান্নাকাটি করে।

ওরা কেন ওদের মায়ের কাছে চায় না?

আমার আম্মু তো চাইলেই দিয়ে দেয়।

আমি দেখেছি আমার

বন্ধুরা কাঁধে উঠে ওদের বাবাদের

সাথে নদীতে গোছল করতে যেত।

নদীটাও সেইরকম স্বচ্ছ আর পরিষ্কার ছিল।

মাইকেল মধুসুদনের কপোতাক্ষ নদ।

আমি কারও কাঁধে উঠেছি কিনা আমার

মনে পড়ে না। নদীতে বেশি গোছল

করলে ওদের বাবারাই আবার ওদের

মারত। তখন আমার মনে হত বাবারা এত

নিষ্ঠুর হয় কেন?? আমার

মনে পড়ে আমি যখন থ্রি-

ফোরে পড়ি তখন আমি বড় মানুষ (পুরুষ)

দেখলে ভয় পেতাম।

যদি আমাকে ধরে মারে।

কিংবা ছেলেধরা হয়।

আমাকে ধরে নিয়ে যায়। আমি তো তখন

আম্মুকে আর পাব না। ছোট বেলাতেই

কেন যেন আমার মাঝে বড় মানুষ (পুরুষ)

সম্পর্কে ভীতি জন্ম নিয়েছিল। একবার

আম্মু আমাকে শুক্রবারে নামাজ

পড়তে মসজিদে পাঠাল।

আমি নামাজে দাড়ায়ে আরচোখে

দেখি সবাই কি করে।

তারা যা করে আমিও তাই করি। নামাজ

শেষে এক আংকেল

আমাকে নামাজে হাত বাঁধতে হয়

কোথায় দেখিয়ে দিলেন।

আমি তাকে ভয়ে ভয়ে বললাম আমার

আম্মুতো এই ভাবে নামাজ পড়ে।

তিনি আমাকে তখন বললেন

আমি যেভাবে হাত

বেঁধেছি সেভাবে নাকি মেয়েরা

বাঁধে ছেলেরা বাঁধে না।

আমিতো জানিনা আমার আম্মু

ছেলে না মেয়ে।

আমিতো জানি আমার আম্মু শুধু আমার

আম্মু। সে যা করে আমিও তাই করব। আমার

বন্ধুরা সাইকেল

চালাতে পারতো আমি পারতাম না।

ওদের বাবা/ ভাইরা ওদের

ধরে ধরে সাইকেল

চালানো শিখিয়েছিল।

আমাকে কে শিখাবে? আমার

বন্ধুরা আমাকে লজ্জা দিত।

মেয়েরা সাইকেল

চালাতে পারে আমি পারিনা। একদিন

জায়নামাজে বসে মোনাজাত

ধরে আম্মুর মত কাঁদতে কাঁদতে আল্লাহ

কে বললাম, আল্লাহ সবাই

আমাকে লজ্জা দেয়

তুমি আমাকে সাইকেল

চালানো শিখিয়ে দাও। খুব কাঁদলাম।

আম্মুকে প্রায়ই দেখতাম নামাজ পড়ে এই

ভাবে কাঁদত। কেন কাঁদত তখন জানতাম

না। সত্যি একটা মিরাকেল ঘটলো।

আমাদের নাইটগার্ড মামার

একটা সাইকেল ছিল।

আমি ঠেলতে ঠেলতে ঐ সাইকেলের

মাঝখানে বড় ফাঁকার

মাঝদিয়ে চালাতে শিখে গেলাম

একা একাই। যে আনন্দ পেয়েছিলাম

তা বোঝাতে পারবো না। এরপর

ছিটে উঠে কেমন করে চালাব?

কাউকে তো ধরা লাগবে।

যদি পড়ে যেয়ে ব্যাথা পাই?? এই

ভয়ে আর লজ্জায় কারও কাছে গেলাম

না। একদিন নাইটগার্ড মামার মেয়ে আর

আমার এক বান্ধবী (ওরা দুইজনই সাইকেল

চালাতে পারত)

এসে আমাকে ছিটে উঠিয়ে দিয়ে ধরে

রাখল। আমি প্যাডেল

দিতে দিতে এগুতে থাকলাম। এক সময়

ওরা ছেড়ে দিয়েছে কিন্তু

আমি পড়ে যাচ্ছিনা। শিখে গেলাম

সাইকেল চালানো। আমার জীবনের

বেশিরভাগ জিনিস আমি শিখেছি আমার

মায়ের কাছ থেকে। এই জন্য আমার

আচরণে মেয়েলি ভাব অনেক বেশি।

আমি ছোটবেলা থেকেই দেখেছি শুধু

আমার মাকে। বাবা কি বা কেমন হয়

আমি জানিনা। অনেকদিন পর্যন্ত

আমি জানতাম না মেয়ে আর

ছেলে আলাদা। আমি জানতাম

পৃথিবীতে শুধু সবার মা থাকে।

বাবা কোথা থেকে আসে তার

সাথে কি সম্পর্ক হয়। তার আচরণ কেমন হয়

আমি কোনদিন দেখিনি। আমার ভাই

থাকতো দূরে।

ভাইয়ুকে আমি পেয়েছি ক্লাস

এইটে এসে। তাহলে পুরুষ নামক প্রানীর

আচরন যে ভিন্ন হয় জন্ম নেয়ার পর

থেকে আমি দেখিনি তাহলে শিখব

কি ভাবে? তবে সেটা শিখেছি ক্লাস

এইটের পর থেকে। খুব কঠিন ভাবে, কষ্ট

পেয়ে পেয়ে শিখেছি।

আমি সত্যি অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকতাম

যখন ওদের বাবা হাতে করে কিছু

নিয়ে আসত

ওরা খেলাধুলা ফেলে ছুটে চলে যেত

তার কাছে। বুঝতাম না আমার বন্ধুরা কেন

বাবার ভয়ে তটস্থ হয়ে থাকত আবার কেন

তার কাছেই সব আবদার করত। আমার

ভাইয়ুকে নিয়ে আম্মু ঝিনাইদাহ

তে একটা প্রি ক্যাডেট

স্কুলে ভর্তি করে দিল। সেখানে বাবার

নাম লিখতে যেয়ে আমার ভাইয়ু প্রচণ্ড

কান্নাকাটি করে। সেখানকার

শিক্ষকরা এবং আমার আম্মু কেউ

তাকে আর থামাতে পারেনা। আমি তখন

অনেক ছোট। ভাইয়ুর

কান্না দেখে আমার অনেক কষ্ট হচ্ছিল।

কিন্তু সে কেন আব্বুর জন্য

কাঁদে তা আমি সে সময় বুঝতে পারিনি।

আমার বন্ধুদের অনেকের থেকেই

আমি আমাকে আলাদা করে পেয়েছি।

সবাই কেমন যেন নিশ্চিন্ত। কোন

চিন্তা ভাবনা না করেই যে কোন কাজ

হুট করে করে ফেলে। ফলাফল ভাবেনা।

আমি সবসময় আতঙ্কে থাকতাম। আজও

থাকি। কি হবে। আর কোন কারণ ছাড়াই

একধরনের অভাববোধ কাজ করে। কি যেন

নেই আমার। আম্মু তার সমস্ত

জীবনটা দিয়ে দিল তার পরেও যেন

সেখানে একটা ঘাটতি আমি ফিল

করি কিন্তু বোঝাতে পারিনা। ভাইয়ুর

উপর ক্ষোভটা চরম আকার ধারণ করে।

ভাইয়ুও যেন কেমন ।

আমি তাকে যেভাবে চাই সে তেমন

না, সে তার মত

করে আমাকে বোঝে কিন্তু আমার মত

করে আমাকে বোঝে না। আমি ছোট

বেলা থেকেই কি যেন মিস করি। আজও

আমার সেই জিনিস টা খুঁজে পাইনা।

একটা নিশ্চয়তা, একটা নির্ভরতা।

মানে এমন কোন কিছু

যেটা থাকলে আমার মনে হবে আমার

কোন সমস্যা হলে এই

জিনিসটা আমাকে বাঁচাবে। আমি সেই

নিশ্চয়তা কোথাও খুঁজে পাইনি। আমার

কোথায় যেন

একটা সমস্যা আছে ঘাটতি আছে। কষ্ট

আছে কিন্তু আমি বুঝিনা। আত্মীয়-স্বজন,

বন্ধু-বান্ধব সবার মাঝে আমি খুঁজি কিন্তু

কোন দিনই পাই না। আমি খুবই ইমোশনাল।

ভিতরে ভিতরে প্রচণ্ড জেদি। কোথাও

কোন কষ্ট পেলে আম্মু আর ভাইয়ু কে কষ্ট

দিতে মন চায়। খালি মনে হয় সবাই

কে ছেঁড়ে অনেক দূরে চলে যাব।

যেখানে কেউ আমাকে চেনে না।

কেমন যেন বাচ্চা বাচ্চা টাইপ আচরণ।

কেন আমি এরকম?? কেন মনে হয় কেউ

আমার আপন না। জানিনা।সব মানুষের

সাথে মিশতে ইচ্ছে করে।

সবাইকে জানতে ইচ্ছে করে। পরিচিত

অপরিচিত সবার মাঝেই আমি যেন

কি একটা খুঁজি। কিন্তু পাইনা।

জাহাঙ্গীরনগরে চতুর্থ বর্ষে পড়ার সময়

হুমায়ূন আহমেদের একটা উপন্যাস

পড়ি নামটা সম্ভবত, 'তোমাকে'

অথবা 'ছেলেটি',

উপন্যাসে একটা বাচ্চা ছেলের

ডিভোর্স হওয়া চিত্রশিল্পী বাবা আর

ধনী মায়ের গল্প লেখা হয়েছে।

উপন্যাস টা পড়ে আমি অনেক্ষণ স্তব্ধ

হয়ে বসে ছিলাম। ঐ বাচ্চাটার

সমস্যা আর আমার সমস্যার মাঝে তেমন

পার্থক্য নেই। পার্থক্য সে ছোট আর

আমি অনেক বড়। আমি বুঝলাম

আমি বাবা কি জিনিস

জানিনা বা বুঝিনা। কিন্তু আমার

অন্তরালের আমি নিশ্চিন্ত আর

নির্ভরতার কাউকে খুঁজে বেড়ায়। এই

নিশ্চিন্ত আর নির্ভরতার মানুষটাই হয় সবার

বাবা, জন্মদাতা। যা আমি বুঝিনা কিন্তু

আমার ভেতরটা বোঝে এবং আমৃত্যু

খুঁজে যাবে। এই প্রকৃতি আমি বোঝার

আগেই আমার বাবাকে আমার কাছ

থেকে অনেকদূরে নিয়ে গেছে। আমার

বাবা আমার প্রথম জন্মদিনে মারা যান

স্ট্রোক করে।

ইংরেজি তারিখে দুইদিনের পার্থক্য।

কিন্তু বাংলা একই দিন। আমার আত্মীয়-

স্বজন বাসায় এসেছিল আমার জন্মদিন

পালন করতে কিন্তু সবাই আমার বাবার

লাশ নিয়ে ফিরে যায়। আমাদের বাসায়

কোনদিন আমার জন্মদিন পালন

করা হয়নি আর হবেও না।

আমি নাকি দেখতে অনেকটাই আমার

বাবার মত। কিন্তু আমি জানিনা, কোনদিন

মিলিয়ে দেখতে পারিনি।

ছবি দেখে মেলাই কিন্তু বুঝিনা। আমার

কাছে মা,বাবা বলতে একজন সে আমার

মা। এক বছর আর চার বছর বয়সের শিশু

বাচ্চাদের নিয়ে যে যুদ্ধ

সে করেছে তা বোঝানোর ক্ষমতাও

আমার নেই। বাবার কবরের

কাছে যেয়ে মাটিতে হাত

দিয়ে অনুভব করি এই যে আমার

সারা জীবনের নিশ্চয়তা আর

নির্ভরতা এইখানে ঘুমিয়ে আছে।

আমি তাকে খুঁজে বেড়াই

মানুষে মানুষে...

By:

Md Mamunur Rashid Rajib

মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.