নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

বেঁচে থাকলে বড় হবো....

চারাগাছ

চারাগাছ একদিন ডালপালা ছড়াবে.....

চারাগাছ › বিস্তারিত পোস্টঃ

নদীর হাওয়া, মনসুরের রক্ত আর ক্রুশের আর্তনাদ: পড়শীর খোঁজে এক অন্তহীন যাত্রা

১৩ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ভোর ৪:২৭



নদীর হাওয়া, মনসুরের রক্ত আর ক্রুশের আর্তনাদ: পড়শীর খোঁজে এক অন্তহীন যাত্রা

কুষ্টিয়ার ধুলোমাখা বাতাসে লালনের গান যেন এক চিরন্তন দীর্ঘশ্বাস। ঘরের কপাট খুললেই কালী নদীর হাওয়া কিংবা ছেউড়িয়ার মাজারের চেনা গন্ধ—মাঝে মাঝে দূর থেকে ভেসে আসা একতারার ধিমিক ধিমিক রিনঝিন শব্দ—সব মিলিয়ে মনটা কেমন যেন আনমনা হয়ে যায়। আমি তো কোনো গবেষক বা লালন বিশ্লেষক নই। কেবল কুষ্টিয়ার মাটিতে বড় হওয়ার সুবাদে লালনের গানগুলো রক্তের ভেতরে এক অন্যরকম আলোড়ন তোলে। মাঝে মাঝে গভীর রাতে আনমনে ভাবি, এই যে ফকির লালন গেয়ে গেছেন—“বাড়ির কাছে আরশী নগর / সেথা পড়শী বসত করে...”—এর আসল অর্থ কী?

মনের আয়না আর সেই অধরা পড়শীঃ

আরশি মানে তো আয়না। লালন আসলে সেই মনের আয়নার কথা বলেছেন, যেখানে বস্তুগতের সমস্ত কল্পনা, অনুভূতি আর দৃশ্যপট ছবির মতো প্রতিফলিত হয়। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই আরশিনগরের ভেতর বাস করেন এক 'পড়শী'। মানুষটার হাত নেই, পা নেই, ছোঁয়া যায় না, ধরা যায় না। অথচ তিনি বাস করেন ঠিক আমাদের বুকের ভেতরেই।
পড়শীর কাছে পৌঁছানোর পথ বড় কঠিন, হাজারো বাধার প্রাচীর। তবুও চরম আকুতি নিয়ে সাধক বসে থাকেন একটু দেখা পাওয়ার আশায়। তাঁর বিশ্বাস ছিল—“পড়শী যদি আমায় ছোতো / যম যাতনা সকল যেত, দূরে।” মৃত্যুর ভয় বা জীবনের সব যন্ত্রণা মুছে যাওয়ার ওই একটাই তো আকুতি!

রুমির ব্যাকুলতা আর মনসুরের আত্মাহুতিঃ

শুধু লালন নন, সুফি সাধক মাওলানা জালাল উদ্দিন রুমি যুগের পর যুগ এই পড়শীকে খুঁজে ফিরেছেন অদ্ভুত এক ব্যাকুলতায়। তিনি আকুতিভরে বলেছেন, "প্রভু, তুমি তো সব জায়গায় বিরাজমান। তবুও আমি তোমাকে পাগলের মতো খুঁজছি।" আবার পরম আত্মবিশ্বাসে এও বলেছেন, "আমি প্রভুকে বললাম, আমি তোমাকে জানার আগে মরবো না! প্রভু উত্তর দিলেন, যে আমাকে জানে সে কখনো মরে না!"
এই পড়শীকে খুঁজতে খুঁজতে, তাঁর সাথে মিলনের নেশায় বুঁদ হয়ে একদিন সুফি মনসুর আল-হাল্লাজ বলেই ফেললেন সেই মারাত্মক কথা—"আলাল হক্ক" (আমিই পরম সত্য)।

ব্যস, বাঁধলো বিপত্তি! সুফিরা জানতেন মনসুর ঠিক কোন গভীরতা থেকে এই কথাটি বলেছিলেন। আল্লাহর সাথে নৈকট্যতা যখন এতটাই গভীর হয়ে ওঠে যে সাধক নিজের অস্তিত্ব ভুলে কেবল তাঁকেই অনুভব করেন, তখন আর আলাদা কিছু থাকে না। কিন্তু বাহ্যিক বিচারব্যবস্থা তো আর সে কথা বোঝে না। শুরু হলো বিচার, ১১ বছরের কারাবাস।
আর তারপর এল সেই ৯২২ খ্রিষ্টাব্দের ২৬শে মার্চ। জনসমক্ষে সরকারি নির্দেশে চলল নির্মম নিষ্ঠুরতা। একে একে এক হাজার বেত্রাঘাত, হাত-পা বিচ্ছিন্ন করা, মুণ্ডুচ্ছেদ—সবশেষে দেহ পুড়িয়ে ছাই দজলা নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হলো। আর কাটা মুণ্ডু ঝুলে রইল ইরাকের এক সাঁকোর ওপর। দজলার স্রোত তখনো হয়তো লালনের সেই সুরের মতো ফিসফিস করে বলছিল—যে রক্ত মাটিতে মিশে যায়, তা কভু ফুরোয় না, তা মৃত্তিকার গভীরে শিকড় ছড়িয়ে দেয়। পড়শীর সন্ধানে নামার এমন নির্মম পরিহাস মানব ইতিহাসে আর কটি আছে!

মেটালিক ঝংকার আর ক্রুশের অন্তিম হাহাকারঃ

পড়শীর খোঁজে যখন মন আনচান করে, ঠিক তখন কানের পর্দায় বেজে ওঠে সিস্টেম অফ এ ডাউন (System of a Down)-এর সেই চিরচেনা ধাতব ঝংকার। গিটারের আর্তনাদ আর ড্রামের ভারী ছন্দের সাথে গায়কের কণ্ঠ চিরে বেরিয়ে আসে সেই প্রশ্ন—
"Father, into your hands I commend my spirit...
Father, into your hands...
"Why have you forsaken me?"


আধুনিক মেটালের এই গোঙানি আর আজ থেকে দুই হাজার বছর আগের ক্যালভারি পাহাড়ের হাহাকার কি মূলত একই সুতোয় গাঁথা নয়?
আর তার প্রতিধ্বনিতেই যেন বুক চিরে বেরিয়ে আসে বাংলা তর্জমা—
"আমার ঈশ্বর, আমার ঈশ্বর, কেন তুমি আমাকে ত্যাগ করেছ?" — মথি ২৭:৪৬

এই লাইনগুলো শুধু কিছু শব্দের সমষ্টি নয়; এটি মানবাত্মার অন্তহীন এক হাহাকার। ক্রুশের ওপর দাঁড়িয়ে যিশু যখন এই আর্তনাদ করেছিলেন, তা ছিল নিছক কোনো সাধারণ অভিযোগ নয়। তিনি যেন সেদিন ক্রুশের কাঠে বিদ্ধ হয়ে মানবজাতির সমস্ত বুকভাঙা কষ্টের, চরম নিঃসঙ্গতার এবং অসহায়ত্বের একটি জীবন্ত প্রতিচ্ছবি ফুটিয়ে তুলেছিলেন। রক্তেভেজা সেই মুহূর্তে তিনি মানুষ হিসেবে অনুভব করেছিলেন চরম একাকিত্বের হিমশীতল স্পর্শ।

তবুও, সেই অন্তিম যন্ত্রণার অতলে ডুব দিয়েও তিনি জানতেন—এটি কোনো সমাপ্তি নয়, বরং এক আদিম মহাপরিকল্পনারই অমোঘ এক অধ্যায়। ঈশ্বর কি সত্যিই তাঁকে চিরতরে, চিরকালের মতো দূরে ঠেলে দিয়েছিলেন? না। মহাবিশ্বের পরম করুণাময় পিতা তাঁকে ভালোবাসায় ত্যাগ করেননি। মানুষের পাপের ভয়াবহতাকে মানুষের নিজস্ব আয়নায় স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে, আর মানবজাতির মুক্তির দুর্গম মূল্য চোকাতে যিশুকে পার হতে হয়েছিল সেই ভীষণ একাকী, তীব্র যন্ত্রণার পথ।
আমাদের প্রতিটি বুকফাঙা আর্তনাদ, নীরব কান্না আর হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম হওয়া বিশ্বাসের ভেতর দিয়ে সেই চিরকালীন সত্যটিই যেন আজও বেজে চলে—যে অন্ধকারের গভীরতম সুড়ঙ্গ পেরিয়েই তবে মিলবে মুক্তির আলো।

ফুরোবার নয় এই অন্বেষণঃ

লালনের গান, মনসুরের রক্ত কিংবা ক্রুশের যন্ত্রণাবিদ্ধ আর্তনাদ—সবকিছুর মূল সুর তো একটাই। পড়শী আজও অধরা, ব্যবধান ঘুচবার নয়, তবুও মনটা বারবার সেই অচিনপুরের পানেই ছুটে চলে। কারণ পড়শী বাইরের কেউ নন—তিনি আমাদেরই নিখোঁজ সত্তা, আমাদেরই আত্মশুদ্ধির আয়না। যতক্ষণ এই বুকে দীর্ঘশ্বাস আছে, ততক্ষণ এই পথচলাও থামবে না। এই চিরকালীন অন্বেষণ কি আদতে আমাদের সবার ভেতরের মুক্তিরই আর্তনাদ নয়?

মন্তব্য ০ টি রেটিং +১/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.