নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

মানুষ মরে গেলে পঁচে যায় আর বেঁচে থাকলে বদলায়

সৈয়দ কুতুব

নিজের অজ্ঞতা নিজের কাছে যতই ধরা পড়ছে প্রচলিত বিশ্বাসের প্রতি ততই অবিশ্বাস জন্মাছে!

সৈয়দ কুতুব › বিস্তারিত পোস্টঃ

নারীর ক্ষমতায়নের নামে বাঙালিকে স্রেফ টুপি পরানো হয়েছে

০৬ ই এপ্রিল, ২০২৬ রাত ১:৪৩


বাংলাদেশে চেয়ার একটি আধ্যাত্মিক বস্তু। শুধু বসার জন্য নয়, এটি পরিচয়ের প্রমাণ, অস্তিত্বের স্বীকৃতি, এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে জীবনের চূড়ান্ত অর্জন। গাড়ি থাকুক না থাকুক, বেতন আসুক না আসুক, পরিচয়পত্রে একটা নতুন পদবি যোগ হলেই মানুষ রাতে শান্তিতে ঘুমাতে পারেন। এই দার্শনিক সত্যটি না বুঝলে বাংলাদেশের প্রশাসন, ক্রীড়া সংস্থা বা কর্পোরেট জগত, কোনোটাই বোঝা সম্ভব নয় ।

গত বছরের অক্টোবরের এক রাতের কথাই ধরুন। ঘড়ির কাঁটা যখন মধ্যরাত ছুঁইছুঁই, তখন ইসফাক আহসান সাহেব কে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ এনএসসি মনোনীত বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবির) পরিচালক ঘোষণা করার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সামাজিক মাধ্যমে ঝড় উঠল। আওয়ামী লীগের পদ, ২০২৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচনে প্রার্থিতা। রাত পোহাতেই দেখা গেল ইসফাক উধাও, আর ভোরের সূর্য ওঠার সাথে সাথে তার জায়গায় বিসিবির পরিচালকের চেয়ারে রুবাবা দৌলার রাজকীয় অভিষেক। যেন এক ফুঁ-তে সব বিতর্ক কর্পূরের মতো উড়ে গেল।

ইসফাক আহসান কীভাবে মনোনয়ন পেলেন, সেটার তদন্ত কেন হলো না ? এনএসসি কি সত্যিই জানত না তাঁর রাজনৈতিক ইতিহাসের কথা? নাকি জেনেশুনেই দিয়েছিল, আর সামাজিক মাধ্যমে শোরগোল না হলে তিনি বহাল থাকতেন? এনএসসি যে মন্ত্রণালয়ের অধীনে, সেই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন আসিফ মাহমুদ। ইসফাকের নাম কার সুপারিশে এলো, রাতারাতি বদলানোর সিদ্ধান্তটাই বা কার ছিল, আর রুবাবার নামটা এত দ্রুত কোথা থেকে এলো, এই প্রশ্নগুলোর উত্তর কেউ খুঁজল না ।

রুবাবা দৌলা বাংলাদেশের কর্পোরেট জগতের একটি পরিচিত এবং সম্মানিত নাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শুরু, তারপর স্টকহোম আর লন্ডনে উচ্চতর ডিগ্রি। গ্রামীণফোনে এগারো বছর কাজ করেছেন, উঠে এসেছেন চিফ মার্কেটিং অফিসার পর্যন্ত। এয়ারটেলে গেছেন, তারপর ওরাকলে বাংলাদেশ, নেপাল ও ভুটানের কান্ট্রি ডিরেক্টর। এই পরিচয়গুলো পড়লে মনে হয়, এমন একজন মানুষ চাইলে যেকোনো প্রস্তাবে "না" বলার সামর্থ্য রাখেন। কারণ তাঁর আর পদের দরকার নেই, পরিচয়ের দরকার নেই। তবু তিনি রাজি হলেন।

বাংলাদেশে এই "তবু রাজি হওয়া"র ঘটনাটা নতুন নয়। আমাদের দেশে একটা অদ্ভুত নিয়ম চালু আছে। যত বড় পদে থাকুন না কেন, সরকারি বা আধাসরকারি একটা চেয়ার পেলে সেটার লোভ সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে। চেয়ারটায় ক্ষমতা থাকুক বা না থাকুক, গাড়ি থাকুক বা না থাকুক, পরিচয়পত্রে একটা নতুন পদবি যোগ হলেই যেন জীবন সার্থক মনে হয়।

কিন্তু রুবাবা সাহেবার ক্ষেত্রে ঘটনাটা আরো গভীর। তিনি শুধু রাজি হননি, রাজি হয়েছেন জেনেশুনে। সে সময়ের পত্রিকা খুললেই দেখা যাচ্ছিল কীভাবে আগের পরিচালক বিতর্কে পড়লেন, কেন বোর্ডে এত অস্থিরতা, আসিফ মাহমুদের ভূমিকা নিয়ে কী কী প্রশ্ন উঠছে। একজন সচেতন, বিশ্বমানের শিক্ষিত মানুষের পক্ষে এই পরিস্থিতি না বোঝার কোনো কারণ নেই। তবু ওরাকলের অফিস থেকে ছাড়পত্র নিয়ে তিনি বিসিবির চেয়ারে বসলেন।

গ্রামীণফোনের সূত্রটা এখানে একটু মনে করিয়ে দেওয়া দরকার। রুবাবা গ্রামীণফোনে যখন ছিলেন, তখন সেই প্রতিষ্ঠান ছিল বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের প্রধান স্পনসর। আর গ্রামীণফোন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ড. মুহাম্মদ ইউনূসের উদ্যোগে। ইউনূস সাহেব ছিলেন তখন দেশের প্রধান উপদেষ্টা। এনএসসি তাঁর সরকারের অধীনে। তাহলে সুতোগুলো কোথায় গিয়ে মেশে, সেটা পাঠক নিজেই বুঝে নিন।

এই পুরো কাণ্ডটায় "নারী ক্ষমতায়ন"এর একটা চকচকে মোড়ক লাগানো হয়েছে। গণমাধ্যম লিখেছে, "বিসিবির ইতিহাসে দ্বিতীয় নারী পরিচালক।" কথাটা সত্যি। কিন্তু ক্ষমতায়ন মানে কি শুধু একজন নারীকে চেয়ারে বসানো? নাকি ক্ষমতায়ন মানে হলো যোগ্য মানুষ স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় দায়িত্ব পাবেন, লিঙ্গ নির্বিশেষে? দ্বিতীয় পছন্দ হিসেবে, বিতর্কিত প্রক্রিয়ায়, তড়িঘড়ি করে একজন নারীকে বসানো আসলে নারীদের সম্মান নয়। এটা নারীকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা। পার্থক্যটা সূক্ষ্ম, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ।

ওদিকে মাঠের চিত্রটা দেখুন। বাংলাদেশ দল ভারতে গিয়ে টি-টোয়েন্টি খেলতে পারল না। ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ বন্ধ। ক্রিকেটাররা আর্থিক সংকটে দিন পার করছেন। আর বোর্ডে চলছে পদত্যাগের মিছিল। ইশতিয়াক সাদেক, আমজাদ হোসেন, ইয়াসির মোহাম্মদ ফয়সাল, ফাইয়াজুর রহমান। ছয় মাসও হয়নি, চারজন চলে গেছেন। কিন্তু রুবাবা আছেন, পদটা আঁকড়ে আছেন। যাঁর আসাটাই প্রশ্নবিদ্ধ ছিল, তিনি সবচেয়ে শক্ত করে চেয়ারটা ধরে বসে আছেন। বাংলাদেশের সিস্টেমে এটাই নিয়ম।

দিনশেষে এই গল্পটা আসলে আমাদের পুরো সিস্টেমের এক ছোট সংস্করণ। এখানে যোগ্যতা থাকলেও সংযোগ লাগে, আর সংযোগ থাকলে প্রক্রিয়ার কোনো ধার ধারতে হয় না। বিসিবির আয়নায় তাকালে আসলে পুরো বাংলাদেশটাকেই দেখা যায়। আর সেই বাংলাদেশে "নারী ক্ষমতায়ন" শব্দটা এখন আর আশার কথা নয়, এটা একটা কৌশল। যে কৌশলে টুপিটা পরানো হয় খুব যত্ন করে, খুব ভদ্রভাবে। এবং বেশিরভাগ সময় হাততালি দিয়ে।

বিসিবি’র পরিচালক আওয়ামী লীগ নেতা! ব্যবস্থা নিচ্ছে এনএসসি- নয়া দিগন্ত অনলাইন ।

ইসফাকের জায়গায় বিসিবির পরিচালক রুবাবা দৌলা-প্রথম আলো ।

মন্তব্য ৩ টি রেটিং +১/-০

মন্তব্য (৩) মন্তব্য লিখুন

১| ০৬ ই এপ্রিল, ২০২৬ রাত ২:০০

স্বপ্নের শঙ্খচিল বলেছেন: রুবাবা দৌলা বাংলাদেশের কর্পোরেট জগতের একটি পরিচিত এবং সম্মানিত নাম।
.....................................................................................................................
আমি উনাকে গ্রামীন ফোন থেকে চিনি ।
পারিবারিক প্রভাবশীলতা এবং উনার ব্যক্তিগত অর্জন
ভালো বিধায় সর্বদা ভালো পদ অধিকার করে আছেন ।

...................................................................................
তাই বলে সবস্হানেই পদ নিয়ে যেতে হবে তা সমর্থন করিনা ।
যে মনটি ঘটেছে ইন্ট্রীম সরকারের সময় ।

০৬ ই এপ্রিল, ২০২৬ রাত ২:২৭

সৈয়দ কুতুব বলেছেন: অসৎ ভাবে ক্ষমতায় বসে দেশের জন্য ভালো কাজ করা পসিবল ?

২| ০৬ ই এপ্রিল, ২০২৬ ভোর ৪:২১

হুমায়রা হারুন বলেছেন: চমৎকার বিশ্লেষণ কুতুব ভাই।
বাস্তবতা আবার মনে পড়ে গেল।
দশ বছর চাকরী করে একটা প্রমোশন মেলে না।
এক জায়গায় বসে আছি তো আছিই। কোন ওভার টাইমও পাওয়া যায় না। বস্‌ মুখে যে একটা ভাল করে কথা বলবে তাও বলে না। কারণ সব জায়গায় লিংক থাকতে হয়। খুব ছোট কাজের জায়গাতেও ।

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.