নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

আমি ও বলতে চাই !

ওয়াসিম ফারুক হ্যাভেন

ব্লগিং হউক সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার।

ওয়াসিম ফারুক হ্যাভেন › বিস্তারিত পোস্টঃ

মক্কা প্রতিরক্ষা জোটে বাংলাদেশ ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ নাকি কূটনৈতিক ঝুঁকি ?

০১ লা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১০:৪৭

গত ৭ আগস্ট সৌদি আরবের পবিত্র নগরী মক্কায় স্বাক্ষরিত " মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি " বা " মক্কা ডিফেন্স অ্যালায়েন্স " বিশ্বরাজনীতি ও মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক সমীকরণে এক নতুন মেরুকরণের জন্ম দিয়েছে। সৌদি আরব, তুরস্ক এবং পাকিস্তানের মত তিনটি বড় মুসলিম প্রধান দেশের সমন্বয়ে গঠিত এই জোটকে বলা হচ্ছে ন্যাটোর আদলে তৈরি একটি যৌথ সামরিক আত্মরক্ষা কাঠামো। চুক্তির মূল নীতি হলো জোটভুক্ত যেকোনো একটি দেশের ওপর আক্রমণ হলে তা তিন দেশের ওপরই আক্রমণ হিসেবে গণ্য হবে এবং যৌথভাবে তার প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে। সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধাবস্থা এবং বৃহৎ শক্তি গুলোর আঞ্চলিক প্রভাবের মুখে গঠিত এই জোটকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ব্যাপক কৌতুহল ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো দক্ষিণ এশীয় উদীয়মান অর্থনীতির দেশের এতে যোগ দেওয়া বা না দেওয়া নিয়ে অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও কূটনীতিতে জোর আলোচনা চলছে। তবে আবেগ ভিত্তিক প্রচারণার বাইরে গিয়ে বাস্তব ভূরাজনীতি, সামরিক ইতিহাস ও দেশের সার্বভৌম স্বার্থ পর্যালোচনা করলে এই জোটে যোগ দেওয়ার সুবিধা ও ঝুঁকির চিত্রটি স্পষ্ট হয়ে ওঠবে।

৭ আগস্ট সৌদি আরবের মক্কায় জোটের আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষরের পর গত ৩১ আগস্ট তুরস্কের ইস্তাম্বুলে অনুষ্ঠিত হয় এর কৌশলগত রাজনৈতিক ও প্রতিরক্ষা কমিটির প্রথম মন্ত্রীপর্যায়ের বৈঠক। এতে জোটের একটি সুস্পষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক রূপরেখা প্রণয়ন করা হয়েছে। বৈঠকে রিয়াদকে জোটের স্থায়ী সচিবালয় হিসেবে নির্ধারণ করা হয় এবং তিন বছরের মেয়াদে পাকিস্তানের একজন প্রতিনিধিকে প্রথম মহাসচিব পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। ত্রিপক্ষীয় এই জোটে সদস্যদেশ গুলোর শক্তির পরিপূরক হিসেবে দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। খনিজ ও অর্থসমৃদ্ধ সৌদি আরব দেবে প্রয়োজনীয় অর্থায়ন ও প্রতিরক্ষা প্রকল্প বাস্তবায়নের সক্ষমতা উন্নত ড্রোন, মিসাইল ও আধুনিক সামরিক প্রযুক্তির দেশ তুরস্ক যোগাবে উন্নত সামরিক সরঞ্জাম ও যুদ্ধকৌশল আর পারমাণবিক শক্তিধর পাকিস্তান দেবে বিশাল পেশাদার জনবল ও সামরিক অভিজ্ঞতা। প্রথম মন্ত্রীপর্যায়ের বৈঠকে সদস্য বাড়ানোর নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর জানা যাচ্ছে যে, বাংলাদেশ, মিসরসহ প্রায় ৮-১০টি মুসলিমপ্রধান দেশ এই জোটে যোগ দিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। সাধারণ মহলে এই জোটকে " মুসলিমদের প্রতিরক্ষা কবচ " বা " ইসলামিক ন্যাটো " বলে অভিহিত করে ব্যাপক আবেগ ও উদ্দীপনা তৈরি করা হচ্ছে। তবে ইতিহাস ও চুক্তি গুলোর বাস্তব প্রয়োগ ধারা পর্যালোচনায় দেখা যায়, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মাঠে সামরিক জোটের কাগুজে প্রতিশ্রুতি সব সময় মাঠ পর্যায়ে কার্যকর হয় না। উদাহরণস্বরূপ, খোদ ন্যাটোর ৫ নম্বর ধারায় (যৌথ প্রতিরক্ষা সংহতি) উল্লেখ আছে এক সদস্য আক্রান্ত হলে সবাই এগিয়ে আসবে, তবে তা ৬ নম্বর ধারা অনুযায়ী নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমার মধ্যে সীমিত। তাছাড়া, ন্যাটোর দীর্ঘ ইতিহাসে একাধিক বার সদস্য দেশগুলো সংকটে পড়লেও সার্বিক সামরিক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। একইভাবে মক্কা চুক্তিতে ন্যাটোর ৫ নম্বর ধারাসদৃশ শর্ত থাকলেও এর প্রাতিষ্ঠানিক কমান্ড স্ট্রাকচার বা স্থায়ী বাহিনী গঠন সংক্রান্ত নীতি স্পষ্ট নয়। তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, আক্রান্ত হলে প্রতিক্রিয়া কী হবে তা ঘটনার সময় সদস্য দেশের নীতিগত পরামর্শের ওপর নির্ভর করবে। অর্থাৎ, এটি ন্যাটোর মতো সুনির্দিষ্ট বাধ্যতামূলক কোনো পদক্ষেপের চেয়ে কৌশলগত অভিপ্রায়ের ঘোষণা হিসেবে বেশি প্রতীয়মান হয়।
যে কোনো সামরিক জোট গড়ে ওঠে এক বা একাধিক অভিন্ন শত্রুকে সামনে রেখে। পশ্চিমের ধারণা ও আঞ্চলিক বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়নে স্পষ্ট যে, মক্কা জোটটি গঠিত হয়েছে মূলত মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের ক্রমবর্ধমান প্রভাব ও ইরান সমর্থিত আঞ্চলিক অক্ষকে ঠেকানোর উদ্দেশ্যে। সৌদি আরবের জন্য ইরান ঐতিহাসিক ও কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বী আবার মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি থাকা সত্ত্বেও তাদের নিরাপত্তার ব্যর্থতা সৌদি আরবকে নিজস্ব প্রতিরক্ষাবলয় গড়ে তুলতে উদ্বুদ্ধ করেছে।

রয়টার্স ও আল জাজিরার মতো আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের বিশ্লেষণ বলছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বব্যাপী প্রতিরক্ষা নীতি পুনর্মূল্যায়নের কারণে সৌদি আরব তাদের আকাশসীমা ও অবকাঠামো সুরক্ষায় তুরস্কের ড্রোন প্রযুক্তি ও পাকিস্তানের সেনা সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হতে চাচ্ছে। লক্ষণীয় বিষয় হলো, ডোনাল্ড ট্রাম্পসহ আমেরিকান নীতিনির্ধারকেরা মক্কা চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছেন, কারণ যুক্তরাষ্ট্রের দুই ঘনিষ্ঠ মিত্র (ন্যাটো সদস্য তুরস্ক ও প্রধান নন-ন্যাটো মিত্র পাকিস্তান) সৌদি আরবের নিরাপত্তার ভার নিলে ওই অঞ্চলে ওয়াশিংটনের সামরিক বোঝা কমে। সুতরাং, এটি কোনো পশ্চিমা বিরোধী বা ইসরায়েল বিরোধী একক ধর্মীয় জোট নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক নিরাপত্তা রক্ষার একটি নির্দিষ্ট শক্তির সমীকরণ। বাংলাদেশে মক্কা জোটে যোগদান নিয়ে যে ভাবে জনমনে একটি কাল্পনিক নিরাপত্তা ছাতার আশ্বাস তৈরি করা হচ্ছে, তার সাথে সরকারের প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতির অসংগতি লক্ষ করার মতো। সরকারের উচ্চপর্যায়ের একাধিক কর্তা ব্যক্তিত্ব এ নিয়ে বিপরীতমুখী ও বিভ্রান্তিকর মন্তব্য করছেন। মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বা প্রতিমন্ত্রী যখন গণমাধ্যমে জোটে যোগ দেওয়ার আগ্রহ ও আমন্ত্রণের কথা বলছেন, ঠিক তখনই পররাষ্ট্র সচিব সংবাদমাধ্যম কে জানান যে এ বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট আমন্ত্রণের তথ্য তাঁর জানা নেই। অপরদিকে, জাতীয় সংসদে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিষয়টি স্পষ্ট করে জানান যে, বাংলাদেশ এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ পায়নি এবং যৌথ চুক্তিটি ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখা হলেও যোগদানের বিষয়টি কোনো বিবেচ্য পর্যায়ে পৌঁছেনি। নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে এই বার্তাগুলোর অসংগতি স্পষ্ট করে যে, বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা বিবেচনা না করেই বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক চর্চা ও বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে।

মক্কা জোটে অন্তর্ভুক্তির ইতিবাচক দিকগুলো মূলত অর্থনৈতিক ও আধুনিক প্রযুক্তিগত সহায়তার সাথে সম্পর্কিত। জোটভুক্ত হতে পারলে বাংলাদেশ তুরস্কের কাছ থেকে সরাসরি অত্যাধুনিক সামরিক প্রযুক্তি যেমন বায়রাক্তার ড্রোন, আর্মার্ড ভেহিকেল, ইলেকট্রনিক যুদ্ধের সরঞ্জাম ইত্যাদি সংগ্রহ এবং যৌথ সামরিক গবেষণায় অংশ নিতে পারে। পাশাপাশি বঙ্গোপসাগর, ভারত মহাসাগর ও আরব সাগরের কৌশলগত সমুদ্রপথে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক লাইফলাইন নিরাপদ করা এবং জ্বালানি আমদানির অবকাঠামো সুসংহত করা সম্ভব হতে পারে। এ ছাড়াও, সৌদি আরবে কর্মরত বিশাল বাংলাদেশি শ্রমবাজার ও রেমিট্যান্স সুরক্ষায় নতুন করে দ্বি-পাক্ষিক সম্পর্ক আরও গভীর হওয়ার সুযোগ থাকে। তবে সুযোগের চেয়ে ঝুঁকির পাল্লাই এখানে অধিক ভারী। বাংলাদেশের বৈদেশিক নীতির অন্যতম মূল ভিত্তি হলো " সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে বৈরিতা নয় " । এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিক ভাবে কোনো বৈশ্বিক বা আঞ্চলিক সামরিক জোটে অংশ নেয়নি। সরাসরি কোনো সামরিক ব্লকে অন্তর্ভুক্ত হলে দীর্ঘদিনের এই কূটনৈতিক ভারসাম্য বিনষ্ট হবে।

প্রথমত, যৌথ প্রতিরক্ষা নীতির কারণে জোটের যে কোনো একটি রাষ্ট্র আক্রান্ত হলে বা অন্য কোনো দেশের সাথে সংঘাত তৈরি করলে বাংলাদেশকে পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে সেই সামরিক সংঘাতের দায় নিতে হবে। এতে করে ভূ-রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা হারানোর পাশাপাশি অপ্রয়োজনীয় যুদ্ধ ও খরচে জড়িয়ে যাওয়ার তীব্র আশঙ্কা থাকে।;দ্বিতীয়ত, দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের প্রধান প্রতিবেশী ভারতের সাথে পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা রয়েছে। পাকিস্তান নেতৃত্বাধীন কোনো সামরিক জোটে ঢাকা যুক্ত হলে নয়াদিল্লি স্বাভাবিকভাবেই এটিকে নিজের নিরাপত্তার জন্য নেতিবাচক হিসেবে গণ্য করবে। ফলে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে আঞ্চলিক সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পেতে পারে এবং দুই দেশের মধ্যকার অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক ভারসাম্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তৃতীয়ত, বাংলাদেশের অর্থনীতি মূলত ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানি এবং মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ দেশগুলোর ওপর নির্ভর করে। এছাড়া চীন, রাশিয়া, জাপান ও ইরানের সাথেও বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে। একটি নির্দিষ্ট সামরিক ব্লকে যুক্ত হলে বাংলাদেশের প্রকৃত রাজনৈতিক অবস্থান প্রশ্নবিদ্ধ হবে এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সাথে সম্পর্ক জটিল হয়ে উঠতে পারে।

মক্কা প্রতিরক্ষা জোট মধ্যপ্রাচ্য ও মুসলিম বিশ্বের জন্য নিঃসন্দেহে একটি বড় রাজনৈতিক পরীক্ষা। সামরিক স্বনির্ভরতা অর্জন ও নিজস্ব ভূখণ্ড রক্ষার লড়াইয়ে তুরস্ক, পাকিস্তান ও সৌদি আরবের স্বার্থ এক বিন্দুতে মিললেও, বাংলাদেশের বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। বাংলাদেশের এখন প্রধান লক্ষ্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা, অর্থনীতি পুনর্গঠন, রপ্তানি বাজার ধরে রাখা এবং কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রাখা। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আবেগের ভিত্তিতে নেওয়া সামরিক সিদ্ধান্ত কেবল রাষ্ট্রকেই ঝুঁকির মধ্যে ফেলে না, জাতীয় অর্থনীতি ও বৈদেশিক কূটনীতিকে ও অস্থিতিশীল করে তোলে। তাই কোনো নির্দিষ্ট সামরিক ব্লকে পা বাড়ানোর আগে বাংলাদেশের উচিত জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ প্রাতিষ্ঠানিক অগ্রাধিকার দেওয়া, উন্মুক্ত আলোচনা করা এবং বহুমুখী পররাষ্ট্রনীতির মূল ধারা বজায় রাখা। উদীয়মান অর্থনীতির দেশ হিসেবে হঠকারী সিদ্ধান্ত এড়িয়ে নিরপেক্ষ ও সচেতন কৌশল অবলম্বন করাই হবে ঢাকার জন্য সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।

মন্তব্য ১ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (১) মন্তব্য লিখুন

১| ০১ লা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১১:৩৬

সৈয়দ কুতুব বলেছেন: বিএনপি সরকার , বারবার দরকার ।

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.