| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
আব্দুল গাফফার রনি
পথের দেবতা প্রসন্ন হাসিয়া বলেন--মূর্খ বালক পথ তো আমার শেষ হয়নি তোমাদের গ্রামের বাঁশের বনে...বটতলায় কি ধলচিতের খেয়াঘাটের সীমানায়?.... ইছামতী পার হয়ে...বেত্রাবতীর খেয়ায় পাড়ি দিয়ে পথ আমার চলে গেল সামনে, সামনে, দেশ ছেড়ে বিদেশের দিকে, সূর্যোদয় ছেড়ে সূর্যাস্তের দিকে, জানার গন্ডী এড়িয়ে অপরিচয়ের উদ্দেশ্যে...
আব্দুল গাফফার রনি
এক
শরতের ভ্যাপসা গরম বেশ কমে এসেছে। আকাশ সেজেছে নীলের হরষে। পেঁজা তুলোর মত সেই নীল সমুদ্রে ভেসে বেড়াচ্ছে সাদা সাদা মেঘ। কিন্তু জামিলের সেদিকে তাকাবার ফুরসৎ নেই। তিনি ব্যস্ত মেমরি রিমুভার যন্ত্র পরীক্ষাতে। মস্তিষ্কের স্মৃতি মোছার যন্ত্র। সদ্যই আবিষ্কার করেছেন যন্ত্রটা। কিন্তু ভীমের গর্জনের তাঁর একাগ্রতায় ছেদ পড়ল। ‘অসময়ে চিৎকার করে কেন পাজিটা?’ আপন মনেই ঝাল ঝাড়লেন। ‘যাই হোক উঠব না।’
উঠতে তাঁকে হলো। জগমোহনের হাঁকে।
‘সাহেব একটু বইরে আসবেন, ভারী সুন্দর একটা বাঁদর এসেছে। ভীম আর পিকু তো ওকে সইতে পারছে না। পিকুটা গাছে উঠে পড়েছে। আপনি এখনই না এলে কেলেঙ্কারী হয়ে যাবে।’
‘গাছে উঠেছে মানে!’ বিড় বিড় করতে করতে বেরিয়ে এলেন জামিল। তারপর যা দেখলেন তাতে হাসবেন না কাঁদবেন বুঝে উঠতে পারছেন না। একটা ছোটখাটো গড়নের বাঁদর। ভুল করে হয়তো এ বাড়িতে ঢুকে পড়েছিল। তারপর বেচারা পড়ে ভীম আর পিকুর পাল্লায় পড়ে। প্রাণ বাঁচাতে নারকেল গাছের মাথায় চড়ে বসেছে। আশেপাশে আর কোনো গাছগাছালী নেই, নেই কোনো ঘরবাড়িও। কোথাও লাফিয়ে পড়ে যে পালাবে, সে উপায়ও নেই বাঁদরটার। কিন্তু তাতেও রেহায় পায়নি বেচারা। পিকু মানে বিষ্ণুপদ বাবুর বিড়ালটা ওকে তাড়া করে গাছে উঠে পড়েছে। তবে সে বাঁদরটার নাগাল পাচ্ছে না।
বাঁদরটা বসে আছে নারকেলের একটা কাঁদিতে। নারকেলের ছোট্ট ছোট্ট গুটি ছিঁড়ে পিকুকে লক্ষ্য করে ছুঁড়ে মারছে। পিকুও মরীয়া নারকেলের আঘাত এড়িয়ে বাঁদরটার কাছে পৌঁছানোর জন্য। কিন্তু পৌঁছালেই কি বাঁদরকে ধরা অত সোজা! তাছাড়া গেছো প্রাণীর গাছেই জোর বেশি।
পিকুকে ধরে যদি ষাট ফুট উঁচু নারকেল গাছের মাথা থেকে ফেলে দেয়, হাড়-মাংস আর আস্ত থাকবে না। ধমক দিয়ে ভীম আর পিকুকে থামালেন জামিল। ভেবেছিলেন বাঁদরটা ঘণ্টাখানেক গাছ থেকে নামবে না। কিন্তু দু’মিনিটের মাথায়ই নেমে এল। ভীম আর পিকু ঝাঁপিয়ে পড়তে যাচ্ছিল, জামিল ওদের নিবৃত করলেন।
বাঁদরাটার কিন্তু ভয়ডর একেবারেই নেই। গুটি গুটি পায়ে সোজা এসে হাজির। একেবারে সুবোধ বালকের মতো বসে পড়ল জামিলের পায়ের কাছে। জামিল ঝুঁকে বাঁদরটাকে কোলে তুলে নিলেন। রওনা দিলেন ল্যাবরেটরির দিকে। ঢোকার আগ মুহূর্তে জগমোহনকে হেঁকে বললেন, ‘দোকান থেকে একছড়া কলা নিয়ে এস তো। আর হ্যাঁ, ভীম আর পিকুকে একটু সামলে রেখো, এঘরে যেন ঢুকতে না পারে।’
দু’দিনেই জামিলের খুব প্রিয় হয়ে উঠল বাদরটা। অনেকটা কুকুর ভীম আর পিকুর মত। কিন্তু ওরা এখনও বাঁদারটাকে মেনে নিতে পারেনি। কেন, জামিলের কাছে তা এক রহস্য।
জামিল বাঁদরটার নাম রাখলেন ইরেক্টাস। মানুষের আদিপুরুষ হোমো ইরেক্টাসের নামানুসারে।
দুই
তৃতীয় দিনে দু-দুটো আশ্চর্য ঘটনা ঘটে গেল।
সকালে ছাদে পায়চারী করছিলেন জামিল। জগমোহন এসে বলল, ‘সাহেব, দেখে যান, বাাঁদরটা কী করছে?’
জামিল দ্রুতপায়ে নেমে এলেন। ল্যাবরেটরিতে ঢুকে যা দেখলেন, তাতে তাঁর পেটে খিল ধরে যাবার জোগাড়। তিনি যেভাবে চেয়ারে বসে বই পড়েন, ঠিক সেভাবে তাঁর চেয়ারে বসে আছে বাঁদরটা। চোখে জামিলের +১.৭৫ পাওয়ারের চশমা। এ মাসের সানেয়ন্টিফিক আমেরিকান পত্রিকাটা মেলে ধরে পড়ার ভঙ্গিতে বসে আছে। বাঁদর চশমা পরেছে আবার বই পড়ছে, এ দৃশ্য দেখা তো দূরে থাক, কখনও শোনেনওনি জামিল।
জামিলের হাসির শব্দে ভড়কে গেল বাঁদরটা। তড়িঘড়ি করে চেয়ার ছেড়ে নেমে এল মেঝেয়। তার আগে অবশ্য চশমা আর ম্যাগাজিনটা রেখে আসতে ভুল করেনি। দুই হাত জোড় করে মাফ চাওয়ার ভঙ্গি করে জামিলের পায়ের কাছে বসে পড়ল। জামিল ওর মাথায় হাত বুলিয়ে অভয় দিলেন।
তিন
বিকেলে ইরেক্টাস জামিলকে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত বাঁচাল। ঘটনাটা ঘটে তাঁর ল্যাবরেটরিতে। চেয়ারে বসে কাজ করছিলেন জামিল। হঠাৎ বেশি গরম লাগতে শুরু করল। ফ্যানের সুইচটা টেবিলের সাথে লাগানো। জামিল সেটায় হাত দিতে যাচ্ছিলেন, হঠাৎ ইরেক্টাস তাঁর শার্টের আস্তিন খামচে জোরসে দিল এক টান। জামিল হতভম্ভের মত ওর দিকে চেয়ে রইলেন। তখন বাঁদরটা আঙুল উঁচিয়ে একবার ফ্যানের রেগুলেটরের দিকে ইশারা করে, একবার সিলিংয়ের ফ্যানটা দেখায়।
প্রথমে জামিল কিছু বুঝে উঠতে পারেননি। পরে অবশ্য তাঁর কিছুটা সন্দেহ হলো। পিছিয়ে গেলেন নিরাপদ দূরত্বে। তারপর ফ্যানের সুইচাটা চাপালেন। ফ্যানটা ঘড়ঘড় করে কয়েক পাক ঘুরল। তারপর ‘গুড়–ম’ আছড়ে পড়ল চেয়ারের ওপর। ফ্যানের ঘুর্নণশক্তি আর মহাকর্ষ বলের টানÑদুইয়ের মিলিত প্রভাবে দুমড়ে মুচড়ে গেল স্টিল ফ্রেমের চেয়ারটা। বিস্ফারিত চোখে জামিল সেদিকে চেয়ে থাকলেন কিছুক্ষণ। বাঁদরটাকে সতর্ক করে না দিলে কী হত? একটা শীতল ¯্রােত নেমে গেল জামিলের মেরুদণ্ড বেয়ে।
বিস্ময়ের ঘোর কাটিয়ে জামিল বাঁদরটা বুকে জড়িয়ে নিলেন।
চার
এরপর জামিলের একটা কথায় মনে হয়েছে বার বার, এটা সাধারণ কোনও বাঁদর নয়। কোনোভাবে এর মস্তিষ্কে বিবর্তন ঘটেছে বিস্ময়কর গতিতে। এর বুদ্ধিমত্তা প্রায় মানুষের কাছাকাছি। শিখিয়ে পড়িয়ে নিলে হয়তো মানুষের সমান সমান হয়ে যাবে। শারিরিক কাঠামোতে অবশ্য বাঁদরই থাকবে। শুরু হলো বাঁদরের লেখাপড়া।
ছাত্র হিসেবে বাঁদরাটাকে লেটার মার্ক দেয়া যায়। কয়েক দিনের ভেতরে শিখে ফেলে লেখাপড়া। পড়তে অবশ্য পারে না। তবে হাতেলেখা চমৎকার বাঁদরটার।
লেখাপড়া শেখাতে গিয়ে জামিলকে একটা সমস্যায় অবশ্য পড়তে হয়েছিল। বাঁদরটা খালি চোখে পড়তে পারে না। বারবার শুধু ইশারা করছিল জামিলের চশমাটার দিকে। জামিল তাঁর চশমাটা খুলে বাঁদরটার চোখে পরিয়ে দিতেই সমস্যা মিটে যায়।
পাঁচ
জামিল তাঁর বাড়ির দেড়শ বছরের পুরোনো ইঁদারাটার পাশে বসে আছেন। হাতে পনের দিনের বাসি খবরের কাগজ। ব্যাস্ততার কারণে কাগজটা আগে পড়তে পারেননি। পিকু আর ভীম খেলছে তাঁর পায়ের কাছে। বাঁদরটা ঝুলছে বড় নিমগাছটার এডাল থেকে সেডালে। হঠাৎ এক খবেরের শিরোনাম দেখে চমকে উঠলেন জামিল:
বিজ্ঞানী পারভেজ আনোয়ার নিখোঁজ!
গতরাতে নিজ বাড়ি থেকে নিখোঁজ হয়েছেন বিশিষ্ট বিজ্ঞানী পারভেজ আনোয়ার। রোজকার মতো গত রাত্রিতেও ল্যাবরেটরিতে ঢুকে খিঁল এঁটে দিয়েছিলেন। তারপর পর থেকেই তিনি লাপাত্তা। সকাল বেলা বেয়ারা নাস্তা দিতে গিয়ে দেখে তখনও দরজা বন্ধ। অনেক ডাকাডাকি করেও সাড়া মেলে না। এক পর্যায়ে দরজা বাইরে থেকে ভেঙে ফেলা হয়। আজব ব্যাপার হল, ভেতরের সকিছুই ঠিকঠাক আছে, শুধু মানুষটাই উধাও! তবে পেছন দিকের একটা জ্বানালাটা খোলা। দুটো শিক বাঁকানো। বাঁকা শিকের ফাঁক দিয়ে বড়জোর বিড়ালের মতো ছোটখাটো প্রাণী যাতায়াত করতে পারে। সেখান দিয়ে ড. আনোয়ারের মতো বিশাল বপুর মানুষ কীভাবে লাপাত্তা হলেন, তা এক বিরাট রহস্য। আরো আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, রাতে যে পোশাক পরে ড. আনোয়ার লাবরেটরিতে ঢুকেছিলেন সেগুলো পড়ে আছে মেঝের ওপর। এমনকী তাঁর জগিংয়ের ছড়ি আর চশমাটাও।
জামিল অবাক হলেন। খারাপও লাগল। যদিও লোকটাকে ভালো চোখে দেখতেন না তিনি। এক লহমায় অনেক কথা মনে পড়ে গেল জামিলের। সেইসাথে মনে হলো, পারভেজ আনোয়ারে অন্তর্ধানের সাথে ইরেক্টাসের কোনো যোগাযোগ নেই তো। সবকিছু বিবেচনায় সে সম্ভাবনাই বেশি।
‘একবার ড. আনোয়ারের বাড়ি থেকে ঘুরে এলে কেমন হয়।’ ভাবলেন জামিল। ঠিক তখনি ফোন বাজল ড্রয়িংরুমের। জগমোহন রিসিভ করল বোধহয়।
‘সাহেব, আফসার সাহেবের ফোন, আপনাকে চাচ্ছেন।’
জামিল ধীরপায়ে উঠে গেলেন। রিসিভার কানে ঠেকিয়ে বললেন, ‘আফসার সাহেব, কী খবর বলুন।’
‘আপনার ফোন বন্ধ। গত তিনদিনে অন্তত দশ বার ফোন করেছি। ই-মেইল করছি গোটাদশেক আপনার সাড়া নেই।’
‘হঠাৎ এই ছাপোষা বিজ্ঞানীকে কী দরকার পড়ল পুলিশ ডিপার্টমেন্টের? নিশ্চয়ই পারভেজ আনোয়ার অন্তর্ধান রহস্যের কুল-কিনারা করতে গিয়ে পুলিশ গলদঘর্ম?’
‘সে খবরও পেয়েছেন দেখছি, তা ঘাপটি মেরে ছিলেন কেন?’ ডিআইজি আফসার খানের কণ্ঠে অধিকার মেশানো তিরষ্কার।
‘খবরটা এইমাত্র পেলাম কিনা... ’ জামিলের জবাব।
‘আপনাকে একবার আসতে হয় যে, জামিল ভাই।’ কথার সুর পাল্টে গেল খান আফসার আলির। ‘স্বয়ং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অনুরোধ করেছেন। তাঁর আবার আÍীয় কিনা। আপনার সাহায্য না পেলে মান-ইজ্জত আর থাকবে না পুলিশ ডিপার্টমেণ্টের। আপনি একবার আসুন, প্লিজ।’
‘সে কথাই ভাবছিলাম।’
‘তাহলে তো ভালই হলো।’ বললেন পুলিশের বড়কর্তা। ‘আসা-যাওয়া নিয়ে আপনাকে ভাবতে হবে না। সে ব্যবস্থা মন্ত্রী মহোদয় করে রেখেছেন। হেলিকপ্টার পাঠিয়ে দেবেন। চাইলে কালই।’
‘ঠিক আছে, কালই বেরুচ্ছি,’ বলে ফোন রেখে দিলেন জামিল।
জামিল জগমোহনের হাতে ধরিয়ে দিলেন বাসি পত্রিকাটা। ‘এটা একেবারে বাক্সের ভেতর তুলে রাখবে।’
জগমোহন অবাক হল। পনের দিনের বাসি পত্রিকা বাক্সের ভেতরে লুকোবার দরকার কী!
জামিল এবার ফোন করলেন জার্মান বন্ধু ফ্রেদেরিখ উইঙ্গারকে। কী কী যেন জানতে চাইলেন। উইঙ্গারের জবাব শুনে অবাক হলেন না। বিড়বিড় করে বললেন, ‘যা ভেবেছিলাম তা-ই।’
জগমোহনকে ডেকে একটা খাঁচা জোগাড় করতে বললেন জামিল। খাঁচা কী, হবে জগমোহনের মাথায় ঢুকল না। ফ্যাল ফ্যাল করে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে ভাড়ার ঘরের দিকে এগিয়ে গেল। মিনিট পাঁচেকের মধ্যে একটা লোহার জংধরা খাঁচা নিয়ে এল।
‘এইটাতে হবে, সাহেব?’
জামিল খাঁচাটা ধরে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখলেন, হালকা চাপ দিয়ে বোঝার চেষ্টার করলেন ঠিক তাঁর মনের মত কি-না।
‘ঠিক আছে, এতেই চলবে।’ বলে জহামোহনকে এবার ভীমের শিকল আর বকলস আনতে পাঠালেন। তারপর হাঁকালেন বাঁদরটার নাম ধরে।
জগমোহনকে বলাই ছিল, বাঁদারটা ল্যাবরেটরিতে ঢোকামাত্র ওর গলায় শিকল পরিয়ে দিল সে।
‘ওকে এবার খাঁচায় ভরে বেঁধে ফেল।’
হুকুম তামিল করল জগমোহন।
‘কাল দু’দিনের জন্য কুমিল্লায় যাচ্ছি,’ বললেন জামিল। ‘একে ভালো করে দেখে রেখো। সাবধান, খাঁচার খুব কাছে যাবে না। কপিকল লাগিয়ে দিচ্ছি তাতে করে খাবার-পানি দেবে।’
ছয়
সকাল দশটা নাগাদ কুমিল্লায় পৌঁছে গেলেন জামিল। কুমিল্লা মানে, ময়নামতিতে। ময়নামতি পাহাড়ের এক জঙ্গলবাড়িতে থাকতেন পারভেজ আনোয়ার।
আঁক-বাঁকা পাহাড়ি পথ ধরে মাইলখানেক হাঁটার পর পারভেজ আনোয়ারের বাড়িটা পেলেন ড. জামিল। গেট পাহারা দিচ্ছে দুজন সসস্ত্র পুলিশ। জামিল পরিচয় দিলেন। ব্যাস্ত-ত্রস্ত হয়ে এক কনস্টেবল পথ দেখিয়ে ভেতরে নিয়ে গেল জামিলকে।
ড্রয়িংরুমের সোফায় বসেছিলেন পুলেশের এক বড়কর্তা। জামিলকে দেখেই দাঁড়িয়ে গেলেন। ডানহাতটা বাড়িয়ে দিলেন জামিলের দিকে।
‘নিশ্চয়ই ড. জামিল?’
হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়লেন জামিল।
‘আসুন, আসুন,’ আগ্রহভরে বললেন পুলিশকর্তা। আমি কুমিল্লার সদর থানার ওসি মাহমুদুল্লাহ। আপনার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম। একজন অভিজ্ঞ লোক না থাকলে আমরা এতবড় বিজ্ঞানীর ঘরে তদন্ত করি কীভাবে বলুন। কোনো মূল্যবান জিনিস নষ্ট করে ফেলে যদি আমার লোকেরা, তাই পনের দিনের অপেক্ষা। আপনাকে পাওয়া গেলে আগেই হাত লাগাতাম। অবশ্য দেশ-বিদেশের সম্ভব সব যায়গায় খোঁজ করা হয়েছে।’
‘বেশ তো,’ স্বাভাবিক কণ্ঠে বললেন জামিল। ‘এখন তদন্ত শুরু করতে পারেন।’
মিনিট দশেকের মধ্যে পুলিশে আরেকটা দল হাজির হলো। জামিলের নির্দেশমতই তারা ল্যাবরেটরির জিনিসপত্র সরাতে লাগল। ওয়ার্ডরোব খুলে একটা ডায়েরি পেলেন ওসি।
‘ওটা আমাকে দিন, ইন্সপেক্টর,’ স্বরটা একটু উঁচু হয়ে গেল জামিলের। ‘কাগজ-পত্র যা পাবেন সব আমাকে একবার দেখিয়ে দেবেন!’
‘আচ্ছা, তাই হবে। ’ সম্মতি জ্ঞাপন করে বললেন ওসি মাহমুদউল্লাহ।
‘ও, হ্যাঁ,’ বললেন জামিল। ‘বাড়ির লোকদের জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন নিশ্চয়ই?’
‘না,’ জবাব দিলেন মাহমুদউল্লাহ। ‘আপনাকে ছাড়া আমরা এক পা-ও এগোতে চাইনি।’
‘তাহলে ওটাই আগে সেরে ফেলা যাক।’
জামিলের মত চিরকুমার নন ড. আনোয়ার। দুই সন্তান আমেরিকায় থাকে। স্ত্রী শাহনাজ পারভেজ, কাজের বুয়া, পিওন আর ড্রাইভার মিলিয়ে পাঁচ জনের বাস এ বাড়িতে। সবাইকে একে একে ডাকা হলে।
জিজ্ঞাসাবাদে খুব বেশি লাভ হলো না। যা জানা গেল তাতে পারভেজ আনোয়ারে অন্তর্ধান রহস্যের কোনো ক্লু নেই।
সাত
বিকাল তিনটা নাগাদ তল্লাসী শেষ হলো। জামিল এক বোঝা কাগজপত্র আর গোটা চারেক ডায়েরি নিলেন। হোটেলে বসে ওল্টাবার জন্য।
টেবিলের ওপর একটা পুরু গ্লাসের চশমাও পেয়েছিলেন জামিল। পুলিশকে বলেছিলেন চশমার ক্যাশমেমোটা পাওয়া যায় কিনা খুঁজে দেখতে। পাওয়া যায়নি। মিসেস পারভেজ আনোয়ার জানতে চাওয়া হয়েছিল চশমার পাওয়ার কত? তিনি বলতে পারেনি। একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়গুলো কারও সাথে শেয়ার করতেন না নাকি পারভেজ আনোয়ার।
জামিল চশমাটা তার ব্যাগে ভরে নিলেন।
আট
রাত ৮টা নাগাদ ওসি সাহেবকে ফোন করলেন জামিল। ‘কিছু বুঝলেন?’
‘না,’ ফোনের ওপাশ থেকে ওসির জবাব। ‘আপনি কিছু বুঝলেন।’
‘হ্যাঁ,’ বললেন জামিল। ‘শুধু বুঝিইনি বিজ্ঞানীর হদিসও মিলেছে।’
‘বলেন কী!’ উত্তেজিত গলায় বললেন ওসি। ‘কোথায়?’
‘আমার বাড়িতে।’ বললেন জামিল। ‘আপনার বাড়ি...’ বিস্ময়ে জমে গেলেন ওসি।
‘আমার হোটেলে চলে আসুন। সব বলছি।’
বিশ মিনিটের মধ্যে হোটেলে পৌঁছে গেলেন ওসি মাহমুদউল্লাহ। সাথে আইজিপি খান আফসার আলি। সন্ধ্যা ছ’টা নাগাদ তিনি কুমিল্লায় পৌঁছেছেন।
জামিল তাঁদের দেখে উঠে দাঁড়ালেন। করমর্দনের জন্য ডানহাতটা বাড়িয়ে দিলেন আফসার খানের দিকে। বসুন সোফার দিকে হাত দেখিয়ে বললেন জামিল। কলিংবেল টিপে বেয়ারা ডাকলেন। চা-নাস্তার অর্ডার দিলেন।
নয়
‘এবার ঝেড়ে কাশুন তো মশায়।’ ধূমায়িত চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে বললেন খান আফসার আলি।
‘বলছি,’ বিস্কিটে একটা কামড় বসিয়ে বললেন জামিল। ‘তবে কথাটা পাঁচকান করা যাবে না। মিডিয়ার কানে তো নয়-ই। তাহলে বেচারি পারভেজ আনোয়ারের মান-ইজ্জত যেটুকু ছিল সেটুকুও আর থাকবে না।’
বুক পকেট থেকে পারভেজ আনোয়ারের চশমাটা বের করলেন জামিল। সেটা ড্রেসিং টেবিলের ওপর রেখে বললেন, ‘এই চশমাটায় আমাকে জামিলের খোঁজ পাইয়ে দিয়েছে।’
চোখ কপালে উঠে গেছে দুই পুলিশ কর্মকর্তার। তবে জামিলে কথার মাঝখানে কোনো কথা বললেন না।
জামিল বলে চলেছেন, ‘সন্দেহটা আমার আগেই হয়েছিল। এই চশমার পাওয়ার পরীক্ষা করে নিশ্চিত হলাম। এর পাওয়ার +১.৭৫, আমার চশমার পাওয়ারও তাই। আমার বাড়িতে একটা বাঁদর এসেছে জুটেছে দিন পনের আগে। তারও +১.৭৫, পাওয়ারের চশমা লাগে।’
‘বাঁদর চশমা পরে!’ আরেকবার কপালে উঠে গেল খান আফসার আলির। ‘এ যে রূপকথার গল্প মশায়!’
‘রূপকার মতই,’ চায়ের কাপে প্রথম চুমুকটা দিয়ে বললেন জামিল। ‘আর ওই বাঁদরটাই হল আমাদের ড. পারভেজ।’
‘কী!’ সমস্বরে চেঁচিয়ে উঠলেন দুই পুলিশ কর্তা। অল্পের জন্য তাঁদের হাত থেকে চায়ের কাপগুলো পড়ল না।
‘হ্যাঁ,’ বললেন জামিল। ‘এ রহস্যের পেছনে রয়েছে লম্বা ইতিহাস।’
জামিল পুলিশকর্তাদের যা জানালেন তার সারমর্ম হলো:
বিজ্ঞানী হলেও পারভেজ আনোয়ার লোকটা অসৎ। প্যারিসের এক সম্মেলনে জামিলের একটা গুরুত্বপূর্ণ ফর্মুলা চুরি করার মতলব এঁটেছিলেন। জামিল আগেভাগে টের পেয়ে যান। তাই ড. আনোয়ারের সে উদ্দেশ্য সফল হয়নি। দিব্যদৃষ্টি যন্ত্রেও ফর্মুলার দিকে লোকটার শ্যেনদৃষ্টি আছে।
জার্মানির ম্যাক্স প্লাঙ্ক ইনিস্টিটিউটে জিনেটিক ইঞ্জিয়ারিংয়ের ছাত্র। পরে অধ্যাপকও হয়েছিলেন ড. আনোয়ার। সেখনেই তাঁর সহকর্মী ছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকার জিনেটিক ইঞ্জিনিয়ার জ্যাকব সাবালা। সাবালার কী একটা পেপার চুরির অভিযোগে পারভেজ আনোয়ারকে বহিষ্কার করা হয় প্লাঙ্ক ইনইস্টিটিউট থেকে।
ফ্রেদেরিখ উইঙ্গার, গতকাল বিকেলে যাকে ফোন করেছিলেন জামিল। ভদ্রলোক প্লাঙ্ক ইনস্টিটিউটে নিউক্লিয়ার পদার্থবিজ্ঞান পড়ান, জামিলের দীর্ঘদিনের বন্ধু। কাল ড. আনোয়ারের নিখোঁজ হয়ার খবর পড়ার পর জামিল তাঁকে ফোন করেন। জানতে চান সাবালার হারিয়ে যাওয়া পেপারটার বিষয় ঠিক কী ছিল। জিনেটক ইঞ্জিনিয়ারিং, জানান উইঙ্গার। তখনি সন্দেহ হয় জামিলের।
প্লাঙ্ক ইনস্টিটিউট থেকে বিতাড়িত হয়ে দেশে ফিরে আসেন পারভেজ আনোয়ার। নিজের বাড়িতেই গড়ে তোলেন বিশাল এক ল্যাবরেটরি। একসময় জামিলের কাছে চেয়েছিলেন দিব্যদৃষ্টির ফর্মুলা। বদলে জামিলকে দিতে চেয়েছিলেন প্রাণীদেহের দ্রুত বিবর্তনের ফর্মুলা। জামিল তাকে পাত্তা দেননি। কিন্তু চিনে জোকের মতো লেগে ছিলেন ড. আনোয়ার। আগ বাড়িয়ে শুনিয়েছিলেন দ্রুত বিবর্তনের ফিরিস্তি। মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই নাকি বানরকে মানুষে রূপান্তর করা যাবে এই ফর্মুলায়। উইঙ্গারের তথ্য থেকে ধরে নেয়া যায়, এই ফর্মুলাটাই সাবালার কাছ থেকে চুরি করেন পারভেজ আনোয়ার। বানরকে যদি এক সপ্তাহে মানুষে রূপান্তর করা যায়, তবে মানুষেকে কেন বাঁদরে রূপান্তর করা যাবে না। জামিলের ধারণা এ ব্যাপারটাও ছিল সাবালার চুরি যাওয়া পেপারে।
তাতেই জামিল ধারণা করেন তার বাড়ি যে বাঁদরটা আশ্রয় নিয়েছে ওটা বাঁদর নয়, ড. পারভেজ আনোয়ার! বাঁদর হওয়ার আগে জানালার শিক বাঁকিয়েছিলেন, পরে বাঁদরের ক্ষুদ্র দেহ নিয়ে শিকের ফাঁক গলিয়ে বেরিয়ে যেতে কষ্ট হয়নি। তবে ভুলটা করেছিলেন চশমাটা সাথে না নিয়ে।
সব শোনার পর আফসার খান বললেন, ‘যদি সত্যিই কোনো ফর্মুলা মুখস্থ করে ফেলেন তিনি?’
‘ব্যবস্থা আছে। মেমরি রিমুভার নামে একটা যন্ত্র তৈরি করেছি সদ্যই। ব্রেন থেকে কোনো নির্দিষ্ট তথ্য স্ক্যান করে রিমুভ করা যায়। ড. পারভেজকে দিয়েই যন্ত্রটার একটা টেস্ট হয়ে যাবে আরকী। বলে হাঃ হাঃ করে হেসে উঠলেন জামিল।
১৭ ই জানুয়ারি, ২০১৪ রাত ৩:২৭
আব্দুল গাফফার রনি বলেছেন: ধন্যবাদ, ভালো থাকবেন।
২|
১৬ ই জানুয়ারি, ২০১৪ সকাল ৭:০৯
উদাস কিশোর বলেছেন: +
১৭ ই জানুয়ারি, ২০১৪ রাত ৩:২৮
আব্দুল গাফফার রনি বলেছেন: ধন্যবাদ
©somewhere in net ltd.
১|
১৬ ই জানুয়ারি, ২০১৪ রাত ১:৩৮
আমি রেদওয়ান বলেছেন: ভালো লাগল