| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
সে প্রায় দেড় যুগ আগের কথা, আমি তখন কেবল নিজে নিজে পড়তে শিখেছি। আমার নানা একটা স্কুলের হেডমাস্টার ছিলেন। তার বদৌলতে আমি আমার নানার কাছ থেকে একটা গল্পের বই পাই। বইটা একটা গল্প ছিল ইরানের বিখ্যাত কবি শেখ সাদীর “পোশাকের মর্যাদা”। আমার যুগের খুব কমই ছাত্র পাওয়া যাবে যে এই গল্পটা না পড়ে এসেছে।
যাইহোক, পোশাক এবং মর্যাদা, এই দুটার গুরুত্ব তখন থেকেই শিখে এসেছি।
আজকে দৈনিক ইনকিলাব একটা সংবাদের শিরোনাম পড়লাম। “ধর্মীও পোশাকের বিরুদ্ধে আইইউবিএটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি আলিমুল্লা মিয়ানের যুদ্ধ ঘোষণা।”
পাঠক, এখন যা পড়বেন তা একান্তই আমার ব্যক্তিগত মতামত। আমার জ্ঞান ও বিদ্ধামত্তায় আমি আমার মতামত বিশ্লেষণ করলাম।
বিশ্ববিদ্যালয় এমন একটা পাঠদান কেন্দ্র যেখান থেকে পড়াশুনা শেষ করা মাত্রই একটা ছাত্র চাকরির বাজারে নামে এবং আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে “ড্রেসকোড” নামের একটা ইস্যু আজকে প্রশ্নের মুখে।
পাঠক, লক্ষ্য করুন, চাকরির ক্ষেত্র গুলোতে পোশাক-পরিচ্ছদের গুরুত্ব কতখানি? আপনি একটা ব্যাংকে টাকা তুলতে যান, সেখানকার অফিসার, হসপিটালের ডাক্তার, রিসিপ্সনিস্ট থেকে সুরু করে শিক্ষক এমনকি অফিসের কেরানী পদে যারাই থাকেন না কেন, সবারই পোশাকটা মার্জিত হওয়া চাই। অফিসের বড় সাহেবদের কথা বাদই দিলাম।
আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩ ক্রেডিটের কোর্স করানো হয় শুধুমাত্র এবং শুধুমাত্র ছাত্রছাত্রীদের চাকরির বাজারের জন্য প্রস্তুত করতে এবং একজন ভাল এন্টারপ্রেনারের গুণাবলীগুলো সেখাতে। এইটারই একটা অংশ “ড্রেসকোড।”
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, “ইসলামি পোশাকে কেন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করা যাবে না?”
অনেক গা গরম করা প্রশ্ন বটে!
কিন্তু আমার প্রশ্ন, ইসলামকে কেন পোশাকের গণ্ডীতে আবদ্ধ করে রাখা হবে?
আমি সপ্তম শ্রেণী থেকে শহরের স্কুলে পড়া শুরু করি। এর আগ আমার গ্রামের স্কুলে স্কুল ড্রেস বাধ্যতামূলক ছিলনা।(কিন্তু এখন তা বাধ্যতামূলক)। আমরা স্কুল ড্রেসটা কেন পরতাম? সোজা কথা, কে বড়লোকের ছেলে কে গরীব ঘরের ছেলে সেটা যেন শিশু-কিশোর শিক্ষার্থীদের মনে প্রভাব ফেলতে না পারে।
দেখুন, আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে একটা ছেলে ১.৫ লক্ষ্য টাকায় স্নাতক শেষ করতে পারে।কারনে এখানে অনেক গরীব ঘরের ছেলে আসে। পাশাপাশি এখানে অনেক ধনী বাবার ছেলেরাও পড়তে আসে।এই বিশ্ববিদ্যালয় সবাইকে মোটামুটি ৩ থেকে ৪ হাজার টাকার পোশাকের খরচ করায়। এটা করানো হয়ই শুধুমাত্র ছাত্রছাত্রীদের মধ্যকার বৈষম্য দূর করার জন্য।
আসুন, এখন কিছু উদাহরন দেখি ও বিশ্লেষণ করি।
ক। নবীজি (সাঃ) কী পড়তেন? জুব্বা নাকি পায়জামা-পাঞ্জাবী?
এই ব্যাপারে আমার সঠিক জ্ঞান নাই। যদি নবীজি (সাঃ) পাঞ্জাবীই পরে থাকতেন, তাহলে মধ্যপ্রাচ্চের বেশীরভাগ মুসলিমরা কেন জুব্বা পরেন? যদি নবীজি (সাঃ) জুব্বাই পরতেন, তাহলে দক্ষিন ও দক্ষিন পূর্ব এশিয়ার মুসলিমরা কেন পাঞ্জাবী পরেন। যদি নবীজি (সাঃ) জুব্বা ও পাঞ্জাবী উভয়ই পরতেন, তাহলে আমার নবীজি(সাঃ) এর জীবনী বিশ্লেষণ করে পাই, মুমিন-মুসলমান হতে হলে পোশাকটা বাধ্যতামূলক নয়, পোশাক ইসলামের ৫ টি স্থম্ভের একটি নয়।
খ। ইসলামী ব্যাংক, ইবনেসিনার মত ইন্সিটিউটগুলোর অবস্থা কেমন?
ইসলামী ব্যাংক, ইবনেসিনার মত ইন্সিটিউটগুলোর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ন্যূনতম ৭০% অফিসিয়াল ড্রেসকোড অনুসরণ করে এবং তারা অফিসিয়ালি জামাতের সাথে অফিসের মধ্যে নামাজ পরেন। উনাদের কর্মকর্তা-করমচারীদের মধ্যে অনেক আলেম ওলামা আছেন। তারা কেন সবাই পাঞ্জাবী-পায়জামা পরেন না? উত্তর একটাই, আমি আল্লাহর গোলাম, আল্লাহ্কে সিজদা করার সময় পাঞ্জাবী কিংবা জুব্বাই পরতে হবে এমন কোন কথা নেই।
গ। আসেন এখন পৃথিবীর সবচেয়ে উন্নত, শিক্ষিত এবং সুসংগঠিত মুসলিম রাষ্ট্রের দিকে তাকাই। রাষ্ট্রটির নাম ইরান। তাদের দিকে তাকিয়ে দেখুন, মেয়েদের পোশাক কতটুকু মার্জিত হতে পারে তারা দেখিয়েছে। ছেলেরা কর্মক্ষেত্রে কী পোশাক পরছে? আমার জানা নেই আয়াতুল্লাহ রুহুলুল্লাহ খমিনি এমন কোন ফতোয়া দিয়েছেন যে যারা পাঞ্জাবী/জুব্বা পরবে না তারা মুসলিম না।বরং আমি ইরানের প্রমীলা ফুটবলারদের টাইস পরে ফুটবল খেলতে দেখেছি।কই, ইরানের প্রমীলা ফুটবলারদের বীরুধে আয়াতুল্লাহ রুহুলুল্লাহ খমিনিতো কোন ফতোয়া দেন নি! ইরান দেখিয়েছে, কী করে ধর্ম ও জীবনকে সুন্দর করে পালন করা যায়।
আচ্ছা, সৌদিআরবের বেশীর ভাগ মানুষ যে সুন্নত নামাজ পরেন না, তাতে কি তারা অমুসলিম হয়ে গেছে? কিন্তু অবশ্যই আমরা শ্রেষ্ঠ মুসলিম হব, অন্তত সৌদিআরবের মুসলিমদের চেয়ে।
আসলে সমস্যাটা কোথায়?
সবচেয়ে বড় সমস্যা(যদিও আমি এই সমস্যাটার জন্য আমি গর্বিত) আমরা মুসলিমরা অনেক বেশি “ধর্ম ভীরু।” এই ভীরুতার কারন আমরা আমাদের ধর্মকে পৃথিবীর যেকোনো জাতীর যেকোনো ধর্মের চেয়ে বেশী শ্রদ্ধা, ভক্তি ,মনে পোষণ এবং পালন করি। এই ভীরুতা সুযোগটা নিয়ে কিছু অর্ধশিক্ষিত স্বার্থন্যাসী লোকজন স্বার্থ খুজছে। হায়, আমরা এতই ভীরু যে ধর্মের কাছে আমার সাধারন জ্ঞান লোপ পেয়েছে! কিন্তু ধর্মের জ্ঞানতো আমাকে আরও সমৃদ্ধ করার কথা!
দেখুন, আমরাও খুব শিক্ষিত নই। তাই বলে এত্ত মূর্খও নই যে “পাঞ্জাবি/লং বোরখার গ্রহণযোগ্যতা না দেয়া মানে ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা।”
শেখ সাদীর “পোশাকের মর্যাদা” গল্পের শিক্ষা থেকেই বলছি, ধর্ম মানুষের, পোশাকের নয়। এখনও এমন অবস্থা হয়নি যে শুধু মাত্র পাঞ্জাবী পরা মানুষ দেখলেই আমরা সালাম দেই, আমরা আমাদের বাবা/মা, শিক্ষক/শিক্ষিকা, গুরুজন আত্মীয় এমনকি অপরিচিত যে কাওকে তার পোশাক দেখে সালাম দেই না। তাহলে পোশাকটা এত্ত গুরুত্ব পাচ্ছে কী করে!
আমি ছোটো ১টা আয়াত আর ১টা হাদিস জানি, ১। আল্লাহ্ স্বয়ং কোরআন এর রক্ষক, ২। বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হত্যার চেয়েও জঘন্ন অপরাধ।
সম্ভব হলে এই দুইটা মেনে চলেন। না পারলে উগ্রবাদী এবং মিথ্যা সংবাদ ছাপানো বন্ধ করুন। 
©somewhere in net ltd.