নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

আবু সিদ

আবু সিদ › বিস্তারিত পোস্টঃ

হলুদ কৈ

১৯ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ দুপুর ১:০১

এক
আকাশের মুখ আজ ভোর থেকেই ভার। এ অঞ্চলে শ্রাবণের ধারা কোনো নিয়ম মানে না। সার্কিট হাউসের বারান্দায় দাঁড়িয়ে বাইরের ঘোলাটে বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। চারিদিকের হাওড়গুলো জলে টইটম্বুর, বৃষ্টির অবিশ্রান্ত ধারা টিনের চালে এক অদ্ভুত একঘেয়ে সুর তুলছে। বাতাসের ঝাপটায় বৃষ্টির ছাঁট বারান্দায় এসে আছড়ে পড়ছে, আর সেই ঠান্ডা জলের ছোঁয়ায় আমার বুকের ভেতরকার অস্থিরতাটা যেন আরও বাড়ছে।

আমি এই অফিসের একজন সাধারণ কর্মকর্তা। লোকে আড়ালে আমাকে ‘অচল’ বলে ডাকে। অচল, কারণ এই যুগেও আমার পকেটে উপরি টাকা ঢোকে না। আমার সমপদস্থরা যখন এসি গাড়িতে ঘোরে, আমি তখন ঘাম আর বৃষ্টিতে ভিজে বাসের হাতল ধরে ঝুলি। আজ আমার কোনো ফাইলের কাজ নেই, টেবিলের হিসাব মেলানোর তাড়া নেই; আজ আমার কাজ হচ্ছে বাজার করা । আরও সহজে বললে, ‘মাছ কেনা'। রাজধানী থেকে ঝটিকা সফরে এসেছেন আমাদের সবার বড় স্যার । তিনি অত্যন্ত ভোজনরসিক, আর তাঁকে খুশি রাখা আমাদের সবার অলিখিত দায়িত্ব ।

এখানকার স্থানীয় প্রশাসনের ছোট-বড় কর্মকর্তারা কাল রাত থেকে তটস্থ। সবার মুখে একটাই কথা, আলম সাহেব, আপনি তো মাছ কিনতে ওস্তাদ। বড় স্যার কিন্তু নদীর জ্যান্ত মাছ ছাড়া খান না। বাজারের দায়িত্বটা তাহলে আপনার ওপর। আমি জানি, এই ‘দায়িত্ব’ মানে হলো নিজের পকেট থেকে অগ্রিম টাকা খরচ করে স্যারের পাতে সেরা বিলাসিতা তুলে দেয়া যা কোনোদিন সরকারি ভাউচারে শোধ হবে না। এ এক ধরনের আধুনিক দাসত্ব, যা এই ঘুণে ধরা সিস্টেমের রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে আছে। আমার সততা এখানে এক বিশেষ অক্ষমতা যেখানে মাছ চেনার এই গুণটুকু আমার টিকে থাকার শেষ অবলম্বন।
সকাল আটটা। বৃষ্টির তোড়ে ছাতা ধরে রাখা দায়। আমি স্থানীয় মাছ বাজারে পৌঁছতে পৌঁছতে আমার ইস্ত্রি করা জামা ঘাম আর বৃষ্টির ছাঁটে গায়ের সাথে সেঁটে গেছে। বাজারে ঢোকার মুখে এক হাঁটু কাদা। পচা মাছের আঁশটে গন্ধ আর ড্রেনের উপচে পড়া ময়লা আবর্জনা। বৃষ্টির জল আর মাছের রক্ত মিলেমিশে একাকার। বাজারের ঢুকতে মানুষের গিজগিজে ভিড়। বৃষ্টির কারণে যেন সবাই একে অপরের গায়ের ওপর আছড়ে পড়ছে।

চারপাশে মানুষের কথার আওয়াজ আর বিক্রেতাদের হাকডাক। বৃষ্টির দিনে সবকিছুর দাম আকাশছোঁয়া। একজন সাধারণ দিনমজুর পাঁচশ গ্রাম পুঁটি মাছের দাম শুনে দীর্ঘশ্বাস ফেলে সরে যাচ্ছেন। তার পাশে একজন স্থানীয় প্রভাবশালী ঠিকাদার এক কাড়ি টাকা দিয়ে বড় তিনটে চিতল মাছ নিলেন।

বাজারে হাঁটতে হাঁটতে আমার মনে পড়ল কাল রাতের সেই বিলাসবহুল ডিনার। বড় স্যার আয়েশ করে পান চিবোতে চিবোতে বলছিলেন, এদিকের মাছের খুব নাম। কাল দুপুরে একটু জ্যান্ত নদীর মাছ কয়েকটা ম্যানেজ করে দিয়েন তো। বুঝতেই পারছেন, এদিকের স্বাদই আলাদা। ঢাকায় তো সব হাইব্রিড, খেয়ে শান্তি নেই।

এই ‘ম্যানেজ’ শব্দটার আড়ালে যে কত হাহাকার লুকিয়ে থাকে, তা কেবল আমার মতো নিম্নপদস্থরা জানে। এখানে চাকরিতে পদমর্যাদা মানে যেন নিচের পদের মানুষকে ব্যক্তিগত ভৃত্য বানিয়ে রাখা। ফাইল সই করার ক্ষমতা যার হাতে, তার খেয়ালখুশি মেটানোটা আজ প্রশাসনিক শিষ্টাচার। আমার মেরুদণ্ডটা যে কতখানি বাঁকা হয়ে গেছে, তা এখন বাজারের এই কাদার দিকে তাকিয়ে অনুভব করছি।
বাজারে প্রতিটি মাছ বিক্রেতা যেন একজন অভিনেতা। এক বিক্রেতা ঝুড়িতে থাকা মরা রুই মাছের গায়ে বারবার পানি ছিটিয়ে দাবি করছে সেগুলো আধঘণ্টা আগে নদী থেকে ধরা। আমি মাছের কানকোটা একটু ওল্টাতে দেখলাম সেটা ফ্যাকাশে। আমি মনে মনে হাসলাম। মানুষের নৈতিকতা আর মাছের কানকো, দুটোই আজকাল সমানতালে পচে গেছে। কেউ আর টাটকা নয়, সবাই শুধু ওপরের চকচকে আবরণ দিয়ে ভেতরকার পচন ঢাকতে চায়।
আমার হাতের ফর্দটা ভিজে একাকার। এতে প্রথমে বড় করে লেখা 'কৈ মাছ'। সেই সকাল থেকে মাছের বাজারে আমি এ দোকান থেকে ও দোকান, ও দোকান থেকে আরেক দোকানে ঘুরছি। বাজারের সেরা মাছগুলো কেনার গুরুদায়িত্ব নিয়ে।

নদীর রুই নিলাম, বড় দেখে কাতলা আর বোয়ালও নিলাম। কিন্তু বড় স্যারের বিশেষ আবদার খাঁটি দেশি বড় কৈ। জুতোটা কাদায় মাখামাখি। মনে মনে নিজের ওপর ঘৃণা হচ্ছে আমার। অবশেষে এক কোণে এক বৃদ্ধ জেলের কাছে কিছু মাছের দেখা মিলল। সেখানে একটা মাটির পাত্রে কয়েকটা জ্যান্ত কৈ লাফাচ্ছে। মাছগুলোর গায়ের রং কালচে সোনালি, খাঁটি নদীর মাছ। কিন্তু বৃদ্ধ জেলে যে দাম চাইলেন, তা শুনে আমার বুকটা ধক করে উঠল। সেই দাম আমার পুরো সপ্তাহের বাজারের খরচের সমান। বাবা, নদীর মাছ, সহজে মেলে না, বৃদ্ধের কণ্ঠে করুণ আর্তি। আমি ভাবলাম, এই বৃদ্ধ জানেন না যে তার এই অতি কষ্টের মাছগুলো চলে যাবে এমন একজনের পেটে, যিনি এক কলমের খোঁচায় এই বৃদ্ধের মতো হাজারো মানুষের ভাগ্য বদলে দিতে পারতেন, কিন্তু দেননি। বরং তিনি এসেছেন প্রমোদ ভ্রমণে। আমি বিনা বাক্য ব্যয়ে টাকাটা দিয়ে দিলাম, যদিও জানিনা কাল থেকে আমার নিজের ঘরে ভাতের সাথে মাছ জুটবে কিনা।

এর মধ্যে আমার মোবাইল ফোন বেজে উঠলো । দেখি আমার বস। দয়া ভরা কণ্ঠে তিনি বললেন, আলম সাহেব! ঘাবড়াবেন না; আপনার যত খরচ হবে আমরা সবাই মিলে তা শেয়ার করে নেব । আপনি শুধু বাজারের সেরা মাছগুলো কিনে আনেন।

কৈ মাছগুলো কেনা হলো। কিন্তু তার মাঝে অন্য এক দোকানে শুনলাম যে নদীর বিশাল এক পাঙ্গাস উঠেছে। এগিয়ে গিয়ে দেখলাম, মাছটা কমপক্ষে ৬/৭ কেজি হবে। কী বিশাল তার শরীর, রুপালি আভা যেন চুইয়ে পড়ছে। মাছটা দেখে আমার মনে হলো, এটা নিতে পারলে বড় স্যারের চশমাটা কৌতূহলে নিশ্চয় নাকের ডগায় ঝুলে পড়বে, আর তিনি খুশি হবেন ।

বৃষ্টির বেগ আরও বাড়ছে। বাজারের টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ যেন এক উন্মাদনার সৃষ্টি করেছে। আমি বাজারের কাদা মাড়িয়ে রিকশার দিকে পা বাড়ালাম। ব্যাগে বড় বড় মাছ, কিন্তু বুকের ভেতরটা পাথরের মতো ভারি। মাছের স্বাদ স্যারের জিভে লেগে থাকবে, আর মাছের কাঁটা বিঁধে থাকবে আমার মতো সাধারণ কর্মচারীর শূন্য পকেটে।

দুই
ডাইনিং রুমের পরিবেশটা বেশ গুমোট। বাইরে বৃষ্টির একটানা শব্দ আর ভেতরে চামচ-প্লেটের মৃদু টুংটাং। বড় স্যার খুব ধীরে সুস্থে খাচ্ছেন। আমরা কয়েকজন আধো-অন্ধকারে দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছি। এই দাঁড়িয়ে থাকাটা অনেকটা আদব রক্ষার মতো, যদিও মনে মনে সবাই আমরা ঘড়ির কাঁটার দিকে তাকিয়ে ।

টেবিলের মাঝখানে সেই বিশাল পাঙ্গাস মাছটা সর্ষের ঝোলে স্নান করে শুয়ে আছে। বড় স্যার এক টুকরো মুখে নিয়ে বেশ কিছুক্ষণ চিবোলেন। তার মুখে হাসি ফুটে উঠল । আমি মনে মনে শান্তি পেলাম। ভাবলাম, প্রথম পরীক্ষায় পাশ! এখন দেখা যাক কৈ মাছের কী হয়।

কৈ মাছ নেড়েচেড়ে তিনি সেটার একটা প্লেটে তুলে নিলেন। সেটা ধীরে ধীরে খেলেন । তারপর আলতো করে কাঁটাটা রেখে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। এই দীর্ঘশ্বাসটা ভালো কিছুর লক্ষণ নয়। রুমের ভেতরে উপস্থিত কর্মকর্তাদের মধ্যে একটা অদৃশ্য কাঁপুনি দিয়ে গেল।
বড় স্যার গ্লাস থেকে এক চুমুক পানি খেয়ে বললেন, আলম সাহেব, মাছটা খারাপ না। তবে... তিনি একটু থামলেন। আমাদের সবার নিঃশ্বাস যেন বন্ধ হওয়ার উপক্রম। তিনি বললেন, বছর তিনেক আগে এক বন কর্মকর্তার বাংলোয় দাওয়াত ছিল। আমার স্ত্রীও সাথে ছিলেন। সেখানে এক অদ্ভুত কৈ মাছ খেয়েছিলাম। ঠিক হলুদ রঙের। যেমন তার রূপ, তেমনি তার স্বাদ। মচমচে ভাজার পর যখন মুখে দিলাম, মনে হলো যেন অমৃত। গিন্নি তো সেই মাছের প্রেমে পড়ে গিয়েছিলেন। আজও মাঝে মাঝে রাতে খাবারের টেবিলে বসে ওই মাছটার গল্প করেন তিনি।

তিনি খুব শান্ত গলায় কথাগুলো বলছেন। কোনো রাগ নেই, কোনো চিৎকার নেই। কিন্তু এই শান্ত গলার পেছনে লুকিয়ে আছে এক বিশাল আবদার। বন কর্মকর্তার বাংলোয় সেই হলুদ কৈ ছিল বুনো, একদম আসল জাতের। তিনি বুঝিয়ে দিলেন, এই বাজারের জ্যান্ত কৈ মাছগুলো তার কাছে খুব সাধারণ ।

আমার বস নাজির সাহেব কাঁচুমাচু হয়ে বললেন, স্যার, ওই মাছ তো আসলে সচরাচর মেলে না, স্যার! গভীর বন বা সংরক্ষিত ফরেস্ট এর মধ্যে যে কূপ বা আপা থাকে কেবল সেখানে এগুলো পাওয়া যায়, স্যার! স্যার! আর বন কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগ ছাড়া এগুলো স্যার! এত অল্প সময়ে ম্যানেজ করা যায় না, স্যার!

বড় স্যার ম্লান হাসলেন। নরম স্বরে বললেন, তা ঠিক। তবে গিন্নি খুব করে বলছিলেন। ঢাকায় তো সব চাষের মাছ। কৈ মাছের আসল স্বাদটা যদি তাকে আর একবার দিতে পারতাম! উনি খুব খুশি হতেন। পরশু তো আমি ঢাকা ফিরছি, ভাবছিলাম সাথে করে নিয়ে যাব। কিন্তু যা আবহাওয়া...কথাটা তিনি শেষ করলেন না। কিন্তু আমরা সবাই বুঝে গেলাম। তিনি চাচ্ছেন, আমরা যেন যেভাবেই হোক সেই বিশেষ 'হলুদ কৈ' জোগাড় করি এবং শুধু একবেলা খাওয়ার জন্য নয়, তার ঢাকা যাওয়ার গাড়িতে যেন কয়েক কেজি এমন মাছ তুলে দিই । তিনি সরাসরি কিছু বলছেন না, কিন্তু তার এই 'ইচ্ছা' প্রকাশ করাটাই আমাদের জন্য অলিখিত আদেশ।

টেবিলে বসে বড় স্যার এখন দেশ আর দশের কথা বলছেন। উন্নয়নের ধারা কীভাবে প্রান্তিক মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে সেসব কথা আলোচনা করছেন । এবার তিনি বললেন, আপনারা কাজ করবেন মানুষের জন্য। নীতি আর সততা যেন আপনাদের ভূষণ হয়! তার কথা শুনে আমার মনে হলো, সততা জিনিসটা বোধহয় খুব দামি, তাই তিনি নিজে সেটা খরচ না করে আমাদের জন্য জমিয়ে রাখতে বলছেন।
অবশেষে তিনি তৃপ্তির ঢেকুর তুললেন। খাওয়া শেষে হাত ধুয়ে আলতো করে হাত মুছলেন। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, আলম সাহেব, আপনারা চেষ্টা করলে সবই সম্ভব। আমার গিন্নি কিন্তু খুব আশা করে আছেন।

তিন
ভোরবেলা বৃষ্টিটা একটু ধরেছিল, কিন্তু বেলা বাড়ার সাথে এখন আবার সেই ঝিরঝিরে ইলশেগুঁড়ি শুরু হয়েছে। সার্কিট হাউসের সামনের লনটা ভিজে সপসপে। বড় স্যার আজ ঢাকা ফিরে যাবেন। তার সাদা রঙের দামি পাজেরো গাড়িটা চকচক করছে। গাড়ির ইঞ্জিনটা চালু করে রাখা হয়েছে, এসি চলছে—যাতে স্যার ওঠার আগেই ভেতরটা হিমশীতল হয়ে থাকে।

আমি দাঁড়িয়ে আছি গাড়ির পেছনের ডালাটার কাছে। আমার পাশে আরও চার-পাঁচজন কর্মচারী। সবার হাতে বড় বড় কার্টন আর ককশিটের বক্স। এই বক্সগুলোর ভেতরে লুকিয়ে আছে গত দুদিনের হাড়ভাঙা খাটুনির ফল। তার সেই কাঙ্ক্ষিত ‘হলুদ কৈ’ শেষ পর্যন্ত জোগাড় হয়নি ।

বড় স্যারের খাস ড্রাইভার রফিক মিঞা বেশ দাপটের সাথে বক্সগুলো গাড়িতে তুলছে। আমি নিজেই ককশিটের একটা বক্স এগিয়ে দিলাম। বরফ দেয়া মাছের বক্সগুলো বেশ ভারি। রফিক মিঞা নিচু স্বরে বলল, স্যার!, বরফ কি ঠিকমতো দিছেন? ঢাকা পৌঁছাতে তো পাঁচ-ছয় ঘণ্টা লাগবো। ম্যাডাম কিন্তু মাছ একটু নরম হইলেই চিল্লাপাল্লা শুরু করবো। আমি ম্লান হাসলাম। মনে মনে ভাবলাম, এই মাছগুলো পচবে কি না জানি না, কিন্তু আমাদের মেরুদণ্ড যে অনেক আগেই পচে গেছে, তা কি রফিক মিঞা জানে? আমি নিজ হাতে গাড়ির ডালা বন্ধ করে দিলাম।

বড় স্যার সিঁড়ি দিয়ে নামছেন। পরনে দামি স্যুট। মুখে তৃপ্তির এক চওড়া হাসি। তাকে ঘিরে আছে একদল ছোট-বড় কর্মকর্তা। বিদায়বেলার এই দৃশ্যটা প্রতিবার এক রকম। সবাই যেন শেষ মুহূর্তে নিজের আখের গুছিয়ে নিতে চায়।
পিডি সাহেব খুব বিনীতভাবে স্যারের গা ঘেঁষে হাঁটছেন। তাকে বলতে শুনলাম, স্যার, আমার বড় ছেলের বদলির ফাইলটা তো আপনার টেবিলে আছে। যদি একটু সদয় হতেন... ছেলেটা দূরে খুব কষ্ট পাচ্ছে। বড় স্যার তার কাঁধে হাত রেখে অভয় দিলেন, আরে ভাই, ওটা তো আমার কাজ। আপনি চিন্তা করবেন না, ঢাকা গিয়ে আমি দেখে নিচ্ছি।

পাশে দাঁড়ানো একজন মহিলা কর্মকর্তা, যার বিরুদ্ধে অফিসে ছোটখাটো অনিয়মের অভিযোগ আছে, তিনি বারবার স্যারের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হাসছেন। “স্যার, এবার কিন্তু ফ্যামিলি নিয়ে আসবেন। আমাদের এই দুর্ভাগা জেলা আপনার মতো গুণী মানুষের ছোঁয়া পেলে ধন্য হয়।”

আমি এক কোণে দাঁড়িয়ে সব দেখছি। কেউ চাইছে পদোন্নতি, কেউ চাইছে শাস্তি থেকে মুক্তি, আর কেউবা চাইছে একটা ভালো বদলি। সবার চাওয়ার কেন্দ্রবিন্দু ওই একজন মানুষ, যার গাড়ির ডিকি এখন কম-বেশি প্রায় এক মণ মাছে ভর্তি।

গাড়িতে ওঠার আগে বড় স্যার সবার দিকে হাত নাড়লেন। তারপর হঠাৎ আমার দিকে তাকিয়ে একটু থামলেন। বললেন, আলম সাহেব, মাছগুলো ঠিকমতো তোলা হয়েছে তো? আমি মাথা নিচু করে বললাম, জি স্যার, সবকিছু গুছিয়ে ড্রাইভারকে বুঝিয়ে দিয়েছি। ওই হলুদ কৈ এর কথা আশাকরি ভুলে যাবেন না। আপনি অত্যন্ত দক্ষ একজন মানুষ। চেষ্টা চালালে অসম্ভবকেও সম্ভব করতে পারবেন।

গাড়িটা স্টার্ট নিল। চাকার নিচে কাদা ছিটিয়ে শাঁ শাঁ করে বেরিয়ে গেল গেট দিয়ে। আমরা সবাই সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে হাত নাড়লাম যতক্ষণ গাড়িটা দেখা গেল। গাড়িটা অদৃশ্য হতে সবার মুখের সেই কৃত্রিম হাসিগুলো জাদুমন্ত্রের মতো উবে গেল।

আমি এখন একা দাঁড়িয়ে সার্কিট হাউসের গেটে। বৃষ্টিটা আবার বাড়ছে। চারপাশের গাছপালাগুলো ধুয়েমুছে পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু আমার বুকের ভেতরটা কেন জানি খুব নোংরা লাগছে।

অফিস শেষে আমি ধীর পায়ে বাসার দিকে হাঁটা দিলাম। বৃষ্টির ফোঁটাগুলো আমার মুখে পড়ছে। মনে হচ্ছে আকাশটা বুঝি আমার হয়েই কাঁদছে। এই ঘুণে ধরা সিস্টেমে সততা আর মানবতার কোনো জায়গা নেই। আমাদের মত সাধারণ মানুষের কাছে জীবনটা যেন কোন মতে যাপন করে যাওয়া। কাল আবার অফিসে যেতে হবে, আবার সেই ফাইলের স্তূপ, আবার কোনো ‘বড় স্যার’-এর অপেক্ষা।

মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.