| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
ডঃ এম এ আলী
সাধারণ পাঠক ও লেখক

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ: মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর রেমিট্যান্স কৃষিভিত্তিক শিল্পায়ন ও টেকসই উন্নয়নের বিকল্প কৌশল
একটি অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক ফিজিবিলিটি স্টাডি।
একটি ধারাবাহিক গবেষনামুলক পোস্ট
১.১ গবেষণার পটভূমি
একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বায়িত অর্থনীতিতে শ্রমশক্তি, পুঁজি, প্রযুক্তি এবং প্রাকৃতিক সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহারই একটি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অগ্রগতির প্রধান নিয়ামক। উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ গত পাঁচ দশকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কৃষি উৎপাদন, তৈরি পোশাক শিল্প, দারিদ্র্য হ্রাস এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। তবে এই অগ্রগতির একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হলো বৈদেশিক কর্মসংস্থান এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাঠানো রেমিট্যান্স।
স্বাধীনতার পরপরই বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে দুটি বড় চ্যালেঞ্জ ছিল দেশের বিপুল জনসংখ্যার কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের টেকসই উৎস সৃষ্টি করা। সীমিত শিল্পভিত্তি, অপ্রতুল মূলধন এবং সীমাবদ্ধ কর্মসংস্থানের কারণে ধীরে ধীরে মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণপূর্ব এশিয়া এবং অন্যান্য অঞ্চলে বাংলাদেশি শ্রমিকদের অভিবাসন বৃদ্ধি পায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই অভিবাসন দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তিতে পরিণত হয়।
বর্তমানে বৈদেশিক কর্মসংস্থান বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বহুমাত্রিক অবদান রাখছে। প্রবাসী শ্রমিকদের পাঠানো রেমিট্যান্স শুধু বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি করে না; বরং গ্রামীণ অর্থনীতি, ভোগব্যয়, আবাসন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং ক্ষুদ্র বিনিয়োগেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বহু পরিবার তাদের জীবনমান উন্নয়নে সরাসরি রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভরশীল।
কিন্তু অর্থনীতির এই সাফল্যের পাশাপাশি কিছু মৌলিক প্রশ্নও ক্রমশ গুরুত্ব পাচ্ছে। বিদেশে কর্মরত শ্রমিকদের একটি বড় অংশ নিম্ন বা মধ্যম দক্ষতার শ্রমবাজারে নিয়োজিত। তাঁদের অনেকেই কঠিন কর্মপরিবেশ, সীমিত শ্রম অধিকার, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা এবং সামাজিক অনিশ্চয়তার মধ্যে কাজ করেন। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও মানবাধিকার প্রতিবেদন অভিবাসী শ্রমিকদের অধিকার, নিরাপত্তা ও কর্মপরিবেশ নিয়ে নিয়মিত উদ্বেগ প্রকাশ করে থাকে। একই সঙ্গে জনপরিসরে এমন ধারণাও প্রচলিত যে কিছু দেশে দক্ষিণ এশীয় শ্রমিকদের সামাজিক মর্যাদা কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে নয়। যদিও এই ধারণা সর্বত্র এবং সব ক্ষেত্রে সমভাবে প্রযোজ্য নয়, তথাপি বিষয়টি গবেষণার দাবি রাখে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম উর্বর বদ্বীপ অঞ্চল। গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা নদীব্যবস্থার পলিমাটিতে গঠিত এই ভূখণ্ড কৃষি উৎপাদনের জন্য অত্যন্ত অনুকূল। দেশের বহু এলাকায় বছরে দুই বা তিন ফসল উৎপাদনের সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে বিস্তৃত নদী, খাল, বিল, হাওর, পুকুর এবং জলাশয়, যা মিঠাপানির মৎস্য উৎপাদনের অসাধারণ সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে। প্রাণিসম্পদ, হাঁস-মুরগি পালন, দুগ্ধশিল্প, কৃষিভিত্তিক খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্প এবং গ্রামীণ ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগও জাতীয় অর্থনীতিতে ক্রমবর্ধমান ভূমিকা পালন করছে।
এই প্রেক্ষাপটে একটি মৌলিক অর্থনৈতিক প্রশ্ন উত্থাপিত হয় বাংলাদেশ কি ধীরে ধীরে এমন একটি অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলতে পারে, যেখানে দেশের বিপুল শ্রমশক্তির একটি বড় অংশ বিদেশে নিম্ন মজুরির শ্রমবাজারে যাওয়ার পরিবর্তে দেশের অভ্যন্তরেই আধুনিক কৃষি, মৎস্য, প্রাণিসম্পদ, খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্প এবং কৃষিভিত্তিক উৎপাদন ব্যবস্থায় নিয়োজিত হতে পারবে?
এই প্রশ্নের উত্তর সরল নয়। কারণ কৃষি ও রেমিট্যান্স দুটি ভিন্ন ধরনের অর্থনৈতিক কার্যক্রম। রেমিট্যান্স সরাসরি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের উৎস, অন্যদিকে কৃষি মূলত উৎপাদনভিত্তিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, যার মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব হয় তখনই, যখন উৎপাদিত পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলকভাবে রপ্তানি করা যায়। ফলে এই দুটি খাতের তুলনা করতে হলে কর্মসংস্থান,উৎপাদনশীলতা, বৈদেশিক মুদ্রা, প্রযুক্তি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, জলবায়ু ঝুঁকি, অবকাঠামো, রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ এবং ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা সবকিছুকে একসঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে।
বাংলাদেশ বর্তমানে এমন এক সময় অতিক্রম করছে, যখন বৈশ্বিক অর্থনীতি, খাদ্যনিরাপত্তা, জ্বালানি নিরাপত্তা, সরবরাহ শৃঙ্খল (Supply Chain) এবং আন্তর্জাতিক কৌশলগত প্রতিযোগিতা দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। লোহিত সাগর, বাব আল-মান্দাব প্রণালী, ভারত মহাসাগর এবং মধ্যপ্রাচ্যকে ঘিরে সাম্প্রতিক ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তন বিশ্ববাণিজ্যের ওপরও প্রভাব ফেলছে। যেহেতু বাংলাদেশের শ্রমবাজার, জ্বালানি আমদানি এবং বৈদেশিক বাণিজ্যের একটি অংশ এই অঞ্চলের সঙ্গে সম্পর্কিত, তাই অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণে ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতাও ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
ফলে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন কৌশল নিয়ে আলোচনায় শুধু রেমিট্যান্স বৃদ্ধি অথবা কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এই দুইয়ের মধ্যে কোনো একটিকে বেছে নেওয়ার প্রশ্ন নয়; বরং একটি ভারসাম্যপূর্ণ, বহুমুখী এবং টেকসই অর্থনৈতিক কাঠামো নির্মাণের প্রশ্নটি সামনে আসে।
এই গবেষণাপত্র সেই বৃহত্তর প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধানের একটি প্রচেষ্টা। এখানে কৃষিকে রেমিট্যান্সের সরাসরি বিকল্প হিসেবে নয়, বরং দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদনশীলতা, কর্মসংস্থান, মূল্য সংযোজন, রপ্তানি সম্ভাবনা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিস্থাপকতা (Economic Resilience) বৃদ্ধির একটি সম্ভাব্য কৌশল হিসেবে মূল্যায়ন করা হবে। একই সঙ্গে বৈদেশিক কর্মসংস্থানের অর্থনৈতিক প্রয়োজনীয়তা, সীমাবদ্ধতা এবং ভবিষ্যৎ রূপান্তরের সম্ভাবনাও বিশ্লেষণ করা হবে।
অতএব, এই গবেষণার মূল লক্ষ্য কোনো পূর্বনির্ধারিত সিদ্ধান্তকে প্রতিষ্ঠা করা নয়; বরং নির্ভরযোগ্য তথ্য, সরকারি পরিসংখ্যান, আন্তর্জাতিক গবেষণা, তুলনামূলক অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ এবং বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে মূল্যায়ন করা যে, বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, সামাজিক মর্যাদা এবং টেকসই উন্নয়নের জন্য কী ধরনের উন্নয়ন কৌশল অধিকতর কার্যকর হতে পারে।
এই গবেষণার প্রতিটি অধ্যায়ে/পর্বে সেই প্রশ্নের ভিন্ন ভিন্ন দিক বিশ্লেষণ করা হবে ;রেমিট্যান্স অর্থনীতি, কৃষির উৎপাদনশীলতা, কৃষিভিত্তিক শিল্পায়ন, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা, অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা (Feasibility), ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং নীতিগত সুপারিশের মাধ্যমে একটি সমন্বিত মূল্যায়ন উপস্থাপন করা হবে। এর মাধ্যমে নীতিনির্ধারক, গবেষক, শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং উন্নয়ন পরিকল্পনাবিদদের জন্য একটি তথ্যভিত্তিক আলোচনার ক্ষেত্র তৈরি করাই এই গবেষণার প্রধান উদ্দেশ্য।
এই গবেশনায় আপনারা আগ্রহী কীনা জানালে পরবর্তী ২ য় পর্ব যথাসময়ে পাঠের আমন্ত্রন রইল ।
©somewhere in net ltd.