নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

সাহিত্য, সংস্কৃতি, কবিতা এবং সমসাময়িক সামাজিক বিষয়াদি নিয়ে গঠনমুলক লেখা লেখি ও মুক্ত আলোচনা

ডঃ এম এ আলী

সাধারণ পাঠক ও লেখক

ডঃ এম এ আলী › বিস্তারিত পোস্টঃ

তাসালসুল (অনন্ত পশ্চাদগমন), প্রথম সৃষ্টি ও ‘আকল’: কুরআন-সুন্নাহর আলোকে একটি সতর্ক অনুসন্ধান

২১ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ভোর ৬:৩৭


ভূমিকা
সৃষ্টিজগতের অস্তিত্ব নিয়ে মানুষের অন্যতম প্রাচীন প্রশ্ন হলো,সবকিছুর শুরু কোথায়? যদি প্রতিটি সৃষ্ট বস্তুর অস্তিত্বের জন্য তার আগে আরেকটি সৃষ্ট বস্তুর প্রয়োজন হয়, এবং সেই নির্ভরতার ধারা কখনো শেষ না হয়, তাহলে এই সমগ্র নির্ভরশীল অস্তিত্বের চূড়ান্ত ব্যাখ্যা কোথায়?

দর্শনের ভাষায় এই সমস্যাকে বলা হয় তাসালসুল বা infinite regress তথা একটির অস্তিত্বের কারণ হিসেবে তার আগের আরেকটি কারণ, তারও আগের আরেকটি কারণ—এভাবে কারণের ধারা অনন্তকাল পিছিয়ে যেতে থাকা। ইসলামী তাওহিদ এই প্রশ্নের একটি মৌলিক উত্তর দেয়: সৃষ্টিজগতের চূড়ান্ত ব্যাখ্যা কোনো সৃষ্ট বস্তুর মধ্যে নয়; বরং এমন এক স্রষ্টার মধ্যে, যিনি নিজে সৃষ্ট নন এবং কারও ওপর নির্ভরশীল নন,তিনি আল্লাহ।

কিন্তু এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে: আল্লাহ প্রথমে কী সৃষ্টি করেছেন? এ প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে বিভিন্ন বর্ণনা, দার্শনিক ব্যাখ্যা এবং আধুনিক বিজ্ঞানের ধারণাকে একত্র করে একটি নির্দিষ্ট মহাজাগতিক ক্রম দাঁড় করানো কতটা গ্রহণযোগ্য? বিশেষ করে বহুল প্রচলিত ‘আকলই প্রথম সৃষ্টি’,এই দাবিটির ভিত্তি কতটা শক্ত?

এই আলোচনায় মূল লক্ষ্য হলো,যেখানে কুরআন ও সহিহ হাদিস স্পষ্ট, সেখানে দৃঢ় থাকা; আর যেখানে দলিল অনিশ্চিত, সেখানে অনুমানকে নিশ্চিত আকীদা হিসেবে উপস্থাপন না করা।
তাসালসুলের সমস্যা এবং আল্লাহর অমুখাপেক্ষিতা
যদি বলা হয়, ‘এই সত্তাটি কেন অস্তিত্বশীল?’,উত্তর আসে, ‘তার আগে আরেকটি সত্তা ছিল।’ আবার প্রশ্ন করা হলে,‘সেটি কেন অস্তিত্বশীল?’,উত্তর আসে, ‘তারও আগে আরেকটি সত্তা ছিল।’ এভাবে যদি নির্ভরতার ধারা অনন্তকাল চলতে থাকে, তাহলে প্রশ্ন থেকেই যায়, সমগ্র নির্ভরশীল ধারাটির অস্তিত্বের চূড়ান্ত ব্যাখ্যা কী?

ইসলামী তাওহিদের মৌলিক বক্তব্য হলো, এই চূড়ান্ত নির্ভরতা এমন এক সত্তায় গিয়ে থামে, যিনি নিজে কারও মুখাপেক্ষী নন।
কুরআন ঘোষণা করে:اللَّهُ خَالِقُ كُلِّ شَيْءٍ‘আল্লাহই সবকিছুর স্রষ্টা।’,সূরা আয-যুমার, ৩৯:৬২
আরও বলা হয়েছে: هَلْ مِنْ خَالِقٍ غَيْرُ اللَّهِ‘আল্লাহ ছাড়া কি কোনো স্রষ্টা আছে?’,সূরা ফাতির, ৩৫:৩
সূরা আত-তূরে প্রশ্ন করা হয়েছে:أَمْ خُلِقُوا مِنْ غَيْرِ شَيْءٍ أَمْ هُمُ الْخَالِقُونَ
‘তারা কি কোনো কিছু ছাড়াই সৃষ্টি হয়েছে, নাকি তারাই স্রষ্টা?’,সূরা আত-তূর, ৫২:৩৫
অর্থাৎ ইসলাম এমন কোনো সৃষ্ট বস্তুকে চূড়ান্ত ও স্বয়ংসম্পূর্ণ কারণ হিসেবে গ্রহণ করে না। সৃষ্টিজগত নির্ভরশীল; আল্লাহ নির্ভরশীল নন।

সূরা আল-ইখলাসে এই সত্যটি আরও সংক্ষিপ্তভাবে এসেছে:
اللَّهُ الصَّمَدُ ‘আল্লাহ অমুখাপেক্ষী।’এবং:لَمْ يَلِدْ وَلَمْ يُولَدْ‘তিনি জন্ম দেননি এবং তাঁকে জন্ম দেওয়া হয়নি।’
সুতরাং তাসালসুলের আলোচনায় ইসলামের মৌলিক অবস্থান হলো,চূড়ান্ত ব্যাখ্যা কোনো সৃষ্ট বস্তুর মধ্যে নয়; বরং অকারণ ও অমুখাপেক্ষী স্রষ্টা আল্লাহর মধ্যে।

‘কুন ফায়াকুন’ এবং সৃষ্টির জন্য পূর্ববর্তী উপাদানের প্রয়োজন প্রসঙ্গ
আল্লাহ যখন কোনো কিছু সৃষ্টি করতে চান, তখন তাঁর সৃষ্টিশক্তি কোনো পূর্ববর্তী সৃষ্ট বস্তুর ওপর নির্ভরশীল নয়। কুরআন বলে:
إِنَّمَا أَمْرُهُ إِذَا أَرَادَ شَيْئًا أَنْ يَقُولَ لَهُ كُنْ فَيَكُونُ ‘তিনি যখন কোনো কিছুর ইচ্ছা করেন, তখন তাঁর ব্যাপার শুধু এই যে, তিনি তাকে বলেন,‘হও’, আর তা হয়ে যায়।’,সূরা ইয়াসীন, ৩৬:৮২ এখানে ‘কুন ফায়াকুন’কে কোনো যান্ত্রিক শব্দ উচ্চারণের অর্থে না নিয়ে আল্লাহর পরম ইচ্ছা ও সৃষ্টিশক্তির প্রকাশ হিসেবে বোঝা অধিক যথাযথ।অতএব কোনো সৃষ্টিই আল্লাহকে সৃষ্টির জন্য অপরিহার্য ‘কাঁচামাল’ সরবরাহ করে,এমন ধারণা ইসলামী তাওহিদের মৌলিক ধারণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

তাহলে কি ধরে নেয়া যায় ‘আকল’ই প্রথম সৃষ্টি? এখানেই আমাদের আলোচনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
‘আল্লাহ সর্বপ্রথম আকল সৃষ্টি করেছেন’,এই বক্তব্যটি মুসলিম সমাজের কিয়দংশে বহুল প্রচলিত হলেও এটিকে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর অকাট্য সহিহ হাদিস হিসেবে উপস্থাপন করা নিরাপদ নয়। ‘أول ما خلق الله العقل’,এই বর্ণনার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে হাদিসবিশারদদের মধ্যে গুরুতর আপত্তি রয়েছে; একাধিক মুহাদ্দিস এটিকে নির্ভরযোগ্যভাবে প্রমাণিত নয় বলে বিবেচনা করেছেন।

একইভাবে, ‘সর্বপ্রথম সৃষ্টি হলো মুহাম্মদ (সা.)এর নূর’,এই বহুল প্রচলিত বক্তব্যকেও সহিহ হাদিস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার মতো নির্ভরযোগ্য ভিত্তি নেই। ফলে রাসূল (সা.)এর মর্যাদা, আহলে বাইতের মর্যাদা কিংবা ‘নূর’সংক্রান্ত আধ্যাত্মিক আলোচনা এক বিষয়; আর কোনো নির্দিষ্ট সৃষ্টিতত্ত্বকে ‘সহিহ হাদিস’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।
এই পার্থক্যটি বজায় রাখা জরুরি।

‘আকল’ গুরুত্বপূর্ণ,কিন্তু তাই বলে প্রথম সৃষ্টি এটি প্রমাণিত হয় না
ইসলামে আকলের মর্যাদা নিঃসন্দেহে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কুরআন মানুষকে চিন্তা করতে, পর্যবেক্ষণ করতে, উপলব্ধি করতে এবং বুদ্ধি ব্যবহার করতে আহ্বান করেছে।কিন্তু এখান থেকে সরাসরি এই সিদ্ধান্ত আসে না যে, আকলই মহাবিশ্বের সর্বপ্রথম সৃষ্টি ।কারণ কোনো কিছুর বিশেষ মর্যাদা থাকা এবং সেটিই কালানুক্রমিকভাবে প্রথম সৃষ্টি হওয়া,দুটি আলাদা দাবি।
অতএব:আকলের মর্যাদা ইসলামী সত্য।কিন্তু: আকলই প্রথম সৃষ্টি,এটি একটি পৃথক ঐতিহাসিক ও হাদিসগত দাবি; এর জন্য পৃথক নির্ভরযোগ্য দলিল প্রয়োজন।

‘আকল’ বলতে আমরা কী বোঝাচ্ছি সেটিও এখন একটু দেখে নিই ।


‘আকল’ শব্দটি নিয়ে আলোচনায় আরেকটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। আকল, মস্তিষ্ক, চেতনা ও জ্ঞান,এগুলো পরস্পর সম্পর্কিত হলেও অভিন্ন বিষয় নয়।যদি ‘আকল’ বলতে মানুষের চিন্তা, বিচার, উপলব্ধি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাকে বোঝানো হয়, তাহলে আধুনিক স্নায়ুবিজ্ঞানের আলোচনায় এই cognitive function মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক কার্যকলাপ একটি জটিল জৈবিক ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত।

কিন্তু এখান থেকে বিপরীত দিকেও অতিরিক্ত সিদ্ধান্ত টানা ঠিক হবে না। অর্থাৎ মানুষের মস্তিষ্কের কার্যক্রমের ওপর ভিত্তি করে কোনো metaphysical ‘আকল’ এর অস্তিত্ব অসম্ভব,এমন চূড়ান্ত সিদ্ধান্তও দেওয়া যায় না।
কারণ ইসলামী কালাম ও দর্শনে ‘আকল’ কখনো জ্ঞান ও বোধশক্তি, কখনো বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষমতা, আবার কখনো একটি স্বতন্ত্র অশরীরী সত্তা বোঝাতে ব্যবহৃত হতে পারে।তাই প্রথমেই নির্ধারণ করতে হবে,কোন অর্থে ‘আকল’ শব্দটি ব্যবহৃত হচ্ছে।

অবস্তুগত হলেই কি তা অকারণ ( কার্যকারণবাহীন) বা প্রথম সৃষ্টি?
ধরা যাক, ‘আকল’ বলতে একটি অশরীরী বা অবস্তুগত বুদ্ধিবৃত্তিক সত্তাকে বোঝানো হচ্ছে। তাহলেও একটি গুরুত্বপূর্ণ যৌক্তিক পার্থক্য মনে রাখা দরকার।

অবস্তুগত হলেই কি তা অকারণ ( কার্যকারণবাহীন) বা প্রথম সৃষ্টি?
একটি সত্তা বস্তুগত উপাদানে গঠিত না হয়েও সৃষ্ট, সীমিত এবং অন্য কিছুর ওপর নির্ভরশীল হতে পারে। Material composition এবং ontological dependence একই বিষয় নয়।
তাই:
অবস্তুগত ≠ অকারণ ( ≠ সমান হতেও পারে কিংবা নাও হতে পারে )
অবস্তুগত ≠ স্বয়ংসম্পূর্ণ ( ≠ সমান হতেও পারে কিংবা নাও হতে পারে )
অবস্তুগত ≠ প্রথম সৃষ্টি ( ≠ সমান হতেও পারে কিংবা নাও হতে পারে )
অবস্তুগত ≠ অন্যান্য সৃষ্টির উৎস ( ≠ সমান হতেও পারে কিংবা নাও হতে পারে )
প্রতিটি দাবির জন্য পৃথক প্রমাণ প্রয়োজন।

এখানে ইসলামী আকীদার মৌলিক সীমারেখাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ: اللَّهُ الصَّمَدُ ‘আল্লাহ অমুখাপেক্ষী।’
কোনো সৃষ্টি বস্তুগত উপাদানহীন হলেও তাকে আল্লাহর মতো অমুখাপেক্ষী বলা যায় না।
আকল’ প্রথম সৃষ্টি হলে আরও কিছু প্রশ্ন থেকে যায়
ধরা যাক, ‘আকল’ সত্যিই প্রথম সৃষ্টি। তাহলে প্রশ্ন আসে,এই আকল কীভাবে কার্যকর হলো?
যদি বলা হয়, তার কার্যকারিতার জন্য কোনো মাধ্যম বা কাঠামোর প্রয়োজন নেই, তাহলে সেই দাবির প্রমাণ প্রয়োজন।

আর যদি বলা হয়, তার কার্যকারিতার জন্য পরবর্তী কোনো সৃষ্ট কাঠামো প্রয়োজন, তাহলে বোঝা যায় কার্যকরী আকল এবং সেই কাঠামোর মধ্যে কোনো না কোনো নির্ভরতার সম্পর্ক রয়েছে।
অবশ্য এই যুক্তি মানুষের মস্তিষ্ক-নির্ভর আকলের ক্ষেত্রে বেশি প্রাসঙ্গিক। ফেরেশতা বা কোনো অদৃশ্য সৃষ্টির জ্ঞানীয় কার্যক্রম মানুষের মস্তিষ্কের মতোই হবে,কুরআন আমাদের এমন কথা বলেনি। তাই ‘আকল মানেই ৮৬ বিলিয়ন নিউরন’,এমন বক্তব্যও গ্রহণযোগ্য নয়।
বরং সীমিত ও সতর্ক বক্তব্য হওয়া উচিত।

যদি ‘আকল’ বলতে মানুষের cognitive faculty বোঝানো হয়, তাহলে সেটি মানুষের সৃষ্ট দেহ ও স্নায়ুতন্ত্রের সঙ্গে কার্যগতভাবে সম্পর্কিত। আর যদি ‘আকল’ বলতে কোনো স্বতন্ত্র metaphysical সত্তা বোঝানো হয়, তাহলে তার অস্তিত্ব, প্রকৃতি এবং প্রথম সৃষ্টি হওয়ার দাবির জন্য নির্ভরযোগ্য ওহিগত দলিল প্রয়োজন।

‘কলম’ সংক্রান্ত হাদিস: একটি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা

‘প্রথম সৃষ্টি’ প্রসঙ্গে একটি সুপরিচিত হাদিস হলো কলম সম্পর্কিত বর্ণনা। উবাদাহ ইবনুস সামিত (রা.)এর বর্ণনায় সুনান আবু দাউদ ৪৭০০-এ এসেছে: ‘নিশ্চয় আল্লাহ সর্বপ্রথম কলম সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর তাকে বললেন,লিখ।’
উক্ত বর্ণনাকে আলবানী সহিহ বলেছেন। তিরমিযী ৩৩১৯-এ অনুরূপ বর্ণনা রয়েছে এবং ইমাম তিরমিযী সেটিকে হাসান সহিহ বলেছেন।
এখানে উদ্দেশ্য ‘কলমই নিশ্চিতভাবে সর্বপ্রথম সৃষ্ট বস্তু’,এমন একটি দীর্ঘ মহাজাগতিক তত্ত্ব দাঁড় করানো নয়। বরং বিষয়টি হলো, যখন ‘প্রথম সৃষ্টি’ নিয়ে হাদিসভিত্তিক বক্তব্য দেওয়া হবে, তখন প্রচলিত কিন্তু বিতর্কিত ‘আকল প্রথম সৃষ্টি’ বর্ণনার পাশাপাশি বিদ্যমান গ্রহণযোগ্য হাদিসগুলোও বিবেচনায় নিতে হবে।

অন্যান্য সৃষ্টি সম্পর্কে যা জানা যায়

সহিহ মুসলিমে আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে ফেরেশতাদের নূর থেকে, জিনদের আগুনের শিখা থেকে এবং আদম (আ.)কে নির্দিষ্টভাবে বর্ণিত উপায়ে সৃষ্টি করা হয়েছে।
কুরআনে আরও এসেছে:وَكَانَ عَرْشُهُ عَلَى الْمَاءِ ‘তাঁর আরশ পানির ওপর ছিল।’,সূরা হূদ, ১১:৭
এসব বক্তব্য আমাদের সৃষ্টিজগত সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেয়। কিন্তু এগুলোকে নিজেদের অনুমান দিয়ে জুড়ে একটি পূর্ণাঙ্গ cosmological sequence বানিয়ে ফেলা ঠিক নয়।
যেমন, আকল -⟩ নূর -⟩ ফেরেশতা -⟩ আরশ -⟩ পানি/বায়ু -⟩ কণা -⟩ পরমাণু -⟩ অণু -⟩ মস্তিষ্ক -⟩ মানুষ
এই সম্পূর্ণ ক্রম কুরআন বা সহিহ হাদিসে এভাবে বর্ণিত হয়নি।

ওহি ও আধুনিক বিজ্ঞানের মধ্যে অযথা জোরপূর্বক সমন্বয়

আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের ইলেকট্রন, প্রোটন, নিউট্রন, পরমাণু বা অন্যান্য ধারণাকে গতানুগতিক ধর্মীয় বর্ণনার ‘পানি’, ‘নূর’ বা ‘বায়ু’-এর সরাসরি ব্যাখ্যা হিসেবে ঘোষণা করতেও আমাদের সতর্কতা প্রয়োজন।
কোনো হাদিসে ‘পানি’ শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে বলেই সেখানে আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের কোনো নির্দিষ্ট particle বোঝানো হয়েছে,এমন দাবি করতে হলে আলাদা প্রমাণ প্রয়োজন।

বিজ্ঞান ও ওহি, দুটির নিজস্ব ক্ষেত্র ও পদ্ধতি রয়েছে। তাই ওহিতে যা স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, তা গ্রহণ করা যেমন জরুরি, তেমনি আধুনিক বৈজ্ঞানিক মডেলকে জোর করে প্রতিটি ধর্মীয় বর্ণনার ওপর বসিয়ে দেওয়াও অনুচিত।
আকীদার ক্ষেত্রে জ্ঞানের সীমা স্বীকার করা জরুরী , কুরআন একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি দিয়েছে:
‘যে বিষয়ে তোমার জ্ঞান নেই, তার অনুসরণ করো না।’
,সূরা আল-ইসরা, ১৭:৩৬

এই নীতিটি সৃষ্টিতত্ত্বের আলোচনায় বিশেষভাবে প্রযোজ্য।আমাদের তাই আলাদা করতে হবে,
১. কোন বক্তব্য সরাসরি কুরআনে আছে।
২. কোন বক্তব্য সহিহ হাদিসে আছে।
৩. কোন বর্ণনা দুর্বল বা বিতর্কিত।
৪. কোনটি সাহাবি বা তাবেঈর বক্তব্য।
৫. কোনটি পরবর্তী দার্শনিক ব্যাখ্যা।
৬. আর কোনটি আধুনিক বিজ্ঞানের সঙ্গে মিলিয়ে তৈরি করা interpretation।
এই স্তরগুলো একাকার হয়ে গেলে ‘ইসলামী আকীদা’, ‘ইসলামী দর্শন’ এবং ‘আধুনিক বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা’,তিনটি ভিন্ন বিষয়কে
একই সত্য হিসেবে উপস্থাপনের ঝুঁকি তৈরি হয়।

তাহলে আমাদের অবস্থান কী হওয়া উচিত?সবচেয়ে সতর্ক ও দলিলসম্মত অবস্থান হলো,
প্রথমত, আল্লাহ সৃষ্ট নন; তিনিই স্রষ্টা।
দ্বিতীয়ত, সমস্ত সৃষ্টি তাঁর ওপর নির্ভরশীল; তিনি কোনো সৃষ্টির ওপর নির্ভরশীল নন।
তৃতীয়ত, তাসালসুলের সমস্যার চূড়ান্ত সমাধান কোনো সৃষ্ট বস্তুকে ‘চূড়ান্ত কারণ’ বানানো নয়; বরং অমুখাপেক্ষী স্রষ্টা আল্লাহকে
স্বীকার করা।
চতুর্থত, আকল ইসলামে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও ‘আকলই সর্বপ্রথম সৃষ্টি’,এটিকে অকাট্য সহিহ হাদিসের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত
আকীদা হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক নয়।
পঞ্চমত, ‘প্রথম সৃষ্টি’ প্রসঙ্গে কলম-সংক্রান্ত গ্রহণযোগ্য হাদিসের মতো প্রাসঙ্গিক দলিলগুলোকে যথাযথ গুরুত্ব দিতে হবে।
ষষ্ঠত, ‘আকল’ যদি মানবিক cognitive faculty বোঝায়, তবে তা মানুষের সৃষ্ট দেহ ও স্নায়ুতন্ত্রের সঙ্গে কার্যগতভাবে সম্পর্কিত।
আর যদি কোনো স্বতন্ত্র metaphysical সত্তা বোঝায়, তবে তার প্রকৃতি ও প্রথম সৃষ্টি হওয়ার দাবির জন্য আলাদা নির্ভরযোগ্য
দলিল প্রয়োজন।
সপ্তমত, কোনো সৃষ্টিকে,তা আকল, নূর, কলম বা অন্য যা-ই হোক,আল্লাহর মতো অমুখাপেক্ষী, স্বয়ংসম্পূর্ণ বা চূড়ান্ত কারণ হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।

উপসংহার

সৃষ্টির শুরু নিয়ে মানুষের কৌতূহল স্বাভাবিক। তাসালসুলের প্রশ্ন আমাদের অস্তিত্বের চূড়ান্ত ভিত্তি নিয়ে ভাবতে বাধ্য করে। ইসলামী তাওহিদ এখানে একটি মৌলিক সীমারেখা নির্ধারণ করে দেয়: সৃষ্টির কোনো স্তরই চূড়ান্ত ও স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়; চূড়ান্ত নির্ভরতার স্থান একমাত্র আল্লাহ।

তবে এই মৌলিক সত্য থেকে ‘প্রথম সৃষ্টি’ সম্পর্কে আমাদের ইচ্ছামতো একটি পূর্ণাঙ্গ মহাজাগতিক ক্রম তৈরি করার অনুমতি পাওয়া
যায় না। ‘আকল’ গুরুত্বপূর্ণ,এটি এক কথা; ‘আকলই প্রথম সৃষ্টি’,এটি সম্পূর্ণ ভিন্ন দাবি। একইভাবে কোনো সত্তা অবস্তুগত হতে পারে,এটি এক কথা; সেখান থেকে তাকে অকারণ, স্বয়ংসম্পূর্ণ, প্রথম সৃষ্টি বা অন্যান্য সৃষ্টির উৎস বলে ধরে নেওয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।
আকীদার আলোচনায় তাই সবচেয়ে সুন্দর ও নিরাপদ পথ হলো, ওহিকে ওহির জায়গায়, সহিহ হাদিসকে সহিহ হাদিসের জায়গায়, দর্শনকে দর্শনের জায়গায় এবং বৈজ্ঞানিক hypothesis-কে hypothesis-এর জায়গায় রাখা।
যেখানে কুরআন স্পষ্ট,সেখানে দৃঢ় থাকা।
যেখানে সহিহ হাদিস আছে,সেটি গ্রহণ করা।
যেখানে বর্ণনা দুর্বল বা বিতর্কিত,সেখানে সতর্ক থাকা।
আর যেখানে ওহি নীরব,সেখানে নিজের অনুমানকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে না বলা।


শেষ পর্যন্ত তাসালসুলের দীর্ঘ দার্শনিক বিতর্কের ঊর্ধ্বে কুরআনের একটি সংক্ষিপ্ত সত্যই সবচেয়ে মৌলিক:
اللَّهُ الصَّمَدُ ‘আল্লাহ অমুখাপেক্ষী; সকলেই তাঁর মুখাপেক্ষী।’
সৃষ্টির ধারায় যত স্তরই থাকুক, কোনো সৃষ্ট স্তরই চূড়ান্ত ব্যাখ্যা নয়। চূড়ান্ত নির্ভরতার স্থান একমাত্র আল্লাহ।

আল্লাহ আমাদের সবাইকে যেখানে জ্ঞান আছে সেখানে দৃঢ় থাকতে, আর যেখানে জ্ঞান নেই সেখানে বিনয়ের সঙ্গে থেমে যেতে তাওফিক দান করুন। আমিন।

মন্তব্য ১৬ টি রেটিং +৫/-০

মন্তব্য (১৬) মন্তব্য লিখুন

১| ২১ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৭:৪৬

স্বপ্নের শঙ্খচিল বলেছেন: সবকিছুর শুরু কোথায়, এই প্রশ্নের আধুনিক বৈজ্ঞানিক উত্তর হলো বিগ ব্যাং (Big Bang)।
.......................................................................................................................
আজ থেকে প্রায় ১৩.৮ বিলিয়ন বছর আগে একটি অতি ক্ষুদ্র, অসীম ঘন এবং অত্যন্ত উত্তপ্ত বিন্দু থেকে আকস্মিক প্রসারণের মাধ্যমে আমাদের এই মহাবিশ্বের সৃষ্টি হয়েছিল।
এই আদিম প্রশ্নের উত্তরটি মূলত দুটি প্রধান দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখা হয়:

বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি (The Scientific View)সময়ের সূচনা:
বিজ্ঞানীদের মতে, বিগ ব্যাং-এর মাধ্যমেই আমাদের চেনা 'সময়' (Time) এবং 'স্থান' (Space)-এর জন্ম হয়েছিল। এর আগে কী ছিল, তা বর্তমান পদার্থবিজ্ঞান দিয়ে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়।

মহাজাগতিক প্রসারণ: বিগ ব্যাং কোনো শূন্যস্থানে মহাশূন্যের বিস্ফোরণ ছিল না। এটি ছিল স্থানের নিজেরই এক তীব্র এবং দ্রুত প্রসারণ, যা আজও চলছে।

দার্শনিক ও ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি (Philosophical & Religious View)পরম শক্তি বা স্রষ্টা: পৃথিবীর প্রায় সব ধর্ম এবং প্রাচীন দর্শনে বিশ্বাস করা হয় যে, এই মহাবিশ্বের পেছনে একজন সচেতন স্রষ্টা বা আদি চালিকাশক্তি রয়েছেন।

অনন্ত অস্তিত্ব: কিছু দার্শনিক মতবাদে মনে করা হয়, শক্তি বা প্রকৃতির কোনো শুরু বা শেষ নেই; এটি রূপান্তরের মাধ্যমে চিরকাল ধরে অস্তিত্বশীল।

২২ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ভোর ৫:৫৪

ডঃ এম এ আলী বলেছেন:




আপনার মুল্যবান মন্তব্যটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্নকে সুন্দরভাবে সামনে এনেছে। তবে বিগ ব্যাং সম্পর্কে
একটি ছোট বৈজ্ঞানিক সংশোধন/স্পষ্টীকরণ প্রাসঙ্গিক মনে হয়।

আধুনিক মহাকাশবিজ্ঞান অনুযায়ী, বিগ ব্যাংকে সরাসরি একটি অতি ক্ষুদ্র, অসীম ঘন বিন্দু থেকে মহাবিশ্বের সৃষ্টি
হিসেবে নিশ্চিতভাবে বর্ণনা করা হয় না। বরং আমাদের পর্যবেক্ষণ ও বর্তমান তত্ত্ব অনুযায়ী, প্রায় ১৩.৮ বিলিয়ন
বছর আগে মহাবিশ্ব অত্যন্ত উত্তপ্ত ও ঘন অবস্থায় ছিল এবং এরপর স্থান নিজেই প্রসারিত হতে শুরু করে। সিঙ্গুলারিটি
ধারণাটি মূলত আমাদের বর্তমান সাধারণ আপেক্ষিকতার সীমাবদ্ধতার ইঙ্গিত এটিকে আক্ষরিক অর্থে মহাবিশ্বের
প্রথম মুহূর্তের নিশ্চিত ছবি বলা যায় না।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বিগ ব্যাং তত্ত্ব মহাবিশ্ব কীভাবে তার প্রাথমিক উত্তপ্ত-ঘন অবস্থা থেকে বিবর্তিত
হয়েছে, সেটি অত্যন্ত সফলভাবে ব্যাখ্যা করে; কিন্তু কেন এই মহাবিশ্বের অস্তিত্ব, কিংবা বিগ ব্যাংয়ের আগে আদৌ
কিছু ছিল কি না এই প্রশ্নগুলোর চূড়ান্ত উত্তর বিজ্ঞান এখনো দেয়নি। এমনকি আগে শব্দটিই কতটা অর্থবহ,
সেটিও নির্ভর করে সময়ের প্রকৃতি সম্পর্কে আমাদের ভবিষ্যৎ তত্ত্বের ওপর।

অন্যদিকে, স্রষ্টা বা কোনো পরম কারণের ধারণা দার্শনিক ও ধর্মীয় ব্যাখ্যার অন্তর্ভুক্ত। বিজ্ঞান বর্তমানে সেই দাবিকে পরীক্ষামূলকভাবে প্রমাণ বা অপ্রমাণ করার মতো কোনো সর্বজনস্বীকৃত পদ্ধতি দেয়নি। একইভাবে শক্তি চিরকাল ছিল
এটিও সরলভাবে বিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠিত সিদ্ধান্ত নয়; শক্তির সংরক্ষণ সূত্র আমাদের পরিচিত ভৌত ব্যবস্থার ক্ষেত্রে
প্রযোজ্য, কিন্তু সমগ্র মহাবিশ্বের উৎপত্তি ও সময়ের সূচনাকে ব্যাখ্যা করার জন্য বিষয়টি আরও জটিল।

তাই হয়তো সবচেয়ে সতর্ক ও সুন্দরভাবে বলা যায়বিগ ব্যাং আমাদের মহাবিশ্বের প্রাথমিক বিবর্তন সম্পর্কে সবচেয়ে
শক্তিশালী বৈজ্ঞানিক মডেলগুলোর একটি, কিন্তু সবকিছুর চূড়ান্ত শুরু কোথায় এবং কেন কিছু আছে, কিছুই না থাকার
বদলে এই প্রশ্নগুলো এখনো বিজ্ঞান, দর্শন ও ধর্মের সংযোগস্থলে থাকা গভীরতম প্রশ্নগুলোর মধ্যে পড়ে।

বিজ্ঞানের সৌন্দর্য এখানেই যেখানে উত্তর নিশ্চিত নয়, সেখানে আমি জানি না বলতেও বিজ্ঞান দ্বিধা করে না।
আর সেই অজানার জায়গাটিই হয়তো নতুন জ্ঞান অনুসন্ধানের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ক্ষেত্র।

শুভেচ্ছা রইল

২| ২১ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৯:২৭

আলামিন১০৪ বলেছেন: আমিই কাল, সুতরাং তোমরা সময়কে গালি দিও না"— কুদসি হাদিস, যা সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম শরিফে বর্ণিত হয়েছে।

আমাদেরকে স্পেস-টাইম কস্টিনিউয়ামে আবদ্ধ করে রাখা হয়েছে- তাই আমাদের সময় সম্পর্কে একটা ধারনা তৈরী হয়েছে- যা আপেক্ষিক এবং পরম সত্য নয়- ভুল ধারনার বশবর্তী হয়ে আমরা প্রশ্ন করে বসি- এর পূর্বে কী ছিল- তার পূর্বে কী ছিল- এভাবে প্রশ্ন করতে করতে এক সময় এমন একটা কিছু বলে বসি- যা আমাদের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা প্রকাশ করে দেয়। কেউ যদি প্রশ্ন করে “সময়ের পূর্বে কী ছিল?” তা যেমন তার বোকামি প্রকাশ করে তেমনি সৃষ্টিকর্তা সর্বপ্রথম কী করেছেন- এই প্রশ্নও তেমনি ।

২২ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ভোর ৬:১০

ডঃ এম এ আলী বলেছেন:




আপনার মন্তব্যটির মন্তব্যটির মূল দার্শনিক বক্তব্যটি যথেষ্ট চিন্তাশীল বিশেষ করে সময়ের পূর্বে কী ছিল?
প্রশ্নটি হয়তো আমাদের প্রচলিত সময়ের ধারণাকে এমন একটি জায়গায় প্রয়োগ করছে, যেখানে সেটি প্রযোজ্য
নাও হতে পারে। তবে এখানে বিজ্ঞান, দর্শন ও ধর্মীয় বিশ্বাসকে আলাদা করে দেখা জরুরি।

আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা অনুযায়ী স্থান ও সময় পরস্পর সম্পর্কিত এবং মহাবিশ্বের গতিশীলতার সঙ্গে
যুক্ত। আধুনিক মহাকাশবিজ্ঞানে মহাবিশ্বের প্রায় ১৩.৮ বিলিয়ন বছরের প্রসারণ-ইতিহাসকে আমরা অত্যন্ত ভালো
ভাবে পর্যবেক্ষণ ও তাত্ত্বিকভাবে ব্যাখ্যা করতে পারি। কিন্তু সেখান থেকে সরাসরি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না যে
বিগ ব্যাংয়ের আগে কিছুই ছিল না কিংবা “সময় অবশ্যই বিগ ব্যাংয়ের সঙ্গেই শুরু হয়েছে কারণ চরম প্রাথমিক
অবস্থায় আমাদের বর্তমান পদার্থবিজ্ঞানের তত্ত্বগুলোই অসম্পূর্ণ হয়ে পড়ে।

একইভাবে, সৃষ্টিকর্তা সর্বপ্রথম কী করেছেন? এই প্রশ্নটিকে নিছক বোকামি বলার প্রয়োজন নেই। বরং এটি একটি
দার্শনিক প্রশ্ন। যদি সৃষ্টিকর্তাকে সময়ের ভেতরে থাকা কোনো সত্তা হিসেবে কল্পনা করা হয়, তাহলে তাঁর আগে কী
ছিল? প্রশ্নটি স্বাভাবিক। কিন্তু যদি ধর্মতত্ত্বে সৃষ্টিকর্তাকে সময় ও স্থানেরই স্রষ্টা এবং সময়ের ঊর্ধ্বে থাকা সত্তা
হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়, তাহলে তাঁর আগে কথাটিই হয়তো প্রযোজ্য নয় কারণ আগে-পরে ধারণাটিই
সময়ের ওপর নির্ভরশীল।

তবে এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে: কোনো ধারণা যুক্তিগতভাবে সম্ভব হওয়া আর সেটি বৈজ্ঞানিকভাবে
প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়। সৃষ্টিকর্তা সময়ের বাইরে এটি একটি ধর্মতাত্ত্বিক/দার্শনিক অবস্থান; বিজ্ঞান বর্তমানে
এটিকে পরীক্ষামূলকভাবে প্রতিষ্ঠা বা অপ্রমাণ করার মতো কোনো সর্বজনস্বীকৃত পদ্ধতি দেয়নি।

আমার মনে হয়, আলোচনাটিকে তাই কে বোকা, কে জ্ঞানী এই জায়গায় না নিয়ে বরং এভাবে দেখা বেশি ফলপ্রসূ।

আমাদের জ্ঞানের সীমা যেখানে শেষ হয়, সেখানে প্রশ্ন করাটাই বোকামি নয়; বরং কোন প্রশ্নের উত্তর বিজ্ঞান দিতে
পারে, কোনটি দর্শনের, আর কোনটি বিশ্বাসের এই সীমারেখা বুঝতে পারাটাই প্রকৃত বুদ্ধিবৃত্তিক সতর্কতা।

আর কুদসি হাদিসটির ধর্মীয় তাৎপর্য বিশ্বাসের পরিসরে গভীর হতে পারে; কিন্তু তার সঙ্গে আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের
ধারণাগুলোর সম্পর্ক স্থাপন করতে হলে ধর্মতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা এবং বৈজ্ঞানিক প্রমাণ দুটিকে পৃথক রাখাই সবচেয়ে
যুক্তিসঙ্গত।

শুভেচ্ছা রইল

৩| ২১ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৯:৩৩

দানবিক রাক্ষস বলেছেন: আমাদের পর্যবেক্ষণযোগ্য মহাবিশ্বে (Observable Universe) আনুমানিক ২ট্রিলিয়নসংখ্যক গ্যালাক্সি থাকতে পারে। আমাদের নিজেদের Milky Way Galaxy-তেই রয়েছে প্রায় ১০০ থেকে ৪০০ বিলিয়ন নক্ষত্র। সেই বিলিয়ন নক্ষত্রের মধ্যে আমাদের সূর্য মাত্র একটি সাধারণ নক্ষত্র।

আর সেই সূর্যের চারদিকে ঘুরে চলা ছোট্ট একটি গ্রহ হলো পৃথিবী।

মহাবিশ্বের বিশালতার তুলনায় পৃথিবী এতটাই ক্ষুদ্র যে তাকে একটি বিন্দু বললেও যেন তার বিশালত্বকে বেশি করে বলা হয়।

অথচ এখন পর্যন্ত আমাদের নিশ্চিত জ্ঞান অনুযায়ী, এই ক্ষুদ্র পৃথিবীই একমাত্র স্থান যেখানে আমরা জীবনের অস্তিত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত। এখানেই মানুষের জন্ম, এখানেই সভ্যতার উত্থান, এখানেই আমাদের ধর্ম, দর্শন, ভালোবাসা, ঘৃণা, যুদ্ধ, রাজনীতি এবং ঈশ্বরকে খোঁজার হাজার বছরের ইতিহাস।

ধর্মগুলো বলে—ঈশ্বর মানুষকে সৃষ্টি করেছেন, মানুষের কাছে নবী বা বার্তাবাহক পাঠিয়েছেন, দিয়েছেন ধর্মীয় বিধান, নৈতিকতা, পাপ-পুণ্য, বিচার এবং পরকালের ধারণা।

তাহলে প্রশ্ন জাগে—

যদি মানুষের জন্যই ধর্মীয় বার্তা আসে, তবে এত অকল্পনীয় বিশাল মহাবিশ্ব সৃষ্টি করার উদ্দেশ্য কী?

কেন শত শত বিলিয়ন গ্যালাক্সি?

কেন প্রতিটি গ্যালাক্সিতে বিলিয়ন বিলিয়ন নক্ষত্র?

কেন এমন সব গ্যালাক্সি আছে, যাদের আলো পৃথিবীতে পৌঁছাতে বিলিয়ন বছর সময় লাগে?

যদি মানুষই সৃষ্টির বিশেষ উদ্দেশ্যের অংশ হয়, তাহলে আমাদের আবাসস্থলকে মহাবিশ্বের এত ক্ষুদ্র একটি কোণে রাখা হলো কেন?

আমরা কি সত্যিই এই মহাবিশ্বে একা?

যদি অন্য কোনো গ্রহে বুদ্ধিমান প্রাণী থেকে থাকে, তাহলে তাদের কাছেও কি ঈশ্বর কোনো বার্তা পাঠিয়েছেন?

তাদেরও কি ধর্ম আছে?

তাদেরও কি নবী, পাপ-পুণ্য, স্বর্গ-নরক কিংবা পরকালের ধারণা রয়েছে?

আর যদি সমগ্র মহাবিশ্বে সত্যিই শুধু পৃথিবীতেই বুদ্ধিমান জীবন থাকে, তাহলে ট্রিলিয়নসংখ্যক গ্যালাক্সি, অসংখ্য নক্ষত্র ও গ্রহের প্রয়োজন কী ছিল?

আরও একটি প্রশ্ন—

ঈশ্বর যদি সমগ্র মহাবিশ্বের স্রষ্টা হন, তাহলে পৃথিবীতে কেন এতগুলো ভিন্ন ধর্মের জন্ম হলো?

কেন এক ধর্মের মানুষ বিশ্বাস করে তার ধর্মই সত্য, আবার অন্য ধর্মের মানুষ একই দৃঢ়তার সঙ্গে বিশ্বাস করে তার ধর্মই সত্য?

যদি সত্য একটাই হয়, তাহলে মানুষের কাছে সেই সত্য এত ভিন্ন ভিন্ন রূপে পৌঁছাল কেন?

কেন ঈশ্বর নিজের অস্তিত্ব এবং তাঁর প্রকৃত বার্তা এমনভাবে প্রকাশ করলেন না, যাতে পৃথিবীর প্রত্যেক মানুষ—দেশ, ভাষা, সংস্কৃতি ও জন্মস্থান নির্বিশেষে—একই সত্যকে সমানভাবে বুঝতে পারে?

কেন একজন মানুষ যে পরিবারে জন্মায়, সেই পরিবারের ধর্মকেই সত্য মনে করার সম্ভাবনা এত বেশি?

যদি মানুষের অনন্তকালের পরিণতি তার বিশ্বাসের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়, তাহলে জন্মস্থান, পরিবার, সংস্কৃতি ও ইতিহাস কেন তার বিশ্বাসকে এত গভীরভাবে প্রভাবিত করে?

২২ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ভোর ৬:২৯

ডঃ এম এ আলী বলেছেন:




আপনার মন্তব্যটিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রশ্ন তোলা হয়েছে। বিশেষ করে মহাবিশ্বের বিপুল ব্যাপ্তি, পৃথিবীর ক্ষুদ্রতা,
অন্যত্র জীবনের সম্ভাবনা এবং বিভিন্ন ধর্মের বৈচিত্র্য এসব প্রশ্ন বিশ্বাসী ও অবিশ্বাসী উভয় পক্ষের জন্যই গভীরভাবে
চিন্তার বিষয়। তবে কয়েকটি প্রশ্নের মধ্যে এমন কিছু অনুমান রয়েছে, যেগুলো আলাদা করে দেখা দরকার।

প্রথমত, মহাবিশ্ব বিশাল তাই পৃথিবী বা মানুষ সৃষ্টির কোনো বিশেষ তাৎপর্য থাকতে পারে না, এই সিদ্ধান্তটি সরাসরি
অনুসরণ করে না। কোনো কিছুর ভৌত আকার বা সংখ্যাগত ব্যাপ্তি তার মূল্য বা উদ্দেশ্য নির্ধারণ করে না। একটি
মানুষের শরীর মহাবিশ্বের তুলনায় ক্ষুদ্র হলেও তার চেতনা, ভালোবাসা বা নৈতিক মূল্যকে কেবল আকার দিয়ে বিচার
করা যায় না। একইভাবে, পৃথিবী মহাবিশ্বের তুলনায় ক্ষুদ্র এটি একটি বৈজ্ঞানিক সত্য; কিন্তু সেখান থেকে মানুষের
অস্তিত্ব অর্থহীন বা উদ্দেশ্যহীন এটি বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্ত নয়।

দ্বিতীয়ত, এত বিপুল মহাবিশ্বের প্রয়োজন কী ছিল?এখানে প্রয়োজন শব্দটি ধরে নেওয়া হচ্ছে যে মহাবিশ্বকে মানুষের
প্রয়োজন মেটানোর জন্যই তৈরি হতে হবে। ধর্মীয় সৃষ্টিতত্ত্বের সব ব্যাখ্যাই কিন্তু এমন দাবি করে না। কোনো ধর্মতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গিতে মহাবিশ্বের উদ্দেশ্য মানুষের ব্যবহারিক প্রয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নাও হতে পারে। ফলে গ্যালাক্সি বেশি
কেন, নক্ষত্র এত কেন এই প্রশ্নের উত্তর না পাওয়া নিজে থেকে কোনো ধর্মীয় দাবিকে খণ্ডন করে না।

তৃতীয়ত, আমরা অন্য গ্রহে জীবন আছে কি না এখনও নিশ্চিতভাবে জানি না। পৃথিবীর বাইরে জীবনের সন্ধান চলছে,
কিন্তু এখন পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে পৃথিবীর বাইরের জীবনের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তাই অন্য বুদ্ধিমান প্রাণীর কাছে আল্লা
কী বার্তা পাঠিয়েছেন? এটি বর্তমানে একটি অনুত্তরিত প্রশ্ন, প্রমাণিত বৈজ্ঞানিক তথ্য নয়। ধর্মতত্ত্বে এর সম্ভাব্য ব্যাখ্যা
নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে, কিন্তু বিজ্ঞান বর্তমানে এ বিষয়ে চূড়ান্ত উত্তর দেয় না।

চতুর্থত, বিভিন্ন ধর্মের অস্তিত্ব অবশ্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক সমস্যা। একই স্রষ্টা থাকলে মানুষের কাছে সত্যের
এত ভিন্ন ব্যাখ্যা কেন এ প্রশ্ন যথার্থ। তবে এখানেও একটি পার্থক্য করা প্রয়োজন, কোনো দাবির বহু ব্যাখ্যা থাকা
মানেই মূল দাবিটি মিথ্যা নয়। বরং প্রশ্নটি দাঁড়ায় কোন দাবির পক্ষে কী ধরনের ঐতিহাসিক, দার্শনিক, ধর্মতাত্ত্বিক
ও অন্যান্য প্রমাণ রয়েছে?

আর জন্ম পরিবারের প্রভাবের বিষয়টিও সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ। একজন মানুষ সাধারণত যে পরিবার, সমাজ ও সংস্কৃতিতে
জন্ম নেয়, তার বিশ্বাস গঠনে সেগুলোর গভীর প্রভাব থাকে। কিন্তু কোনো বিশ্বাসের সামাজিক উৎস এবং সেই বিশ্বাস
সত্য কি না এই দুটি আলাদা প্রশ্ন। যেমন কোনো বৈজ্ঞানিক সত্য আমি পরিবার থেকে শিখেছি বলে সত্যটি মিথ্যা হয়ে
যায় না। আবার শুধু পরিবার থেকে পাওয়া বলে কোনো ধর্মীয় বিশ্বাস সত্য প্রমাণিতও হয় না।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বিজ্ঞান এখনো উত্তর দিতে পারেনি এবং এর কোনো উত্তর নেই এই দুটি কথা এক
নয়। একইভাবে, আমি কোনো ধর্মীয় ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট নই এবং তাই কোনো স্রষ্টা নেই এ দুটিও একই সিদ্ধান্ত নয়।
আমার মনে হয়, এই আলোচনার সবচেয়ে সৎ জায়গাটি হলো প্রশ্নগুলোকে বন্ধ না করা। বরং একসঙ্গে তিনটি
প্রশ্ন রাখা ১) মহাবিশ্ব কীভাবে অস্তিত্ব লাভ করল?২) কেন আদৌ কিছু আছে কিছুই না থাকার পরিবর্তে?আর
৩) মানুষের ধর্মীয় অভিজ্ঞতা ও বিভিন্ন ধর্মের দাবিগুলোর মধ্যে কোনগুলো সত্য, কোনগুলো মানবিক ব্যাখ্যা?
প্রথম প্রশ্নের অনেকটাই বিজ্ঞান অনুসন্ধান করছে; দ্বিতীয়টি গভীরভাবে দার্শনিক; আর তৃতীয়টি ধর্মতত্ত্ব, ইতিহাস,
দর্শন ও ব্যক্তিগত বিশ্বাসের বিস্তৃত আলোচনার বিষয়।

অতএব, মহাবিশ্বের বিশালতা যেমন সৃস্টিকর্তার অস্তিত্বকে বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণ করে না, তেমনি মহাবিশ্বের
বিশালতা, ধর্মের বৈচিত্র্য বা পৃথিবীর ক্ষুদ্রতাও একা সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বকে অস্বীকার করার চূড়ান্ত প্রমাণ নয়।
আপনারন প্রশ্নগুলো খুবই শক্তিশালী, কিন্তু শক্তিশালী প্রশ্ন আর চূড়ান্ত খণ্ডনএক জিনিস নয়।

শুভেচ্ছা রইল

৪| ২১ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১০:০৯

কাজী আবু ইউসুফ (রিফাত) বলেছেন: اللَّهُ الصَّمَدُ ‘আল্লাহ অমুখাপেক্ষী; সকলেই তাঁর মুখাপেক্ষী।’
সৃষ্টির ধারায় যত স্তরই থাকুক, কোনো সৃষ্ট স্তরই চূড়ান্ত ব্যাখ্যা নয়। চূড়ান্ত নির্ভরতার স্থান একমাত্র আল্লাহ।


ইহাই চরম ও পরম সত্য।

--আপনি অনেক সুন্দরভাবে যথেষ্ঠ মেধার পরিচয় দিয়েছেন। যাযাকাল্লাহ খাইরান।

২২ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ভোর ৬:৩১

ডঃ এম এ আলী বলেছেন:



সুন্দর মুল্যবান মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানবেন ।

শুভেচ্ছা রইল

৫| ২১ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:৪৬

রাজীব নুর বলেছেন: ওকে।

২২ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ভোর ৬:৩২

ডঃ এম এ আলী বলেছেন:



ওকে কী পক্ষে না বিপক্ষে ।
শুভেচ্ছা রইল ।

৬| ২২ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৩:৪৪

সুলাইমান হোসেন বলেছেন: আপনার পোস্টটি মনোযোগ দিয়ে পড়েছি। এখানে দুইটি বিষয় পেয়েছি,যার একটি গুরুত্বপূর্ণ আকিদা গত।
আরেকটি মানুষের স্বাভাবিক এবং সাধারন কৌতুহল বিষয়ক।
প্রথম সৃষ্টি কি?এটা মানুষের কৌতুহল বিষয়ক একটি প্রশ্ন।যা মানুষের প্রয়োজন বা দরকারের সাথে সম্পর্কিত নয়।
আরেকটি বিষয় আল্লাহর সত্তা সম্পর্কে।তিনি কোত্থেকে এলেন।তার উপরে কি কেউ আছে নাকি?
এই প্রশ্নের উত্তর জানাও দুনিয়াতে প্রয়োজনীয় নয়। শুধু এতটুকু জানাই যথেষ্ট যতটুকু সূরা ইখলাসে বলা হয়েছে।

কুরআন আমাদেরকে যতটুকু জানিয়েছে এর বাইরে আমরা আর কোনোকিছুই জানিনা।
ধারনা বা কল্পনা করে সৃষ্টিকর্তা সম্পর্কে কোনোকিছুই বলা যায়না।যতক্ষন না সৃষ্টিকর্তা নিজেই জানিয়ে দিবেন অথবা বলে দিবেন।

এজন্য যারা বুদ্ধিমান তারা চুপ থাকে এবং ধৈর্য ধরে অনন্তকালের জন্য।এবং আশা রাখে হয়ত আল্লাহ কোনোদিন তার নিজের হাকিকত জানিয়ে দিবেন।সেই পররযন্ত আমাদেরকে ধৈর্য ধরতে হবে!

তাছাড়া আমি নিজের পড়াশোনা ধ্যান চিন্তা থেকে জানতে পরেছি,দুনিয়াতে আল্লাহ তার হাকিকত কাউকেই জানাবেননা।কিন্তু পরকালে হয়তোবা জানিয়ে দিবেন,কিন্তু সবাইকে নয়।তার নিকটতম বন্ধু এবং উঁচু মকামের নবী রসূলদের কাউকে কাউকে হয়তোবা জানিয়ে দিবেন।নবী রসূলদের থেকে অন্যরা জানতে পারে।তবে এটা সম্ভাবনা।এই বিষয়ে কুরআন হাদীসে কোনো কিছু বলা হয়নি।আমাদের কাজ হলো অনন্তকাল ধৈর্য ধরে থাকা।এবং যা নির্দেশনা দেওয়া হয় তা পালন করতে থাকা।তারপর দেখতে থাকা যে কি হয়।এবং সামনে কি কি আসে।এবং সামনে মানুষকে অনেক কিছুই দেখানো হবে এতে কোনো সন্দেহ নেই।

আল্লাহ তায়ালা বলেন,

سَنُرِیۡہِمۡ اٰیٰتِنَا فِی الۡاٰفَاقِ وَفِیۡۤ اَنۡفُسِہِمۡ حَتّٰی یَتَبَیَّنَ لَہُمۡ اَنَّہُ الۡحَقُّ ؕ اَوَلَمۡ یَکۡفِ بِرَبِّکَ اَنَّہٗ عَلٰی کُلِّ شَیۡءٍ شَہِیۡدٌ


এখন আমি তাদেরকে আমার নিদর্শনাবলী প্রদর্শন করাব পৃথিবীর দিগন্তে এবং তাদের নিজেদের মধ্যে; ফলে তাদের কাছে ফুটে উঠবে যে, এ কোরআন সত্য। আপনার পালনকর্তা সর্ববিষয়ে সাক্ষ্যদাতা, এটা কি যথেষ্ট নয়?



—হা-মীম আস-সিজদাহ্ (ফুছছিলাত) - ৫৩

এই আয়াত থেকে বোঝা যায়।অনেক কিছুই আল্লাহ মানুষকে জানিয়ে দিবেন।শুধু সময়ের ব্যবধান।
সুতরাং মুমিননদের কর্তব্য হলো—
১।কোনো বিষয়ে যদি জ্ঞান থাকে (নিশ্চিত জ্ঞান) তাহলে অনুমান করে কিছু না বলে সেই বিষয়টি,আল্লাহর সাথে সাক্ষাত ঘটার সময় বিনয়ের সাথে জেনে নেওয়া যাবে।এই অপেক্ষা নির্দিষ্টকাল ধৈর্যধারন করা।

২।মুমিনদের এখন কাজ হলো আল্লাহকে নিয়ে চিন্তা না করে আল্লাহর সৃষ্টিজগত নিয়ে ধ্যান চিন্তা করা,এবং আল্লাহর অপূর্ব ক্ষমতা,সত্যতা অন্তরের চোখে উপলব্ধি করার চেষ্টা করা।এই উদ্দ্যেশে আমি আমার "হাকিক্বতুল মায়ারিফ" সিরিজ আকারে লেখা শুরু করেছি।আগ্রহী পাঠকরা পাঠ করতে পারেন।ইহা পাঠ করলে এমন অনেক নিদর্শন প্রত্যক্ষ করা যাবে,যেদিকে সাধারনত আমাদের মনোযোগ যায়না।

৩।আল্লাহর সত্তা সম্পর্কে আল্লাহ ছাড়া আর কেউই জানেনা।কিন্তু আল্লাহ তায়ালা যদি কাউকে দুএকটু জানিয়ে দেন সেটা ভিন্ন কথা।নবী -রসূলরাও তার সম্পর্কে পুরোপুরি জানেনা,এই বিশ্বাস রাখা।কারন কুরআন হাদিস থেকে ইহা জানা যায়।

৪।আল্লাহ সম্পর্কে জানার আগ্রহ অনেক মানুষেরই ছিলো।সেই আগ্রহ থেকেই মানুষ আল্লাহরই দেখানো পথে আধ্যাতিক সাধনা শুরু করে।এবং অল্প অল্প করে জানতে থাকে।
যদি আল্লাহ সম্পর্কে হঠাৎ পুরুপুরি কোনো মানুষকে জানিয়ে দেওয়া হয়,তাহলে সেই মানুষটা বাঁচতে পারবেনা।কারন পৃথিবীতে সেই যোগ্যতা ক্ষমতা নেই।সহ্য করার শক্তিও নেই।

(আমি জানি,ড.এম এ আলী ভাই বিস্তারিত লিখতে এবং বিস্তারিত এবং বড় মন্তব্য পছন্দ করেন।এজন্য আমার মন্তব্যকে কিছুটা বড় আকারেই করেছি।তাছাড়া মূল কথা খুবই সংক্ষিপ্ত এবং ছোট)

আল্লাহকে যদি পুরোপুরি জানিয়ে দেওয়া হয়,তাহলে মানুষ সেটা সহ্য করতে পারবেনা কেন।এই বিষয়ে হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম আবু হামেদ গাজ্জালী রহ.(ইন্তেকাল ১১১১ খ্রী.) একটি ঘটনা তার বিখ্যাত গ্রন্হ ইহইয়াউল উলুমুদ্দিনে উল্ল্যেখ করেছেন,ঘটনাটি আমি এখানে লিখে দিচ্ছি।

সম্ভবত আবু তুরাব বলখী রহ. এর একজন তত্ত্বঅন্বেষি মুরীদ অধিকাংশ সময় দুনিয়াবি কাজকর্মে লিপ্ত থাকত।একদিন আবু তুরাব রহ. তার মুরিদকে একান্তে বললেন,খুব ভালো হতো যদি তুমি ইয়াজিদ বুস্তামি রহমাতুল্লাহি আলাইহির সাথে দেখা করতে।মুরিদ বলল, তার আমার কোনো প্রয়োজন নেই, আমি সর্বোক্ষন অন্তরের চোখে আমার প্রতিপালককে দেখতে থাকি।
আবু তুরাব রহ.বললেন, "তুমি তোমার প্রতিপালককে এই ভাবে একশতবার দেখার চাইতে আবু ইয়াজিদ বোস্তামী রহমাতুল্লাহি আলাইহিকে একবার দেখা আমি উত্তম মনে করি।মুরিদ তার কথা শুনে আশ্চর্য হলো।পীরের কথার মর্ম বুঝতে পেরে পীর মুরীদ দুজনেই আবু ইয়াজিদ বোস্তামী রহ.এর সাথে সাক্ষাত করতে গেলেন।

এক ভয়ংকর জঙ্গলের মধ্যে দুজনেই ইয়াজিদ বুস্তামি রহ.এর সাক্ষাত লাভে ধন্য হলেন।আবু তুরাব রহ.এর যদিও কিছু হলোনা কিন্তু তার মুরিদ আবু ইয়াজিদ বুস্তামি(বায়জিদ বুস্তামি)রহতুল্লাহি আলাইহিকে দেখা মাত্রই মাটিতে পড়ে গেলো, এবং প্রানবায়ু বের হয়ে গেলো।

আবু তুরাব রহ.তখন আবু ইয়াজিদ রহ.কে বললেন," আপনাকে দেখার কারনে লোকটা মরে গেলো!"আবু ইয়াজিদ রহ.বললেন,"আমাকে দেখার কারনে কেউ মারা যায়না।কিন্তু আপনার মুরীদ সিদকের হালতে ছিলো,আমাকে দেখার কারনে তার হালত পরিপূর্ণভাবে বিকশিত হলো,যেটা তার সহ্যের বাইরে ছিলো।এজন্যই সে মারা গেছে।

এই ঘটনা থেকে আমরা বুঝত পারলাম দুনিয়াতে আসলে আমাদের ধৈর্য ধারন করা উচিত

২২ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ভোর ৬:৪৫

ডঃ এম এ আলী বলেছেন:




আপনার দীর্ঘ ও মননশীল মন্তব্যটি অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে পড়লাম। বিশেষ করে যেখানে নিশ্চিত জ্ঞান নেই,
সেখানে অনুমানকে জ্ঞান হিসেবে উপস্থাপন না করা এই সতর্কতার সঙ্গে আমি একমত। সৃষ্টিকর্তার সত্তা সম্পর্কে
মানুষের জ্ঞানের সীমা স্বীকার করা নিঃসন্দেহে বুদ্ধিবৃত্তিক বিনয়ের পরিচয়।

আমার কাছে আপনার বক্তব্যের সবচেয়ে সুন্দর দিকটি হলোমসৃষ্টিকর্তার সত্তা নিয়ে অযথা কল্পনা না করে তাঁর
সৃষ্টিজগত নিয়ে চিন্তা করা। কুরআনের আফাক ও আনফুস এর নিদর্শনের দিকে যে আহ্বান, সেটি মানুষকে একই
সঙ্গে জ্ঞান, আত্মজিজ্ঞাসা ও বিস্ময়ের পথে নিয়ে যায়। সূরা ফুসসিলাতের ৫৩ নম্বর আয়াতও এ প্রসঙ্গে অত্যন্ত
তাৎপর্যপূর্ণ।

তবে একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য মনে রাখা দরকার আমরা জানি না এবং কেউ কোনোভাবেই জানতে পারে না এই দুটি
বক্তব্য সমার্থক নয়। প্রথমটি আমাদের বর্তমান জ্ঞানের সীমা স্বীকার করে দ্বিতীয়টি ভবিষ্যৎ জ্ঞান বা ওহির
সম্ভাবনা সম্পর্কেও একটি অতিরিক্ত সিদ্ধান্ত হয়ে যেতে পারে। তাই এ ক্ষেত্রে “আল্লাহ যতটুকু জানিয়েছেন,
আমরা ততটুকুই নিশ্চিতভাবে জানিম এই অবস্থানটি হয়তো সবচেয়ে নিরাপদ।

আর “আল্লাহ কোথা থেকে এলেন? প্রশ্নটির মধ্যেও একটি দার্শনিক অনুমান লুকিয়ে আছে। কোথা থেকে আসা,
আগে-পরে, কার দ্বারা সৃষ্টি এসব ধারণা সাধারণত সৃষ্ট ও পরিবর্তনশীল জগতের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। ইসলামী আকিদায়
আল্লাহ সৃষ্ট জগতের অন্তর্ভুক্ত নন, বরং তিনিই স্রষ্টা। সূরা ইখলাসের ভাষায় তিনি কারও মুখাপেক্ষী নন এবং তাঁর
সমতুল্য কেউ নেই। ফলে সৃষ্টির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য কারণ-কার্য সম্পর্ককে স্রষ্টার ওপর একইভাবে প্রয়োগ করা কতটা
যৌক্তিক এটি নিজেই একটি গভীর দার্শনিক প্রশ্ন।

তবে এখানে আরেকটি জায়গায় সামান্য সতর্কতা প্রয়োজন। কোনো আধ্যাত্মিক ব্যক্তির অভিজ্ঞতা, কাশফ, কিংবা
সাধকের কোনো ঘটনা একজন মানুষের ব্যক্তিগত বিশ্বাসকে গভীরভাবে প্রভাবিত করতে পারে; কিন্তু সেটিকে সবার
জন্য প্রমাণিত জ্ঞান বা আকিদার ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করতে হলে আলাদা প্রমাণ প্রয়োজন। ইমাম গাজ্জালী (রহ.)
এর মতো মহান মনীষীদের আধ্যাত্মিক বর্ণনাগুলো আমাদের চিন্তার দুয়ার খুলে দিতে পারে, কিন্তু কুরআন ও সহিহ
হাদিসের সুস্পষ্ট বক্তব্য এবং পরবর্তী আধ্যাত্মিক বর্ণনার মর্যাদা এক করে দেখা উচিত নয়।

আমার কাছে তাই আপনার বক্তব্যের সারকথাটি এমন যেখানে ওহি আমাদের জ্ঞান দিয়েছে, সেখানে বিশ্বাস ও
উপলব্ধির সঙ্গে তা গ্রহণ করা; যেখানে ওহি নীরব, সেখানে নিজের কল্পনাকে চূড়ান্ত সত্য না বানানো; আর
যেখানে প্রকৃতির নিদর্শন উন্মুক্ত, সেখানে জ্ঞান ও চিন্তার মাধ্যমে সেগুলো পর্যবেক্ষণ করা এই তিনটির সমন্বয়ই
হয়তো সবচেয়ে সুন্দর পথ।

আর একটি কথা বিশেষভাবে ভালো লেগেছে অজানাকে স্বীকার করা জ্ঞানের পরাজয় নয়; বরং জ্ঞানের প্রতি সততা।
মানুষ যত বেশি জানতে শেখে, ততই অনেক প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার পাশাপাশি নতুন প্রশ্নের জন্ম হয়। সুতরাং
সৃষ্টিজগত নিয়ে অনুসন্ধান এবং স্রষ্টার সামনে বিনয় দুটিকে পরস্পরের বিরোধী না ভেবে পাশাপাশি রাখাই সম্ভবত
অধিক ফলপ্রসূ।

আপনার শেষ কথাটিও যথার্থভাবে একটি আধ্যাত্মিক শিক্ষা সামনে আনে মানুষের উপলব্ধি সীমিত। তবে সেই
সীমাবদ্ধতার অর্থ জিজ্ঞাসাকে হত্যা করা নয়; বরং জিজ্ঞাসাকে বিনয়ী করা। কারণ প্রশ্ন করতে করতে মানুষ জ্ঞান
অর্জন করে, আর নিজের সীমা বুঝতে বুঝতেই সত্যের সামনে নত হতে শেখে।

আপনার হাকিক্বতুল মায়ারিফ সিরিজের কথাও আগ্রহ জাগায়। সৃষ্টিজগতের নিদর্শনকে নতুন চোখে দেখার যে
আহ্বান আপনি জানিয়েছেন, সেটি ধর্মীয় চিন্তা ও জ্ঞানানুসন্ধানের মধ্যে একটি সুন্দর সেতুবন্ধন তৈরি করতে পারে।

শুভেচ্ছা রইল

৭| ২২ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:০৫

সৈয়দ মশিউর রহমান বলেছেন: লেখার সংগে প্রশ্ন ও উত্তর অনেক চমৎকার হয়েছে। তবে শেষের লাইনটি আমার মনে অনে প্রশান্তি দিয়েছে।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে যেখানে জ্ঞান আছে সেখানে দৃঢ থাকতে, আর যেখানে জ্ঞান নেই সেখানে বিনয়ের সঙ্গে থেমে যেতে তাওফিক দান করুন। আমিন

৮| ২২ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৪:১৮

আলামিন১০৪ বলেছেন: আত্মা সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে আল্লাহ বলেন, তোমাদের অল্প জ্ঞানই দেয়া হয়েছে। আমাদের পঞ্চ-ইন্দ্রিয় হতে যা জানতে পারি তা অত্যন্দ ক্ষুদ্র। একটু ব্যাখ্যা করি- যে ব্যক্তি বর্ণান্ধ তাকে আপনি যতই বোঝান- হাজার টেরাবাইটের বই পড়েও সে বুঝবে না লাল আলো দেখতে কেমন। আমাদের চারপাশে সময়ের পরিবর্তন দেখি- আর দেখি ঘটনার আগ পরের সম্পর্ক । আর আমরা সেই বর্ণান্ধ ব্যক্তির মতো সীমাবদ্ধ ইন্দ্রিয়লব্ধ ধারনা নিয়ে প্রশ্ন করার দুঃসাহস দেখাই। স্রষ্টার আগে কি ছিল তা জানতে চাই। স্রষ্টা যে কলম সৃস্টি করেছেন-তা কেবল আমাদের যমানার শুরু ও শেষ লিপিবদ্ধ করার জন্য। তার পূর্বে কি কিছু ছিলনা? বলা হয়েছে- আদিতে পানির উপর স্রষ্টা বিরাজমান ছিলেন। সেটাকে আদি ধরলেও আবারো প্রশ্ন আসে- তার আগে কী ছিল- । আসলে এই প্রশ্ন-শৃঙ্খলের শেষ নেই। ধরা যেতে পারে আমাদের সন্তষ্ট করতে এতটুকুই তথ্য দিয়েছেন আল্লাহ-তাআলা।

বিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠিত সত্য যা সন্দেহের উর্ধ্বে , তার সাথে ধর্মের কোন বিরোধ থাকতে পারে না। আমরা ধর্মকে বিজ্ঞান থেকে আলাদা চিন্তা করার কারণে আল্লাহর আয়াত নিয়ে গবেষণা করার ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে না। আপনি মহাবিশ্বের যে ধারনা প্রতিমন্তব্যে দিয়েছেন- তা শুধু আমাদের ইন্দ্রিয়লব্ধ যতটুকু জগত ততটুকু নির্দেশ করে। বস্তুত, ‍নিকটতম আকাশ যাকে তিনি তারকারাজি দ্বারা সুশোভিত করেছেন তার কিয়দংশ আমরা জানতে পেরেছি। এর বাইরে বৃহৎ থেকে বৃহত্তর আরো ৬টি আসমান রয়েছে। সেখানে সময় কীভাবে প্রবহমান তা আমরা জানিনা। আবার পবিত্র কুরআনে জান্নাতের বিশালতা বোঝাতে বলা হয়েছে এটি আসমানসমূহ (আকাশমণ্ডলী) ও জমিনের (পৃথিবী) মতো প্রশস্ত [সূরা আল ইমরান: ১৩৩]।
আপনি বিশেষ আপেক্ষিকতার এফেক্ট এর উদাহরণ দিয়েছেন । গতির সাথে সময়ের আপেক্ষিকতার সম্পর্কের বাইরেও- গ্রেভিটি ফিল্ডের কারণে স্পেস-টাইমের বক্রতা সৃষ্টি হয়। আল্লাহ বলেছেন- তার আসন আসমানসমূহ ও জমিনে ব্যাপ্ত। সময়কেও তিনি নিয়ন্ত্রন করতে পারেন- সে হিসেবে তিনিই সময়ের বহমানতার কারণ। আর আমরা অল্পই জানি-

৯| ২২ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৫:১৪

রাজীব নুর বলেছেন: পোষ্টে আবার এলাম। কে কি মন্তব্য করেছেন, সেটা জানতে।

১০| ২২ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৫:৫৩

নতুন বলেছেন: দানবিক রাক্ষস বলেছেন: আমাদের পর্যবেক্ষণযোগ্য মহাবিশ্বে (Observable Universe) আনুমানিক ২ ট্রিলিয়ন গ্যালাক্সি থাকতে পারে। আমাদের নিজেদের Milky Way Galaxy-তেই রয়েছে শত শত বিলিয়ন নক্ষত্র। সেই অগণিত নক্ষত্রের মধ্যে আমাদের সূর্য মাত্র একটি সাধারণ নক্ষত্র। আর সেই সূর্যের চারদিকে ঘুরে চলা ছোট্ট একটি গ্রহ হলো পৃথিবী।

মহাবিশ্বের বিশালতার তুলনায় পৃথিবী এতটাই ক্ষুদ্র যে তাকে একটি বিন্দু বললেও হয়তো পৃথিবীর গুরুত্বকে অতিরঞ্জিত করা হবে।

এবার এই বিশালতাকে কল্পনা করুন অন্যভাবে।

ধরুন, আপনার বাড়ির পেছনের একটি ছোট্ট জায়গায় একটি পিঁপড়ার কলোনি রয়েছে। সেই কলোনির কাছে তাদের পুরো পৃথিবী বলতে ওই সামান্য জায়গাটুকুই। তারা জানে না আপনার বাড়ির ওপাশে কী আছে, পাশের রাস্তায় কী আছে, কিংবা পৃথিবীর অন্য প্রান্তে আরও কত অসংখ্য পিঁপড়ার কলোনি রয়েছে।

এখন যদি সেই পিঁপড়ারা বিশ্বাস করে যে তাদের সেই ক্ষুদ্র কলোনির জন্যই সমগ্র মহাবিশ্ব সৃষ্টি করা হয়েছে, তাহলে বিষয়টি কেমন শোনাবে?

তারা আরও দাবি করল—তাদের স্রষ্টা একজন বিশেষ পিঁপড়ার সঙ্গে একটি পাহাড়ের ওপরে কথা বলেছেন; সে সেখানে আগুন দেখেছে এবং স্রষ্টার সঙ্গে কথোপকথন করেছে।

আরেকজন বিশেষ পিঁপড়াকে স্রষ্টা সাত আসমানের ওপরে নিয়ে গেছেন এবং পর্দার ওপাশ থেকে তার সঙ্গে কথা বলেছেন।

আশ্চর্যের বিষয় হলো, সেই সব নবী-রাসুলের সবাই জন্ম নিয়েছেন একই ছোট্ট ভৌগোলিক অঞ্চলে, এবং তাদের কারও ধারণাই ছিল না যে তাদের সেই অঞ্চলের দক্ষিণে, পশ্চিমে কিংবা পৃথিবীর অন্য প্রান্তে আরও অসংখ্য পিপড়াসমাজ রয়েছে—যাদের ভাষা, সংস্কৃতি ও বিশ্বাসও সম্পূর্ণ ভিন্ন।

সময়ের সঙ্গে পৃথিবীর বিভিন্ন বিচ্ছিন্ন মানবসমাজ নিজেদের ভাষা, সংস্কৃতি, ব্যাখ্যা এবং ধর্মীয় ধারণা তৈরি করেছে। তারা নিজেদের মধ্যে কথা বলেছে, গল্প বলেছে, বিশ্বাস তৈরি করেছে এবং সেই বিশ্বাস প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে সংরক্ষণ করেছে।

তাহলে প্রশ্নটা কি করা যায় না—

আমাদের অবস্থাটাও কি সেই পিঁপড়ার কলোনির মতো হতে পারে না?

আমরা কি মহাবিশ্বের বিশালতার তুলনায় অত্যন্ত ক্ষুদ্র একটি গ্রহে বসবাস করে, আমাদের নিজেদের সীমিত জ্ঞান, ভাষা, সংস্কৃতি ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে একজন স্রষ্টার ধারণা এবং একটি ধর্মীয় কাঠামো নির্মাণ করে নিতে পারি না?

অর্থাৎ, আমরা যে স্রষ্টাকে নিয়ে কথা বলছি, সেই ধারণাটি সত্যিই কোনো মহাজাগতিক স্রষ্টার কাছ থেকে এসেছে—নাকি আমাদের সীমিত মানবিক অভিজ্ঞতা থেকেই তৈরি হয়েছে—এই প্রশ্নটি কি অন্তত যৌক্তিকভাবে তোলা যায় না? যদি ভাষার মতন জটিল জিনিস মানুষ সৃস্টি করতে পারে তবে সৃস্টিকর্তা ধর্মের মতন জিনিসও মানুষের সৃস্টি হতেই পারে তাই না?

কারণ, কোনো বিশ্বাস মানুষের কাছে অত্যন্ত পবিত্র ও গভীর হলেই সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে তার উৎসকে প্রমাণ করে না। একইভাবে, আমাদের মহাবিশ্ব সম্পর্কে অজ্ঞতা কোনো ধর্মীয় দাবিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মিথ্যাও প্রমাণ করে না।

প্রশ্নটা তাই ধর্ম বনাম বিজ্ঞান নয়; প্রশ্নটা আরও মৌলিক—আমরা যে বাস্তবতাকে ব্যাখ্যা করছি, সেই ব্যাখ্যার উৎস সম্পর্কে আমরা কতটা নিশ্চিত হতে পারি?

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.