নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

জুয়েল তাজিম

জুয়েল তাজিম

অলস হবেন, তো হতাশা পাবেন। শুরু করুন,শেষ হবেই। সামনে এগোতে থাকুন, পথ কমবেই।

জুয়েল তাজিম › বিস্তারিত পোস্টঃ

প্রজাপতির ডানায় ভর করে

০৪ ঠা আগস্ট, ২০২৬ সকাল ১০:৪৯

আজ মাসের ১০ তারিখ।

গার্মেন্টসে চাকরি করি। আমাদের কারখানায় একটা ভালো দিক আছে—প্রতি মাসের ১০ তারিখের মধ্যেই বেতন দিয়ে দেয়। আজও যথাসময়ে বেতন হাতে পেলাম। হাতে টাকাটা নিয়ে বুকের ভেতর অদ্ভুত এক প্রশান্তি নেমে এলো। মনে মনে ঠিক করে ফেললাম, আজ আব্বার জন্য গরুর মাংস কিনব। অনেকদিন ধরেই মানুষটা বলছিলেন, "গোশত খাইতে মন চাইতাছে।"

সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। কারখানা থেকে বের হয়েই কাঁচাবাজারের দিকে হাঁটা দিলাম।

পেছন থেকে সহকর্মী শফিউল হেসে বলে উঠল,

— "কিরে, এখন নাকি ওই দিকের ধান্দাও শুরু করছিস?"

আমি শুধু একবার ফিরে তাকালাম।

শফিউল এমনই। অন্যকে খোঁচা দেওয়াটাই যেন তার সবচেয়ে বড় আনন্দ। তাই ওকে আমাদের ফ্লোরে খুব কম মানুষই পছন্দ করে।

আমি কোনো উত্তর দিলাম না।

চুপচাপ হাঁটতে লাগলাম।

বাজারে ঢুকতেই কোলাহল, মানুষের ভিড় আর বিক্রেতাদের হাঁকডাক চারদিক ভরিয়ে দিয়েছে।

মাছের সারিতে দাঁড়াতেই চোখ আটকে গেল। বরফের ওপর সাজানো বিশাল বিশাল নদীর মাছগুলো আলোয় এমন ঝলমল করছে, যেন হীরার টুকরো।

ইচ্ছে করল একটু দাঁড়িয়ে দেখি।

তারপর আবার নিজের বাস্তবতার কথা মনে পড়ল।

সংসারের বাজার আমি নিয়মিতই করি। কিন্তু এই অংশে খুব একটা আসা হয় না। আমার বাজার বলতে বাইরের দিকের ছোট মলা মাছ, পোনা কিংবা মাঝারি সাইজের সিলভার কার্প পর্যন্তই। ভেতরে ঢুকলে জিনিসগুলো শুধু ভালো লাগে, কেনার সাহস হয় না।

হাঁটতে হাঁটতে গরুর মাংসের দোকানের সামনে এসে দাঁড়ালাম।

তাজা লালচে মাংসগুলো ঝুলছে।

দেখেই মনে হলো, আজ আব্বা খুব খুশি হবেন।

— "ভাই, কেজি কত?"

— "সাতশো টাকা।"

আমি একটু লজ্জা মিশ্রিত কণ্ঠে বললাম,

— "একটু কম হবে না?"

দোকানদার হাসলেন।

— "না ভাই। একদম দেশি গরু। সলিড মাংস। এই বাজারে এর চেয়ে ভালো পাবেন না।"

আমি আর দরদাম করলাম না।

পকেট থেকে টাকাগুলো বের করে গুনলাম।

তিনশো পঞ্চাশ টাকা।

— "আধা কেজি দেন।"

মাংস কাটার শব্দের সঙ্গে সঙ্গে মনটা হঠাৎ বহু বছর পেছনে ফিরে গেল।

ছোটবেলায় আমাদের কাছে কোরবানির ঈদ মানেই ছিল বছরের সবচেয়ে আনন্দের দিন।

নতুন জামার জন্য নয়।

গরুর মাংসের জন্য।

আমাদের সংসারে অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী। ঈদ ছাড়া গরুর মাংস খাওয়ার কথা ভাবাই যেত না।

ঈদের দিন সকালে নামাজ শেষ করেই আব্বা পুরোনো লুঙ্গি আর বিবর্ণ একটা শার্ট পরে চলে যেতেন সৈয়দ চাচার বাড়ি।

সৈয়দ চাচা ছিলেন গ্রামের সবচেয়ে প্রভাবশালী মানুষদের একজন। প্রতি বছর দুটো বড় গরু কোরবানি দিতেন।

আব্বাকে খুব ভালোবাসতেন।

তাই আগে থেকেই বলে রাখতেন,

— "ভাই, নামাজ শেষ করেই চলে আসবেন।"

আব্বা সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত গরু কাটা, মাংস ভাগ করা, মানুষকে পৌঁছে দেওয়া—সব কাজেই সাহায্য করতেন।

আর আমরা?

আমরা সারাক্ষণ বাড়ির উঠোনে বসে থাকতাম।

দূরের রাস্তার দিকে তাকিয়ে।

কখন আব্বা ফিরবেন...

কখন সেই ছোট্ট কাপড়ের পুঁটলিতে করে গোশত নিয়ে আসবেন...

দূর থেকে আব্বাকে দেখা মাত্রই আমাদের চোখ দুটো আনন্দে জ্বলে উঠত।

মনে হতো, ঈদ বুঝি এখনই শুরু হলো।

সেদিন বিকেল থেকেই রান্নাঘরে উৎসব লেগে যেত।

আম্মা বড় হাঁড়িতে মাংস বসাতেন।

আমরা ভাইবোনেরা রান্নাঘরের দরজায় বসে শুধু সেই গন্ধ শুঁকতাম।

মনে হতো, এর চেয়ে সুন্দর কোনো সুগন্ধ পৃথিবীতে নেই।

দুপুরে গোসল সেরে আব্বা আমাদের নিয়ে একসাথে খেতে বসতেন।

কিন্তু আজ ভাবলে অবাক লাগে...

আব্বা নিজে খুব বেশি খেতেন না।

চুপচাপ আমাদের খাওয়া দেখতেন।

মাঝে মাঝে হাসিমুখে বলতেন,

— "আরেকটু নাও। দেশি গরুর গোশত। ভালো করে খাও।"

তখন বুঝিনি।

আজ বুঝি—

তিনি নিজের ক্ষুধার চেয়ে আমাদের তৃপ্তিকে বেশি ভালোবাসতেন।

আম্মা তখন আরেকটা প্লেটে ভাত নিয়ে আব্বার পাশে বসতেন।

হেসে বলতেন,

— "ওদের দিকে চাইয়া থাকতে থাকতে আর খাবা না। নাও, আমার সাথে খাও।"

দু'জনের সেই একসাথে খাওয়ার দৃশ্যটা আজও আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর ছবিগুলোর একটি।

তখন মনে হতো—

আমাদের মতো সুখী পরিবার বুঝি পৃথিবীতে আর নেই।

তারপর একদিন সব বদলে গেল।

হঠাৎ করেই আম্মা চলে গেলেন।

সেদিন প্রথম দেখেছিলাম, একজন শক্ত মানুষ কীভাবে ভেঙে পড়ে।

আব্বা শুধু বলেছিলেন,

— "আমার ঘরের লক্ষ্মী চলে গেল।"

এরপর থেকে তিনি আর আগের মতো রইলেন না।

ধীরে ধীরে অসুস্থ হয়ে পড়লেন।

আজ তিনি বেশিরভাগ সময় বিছানায়।

অভাবও যেন আরও বড় হয়ে উঠল।

সংসারের সব দায়িত্ব নীরবে এসে পড়ল আমার কাঁধে।

কখন যে বাড়ি ফিরে এসেছি, বুঝতেই পারিনি।

অন্যদিন কাজ শেষে শরীর ভেঙে যায়।

আজ যেন ক্লান্তির কোনো অস্তিত্ব নেই।

অনেক যত্ন করে মসলা বাটলাম।

মায়ের মতো করে রান্না করার চেষ্টা করলাম।

রান্না শেষ হলে হাত-মুখ ধুয়ে ভাত আর গরুর মাংস থালায় সাজিয়ে আব্বার কাছে গেলাম।

হেসে বললাম,

— "আব্বা... গোশত দিয়ে ভাত খাইবা?"

শব্দগুলো শোনামাত্রই আব্বার মুখে শিশুর মতো হাসি ফুটে উঠল।

অনেকদিন পর মানুষটার চোখে এমন উজ্জ্বলতা দেখলাম।

তিনি ধীরে ধীরে খেতে শুরু করলেন।

প্রথম লোকমা মুখে দিয়েই বললেন,

— "আম্মা... অনেক মজা হইছে।"

আমার বুকটা কেঁপে উঠল।

মনে হলো, তিনি হয়তো আমাকে নয়...

আমার মাকেই ডাকছেন।

আমি চুপচাপ বসে তাঁর খাওয়া দেখছিলাম।

হঠাৎ অনুভব করলাম—

আজ আমি ঠিক সেই জায়গাটাতেই বসে আছি, যেখানে একদিন আমার আব্বা বসতেন।

সেদিন তিনি তাঁর সন্তানদের খাওয়া দেখে তৃপ্তি পেতেন।

আজ আমি আমার বৃদ্ধ বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে সেই একই তৃপ্তি অনুভব করছি।

সময় কত নিঃশব্দে মানুষের পরিচয় বদলে দেয়!

একদিন যিনি আমার হাত ধরে হাঁটতে শিখিয়েছিলেন, আজ তাঁকেই ধীরে ধীরে ধরে বসাতে হয়।

একদিন যিনি আমাকে খাইয়ে দিয়েছেন, আজ তাঁর থালায় ভাত তুলে দিই আমি।

বাবা কখন যে সন্তানের মতো হয়ে যান, মানুষ তা বুঝতেই পারে না।

চোখের কোণে পানি এসে জমল।

দ্রুত অন্যদিকে তাকালাম।

এই কান্না দুঃখের নয়।

এই কান্না কৃতজ্ঞতার।

কারণ, আল্লাহ আমাকে এতটুকু সামর্থ্য দিয়েছেন যে, আমার শিশুসুলভ হয়ে যাওয়া বৃদ্ধ বাবার ছোট্ট একটা ইচ্ছা পূরণ করতে পেরেছি।

হয়তো আমি বড়লোক নই।

হয়তো প্রতিদিন বাবার সামনে রাজকীয় খাবারের আয়োজন করতে পারি না।

কিন্তু সেদিন তাঁর মুখের সেই হাসিটুকু দেখে মনে হলো—

আমি পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী মানুষ।

সেদিন নতুন করে বুঝেছিলাম—

সুখ কখনো বড় বাড়িতে থাকে না।

সুখ থাকে না ব্যাংকের মোটা অঙ্কের হিসাবেও।

সুখ লুকিয়ে থাকে বৃদ্ধ বাবার তৃপ্তির হাসিতে,

মায়ের শেখানো রান্নার স্বাদে,

অনেক কষ্টে কেনা আধা কেজি গরুর মাংসে,

আর একসাথে বসে খাওয়া একটি সাধারণ পরিবারের নিঃশব্দ ভালোবাসায়।

আমাদের মতো নিম্নবিত্ত মানুষের সুখগুলো আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন দেখে না।

তারা বিলাসিতার ভাষাও বোঝে না।

তারা শুধু জানে—

প্রিয় মানুষের মুখে এক চিলতে হাসি ফোটানোর নামই জীবন।

প্রজাপতির ডানায় ভর করেই সেই ছোট ছোট সুখগুলো প্রতিদিন আমাদের ক্লান্ত জীবনে রঙ ছড়িয়ে দেয়।

সেদিন রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে আব্বার ঘরে উঁকি দিয়ে দেখলাম, তিনি শিশুর মতো নিশ্চিন্ত ঘুমিয়ে আছেন।

আমি নীরবে আকাশের দিকে তাকিয়ে বললাম—

"আলহামদুলিল্লাহ।"

কারণ, সেদিন আমি বুঝেছিলাম—

জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি ধন-সম্পদ নয়; সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হলো, যাঁদের হাত ধরে আমরা পৃথিবী চিনেছি, তাঁদের শেষ বয়সে একটু শান্তি, একটু ভালোবাসা আর এক চিলতে হাসি উপহার দিতে পারা।

আর সত্যিই—

জীবন সুন্দর।

খুব, খুব বেশি সুন্দর।

মন্তব্য ৩ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (৩) মন্তব্য লিখুন

১| ০৪ ঠা আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ১:৪৪

ওয়াদুদ সোহেল মোল্লা বলেছেন: বাবা-ছেলের ভালোবাসার টান এবং শৈশবের কুরবানির ঈদের স্মৃতি নিয়ে অত্যন্ত হৃদয়স্পর্শী ও আবেগঘন একটি গল্প লিখেছেন। লেখাটি পড়তে পড়তে নিজেরও পুরোনো দিনের অনেক স্মৃতি মনে পড়ে গেল। চমৎকার এই লেখার জন্য অনেক ধন্যবাদ!

০৪ ঠা আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৫:৫৫

জুয়েল তাজিম বলেছেন: বাবা এবং কন্যার গল্প ! গার্মেন্টস শিল্প কারখানা থেকে নেওয়া বাস্তব গল্প

২| ০৪ ঠা আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:২৩

রাজীব নুর বলেছেন: খুব ভালো।

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.