| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
অপলক
তত্ত্ব, তথ্য ও অনুভূতি ভাগাভাগি করা আমার অভিপ্রায়। কারও যদি ইচ্ছে হয় তবে যে কেউ আমার এই ব্লগের যে কোন কিছু নিজের সংগ্রহে রাখতে পারে।
আপনি আমি প্রত্যাক্ষ পরোক্ষ ভাবে নদীকে হত্যা করি। হয় রাতারাতি বা তিলে তিলে। কিন্তু কিভাবে, সেটাই দেখাবো।
সবার আগে জানা দরকার কোন জলাশয় বা জলাধারকে নদী বলব?
দুনিয়ার বিভিন্ন দেশ নদীকে বিভিন্নভাবে সংজ্ঞায়িত করেছে। বাংলাদেশের নদী কমিশনের মত নদীর সংজ্ঞা হল:
নদ বা নদী বলিতে পাহাড়, পর্বত, হিমবাহ, হ্রদ, ঝরনা, ছড়া, অন্য কোনো জলাশয় বা অন্য কোনো জলাধার হইতে প্রাকৃতিকভাবে উৎপন্ন হইয়া যে জলধারা সারা বছর বা বছরের কোনো কোনো সময় দুই তীরের মধ্য দিয়ে প্রাকৃতিকভাবে প্রবাহিত হইয়া সমুদ্র, মহাসমুদ্র, হ্রদ, অন্য কোনো জলাশয় বা অন্য কোনো জলাধারে পতিত হয় তাহাকে বুঝায়। তবে শর্ত থাকে, উপর্যুক্ত সংজ্ঞায় যাহাই থাকুক না কেন ক্যাডেস্ট্রাল সার্ভে, রিভিশনাল সার্ভে ও বাংলাদেশ রিভিশনাল সার্ভে রেকর্ডে নদ বা নদী যাহা উল্লেখকৃত হইয়াছে, তাহা নদ বা নদী হিসাবে গণ্য হইবে।
২০২৪এ ২৪ সেপ্টেম্বর বিশ্ব নদী দিবসে নদী কমিশন একটি তালিকা প্রকাশ করে। তাতে বলা হচ্ছে, দেশে নদ-নদীর সংখ্যা ১০০৮টি। ২০২৬এ ১০ আগস্ট নদী কমিশনের ওয়েবসাইটে নদনদীর সংখ্যা প্রাথমিকভাবে ৯০৭টি নির্ধারণ করা হয়েছে। মানে নদীর সংখ্যা কমেছে। অর্থাৎ প্রায় ১১ টি নদী স্বরুপ পরিবর্তিত হয়েছে বা মৃত। আরও প্রায় ৭০০টি নদী স্রোতহীন বা সরু হয়েছে বা ভরাট হয়েছে অথবা বলা ভাল শুধু বর্ষায় পুরোপুরি জাগ্রত হয়।
বিজ্ঞদের ভাষায় নদীকে হত্যা বলতে কি বোঝায়?
নদীকে হত্যা বলতে নদীর স্বাভাবিক প্রাণপ্রবাহ, বাস্তুতন্ত্র এবং তার স্বকীয় সত্তাকে ধ্বংস করাকে বোঝায়। আইন ও পরিবেশ গবেষকদের মতে, নদী একটি জীবন্ত সত্ত্বা, প্রবহমানতাকে বাধাগ্রস্ত করে, বিষাক্ত বর্জ্য মিশিয়ে এবং দখল করে যখন নদীকে মৃতপ্রায় বা বালুমহালে পরিণত করা হয়, তখন তা 'নদী হত্যা' হিসেবে গণ্য হয়।
আমি বলব, যে জলাশয়ের পানি প্রবাহে স্রোত নেই + প্রাণের চিহ্ন নেই + জলজ ফুড চেইন নেই + অক্সিজেনের মাত্র প্রায় শূন্য + অন্য বড় নদী বা সাগরে যোগ নেই, সেটা আর নদী নয়। মৃত নদী... যেমন বুড়িগঙ্গা বা করতোয়া।
কিন্তু এই নদী কিভাবে হত্যার শীকার হয়?
-দখল ও ভরাট: নদীর জায়গা দখল করে অবৈধ স্থাপনা, ইটভাটা বা আবর্জনা ফেলার কারণে নদীর স্বাভাবিক প্রশস্ততা ও গভীরতা হারিয়ে যায়।
-বিষাক্ত বর্জ্য ও দূষণ: শিল্পকারখানার অপরিশোধিত বর্জ্য, ট্যানারীর উচ্ছিষ্ট এবং প্লাস্টিক নদীতে ফেলার কারণে পানির গুণাগুণ নষ্ট হয়। নদীর প্রাকৃতিক পরিবেশ নষ্ট হয়। এতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ শূন্যের কোঠায় নেমে যায়, যার ফলে জলজ প্রাণীর মৃত্যু ঘটে। প্লাংকটন বা অনু জীব বাঁচতে পারে না। খাদ্য শৃঙ্খল ভেঙ্গে পড়ে।
-অবৈধ বাঁধ ও ড্যাম নির্মাণ: অপরিকল্পিত বাঁধ, স্লুইসগেট বা জলকপাট নির্মাণের মাধ্যমে নদীর স্বাভাবিক গতিপ্রবাহকে রোধ করা হয়। পানি প্রবাহ না থাকায় নদী মরে যায়।
-যত্রতত্র বালু উত্তোলন: ড্রেজার বা যন্ত্র দিয়ে নদীর তলদেশ থেকে অতিরিক্ত বালু তোলার কারণে নদী তার ভারসাম্য হারায় এবং তীরবর্তী অঞ্চলে তীব্র ভাঙন দেখা দেয়।
-অতিরিক্ত জলজ সম্পদ আহোরন: নদী থেকে স্থানীয় মাছ , জলজ প্রানী বা উদ্ভিদ বেশি মাত্রায় তুলে ফেললে এবং বিদেশী আগ্রাসী প্রজাতির অনুপ্রবেশ ঘটলে, ফুড চেইন ভেঙ্গে পরে। তখনও নদী প্রাণ হারায়, নদী মারা যায়।
-প্রাকৃতিক দূর্যোগে: ভূমিকম্পে বা আগ্নেয়গিরি জন্যে নদীর অবস্থা পরিবর্তন হলে বা নদীর তলদেশ অনেক উঁচু হয়ে পড়লে। এই পয়েন্টটা আমাদের দেশের জন্যে খুব একটা প্রযোজ্য নয়। তবুও এটাও নদী হত্যার একটা কারন।
-সমূদ্রের উচ্চতা বাড়লে: সমূদ্রের উচ্চতা বাড়লে পানি শুধু লবনাক্ত হয় না, বাস্ততন্ত্রের উপরেও চাপ পড়ে। পলি পড়ে, নদী ভরাট হয় বা গতিপথ পরিবর্তিত হয়। দীর্ঘমেয়াদী ফলাফল সাধু পানির নদীটি মারা যায়। সরু হতে হতে সেটি একসময় খাল বা নালায় রুপান্তরিত হয়। অথবা বার্ষায় জেগে ওঠে।
-নাগরিক চাপ : নদী কেন্দ্রিক নগর তৈরী হলে এবং নদীর উপর অতিরিক্ত চাপ পড়লে, সেই সাথে অপরিকল্পিত নগরায়নের জন্যেও নদী মারা যায়। ধরুন নদী থেকে প্রচুর পানি তুলে নেয়া হল বা নগরের ড্রেনেজ ব্যবস্থা এমন যে সরাসরি সেটা নদীতে গিয়ে পড়ছে। শহুরে জীবনে আমার বাসাবাড়িতে নানা কেমিক্যাল ব্যবহার করি, যেমন, হারপিক, ডিস ক্লিনার, সাবান, ডিটার্জেন্ট, ব্লিচিং পাউডার, কেরোসিন, মশা মাছি তাড়ানোর স্প্রে বা পানির লার্ভা নাশক তরল কেমিক্যাল, গাড়ি বা যন্ত্রপাতির ধৌয়ার ক্লিনার এবং অন্যান্য আবর্জনা তো আছেই।
-অসংরক্ষিত সুইচগেট বা অসৎ ব্যবহার: দেশের দক্ষিনাঞ্চলে অপরিকল্পিত প্রায় আড়াই হাজার সুইচগেট আছে। সেগুলো অনেকগুলো অকেজো, আবার অনেকগুলো ব্যক্তি সার্থে ব্যবহার হয়, যেমন মাছের ঘেরে যখন পানি লাগে। কিন্তু সময় মত পানি আসা যাওয়ার বাধা তৈরীর কারনে ছোট ছোট নদী ও খাল মারা গেছে, মারা যাচ্ছে।
এদিকে উত্তরবেঙ্গের একটা উদাহরন দিতে পারি। গাইবান্ধায় একটা নষ্ট সুইচ গেটের কারনে করতোয়া নদীতে পানি ঢোকে না। যার কারনে করতোয়া ছোট ছোট হতে হতে এখন একটা খাল হয়ে গেছে। আগে নাকি করতোয়া বাঙ্গালী নদীর চেয়ে বড় ছিল। দক্ষিণবঙ্গেও এরকম বহু ঘটনা আছে।
এখন প্রশ্ন আসতে পারে নদী হত্যার শাস্তি কি বা এর পেছেনে আইন কি বলে?
পরিবেশ সুরক্ষা আইন এবং জলাধার সুরক্ষা আইনে বিচ্ছিন্নভাবে কিছু নির্দেশনা ও শাস্তির কথা উল্লেখ রয়েছে। নদীসহ যেকোনো প্রাকৃতিক জলাধার দখল বা অবৈধ ব্যবহার করা হলে দায়ী ব্যক্তি অনধিক ৫ বছর কারাদণ্ড বা অনধিক ৫০ (পঞ্চাশ) হাজার টাকা অর্থদণ্ডে অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডনীয় হবেন।
এই আইনে আরও বলা হয়েছে, কোনো জলাধারের জায়গায় অননুমোদিত নির্মাণকার্য হলে সেটি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ভেঙে ফেলার নির্দেশ দিতে পারবে এবং অন্য কোনো আইনে যা কিছুই থাকুক না কেন, এই ভেঙে ফেলার জন্য কোনো ক্ষতিপূরণ দেয়া হবে না। অর্থাৎ কেউ যদি নদী দখল করে কোনো স্থাপনা নির্মাণ করে তাহলে সেটি দখলকারীকেই ভেঙে ফেলতে হবে।
আশার কথা, নদী দখল ও দূষণ ঠেকাতে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের ক্ষমতা বাড়ানো হচ্ছে। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন আইন ২০২০ এর খসড়ায় বেশ কিছু কঠোর বিধান রাখা হয়েছে। যেমন নদীর দখল ও দূষণের জন্য সর্বোচ্চ শাস্তি ১০ বছরের কারাদণ্ড বা পাঁচ কোটি টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। ২০১৩ সালে যখন আইন প্রনয়ন করা হয়, সেখানে এ ধরনের অপরাধের জন্য কোনো শাস্তি নির্ধারিত ছিল না।
সবশেষে বলব, নিজেরা সচেতন হই। আমাদের নিজেদের ব্যক্তিগত জিনিস যেন নদীতে না পড়ে। ভ্রমনে গেলে বাচ্চার প্যামপারস বা চিপসের ঠোঙ্গাটা যেন নদীতে না পরে বা নিজের ব্যবহৃত টিস্যুটাও যেন ড্রেন বা নদীতে না পড়ে। নিজে মানুন, অন্যকে মানান, বাচ্চাদের শেখান।
©somewhere in net ltd.
১|
৩০ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ৯:০১
স্বপ্নের শঙ্খচিল বলেছেন: নিজের ব্যবহৃত টিস্যুটাও যেন ড্রেন বা নদীতে না পড়ে।
নিজে মানুন, অন্যকে মানান, বাচ্চাদের শেখান।
...............................................................................
খুবই ভালো কথা, কিন্ত যখন বসুন্ধরা গ্রুপ বিরাট জলাশয় ভরাট
করে প্লট বিক্রি শুরু করে তখন সরকার চোখ বন্ধ করে থাকল কেন ?