| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
আব্দুল গাফফার রনি
পথের দেবতা প্রসন্ন হাসিয়া বলেন--মূর্খ বালক পথ তো আমার শেষ হয়নি তোমাদের গ্রামের বাঁশের বনে...বটতলায় কি ধলচিতের খেয়াঘাটের সীমানায়?.... ইছামতী পার হয়ে...বেত্রাবতীর খেয়ায় পাড়ি দিয়ে পথ আমার চলে গেল সামনে, সামনে, দেশ ছেড়ে বিদেশের দিকে, সূর্যোদয় ছেড়ে সূর্যাস্তের দিকে, জানার গন্ডী এড়িয়ে অপরিচয়ের উদ্দেশ্যে...
কারাপ্রকোষ্ঠে লম্ফঝম্ফ করিয়া, দুই আঙুল তুলিয়া ভি চিহ্ন আঁকিয়া তেনাকে দেখাইতেছে কাদের মোল্লা। আর কাহাকেই বা দেখাইবে। নির্জন প্রকোষ্ঠে তেনি ছাড়া আর কাহারও সঙ্গ তো পাইতেছে না। তেনার সাথে তাহার পরিচয় বেশ নাটকীয়তার মাধ্যমে ঘটিয়াছিল। হঠাৎ করিয়ায় ভিআইপি সেলে লোডশেডিং ভর করে সেই রাত্রে। ভিআইপি কাদের মোল্লা সেটা মানিবে কেন-- গলা উচ্চগ্রামে তুলিয়া সেলের রক্ষীদের আপন বিবিগণের ভ্রাত্রা বানাইতেছেন। রক্ষীদের প্রেস্টিজে ঘা লাগে, অন্তত রাজাকারের শ্যালক হইবার খায়েশ তাহাদের নাই। হেন পরিস্থিতিতে এক রক্ষী বিরক্ত হইয়া ভাঁড়ার ঘর হইতে একখানি জীর্ণ প্রদিপ খুঁজিয়া তাহাতে অগ্নিসংযোগপূর্বক কাদের মোল্লার সেলে রাখিয়া গেল। প্রদিপখানি দেখিয়া কাদের মোল্লার লোভাতুর চোখ চকচক করিয়া উঠিল। ঠিক যেমন করিয়া একাত্তরে গণিমতের মাল লুট করিবার সময় চকচক করিত। তাহার কেন জানি মনে হইল, ইহা আলাদিনের প্রদিপ না হইয়া পারে না। ডানহাতের তর্জনিতে সুবর্ণ মোড়ানো হীরক আংটিটা প্রদিপের গায়ে ঘষিল জোরেসোরে। অমনি প্রদিপের নল হইতে উদগীরত হইল ধোয়ার কুণ্ডলি। সেই ধোয়ার কুণ্ডলি ভেদ করিয়া দৃশ্যমান হইল এক বিকট মূর্তি। কাদেরর মোল্লা না হইয়া অন্য কেহ হইলে নির্ঘাৎ মুর্ছা যাইত। কিন্তু রাজাকারী প্রাণ বলিয়া কথা।
দৃশ্যমান মূর্তি বিকট জোরে, ‘হুঃ হুঃ হাঃ হাঃ...’ করিয়া হাসিয়া উঠিয়া কহিল, ‘হুকুম করুন মালিক।’
কাদের মোল্লা ফিচেল মার্কা একখান হাসি দিয়া আপন মনে কহিল, ‘পাইছি, আমারে দিব ফাঁসি? খারা দেখাইতাছি।’ তারপর কী জানি ভাবিয়া দৈত্যকে কহিল, ‘তুমি অহন ফুটো, চাইরদিন পরে আইস, ম্যালা কথা আছে।’
তখন থেকেই কাদের লম্ফঝম্প আরম্ভ করিয়াছে।
চারিদিন গত হইবার পর প্রকাণ্ড একটা বুদ্ধি যোগাইয়া কাদের মোল্লা আংটি মারফত দৈত্যকে পুনর্বার ডাকিয়া পাঠাইল। দৈত্য আসিয়া একই ভঙ্গীতে কহিল, ‘হুকুম করুন মালিক।’
কাদের মোল্লা দৈত্যকে হুকুম করিল, তাহাকে জেলের বাইরে লইয়া যাইবার জন্য। দৈত্য ‘হুঃ হুঃ হাঃ হাঃ...’ করিয়া অট্টহাসিয়া কহিল, ‘সেলের বাইরে বের হওয়া কি এই লগ্নে আপনার জন্য শুভ হইবে মালিক? শাহবাগের মোড়ে তরুণদের ঢল নামিয়াছে যে। আপনাকে হস্তসীমায় পাইলে হয় কাবাব নয় ফ্রাই করিয়া কুত্তাকে খাওয়াইবে।’
কাদের মোল্লা দাঁত-মুখ খিঁচাইয়া কহিল, ‘আমগো শিবির-বাহিনি কি বসিয়া বসিয়া গুপ্তাঙ্গের কেশ ছিঁড়তাছে।’
‘না, মালিক,’ বাজখাঁই স্বরে কহিয়া উঠিল দৈত্য, ‘গুপ্তাঙ্গের কেশ উৎপাটন করিবার ক্ষমতাও এখন তাহাদের লোপ পাইয়াছে। লেজগুটাইয়া সব জিকির-আজগর করিতেছে। তবে কিনা আপনি মালিক। চাইলে আপনাকে অন্যদেশে লইয়া যাইতে পারি। হুঃ হুঃ হাঃ হাঃ...’
‘তাইলে তো ভালা হয়,’ কাদের মোল্লা কহিল। ‘আমারে পাকিস্তানে নিয়া চলো।’
‘পাকিস্তান!’ অবাক হইল দৈত্য। এই নাম সে কভু শোনে নাই।
দৈত্য পাকিস্তান চিনিতেছে না শুনিয়া কাদের মোল্লা ভারী অবাক হইল, তেনাদের তো পাকিস্তান না চিনিবার কথা নয়। তেনারা তো সেই দেশেই থাকেন। তখন কাদের মোল্লা ভাবিল, তাহার কোথাও ভুল হইতেছে। দৈত্যকে বলিল, ‘চান-তারার দেশ চেন দৈত্য মিয়া?’
দৈত্য আরেকবার হুঙ্কার ছাড়িয়া কহিল, ‘চিনি বৈকি। নিশ্চয়ই চিনি। আপনি বরাহিস্তানের কথা বলিতেছেন তো? আমাদের কোহেকাফ নগরী হইতে উহা হাজার কোশ দূরে।’
‘বরাহিস্তান!’ কাদের মোল্লা ভাবিল। ‘বরাহ’ শব্দের মানে তাহার জানা নাই। অনুমান করিল ‘পাক’কে আরবীতে বোধহয় ‘বরাহ’ বলে।’
‘শুধু চান-তারার দেশ কেন মালিক, আপনি চাইলে আমি আপনাকে লিলিপুট কিংবা ববডিংনাগদের দেশ হইতেও ঘুরাইয়া আনিতে পারি।’
‘লিলিফুট, বডবডিনাগ! কী কইতেছ দৈত্য মিয়া।’ আরো একবার অবাক হইল কসাই কাদের মোল্লা।
‘কী কহিতেছেন মালিক, লিলিপুট-বাবডিংনাগদের দেশের কথা শুনেন নাই কভু? জোনাথন সুইফট নামের সেই ভদ্রলোক লিখিয়াছিলেন।’
‘দৈত্য মিয়া জোনাথ-ফোনাথ, সুইট-ফুইট-- এসব কী বলতাছ? এইসব ইহুদি-নাচারাগো নাম শুনাইয়া আমার ওজুডারে ভাঙবার লাগছ দেখতাছি?’ মুখ ভেঙচাইয়া কহিল কাদের মোল্লা।
‘ইহুদি-নাচারা-- ঠিকই বলিয়াছেন মালিক, ইহুদি নাচারার দেশের লোক বটেন সুইফট। তবে তাহারা আপনাদের পক্ষাবলম্বন করিয়া কথা বলে কিনা। এই ধরুন ইকনোমিস্ট-এর কথা-- কী-না করিল আপনাদের তরে। ওয়াশিংটন পোস্টের কথাই চিন্তা করুন একটিবার-- শাহবাগের প্রজন্ম চত্বরকে তাহারা শিবির-চত্বর বলিয়া খবর প্রকাশ করিল!’
‘থামে থামো, দৈত্য মিয়া।’ আসল ব্যপারটা এতক্ষণে বুঝিল কাদের মোল্লা। ‘ইকমিস্টো আর ওয়াশিংপোস্ট না কি যেন কইলা? হেরা তো জানি আম্রিকা-বিটিশগো পেপার। ওই জোনাথ সুইট কি আম্রিকার লোক?’
‘হুজুর বুদ্ধিমান, তাই খুলিয়া বলিবার পূর্বেই বুঝিয়া লইয়াছেন। ঠিক আমেরিকার না হইলেও, সুইফট সাহেব ব্রিটিশ লোক ছিলেন।’
‘তওবা, তওবা, তওবা...’ বার বার জীভে কামড় দিয়া তওবা পাঠ করিতে লাগিল কাদের মোল্লা। ‘আগে কইবা তো দৈত্য মিয়া। তেনারা কি ইহুদি-নাচারা? ধর্ম আলাদা হইতে পারে, আমাদের জন্য কত সাহায্য করতাছেন, তেনারা কি আর পাপী-তাপী হইতে পারেন। মুজাহিদের সন্মান কি খোদা তাদের দিবে না? আরে ইহুদি-নাচারা কি দূরদেশের লোক। এই আমাদের চারপাশে যে দেশটা ঘিরিয়া রহিয়াছে, ওই মালায়নের জাতেরা তো আসল নাচার। তা কও দেখি, তোমার ওই সুইট সাহেব যে দেশ ঘুরিয়াছিলেন সেগুলান কি নেক-বান্দাদের আস্তানা?’
‘তা কহিতে পারেন,’ দৈত্য কহিল। ‘তবে কিনা ওইসব দেশের কথা লিখিয়া সুইফট সাহেব বিখ্যাত হইয়াছিলেন। আর আপনি বরাহিস্তানে ঘুরিয়া, সেই দেশের কথা লিখিলে রাতারাতি আপনার নামে জনগণ ভুমিষ্ট পুত্রের নাম রাখিতে আরম্ভ করিবে।’
‘তাইলে দেরি করতাছ কেন দৈত্য মিয়া। শিঘ্রই আমারে বরাহিস্তানে লইয়া যাও।’
‘তবে তাহাই হউক বলিয়া,’ দৈত শূন্যালোক ইহতে একখানি চান-তারা মার্কা গালিচা আনিয়া সেলের মেঝেয় পাতিল। অতঃপর কাদের মোল্লাকে লইয়া সেই গালিচায় উপবেশন করিয়া গরাদ ভেদ করিয়া উড়াল দিল নীল আকাশে। কাদের মোল্লার ভারী ফুর্তি লাগিতেছিল, হাত দিয়া মেঘ ছুঁইয়া দেখিতেছিল। বাতাসে প্রাণ ভরিয়া শ্বাস নিতেছিল। আর ভাবিতেছিল, পুরো দেশটাই মুর্তাদ হইয়া গিয়াছে, ভালোয় ভালোয় যে সরিয়া পড়িতে পারিয়াছে এই তাহার বাবার ভাগ্য।
সাত নক্ষত্র-তেরো তেরো গ্রহ পাড়ি দিয়া অবশেষে কাদের মোল্লাকে লইয়া দৈত্য বরাহিস্তানে পৌঁছিল প্রদিপ-দৈত্য। সবুজ-ছায়াবীথি ঘেরা আশ্চর্য সুন্দর দেশখানা। একদিকে গরম পানির আরেক দিকে দুধের নহর বহিতেছে। বাতাসে আতর-গোলাপের খুসবু। কাদের মোল্লা ভাবিল, এ বেহেস্ত না হইয়া পারে না। নিশ্চয়ই দৈত্য ভুল করিয়া তাহাকে বরাহিস্তানে লইতে গিয়া বেহেস্তে লইয়া আসিয়াছে। বেহেস্তের কথা মনে হইতেই মনে আসিল বাহত্তরখানা হুরের কথা। বেহেস্তে যখন আসিয়ায় পড়িয়াছে নিশ্চয় খুব শিঘ্রি সে হুরদের সঙ্গলাভ করিবে। হুরদের সঙ্গলাভের কথা মনে আসিতেই তাহার শরীরে ভেতর কেমন জানি চঞ্চল হইয়া উঠিল। হুরদের সাথে কীভাবে কথা কইবে, গাইবে....কী করিবে এই কথা ভাবিতেই আনমোনা (গরম) হইয়া পড়িয়াছিল কাদের মোল্লা। তখনি বেরসিক দৈত্য মিয়া তাকে খোঁচাইয়া জাগ্রত করিল, ‘হুজুর বরাহিস্তানে আসিয়া পড়িয়াছি। এইবার আমাদের গালিচা হইতে নামিতে হইবে।’
‘এইডা তাইলে বেহেস্ত নয়,’ হতাশচিত্তে বিড় বিড় করিতে লাগিল কাদের মোল্লা। তারপর সচকিত হইয়া কহিল, ‘এবার আমারে কুনখানে লইবা দৈত্য মিয়া।’
‘রাজদরবারে মালিক,’ দৈত্য জবাব পাড়িল।
বিরাট এক রাজ প্রাসাদের সম্মুখে গালিচা ল্যান্ড করিল। প্রাসাদ দেখিয়া তো কাদের মোল্লা ভিমরি খাইবার জোগাড়। তারপর মনে মনে ভাবিল এতোবড় প্রাসাদ যখন সোনাদানাও নিশ্চয়ই ভরপুর আছে। যদি সুযোগ মেলে তো আপন বিবি আর কন্যার জন্য ক’গাছি হার আর দু’খানি বিছা সরাইয়া পকেটস্থ করিবে।
প্রাসাদের ওপর পত পত করে উড়ছে চান-তারা মার্কা অতিকায় একটা পতাকা। কাদের মোল্লা কপালে হাত ঠেকিয়ে পতাকাকে স্যালুট করল। কিন্তু তার পরেই ধরা পড়ল ত্রুটিটা। চান-তারার পাশেই কালোমতো কী এক জানোয়ারের ছবি। মোল্লা হাঁকিয়া কহিল, ‘চান-তারার পাশে ওইডা কীয়ের ছবি দৈত্য মিয়া?’
‘বুঝিলেন না মালিক, উহা একটা তরুণ বরাহ’র ছবি।’
‘বরাহ! আমি তো দেখি শুয়োর।’
‘শুয়োরই বটে,’ দৈত্য ব্যাখ্যা করিতে লাগিল। ‘ মানুষ শুয়োর শব্দটাকে এত অপব্যবহার করিয়াছে যে এই শব্দটা উচ্চারণ করিলে বরাহদের প্রেস্টিজে লাগে। তাই শুয়োরের উচ্চমার্গীয় প্রতিশব্দ ব্যবহার করিতে উহারা স্বাচ্ছন্দবোধ করে।’
প্রাসাদের প্রবেশ করিতে গিয়েই ভড়কাইয়া গেল কাদের মোল্লা। মানুষের বদলে দ্বাররক্ষী হিসাবে এ কাহাদের দেখিতেছে। হাত-পা আছে বটে। কিন্তু গোটা শরীরে মানুষের আদলের ছিটেফোঁটাও নেই। সারা গায়ে কালো কালো লোমে ভরা, ছুঁচোর মতো ছুঁচালো নাক-মুখ, গালের দুই পাশ দিয়া বাহির হইয়া রহিয়াছে খাড়ার মতো চারপাটি দাঁত। বন্য শুকরদের সাথে এদের পার্থক্য হইল বন্যরা চার পায়ে হাঁটে আর ইহারা সামনের পা দু’খানি হাতের মতো করিয়া ব্যাবহার করিতে পারে।
কাদের মোল্লা ভাবিয়াছিল রক্ষী বরাহ হইতে পারে, রাজা নিশ্চয়ই কোনো সুপুরষ। সুপুরুষই বটে, অন্তত পর্দার আড়াল থেকে বহিরাগত প্রবরটিকে প্রতক্ষ্য করিয়া সখিগণের নিকট রানির ভাষ্য ছিল, ‘দেখ দেখ, বদসুরৎ এক লোকের আগমন ঘটিয়াছে প্রাসাদে। ইহার চেয়ে আমাদের রাজা কোটিগুণ সুর্দশন। ওমা! ব্যাটার দেখি ছাগুর মতো দাঁড়িও আছে!’
সখিগণের সাথে রানির কথপোকথন বরাহ-রাজের কানে গেছে। দৈত্য আর কাদের মোল্লা তাহার সম্মুখে উপস্থিত হইবামাত্র রাজা হাঁক পাড়িলেন, ‘এই কে আছিস, এই নতুন ছাগলটাকে গো-শালায় বাঁধিয়া ফেল।’ তারপর তিনি স্মিত হেসে কহিলেন, ‘কিছু মনে করিও না প্রদিপ-দৈত্য, বরাহ-রানি যাহাকে ছাগল বলিয়া সম্মোধন করিয়াছে তাহাকে তো খাতির করিয়া অন্দর মহলে রাখিতে পারি না।’
এক বরাহ-রক্ষী আসিয়া কাদের মোল্লার গলায় ফাঁস আঁটা একখানা দড়ি ঝুলাইয়া টানিতে টানিতে গোশালায় লইয়া গেল। রাজা গো-শালা বলিয়া কথা। আয়তনে যেমন বিশাল, তেমনি গোসংখ্যায়। চুনা-কাদা মিলিয়া বেশ নরম নরম হইয়া আছে গোশালার মেঝে। গরগুলো সেই কাদায় শুইতে না পারিলেও মহীষগুলি বেশ আরামেই শুইয়াছিল।
কাদের মোল্লা নতুন অতিথি বলিয়া রাজার রাখালেরা বেশ সৌজন্য দেখাইল। পাচনের বাড়ি কষিল, তবে তাহা মৃদু। যদিও কাদের রাজাকারের মনে হইতে ছিল তাহার দম বন্ধ হইয়া আসিতেছে, কিন্তু গলার দড়ি যথাসম্ভব ঢিলা করিয়া বাঁধিয়াছিল বরাহ-রাখালেরা। তথাপি তাহাকে শোয়ার বন্দোস্তটাও করা হইল ভিআইপি মানের। গোশালার কোণে গচ্ছিত নতুন অতিথিদের জ্যন চুনা মখিয়া হলুদ বর্ণ ধারণ করা থলে পাতিয়া দেওয়া হইল তাকে। কাদের মোল্লার বমি পাইতেছিল, কিন্তু গলার ফাঁস আটো সাটো হওয়ায় তাহা আর ধরণীর মুখ দেখিতে পাইল না।
শরীরটা খারাপ লাগিতেছিল। দৈত্য ব্যাটাও তাহাকে বিপদে ফেলিয়া চম্পট দিয়াছে। এখন এই গন্ধেভরা থলের ওপর না শুইয়া উপায় নাই। কিন্তু থলেতেও বিশেষ সুবিধা হইল না। দুই মণ ওজনের দেহখানার ভারে থলে পাঁচ-ইঞ্চি দাবিয়া গেল চোনা-কাদার ভেতর। ভেজা থলে ভেদ করিয়া আসা চোনা-কাদার রস কাদের মোল্লার সাদা পাঞ্জাবীতে পাকিস্তানের ম্যাপ আঁকিয়া দিল।
কাদের মোল্লার ইচ্ছে হইতেছিল চিৎকার দিয়ে কাঁদিয়া ওঠে। ইহার চেয়ে ফাঁসিও এখন ‘মধুর হইত’ বলিয়া বোধ হইতেছে। রাগে দুঃখে ক্ষোভে অভিমানের ব্যাঞ্জনে দলা পাকানো কান্না বুকের ভেতর ঠেলিয়া উঠিয়া আসিতে চাহিতেছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা দলা পাকিয়েই আটক রহিল গলার দড়ির কাছে।
কয়েক ঘন্টা পার হইয়া গেছে। ক্ষুধার উদ্রেগে কাদের মোল্লার উদরান্তে ছুঁচো ঘোরাঘুরি করিতেছিল। ঠিক সেই মুহূর্তে এক বরাহ ভাঙ্গা শানকিতে করিয়া একমুঠো ভাত আনিল তাহার জন্য। শানকি দেখিয়াই কাদের মোল্লা চিনিয়া ফেলিল এবং তাহার আরো একবার বমির উদ্রেগ হইল। কারণ প্রাসাদে ঢুকিবার সময় এক নেড়ি কুকুরকে এই শানকিতেই ফ্যান চাটিতে দেখিয়াছিল। কাদের মোল্লা বিড় বিড় করিয়া খোদার কাছে মৃত্যুভিক্ষা চাহিতে লাগিল।
কাদের মোল্লার পাশেই চোনা-কাদার ওপর ঝিমাইতেছিল এক ধাড়ি ছাগল। ধাড়িটার দাড়িটা একটু অন্যরকম, ঠিক ছাগলের মতো নয়। লালচে-বাদামী রঙয়ের-- যেন সদ্য মেহেদী লাগানো হইয়াছে তাহাতে। কাদের মোল্লার বিড়বিড়ানিতে ধাড়িটার ঝিমানো বোধহয় কমিল কিন্তু সে চোখ মেলিল না। উদরস্থ খাবার মুখে টানিয়া আনিয়া জাবর কাটিতে লাগিল। কাদের মোল্লা মনে হইল ছাগলটা কত সুখি! আরাম করিয়া জাবর কাটিতেছে। সে যদি ভিআইপি সেল হইতে খাইয়া আসা খাবারগুলি উদর হইতে টানিয়া এইরূপ জাবর কাটিতে পারিত।
কাদের মোল্লা সাত-পাঁচ ভাবিতেছিল, ঠিক তখনই তাকে চমকে দিয়ে ধাড়ি ম্যাঁ ম্যাঁ করিয়া হাঁক ছাড়িল। তারপর কিছুটা মানুষের গলায়, খানিকটা ছাগলের গলায় বলিয়া উঠিল, ‘কী কাইদরা, তুইও বরাহিস্তানে আইলি তাইলে।’
চলবে
©somewhere in net ltd.