| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
রাজীব নুর
আমি একজন ভাল মানুষ বলেই নিজেকে দাবী করি। কারো দ্বিমত থাকলে সেটা তার সমস্যা।
'এই জল ভালো লাগে; বৃষ্টির রূপালি জল কত দিন এসে
ধুয়েছে আমার দেহ- বুলায়ে দিয়েছে চুল-চোখের উপরে
তার শান-স্নিগ্ধ হাত রেখে কত খেলিয়াছে, আবেগের ভরে
ঠোঁটে এসে চুমো দিয়ে চলে গেছে কুমারীর মতো ভালোবেসে।'
আজকে বাংলা ২রা আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ।
হে হে- দেখতে দেখতে বর্ষাকাল চলে এলো! বাংলা বছরের দ্বিতীয় ঋতু। আষাঢ় ও শ্রাবণ এই দুই মাস জুড়ে বর্ষাকাল। বর্ষাকাল নিয়ে রবীন্দ্রনাথ খুব আদিখ্যেতা করেছেন। অবশ্য রবীন্দ্রনাথ উপভোগ করতে জানতেন। সবাই উপভোগ করতে জানে না। এই কিছু দিন আগে কি মারাত্মক গরম গেলো। চামড়া পুড়ে যায়- এমন গরম। সৌদি আরবের মতো গরম। এবার কোথাও বর্ষাবরন অনুষ্ঠান হলো না। ইহা দুঃখজনক। বর্ষাকালে মানুষের মন মেজাজ ঠান্ডা থাকে। ঝগড়া ঝাটি আর মনমালিন্য কম হয়। সবার মনে এক ধরনের সতেজ ভাব থাকে। নদী, খাল বিলের পানি বাড়ে। তুলনামূলক বর্ষাকালে মাছ বেশি পাওয়া যায়। এবং দাম কম থাকে।
কোনো এক নাটকে দেখেছি, স্ত্রী বলছে- চলো বৃষ্টিতে ভিজি। স্বামী রাজি হয়েছে। কিন্তু হঠাত স্বামী স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া বেঁধে যায়। স্বামী রাগ করে বাইরে চলে যায়। এক রিকশায় উঠে বসে। রিকশা চালক বলে, কোথায় যাবেন? স্বামী বলে চিটাগাং। রিকশা চালক বলে, রিকশায় করে চিটাগাং! আচ্ছা, নিয়া যাবো। দুই তিন মাস লাগবে। রিকশা চালক বলে, পরিবারের সাথে ঝগড়া হয়েছে নাকি? হ্যা হয়েছে। রিকশা চালক বলে, আমারও পরিবারের সাথে ঝগড়া হয়েছে। আজই রিকশা নিয়ে কোনো একটা ট্রাকের নিচে পড়ে যাবো। স্বামী বেচারা ভয় পেয়ে বলে, রিকশা থামাও আমি নামবো। রিকশা চালক বলে, কোনো থামাথামি নাই। এমন সময় একটা ট্রাক তীব্র গতিতে আসতে দেখা যায়। রিকশা চালকও তীব্র গতিতে ট্রাকের দিকে যেতে শুরু করে।
ঢাকা শহরে বর্ষাকাল মানে ভোগান্তি।
অলি-গলিতে পানি জমে যায়। রাস্তার জ্যাম দ্বিগুন হয়ে যায়। অল্প বয়সী মেয়েরা ব্যলকনিতে বসে হাত বাড়িয়ে বৃষ্টির পানি স্পর্শ করে, গালে ছোঁয়ায়। গ্রামের ছেলেরা বৃষ্টির মধ্য দল বেঁধে ফুটবল খেলতে যায়। আমি নিজেও গ্রামে বৃষ্টির মধ্যে ফুটবল খেলেছি! কাঁদা মাটিতে বারবার আছাড় খেয়েছি। আছাড় খাওয়াই যেন আনন্দের! বর্ষাকালে অনেক ফুল ফোটে। পানি পেয়ে অতি তুচ্ছ ঘাসও 'ঘাসফুল' দিয়ে দেয়। কলমি ফুল, কচু ফুল। তবে বর্ষার সবচেয়ে গ্রেট ফুল হলো- কদম। অদ্ভুত একটা ফুল! আমাদের হুমায়ূন আহমেদ বলেছেন, কদম ফুল ছাড়া বর্ষাযাপন হয় না। স্কুলে পড়েছি রবীন্দ্রনাথের কবিতা। ''নীল নবঘনে আষাঢ় গগনে তিল ঠাঁই আর নাহি রে।/ ওগো, আজ তোরা যাস নে ঘরের বাহিরে।' আমার খুবই পছন্দের একটা কবিতা ছিলো।
কোনো এক বর্ষাকালে আমি সংসদ ভবনের রাস্তা দিয়ে হেঁটে আসছিলাম।
হঠাত ঝুম ঝুম বৃষ্টি শুরু হলো। আমি কোথাও আশ্রয় নিলাম না। বৃষ্টির মধ্যে ভিজতে ভিজতে চললাম। একটা রিকশায় দুটা ছেলেমেয়ে যাচ্ছে। রিকশার হুড খোলা। ছেলেমেয়ে দুটা রিকশা থেকে নেমে ভিজতে শুরু করলো। মেয়েটা দুই হাত মেলে আকাশের দিকে তাকিয়ে ভিজতে শুরু করলো। দৃশ্যটা দেখে ভালো লাগলো। তাদের জ্বর আসবে, ঠান্ডা লাগবে, ভিজে বাসায় ফিরলে মা বকবে, সেদিকে খেয়াল নেই। তারা বৃষ্টি বিলাস করছে। আমারও ইচ্ছা হলো- আমিও এভাবে একদিন বৃষ্টিতে ভিজবো। আল্লাহপাক আমার সে ইচ্ছা পূরন করেছেন। বর্ষাকাল নিয়ে লিখতে গিয়ে আমার আরেকটা ঘটনা মনে পড়লো। অফিসে বার্ষরিক অনুষ্ঠান। বড় একটা হোটেলে একটা হল রুম ভাড়া করা হয়েছে। আমি কোট প্যান্ট টাই পড়েছি। আমার সবচেয়ে দামী জুতোটা পড়েছি। নিজেকে একদম বাংলা সিনেমার নায়কের মতো লাগছে। হঠাত বৃষ্টি শুরু হলো। প্রচুর বৃষ্টি। রাস্তায় পানি জমে গেছে। বৃষ্টির মধ্যে, পানি পাড়িয়ে সাইন্সল্যাব থেকে হেঁটে হেঁটে আমি মোতালেব প্লাজা পর্যন্ত এসেছি। বড় মজা পেয়েছি।
রবীন্দ্রনাথের কাছে বর্ষা প্রেমের ঋতু। বিরহের সান্ত্বনা এবং প্রকৃতির নবজাগরণের প্রতীক।
আর জীবনানন্দের কাছে বর্ষা হলো অপেক্ষার, বিষাদের এবং একধরনের মোহময় নিঃসঙ্গতার ঋতু। আমার কাছে বর্ষা হলো- হাতে চায়ের কাপ। ব্যলকনিতে বসে থাকা। আমার কাছে বর্ষা হলো- খিচুড়ি আর ইলিশ মাছ ভাজা খাওয়া। আমার কাছে বর্ষা হলো- পাতলা চাদর গায়ে দিয়ে মুভি দেখা। বই পড়া। একবার সব বন্ধুবাধব মিলে সিলেট গিয়েছিলাম। জয়ন্তিকা এক্সপ্রেস। রাতের ট্রেন। রাত ১২ টা বেজে গেছে ট্রেন ছাড়ে না। বাংলাদেশের ট্রেন। দেরি তো কবেই। আমাদের মোটেও বিরক্ত লাগছে। তখন বয়সটাই এমন সব কিছুতে আনন্দ পাই। যাইহোক, ভোরবেলা ট্রেন আমাদের সিলেট নিয়ে গেলো। রেল স্টেশন থেকে বের হতেই বৃষ্টি শুরু হলো। প্রচুর বৃষ্টি। রাস্তার পাশে এক রেস্টুরেন্টে আশ্রয় নিলাম। বৃষ্টি আর থামে না। আমাদের সকালের নাস্তা খাওয়া শেষ। কয়েক দফা চা খাওয়া হয়ে গেছে। কিন্তু বৃষ্টি আর থামে না। হোটেলে বসে বৃষ্টি উপভোগ করিলাম।
এবার একটা ভয়াবহ ঘটনা বলে, লেখাটা শেষ করবো।
সময় তখন ১৯৮৩ সাল। ৪৩ বছর আগের কথা। এক মা তার দুই ছেলেকে নিয়ে গ্রামে যাচ্ছে। বর্ষাকাল ছিলো। তুমুল বৃষ্টি হচ্ছে। এক ছেলে কোলে। আরেক ছেলে হাতে ধরা। একজনের বয়স দুই বছর, আরেক ছেলের বয়স ১১ মাস। সবাই ভিজে একাকার। ঢাকা থেকে গ্রামে যেতে যেতে সন্ধ্যা হয়ে গেছে। খবর পাওয়া গেছে রমিজ বিয়ে করেছে। এটা শুনে ফাতেমা প্রায় পাগল পাগল অবস্থা। তার স্বামী বিয়ে করেছে! এর আগে ফাতেমা কখনও শ্বশুর বাড়ি যায় নি। শুধু জানে গ্রামের নাম সালতা। ফাতেমা এবং দুই শিশু সন্তান ভিজে একাকার। বৃষ্টির মধ্যে কাঁদামাটির পথ তাদের চলতে সমস্যা হচ্ছে। ছোট বাচ্চাটা ক্ষুধায় কাঁদছে। সেদিকে ফাতেমার খেয়াল নেই। সে তার স্বামী দ্বিতীয় বিয়ের খবর পাওয়ার পর থেকেই কাঁদছে!
অনেক ঝড় তুফান পেরিয়ে ফাতেমা সালতা গ্রাম খুঁজে বের করে।
তখন রাত আটটা। দুটা বাচ্চাসহ সে ভিজে একাকার। ঠান্ডায় কাঁপছে। বৃষ্টি থামার কোনো নামগন্ধ নাই। হ্যা খোজ পাওয়া গেলো- রমিজ আরেকটা বিয়ে করেছে। ঘটনা সত্য। ফাতেমা রাগের মাথায় দুটা দুধের শিশুকে এই অজপাড়া গায়ে বৃষ্টির মধ্যে এনে ভুল করেছে। সে শহরে ফিরে যাবে। এমন সময় রমিজ এসে হাজির। সে ফাতেমাকে স্যরি বলে। এবং বলে, আমি আরেকটা বিয়ে করেছি আমার বাবার জন্য। বাবা অনেক রাগি। বাবা আমার জন্য মেয়ে পছন্দ করেছে। আমি মানা করতে পারিনি। আমাকে ক্ষমা করো ফাতেমা। ফাতেমা আমি তোমাকে ভালোবাসি। এবং আমার এমনই পোড়া কপাল আমি এখন তোমাকে বাড়ি নিতে পারবো না। বাড়িতে নতুন বউ। তাছাড়া আমার বাবা তোমাকে বাড়িতে ঢুকতে দিবে না। তুমি ঢাকা যাও। আমি দুইদিন পর আসিব। রমিজ একজন লোক দিয়ে ফাতেমাকে ঢাকা পাঠিয়ে দেয়।
©somewhere in net ltd.