নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

আমি ও বলতে চাই !

ওয়াসিম ফারুক হ্যাভেন

ব্লগিং হউক সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার।

ওয়াসিম ফারুক হ্যাভেন › বিস্তারিত পোস্টঃ

ভয়ের সংস্কৃতি নয়, চাই জবাবদিহিমূলক রাজনীতির বাংলাদেশ

১০ ই এপ্রিল, ২০২৬ বিকাল ৪:৩৫

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান কেবল একটি সরকারের পতন ছিল না, এটি ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসের এক অন্ধকার অধ্যায়ের অবসান। পনের বছরের দীর্ঘ আওয়ামী দুঃশাসন যেভাবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী বা দীর্ঘস্থায়ী করার চেষ্টায় লিপ্ত হয়েছিল, তা গণতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থায় বিরল। শেখ হাসিনা তাঁর ক্ষমতাকে দীর্ঘস্থায়ী করতে মানুষের বাকস্বাধীনতা, মানবাধিকার এবং গণতন্ত্রকে কেবল হরণই করেননি, বরং পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রকে একটি নিপীড়নমূলক কাঠামোতে রূপান্তর করেছিলেন। গুম, খুন এবং বিনা বিচারে আটকের সংস্কৃতি জনমনে এক বিভীষিকা তৈরি করেছিল। কিন্তু ইতিহাস আমাদের বলে দেয় , অস্ত্রের মুখে বা ভয়ের রাজত্ব কায়েম করে কোনো শাসকই দীর্ঘকাল টিকে থাকতে পারে না। চব্বিশের আগস্টে সেই প্রবল দম্ভের পতন ঘটে এবং শেখ হাসিনাসহ তাঁর দোসরদের ক্ষমতাচ্যুত হয়ে দেশ ছাড়তে বাধ্য হতে হয়। এই ঐতিহাসিক পটপরিবর্তন বর্তমান ক্ষমতাসীন বিএনপি এবং বিশেষ করে জনাব তারেক রহমানের জন্য যেমন উদ্দীপনার, তেমনই গভীর সতর্কবার্তার ও বটে ।

​শেখ হাসিনার পতনের কারণগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তিনি কেবল জনবিচ্ছিন্নই হননি, বরং জনগণের সঙ্গে রাষ্ট্রের যে মৌলিক বিশ্বাস বা " 'সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট " থাকে, তা পদদলিত করেছিলেন। রাজনৈতিক দার্শনিক জাঁ-জ্যাক রুশোর মতে, "পাবলিক উইল " বা জনগণের ইচ্ছাই হলো ক্ষমতার প্রকৃত উৎস। শেখ হাসিনা যখন পরপর তিনটি নির্বাচনে জনগণের ভোটাধিকার কেড়ে নিয়ে একদলীয় শাসন কায়েম করেন, তখনই তিনি নৈতিকভাবে ক্ষমতা হারান। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্যামুয়েল পি. হান্টিংটন তাঁর " পলিটিক্যাল অর্ডার ইন চেঞ্জিং সোসাইটিজ " গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, যখন কোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থা তার জনগণের আকাঙ্ক্ষা ধারণ করতে পারে না এবং সংস্কারের বদলে দমনের পথ বেছে নেয়, তখন সেই কাঠামো ধসে পড়ে। বাংলাদেশে শেখ হাসিনার শাসনামলের পনের বছর ধরে রাষ্ট্রীয় বাহিনীকে দলীয় সন্ত্রাসীর মতো ব্যবহার করে এবং দুর্নীতির স্বর্গরাজ্য তৈরি করে ক্ষমতার চূড়ায় বসেছিলেন যারা, তারা তাদের ক্ষমতাকে শেষ রক্ষা করতে পারেননি। জাতীয় মসজিদের খতিব থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ কর্মকর্তা পর্যন্ত যারা এই অপশাসনের দোসর ছিলেন, তাদের পলায়ন প্রমাণ করে যে অন্যায়ের ভিত্তি কতটা নড়বড়ে।
​বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিএনপি এবং এর শীর্ষ নেতৃত্বের জন্য ২০২৪-এর এই অভ্যুত্থান একটি আয়নার মতো। পনের বছর রাজপথে লড়াই করা একটি দল হিসেবে বিএনপিকে এখন সবচেয়ে বড় সতর্কবার্তা দিচ্ছে খোদ এই অভ্যুত্থানের চেতনা। মানুষ কেবল একটি পতাকাবাহী দলের পরিবর্তন চায়নি, তারা চেয়েছিল ব্যবস্থার পরিবর্তন। শেখ হাসিনার শাসনামলে জোরপূর্বক গুম বা নিখোঁজ হওয়ার অভিযোগ একটি দীর্ঘস্থায়ী ও বিতর্কিত বাস্তবতায় পরিণত হয়েছিল।
বিএনপি নেতা চৌধুরী আলম, এম ইলিয়াস আলী, সালাহউদ্দিন আহমেদ কিংবা যুদ্ধাপরাধ মামলায় দণ্ডিতদের স্বজন হুম্মাম কাদের চৌধুরী, ব্যারিস্টার মীর আহমেদ বিন কাশেম আরমান এবং আমান আজমীর কিংবা সাংবাদিক শফিকুল ইসলাম কাজল ও লেখক ফরহাদ মাজহারের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাগুলো জনমনে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করেছিল। সাজেদুল ইসলাম সুমন, সম্রাট মোল্লা কিংবা খালেদ হাসান সোহেলের মতো নিখোঁজ হওয়া শত শত মানুষের পরিবারের হাহাকার আজও বাতাসে ভেসে বেড়ায়। আয়নাঘর নামক গোপন বন্দিশালার বিভীষিকা প্রকাশ পাওয়ার পর এটি স্পষ্ট হয় যে, রাষ্ট্র কীভাবে তার নিজের নাগরিকদের ওপর মধ্যযুগীয় বর্বরতা চালিয়েছে। বিএনপির নেতৃত্বের জন্য এখান থেকে বড় শিক্ষা হলো আইনের শাসন ও মানবাধিকারের প্রশ্নে কোনো আপস করা যাবে না। দার্শনিক জন লকের মতে, সরকারের একমাত্র উদ্দেশ্য হলো মানুষের জীবন, স্বাধীনতা ও সম্পদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা। সরকার যখনই এই কাজে ব্যর্থ হয় এবং নিজেই অধিকার হরণকারী হয়ে ওঠে, তখনই জনগণের বিদ্রোহ করার অধিকার বৈধ হয়ে যায়। তাই বর্তমান সময়েও ভিন্নমতের কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা করা হয়, তবে তা হবে চব্বিশের শহীদদের রক্তের সাথে চরম বিশ্বাসঘাতকতা। সম্প্রতি ভোলার বিবি সওদা বেগমকে সাইবার নিরাপত্তা আইনে আটক পরে আদালত কতৃক জামিনে মুক্তি কিংবা মুন্সিগঞ্জে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমানকে সমালোচনার দায়ে তার দলের স্হানীয় নেতা কর্মীরা মব সৃষ্টি করে শাওন মাহমুদ শুভ নামের যুবককে আটকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া এমনকি
ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে আপত্তিকর পোস্ট শেয়ার করার অভিযোগে আজিজুল হক নামের এক যুবককে পুলিশের গ্রেফতার এই ঘটনাগুলো প্রশ্ন তুলছে আমরা কি তবে সেই পুরনো পথেই হাঁটছি?

​রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জুয়ান লিনজের মতে, স্বৈরাচারের পতনের পর যদি নতুন সরকার একই হাতিয়ার ব্যবহার শুরু করে, তবে তা পুনরায় একটি হাইব্রিড বা পূর্ণ স্বৈরতন্ত্রের দিকে ধাবিত হয়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান এবং বিএনপির বর্তমান নেতৃত্বকে এটি স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করতে হবে যে, বাকস্বাধীনতা মানেই হলো আপনাদের কঠিন সমালোচনা করার অধিকার। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বা সাইবার নিরাপত্তা আইনের মাধ্যমে যেভাবে লেখক মুশতাক আহমেদকে কারান্তরালে প্রাণ দিতে হয়েছে কিংবা আহমেদ কবির কিশোরের মতো শিল্পীকে নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে, সেই ইতিহাস থেকে বিএনপিকে শিক্ষা নিতে হবে। রাজনৈতিক নেতৃত্বের অবমাননার দোহাই দিয়ে যদি সাধারণ নাগরিককে আইনের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়, তবে শেখ হাসিনার প্রবর্তিত সেই " ভয়ের সংস্কৃতি " আর বর্তমানের মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকবে না। ফরাসি দার্শনিক ভলতেয়ারের সেই বিখ্যাত উক্তি " আমি তোমার মতের সাথে দ্বিমত পোষণ করতে পারি, কিন্তু তোমার কথা বলার অধিকার রক্ষার জন্য আমি আমার জীবন দিতে পারি " একটি সচল গণতন্ত্রের মূলমন্ত্র হওয়া উচিত। ​চব্বিশের আন্দোলনের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তরুণ প্রজন্ম বা জেন-জি । এই প্রজন্ম কোনো ব্যক্তি বা দলপূজায় বিশ্বাসী নয়, তারা জবাবদিহিতায় বিশ্বাসী। তাই বর্তমান ক্ষমতাসীন বিএনপি ও জনাব তারেক রহমানের সরকারকে এই প্রজন্মের চিন্তা ধারাকে অবশ্যই সম্মান করতে হবে। আর লর্ড অ্যাকটনের সেই অমোঘ সত্য " ক্ষমতা মানুষকে কলুষিত করে, এবং নিরঙ্কুশ ক্ষমতা সম্পূর্ণরূপে কলুষিত করে।" সবসময় স্মরণে রাখতে হবে। রাষ্ট্রযন্ত্রকে দলীয় বাহিনীতে রূপান্তর করার যে সংস্কৃতি আওয়ামী লীগ রেখে গেছে, তা উপড়ে ফেলাই বিএনপির এখনকার প্রধান কাজ হওয়া উচিত। পুলিশ বা প্রশাসনকে যদি আবারও বিরোধী মত দমনে বা ব্যক্তিগত আক্রোশ মেটানোর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তবে জনগণের ক্ষোভ আবারও রাজপথে আছড়ে পড়তে দেরি হবে না। চব্বিশের অভ্যুত্থান শিখিয়েছে যে, শাসকের দম্ভের চেয়ে জনগণের ঐক্য অনেক বেশি শক্তিশালী। ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ও প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা নিশ্চিত করাই হবে শেখ হাসিনার উত্তরাধিকার থেকে বেরিয়ে আসার একমাত্র পথ।

​পরিশেষে বলবো, ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট শেখ হাসিনার পলায়ন কেবল একটি ব্যক্তিগত পরাজয় নয়, এটি ছিল অহংকার ও অন্যায়ের পরাজয়। বিএনপি ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমানের সামনে এখন বিশাল সুযোগ একটি বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক এবং বাকস্বাধীনতাপূর্ণ বাংলাদেশ গড়ার। কিন্তু তার জন্য প্রথম শর্ত হলো সহনশীলতা। রাজনৈতিক নেতাদের নিয়ে কার্টুন আঁকা বা ফেসবুকে সমালোচনা করা কোনো অপরাধ নয়, বরং এটি একটি সুস্থ গণতন্ত্রের অলংকার। ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত স্বৈরাচারের পথে না হেঁটে, দার্শনিক জন লকের সেই আদর্শে উদ্বুদ্ধ হতে হবে যেখানে রাষ্ট্র হবে জনগণের সেবক, মালিক নয়। চব্বিশের বিপ্লব থেকে নেওয়া শিক্ষাই হোক আগামীর বাংলাদেশের মূল চালিকাশক্তি যেখানে কোনো মা-বোনকে সরকারবিরোধী পোস্টের জন্য জেলে যেতে হবে না এবং কোনো যুবককে নেতার সমালোচনা করার দায়ে শিকল পরতে হবে না। তবেই এই রক্তস্নাত স্বাধীনতার সার্থকতা বজায় থাকবে এবং বিএনপি জনগণের প্রকৃত আস্থার ঠিকানায় পরিণত হবে।

মন্তব্য ১ টি রেটিং +১/-০

মন্তব্য (১) মন্তব্য লিখুন

১| ১০ ই এপ্রিল, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:০৭

মোঃ খালিদ সাইফুল্লাহ্‌ বলেছেন: বি এন পি কে সতর্ক হতে হবে, যেন তাদের পালিয়ে যেতে না হয়। তারা কোন পথে হাটছেন বুঝতে খুব দীর্ঘ সময় লাগার কথা না! এখনই সতর্ক না হলে তারাও দেশবাসীর কাছে পরিত্যক্ত বলে বিবেচিত হবেন।

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.