| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
নদীর হাওয়া, মনসুরের রক্ত আর ক্রুশের আর্তনাদ: পড়শীর খোঁজে এক অন্তহীন যাত্রা
কুষ্টিয়ার ধুলোমাখা বাতাসে লালনের গান যেন এক চিরন্তন দীর্ঘশ্বাস। ঘরের কপাট খুললেই কালী নদীর হাওয়া কিংবা ছেউড়িয়ার মাজারের চেনা গন্ধ—মাঝে মাঝে দূর থেকে ভেসে আসা একতারার ধিমিক ধিমিক রিনঝিন শব্দ—সব মিলিয়ে মনটা কেমন যেন আনমনা হয়ে যায়। আমি তো কোনো গবেষক বা লালন বিশ্লেষক নই। কেবল কুষ্টিয়ার মাটিতে বড় হওয়ার সুবাদে লালনের গানগুলো রক্তের ভেতরে এক অন্যরকম আলোড়ন তোলে। মাঝে মাঝে গভীর রাতে আনমনে ভাবি, এই যে ফকির লালন গেয়ে গেছেন—“বাড়ির কাছে আরশী নগর / সেথা পড়শী বসত করে...”—এর আসল অর্থ কী?
মনের আয়না আর সেই অধরা পড়শীঃ
আরশি মানে তো আয়না। লালন আসলে সেই মনের আয়নার কথা বলেছেন, যেখানে বস্তুগতের সমস্ত কল্পনা, অনুভূতি আর দৃশ্যপট ছবির মতো প্রতিফলিত হয়। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই আরশিনগরের ভেতর বাস করেন এক 'পড়শী'। মানুষটার হাত নেই, পা নেই, ছোঁয়া যায় না, ধরা যায় না। অথচ তিনি বাস করেন ঠিক আমাদের বুকের ভেতরেই।
পড়শীর কাছে পৌঁছানোর পথ বড় কঠিন, হাজারো বাধার প্রাচীর। তবুও চরম আকুতি নিয়ে সাধক বসে থাকেন একটু দেখা পাওয়ার আশায়। তাঁর বিশ্বাস ছিল—“পড়শী যদি আমায় ছোতো / যম যাতনা সকল যেত, দূরে।” মৃত্যুর ভয় বা জীবনের সব যন্ত্রণা মুছে যাওয়ার ওই একটাই তো আকুতি!
রুমির ব্যাকুলতা আর মনসুরের আত্মাহুতিঃ
শুধু লালন নন, সুফি সাধক মাওলানা জালাল উদ্দিন রুমি যুগের পর যুগ এই পড়শীকে খুঁজে ফিরেছেন অদ্ভুত এক ব্যাকুলতায়। তিনি আকুতিভরে বলেছেন, "প্রভু, তুমি তো সব জায়গায় বিরাজমান। তবুও আমি তোমাকে পাগলের মতো খুঁজছি।" আবার পরম আত্মবিশ্বাসে এও বলেছেন, "আমি প্রভুকে বললাম, আমি তোমাকে জানার আগে মরবো না! প্রভু উত্তর দিলেন, যে আমাকে জানে সে কখনো মরে না!"
এই পড়শীকে খুঁজতে খুঁজতে, তাঁর সাথে মিলনের নেশায় বুঁদ হয়ে একদিন সুফি মনসুর আল-হাল্লাজ বলেই ফেললেন সেই মারাত্মক কথা—"আলাল হক্ক" (আমিই পরম সত্য)।
ব্যস, বাঁধলো বিপত্তি! সুফিরা জানতেন মনসুর ঠিক কোন গভীরতা থেকে এই কথাটি বলেছিলেন। আল্লাহর সাথে নৈকট্যতা যখন এতটাই গভীর হয়ে ওঠে যে সাধক নিজের অস্তিত্ব ভুলে কেবল তাঁকেই অনুভব করেন, তখন আর আলাদা কিছু থাকে না। কিন্তু বাহ্যিক বিচারব্যবস্থা তো আর সে কথা বোঝে না। শুরু হলো বিচার, ১১ বছরের কারাবাস।
আর তারপর এল সেই ৯২২ খ্রিষ্টাব্দের ২৬শে মার্চ। জনসমক্ষে সরকারি নির্দেশে চলল নির্মম নিষ্ঠুরতা। একে একে এক হাজার বেত্রাঘাত, হাত-পা বিচ্ছিন্ন করা, মুণ্ডুচ্ছেদ—সবশেষে দেহ পুড়িয়ে ছাই দজলা নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হলো। আর কাটা মুণ্ডু ঝুলে রইল ইরাকের এক সাঁকোর ওপর। দজলার স্রোত তখনো হয়তো লালনের সেই সুরের মতো ফিসফিস করে বলছিল—যে রক্ত মাটিতে মিশে যায়, তা কভু ফুরোয় না, তা মৃত্তিকার গভীরে শিকড় ছড়িয়ে দেয়। পড়শীর সন্ধানে নামার এমন নির্মম পরিহাস মানব ইতিহাসে আর কটি আছে!
মেটালিক ঝংকার আর ক্রুশের অন্তিম হাহাকারঃ
পড়শীর খোঁজে যখন মন আনচান করে, ঠিক তখন কানের পর্দায় বেজে ওঠে সিস্টেম অফ এ ডাউন (System of a Down)-এর সেই চিরচেনা ধাতব ঝংকার। গিটারের আর্তনাদ আর ড্রামের ভারী ছন্দের সাথে গায়কের কণ্ঠ চিরে বেরিয়ে আসে সেই প্রশ্ন—
"Father, into your hands I commend my spirit...
Father, into your hands...
"Why have you forsaken me?"
আধুনিক মেটালের এই গোঙানি আর আজ থেকে দুই হাজার বছর আগের ক্যালভারি পাহাড়ের হাহাকার কি মূলত একই সুতোয় গাঁথা নয়?
আর তার প্রতিধ্বনিতেই যেন বুক চিরে বেরিয়ে আসে বাংলা তর্জমা—
"আমার ঈশ্বর, আমার ঈশ্বর, কেন তুমি আমাকে ত্যাগ করেছ?" — মথি ২৭:৪৬
এই লাইনগুলো শুধু কিছু শব্দের সমষ্টি নয়; এটি মানবাত্মার অন্তহীন এক হাহাকার। ক্রুশের ওপর দাঁড়িয়ে যিশু যখন এই আর্তনাদ করেছিলেন, তা ছিল নিছক কোনো সাধারণ অভিযোগ নয়। তিনি যেন সেদিন ক্রুশের কাঠে বিদ্ধ হয়ে মানবজাতির সমস্ত বুকভাঙা কষ্টের, চরম নিঃসঙ্গতার এবং অসহায়ত্বের একটি জীবন্ত প্রতিচ্ছবি ফুটিয়ে তুলেছিলেন। রক্তেভেজা সেই মুহূর্তে তিনি মানুষ হিসেবে অনুভব করেছিলেন চরম একাকিত্বের হিমশীতল স্পর্শ।
তবুও, সেই অন্তিম যন্ত্রণার অতলে ডুব দিয়েও তিনি জানতেন—এটি কোনো সমাপ্তি নয়, বরং এক আদিম মহাপরিকল্পনারই অমোঘ এক অধ্যায়। ঈশ্বর কি সত্যিই তাঁকে চিরতরে, চিরকালের মতো দূরে ঠেলে দিয়েছিলেন? না। মহাবিশ্বের পরম করুণাময় পিতা তাঁকে ভালোবাসায় ত্যাগ করেননি। মানুষের পাপের ভয়াবহতাকে মানুষের নিজস্ব আয়নায় স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে, আর মানবজাতির মুক্তির দুর্গম মূল্য চোকাতে যিশুকে পার হতে হয়েছিল সেই ভীষণ একাকী, তীব্র যন্ত্রণার পথ।
আমাদের প্রতিটি বুকফাঙা আর্তনাদ, নীরব কান্না আর হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম হওয়া বিশ্বাসের ভেতর দিয়ে সেই চিরকালীন সত্যটিই যেন আজও বেজে চলে—যে অন্ধকারের গভীরতম সুড়ঙ্গ পেরিয়েই তবে মিলবে মুক্তির আলো।
ফুরোবার নয় এই অন্বেষণঃ
লালনের গান, মনসুরের রক্ত কিংবা ক্রুশের যন্ত্রণাবিদ্ধ আর্তনাদ—সবকিছুর মূল সুর তো একটাই। পড়শী আজও অধরা, ব্যবধান ঘুচবার নয়, তবুও মনটা বারবার সেই অচিনপুরের পানেই ছুটে চলে। কারণ পড়শী বাইরের কেউ নন—তিনি আমাদেরই নিখোঁজ সত্তা, আমাদেরই আত্মশুদ্ধির আয়না। যতক্ষণ এই বুকে দীর্ঘশ্বাস আছে, ততক্ষণ এই পথচলাও থামবে না। এই চিরকালীন অন্বেষণ কি আদতে আমাদের সবার ভেতরের মুক্তিরই আর্তনাদ নয়?
২|
১৩ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৯:২৫
কামাল১৮ বলেছেন: বাস্তব আর কল্পনার মাঝে বিরাট একটা পা্র্থক্য আছে ,একটার শেষ আছে কল্পনার কোন শেষ নাই।
৩|
১৩ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৯:২৫
স্বপ্নের শঙ্খচিল বলেছেন: “বাড়ির কাছে আরশী নগর / সেথা পড়শী বসত করে...”
.....................................................................................
গানটি আমার ভালো লাগে, কিন্ত গভীরতম অধ্যায়ের প্রবেশ করার
সময় কোথায় ?
মনে র মাঝের ছন্দগুলো বেঁচে থাক সেটাই প্রার্থনা ।
©somewhere in net ltd.
১|
১৩ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ভোর ৫:২৩
ডঃ এম এ আলী বলেছেন:
মুল্যবান তথ্য ও ভাববাদী পোস্ট । মরমী ইতিহাসের এক দারুন অধ্যায় কে তুলে ধরেছেন ।
নসুর হাল্লাজ, রুমি ও লালন মরমী সাধনার এক অনন্ত সেতুবন্ধন।
মরমী সাধনার ইতিহাসে মনসুর হাল্লাজ, মাওলানা জালালুদ্দিন রুমি এবং বাংলার বাউলসম্রাট ফকির লালন শাহ
তিনটি ভিন্ন সময় ও ভূখণ্ডের তিন উজ্জ্বল নাম। তাঁদের মধ্যে সরাসরি সাক্ষাৎ বা ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল না; বরং
তাঁদের ভাবধারার মধ্যে খুঁজে পাওয়া যায় এক গভীর আত্মিক সাদৃশ্য নিজেকে অতিক্রম করে পরম সত্য, প্রেম
ও মানুষের অন্তরের মানুষকে খুঁজে পাওয়া।
মনসুর হাল্লাজ দেখালেন প্রেমের আত্মবিসর্জন।
নবম দশম শতকের সুফি সাধক হুসাইন ইবনে মনসুর আল-হাল্লাজ ছিলেন আত্মবিলীন প্রেমের এক অসাধারণ সাধক।
তাঁর বিখ্যাত উচ্চারণ “আনা আল-হক” তাঁর সময়ের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে প্রবল বিতর্ক সৃষ্টি করেছিল।
সুফি ব্যাখ্যায় এই উক্তিকে অনেক সময় ব্যক্তিগত ‘আমি’-এর বিলুপ্তি এবং পরম সত্যের মধ্যে আত্মবিলয়ের অভিজ্ঞতা
হিসেবে বোঝানো হয়।
দীর্ঘ কারাবাসের পর ৯২২ খ্রিস্টাব্দে বাগদাদে তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয় এই করুন দৃশ্য সুন্দর করে তুলে ধরেছেন।
তাঁর করুণ পরিণতি পরবর্তী সুফি সাহিত্যে হয়ে ওঠে প্রেমের জন্য আত্মবিসর্জন ও সত্যের পথে শাহাদাতের প্রতীক।
রুমি দিলেন হাল্লাজের আগুনকে প্রেমের ভাষা ।
হাল্লাজের মৃত্যুর প্রায় তিন শতাব্দী পরে জন্ম নেন মাওলানা জালালুদ্দিন রুমি। তাঁদের কোনো সরাসরি সাক্ষাৎ সম্ভব
ছিল না; কিন্তু হাল্লাজের মরমী ভাবনা রুমির যুগের সুফি জগতে জীবন্ত ছিল। রুমি তাঁর মসনভি-তে হাল্লাজ ও তাঁর
“আনা আল-হক” উক্তির প্রতি একাধিকবার ইঙ্গিত করেছেন।
রুমির কাছে মানুষের আসল পরিচয় তার বাহ্যিক ‘আমি’ নয় বরং সেই গভীর প্রেম, যেখানে নিজের অহংকার বিলীন
হয়ে যায়। অর্থাৎ হাল্লাজ যে সত্যকে নিজের জীবন দিয়ে প্রকাশ করেছিলেন, রুমি সেই সত্যকে কবিতা, প্রেম ও
আধ্যাত্মিক দর্শনের ভাষায় মানুষের কাছে পৌঁছে দেন।
তারপর বাংলার মাটিতেলালন শাহ।
এই মরমী ধারার সঙ্গে বাংলার ফকির লালন শাহের একটি ভাবগত সেতুবন্ধন কল্পনা করা যায় যদিউ তাদের মাঝে
ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার বা প্রত্যক্ষ প্রভাব ছিলনা ।
লালন শাহ কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়াকে কেন্দ্র করে তাঁর সাধনা ও গানের এক অনন্য জগৎ গড়ে তোলেন। তাঁর মরমীবাদে
সুফিবাদ, বৈষ্ণব সহজিয়া এবং বাংলার লোকজ আধ্যাত্মিকতার নানা উপাদানের সমন্বয় ঘটেছিল। তাঁর গানের মূল
অনুসন্ধান ছিল মানুষের নিজের ভেতরের সেই ‘মনের মানুষ’, সেই অচিন সত্তা যাকে বাইরে নয়, নিজের অন্তরেই
খুঁজে পেতে হয়।
লালনের মরমী দর্শনে দেহ কেবল দেহ নয় দেহের মধ্যেই সত্যের সন্ধান। বাউলরা বিশ্বাস করেন, মানুষের অন্তরের
মধ্যেই সেই অদৃশ্য পরম সত্তার সন্ধান পাওয়া সম্ভব; প্রেম, সাধনা, গুরু এবং আত্মঅনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে সেই
উপলব্ধির পথ খুলে যায়।
এই জায়গাতেই যেন হাল্লাজ, রুমি ও লালনের ভাবজগতের মধ্যে একটি অপূর্ব মিল খুঁজে পাওয়া যায়
হাল্লাজ বললেন নিজের ‘আমি’কে বিলীন করে সত্যের মধ্যে পৌঁছাও।
রুমি বললেন প্রেমের আগুনে অহংকার পুড়িয়ে প্রিয়তমের সন্ধান করো।
লালন বললেন দূরে কেন খোঁজো?যাকে খুঁজছ, সে তো তোমারই অন্তরে, তোমারই ‘মনের মানুষ’।
লালনের বাউলগান তাই শুধু গান নয়; এগুলো তাঁর সাধনার ভাষা। বাউলরা তাঁদের দর্শন, জীবনবোধ ও আধ্যাত্মিক
অনুসন্ধানকে গানের মধ্য দিয়েই প্রকাশ করেছেন। লালনের গানে প্রেম, মানবতা, দেহতত্ত্ব, গুরু, আত্মপরিচয় এবং
স্রষ্টার সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক বারবার ফিরে আসে।
এ যেন এক সুদূর মরমী সেতু
তাই ইতিহাসের বিচারে হাল্লাজ - রুমি- লালনকে কোনো সরল ধারাবাহিকতা বলা যাবে না। তাঁদের মধ্যে শত শত
বছরের ব্যবধান এবং ভিন্ন ভিন্ন সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল রয়েছে।
কিন্তু মরমী চেতনার স্তরে তাঁদের পাশাপাশি দাঁড় করালে এক আশ্চর্য সুর শোনা যায়
হাল্লাজের আত্মবিসর্জন,
রুমির প্রেমের দর্শন,
আর লালনের ‘মনের মানুষ’-এর অনুসন্ধান
তিনটিই যেন মানুষকে বাহ্যিক বিভাজন অতিক্রম করে নিজের অন্তরে ফিরে যেতে আহ্বান করে।
হাল্লাজের রক্তে যে প্রশ্ন লেখা হয়েছিল, রুমির কবিতায় তা প্রেমের ভাষা পেল; আর বহু শতাব্দী পরে বাংলার
মাটিতে লালনের একতারা সেই অন্তর্গত অনুসন্ধানকে মানুষের সহজ ভাষায় গেয়ে উঠল।
সত্যের পথ এক, তার ভাষা বহু।
কেউ তাকে বললেন ‘হক’,
কেউ বললেন ‘প্রেম’,
আর লালন বললেন‘মনের মানুষ’।
এইভাবেই প্রাচ্যের মরমী সাধনার দীর্ঘ ইতিহাসে হাল্লাজ থেকে রুমি, আর রুমি থেকে লালনের সঙ্গে ভাবগত
এক সেতুবন্ধন কল্পনা করা যায়—যেখানে ধর্মের বাহ্যিক পরিচয়ের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে মানুষ, প্রেম,
আত্মঅনুসন্ধান ও পরম সত্যের সন্ধান।
শুভেচ্ছা রইল