নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

আমি অনিকেত বলছি

নতুনের খোজেঁ আমি অনিকেত বলছি!!!!!!!!!!!

আমি অনিকেত বলছি › বিস্তারিত পোস্টঃ

তুলির আঁচড়ে রক্তের ছোপ

২২ শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৩ ভোর ৪:২৯







উনিশশো একাত্তর সাল।







তিন ছেলেমেয়ে নিয়ে নিতাই বাস করে। সে একজন চিত্রশিল্পী। গত ১২ বছর ধরে আন্দোলনের ও প্রতিবাদের লেখা ও ছবি রাস্তার পাশে দেয়ালে আঁকে সে। প্রতিবাদের লেখা তার কাছে অনেকটা নেশার মত। ছাত্ররা খুশি হয়ে পয়সা দিলে সে নেয়, না দিলেও ক্ষতি নেই। ছাত্ররা নিতাইদা বলতে অজ্ঞান! এই ছাত্রদের চেতনাটা তার খুব ভাল লাগে। অত্যন্ত অসচ্ছল সংসার। স্ত্রীর অভিযোগের সীমা নেই। অভিযোগ থাকলেও স্ত্রী বিপাশার তেমন একটা চাহিদা ছিলনা আর এত মার্কেট দোকান ও ছিলনা। আর এখন ছোট ছেলে দেবু'র বৌকেই তো দেখা যায় প্রায় দিনই দুনিয়ার এটা ওটা হাবিজাবি কিনে আনছে।



কি দিনগুলোই না কাটিয়েছিল নিতাই সে সময় ! সেই ভয়াল একাত্তরের কথা ভাবলে সারা শরীরে এখনও কাটা দিয়ে উঠে। ঢাকা শহর তখন ছিল অনেক নিরিবিলি, এত দালান কোঠা ও ছিলনা। বেশীরভাগই কাঠের ফ্রেম করা লাল রঙের চাল দেয়া টিনের ঘর। সে সময় বড় রাস্তার একদম পাশেই ঐ রকম টিনের একটা ছোট্ট ঘরে তারা থাকতো। বুক সমান দেয়াল ঘেরা বাসাটায় ছোটো একটা কাঠের গেট দিনরাতই খোলা থাকতো। সামনে বেশ বড় উঠোন। তাতে নানা রকম পাতাবাহার আর ফুলের গাছ। একমাত্র মেয়েটার বাগান করার খুব শখ ছিল। মেয়ের বয়স তখন ষোলো ছুই ছুই আর বড় ছেলেটার বয়স উনিশ, ছোট ছেলেটা তখন ছয় বছরের। বাড়ীর সামনে রাস্তার ঐ পারেই খোলা মাঠ তার ঐ পাশেই পাক আর্মির ক্যাম্প,মাঝে মাঝেই মুক্তিযোদ্ধারা ক্যাম্পে আক্রমন করতো, দু পক্ষই গোলাগুলি বিনিময় হতো প্রচুর কিছুক্ষন পরেই আবার সব ঠান্ডা হয়ে যেত।



আগস্ট মাসের কোন এক রাত। সেদিন রাত প্রায় দশটা। স্ত্রী বিপাশা থেকে থেকে কাঁদছে। দুদিন ধরে বড় ছেলেটার হদিস নেই। মহল্লার লিটু আর তরুণকেও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছেনা। লিটুর বাবা খোঁজ নিয়ে জেনেছেন ওরা সবাই মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিয়েছেন। নিতাই বেশ ব্যথিত, চিন্তিত ও বিরক্ত। ব্যথিত এই কারণে যে বড় ছেলেকে সে খুবই ভালবাসে, চিন্তিত এই কারণে একে তারা হিন্দু তার উপর ছেলে যোগ দিয়েছে মুক্তিতে- বিপদ অবশ্যম্ভাবী, বিরক্ত কারণ বিপাশা অকারণে মরাকান্না জুড়ে দিয়েছে।



হঠাৎ বাসার সামনে গাড়ী থামার শব্দ। নিতাই বলে উঠলো 'বিপাশা মনে হয় আমার দাদার বাসা থেকে কেউ এসেছে' ! বলে একটানে দরজা খুলে খোলা বারান্দায় গিয়ে দাড়ালো। পাশে তার ছোট্ট ছেলেটা। বাসার সামনে এক মিলিটারী কনভয় তাতে সেনাবাহীনির ট্রাক বোঝাই পাক আর্মি দু পাশে সারি সারি বসে আছে হাতে অত্যাধুনিক অস্ত্র শস্ত্র নিয়ে। আর নিতাই দু হাতে সন্তানকে ধরে ঘটনা আকস্মিকতায় পাথরের মত নিশ্চুপ দাড়িয়ে সেই খোলা বারান্দায়। মহল্লার সুরত মাওলানা আর টুপি পড়া আরও দুইজন- দুজন বিশালদেহী আর্মি অফিসারকে নিয়ে এগিয়ে আসছেন। নিতাইকে দেখিয়ে সুরত বলল, 'এ নিতাই হ্যায়। খুব সুরত চিকা লিখতা হ্যায়।' পাকিস্তানি আর্মি অফিসার মুচকি হাসলেন পর্দার ফাঁক দিয়ে উঁকি দেয়া বিপাশাকে দেখে- গোঁফ পাকালেন নিঃশব্দে। তাই দেখে একান-ওকান হেসে সুরত মাওলানা বললেন, 'নিতাই তুই বড্ড ভাল আঁকিয়ে। তুই লিখবি 'আর্মি জিন্দাবাদ' 'পাকিস্তান জিন্দাবাদ' মহল্লার দেয়ালে দেয়ালে। আর মুক্তি হারামজাদারা যেসব কথা দেয়াল যেসব স্লোগান, আপত্তিকর 'জয়বাংলা' লিখছে, সেগুলো মুছে ফেলবি। পারবিনা?'



হঠাৎ নিতাইয়ের কোথা থেকে এত সাহস এল সে বলতে পারবেনা। সে চিৎকার করে উঠলো, 'কক্ষনো না।'



সুরত মাওলানা সুন্দর হেসে পানের পিক ফেলে বললো, 'আহা! দেখলিতো স্যরের তোর বউকে খুব মনে ধরেছে। তোর ষোড়শী মেয়েটার কথা শুনলে দিলে উনার আগুন ধরে যাবে। ঘাড়তেড়ামো করিসনা। এঁকে ফেলবি যত্ন করে। ছেলে তোর মুক্তিতে যোগ দিয়েছি। মরণ ডেকে এনেছে শুধু। বাঘের সাথে লাগতে গেছে। অহেতুক নির্বংশ হোসনে নিতাই। তোর ভাল চাই আমি। বিকেলে খোঁজ নিয়ে যাব কালকে।'



আর্মির দিকে ঘুরে সুরত মাওলানা বললো, 'চলিয়ে স্যর। কেল্লা ফতে।'



আর্মি অফিসার দুজন দরজার পর্দার ফাঁক দিয়ে বের হওয়া বিপাশার মুখের দিকে চকচকে চোখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে পথ ধরল ফিরতি।



সারারাত নিতাইয়ের ঘুম এলোনা। সে ভাবল এলোমেলো চুল নিয়ে। ১৯৬২,৬৬,৬৯,৭০ সালে কত রাত জেগে ঝুঁকি নিয়ে চুপে চুপে বাংলায় স্লোগান লিখেছে ভাবতেই তার চোখে পানি আসছে। এখন নৃশংস পাকিস্তানিদের নামে স্লোগান! কিছুতেই না!! কিন্তু পরিবারের কি হবে! এসব ভাবছে- এমন সময় কাধে কারো হাত পড়তেই চমকে উঠলো সে। বিপাশা চোখে পানি নিয়ে দাঁড়িয়ে। 'তুমি কখনোই ওই জানোয়ারদের কথা লিখবেনা। কিভাবে নিজের সম্মান তুমি নরপশুদের ভয়ে বিলিয়ে দেবে! না আমার জীবন থাকতে তোমাকে ওদের পক্ষে লিখতে দেবনা।', চিৎকার করে বললো বিপাশা।



নিতাইয়ের চোখে অতীত ছবি হয়ে ধরা দিতে লাগলো... দ্বিধা-চেতনার মাঝামাঝি দুলতে লাগলো সে...



পরের দিন রাতে আশঙ্কায় কাঁপছে নিতাই। নিজের সাথে যুদ্ধ করেছে- তুলি হাতে উঠেনি ২৫মার্চের হত্যাকারীদের পক্ষে আঁকতে। ঘরের লাইটগুলো অফ। হঠাৎ গাড়ী আসার শব্দ শোনা গেল। বুটের শব্দে বোঝা যাচ্ছে মিলিটারীরা নেমে আসছে ট্রাক থেকে। ভয়ে আতংকে সবার হাত পা জমে যাবার অবস্হা। হঠাৎ দরজায় শব্দ। ঠকঠক। তাড়াতাড়ি বিপাশাকে বলল সে ফিসফিস করে, 'যাও বাচ্চাদের নিয়ে আমার দাদার কাছে চলে যাও।' বিপাশা কিছুদেই যাবেনা। হুঁহুঁ করে কাদছে নিতাই, বিপাশা, সন্তানেরা। বিপাশা বলল, 'চলো তুমিও চল।' আবার নিজের আচরণে অবাক নিতাই! জলদস্বরে সে বলল, 'নাহ, আমি একজন যোদ্ধা। যোদ্ধারা পালায় না।' জোর করে পিছনের দরজা দিয়ে বের করে দিল বিপাশা ও সন্তানকে সে।



দরজায় দমাদ্দম লাথি পড়ছে। দরজা খুলল নিতাই। দুজন পাকিস্তানি সৈন্যসহ সুরত মাওলানা দাঁড়িয়ে- হাসছে কিন্তু সাপের মত ঠান্ডা চোখ।



সৈন্যরা তন্নতন্ন করে ঘর খুঁজল। কেউ নেই। হঠাৎ সুরত মাওলানা একটা লাথি মারল নিতাইয়ের বুকে। পড়ে গেল ও মাটিতে। কানফাটানো গুলির আওয়াজ- পিঠে তীব্র ব্যথা অনুভব করল। তারপর মনে নেই।



পাশের বাড়ির রমিজ ডাক্তারের সেবায় সৌভাগ্যক্রমে সে বেঁচে ওঠে। জানতে পারে ছোট ছেলেটি সিলিঙয়ের ওপর লুকিয়ে ছিল বলে বেঁচে গেছে।







ত্রিশ বছর পর...







নিতাই এখন আর তেমন চোখে একটা ভালো দেখেনা, সব কিছু যেন ঝাপসা ঝাপসা। হঠাৎ কানে ভেসে আসলো টিভির শব্দ। চোখে ঝাপসা দেখলেও কানে ভালই শোনে। সে টিভি দেখেনা, তবে কানে সারাক্ষনই ভেসে আসে হিন্দী ছবির গান না হলে হিন্দী সিনেমার ডায়লগ। অসহ্য লাগে তার।



হঠাৎ বাইরে কে যেন ডাকছে ওর ছেলেকে শুনতে পেল ও। বাইরে বেরিয়ে আবছাভাবে দেখল একদল তরুণ। ওর উদ্দেশ্যে বলল, 'কাকু। দেবু এলে বলবেন হুজুরে মাওলানা এনায়েতের নামে ব্যানারগুলো রেডি রাখতে। আর জানেনই তো উনার উপর যে পাবলিক সাপোর্ট! নিশ্চিত এম.পি.। আপনাদেরও মহল্লায় থাকন লাগবো। হেহে। চলি।'



নিতাইয়ের পিঠের ক্ষতটা আবার ব্যথা করা শুরু করেছে। বুকের মাঝেও ব্যথা- অক্ষম ক্রোধ!



মাওলানা এনায়েত ওরফে সুরত রাজাকার আজ জনগণের নেতা। হারিয়ে যাওয়া স্ত্রী-কন্যার চেহারা ভেসে উঠলো চোখে। মুক্তিযুদ্ধে হারানো ছেলেটার চেহারা মনে পড়ল। চেহারাগুলো ঝাপসা হতে শুরু করেছে চোখের জলে। পিঠের গুলির ক্ষতটা আবার চিনচিন করে উঠলো। বুকে দুর্দমনীয় ক্রোধ...



নিজের স্ত্রী-সন্তানের বিনিময়ে স্বাধীন এ দেশটায় এখনও সুরত রাজাকারদের অনেক ক্ষমতা। নিতাই এদের কাছে নস্যি।







তবে যোদ্ধা হিসেবে একটা জিনিস নিতাই পারেনা। কখনোই পারেনা।



সে যে যোদ্ধা একথা ভুলতে পারেনা। দাঁতে দাঁত চেপে সে ভাবে,'আমার জীবন গেলেও দেবু এ ব্যানার লিখবেনা।'



সত্যিকারের যোদ্ধার রক্ত শত্রুর সাথে আপস করেনা...কখনোই না..

মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.