নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

কিছু গল্প

দীপালী

দীপালী › বিস্তারিত পোস্টঃ

ভালোবাসার সাতকাহন পর্ব ১০

২৯ শে নভেম্বর, ২০১৩ রাত ১:৫৩



সন্ধ্যা ৭ টা। সারাদিনের আর রাতের ক্লান্তি দূর করতে আনিতা একটা হট সাওয়ার নিচ্ছে। একটু আগে তারা কক্সবাজারের এক স্বনামধন্য হোটেলে চেক ইন করেছে। জার্নি টা বেশ উপভোগ করার মতই ছিল শুধু চিটাগাং থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত রাস্তাটা মোটামুটি কষ্টদায়ক হয়ে গেছে। শেষ মুহূর্তে তাদের রিসার্ভ করা বাসটা ইস্টেশনে না আসায় তাদের লোকাল বাসে করে কক্সবাজার পর্যন্ত আসতে হয়েছে। রাই তো সেই আঁকাবাঁকা পথে আসতে গিয়ে বমি টমি করে পুরা মেসআপ করে ফেলেছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত যখন হোটেলের ঘরগুলোয় ঢুকতে পারলো তখন সবাই হাঁফ ছেড়ে বাঁচল।

প্রতিটা ঘরে ডাবল ব্যাড। কিন্তু তিনজনের আরামসে জায়গা হয়। তাই প্রতিটা ঘরে তিনজন তিনজন করে থাকবে ঠিক হল। আনিতাদের গ্রুপে রাই, জেবা আনিতা আর আঁখি চারজন মেয়ে বলে একটু অসুবিধায় পরেগেল বাকিরা। কেউ কাউকে ছাড়া ঘুমবে না। কিন্তু একটা ঘরে তিনজনের বেশি ইষ্টে করা যাবে না। তাই আনিতা নিজে থেকেই আলাদা একটা ঘর নিয়ে নিলো। জানালার পর্দা সরালেই নীল সমুদ্র চখে পরে আনিতার ঘর থেকে। অসম্ভব সুন্দর এক দৃশ্য। সাগরের ঢেউ আছড়ে পড়ছে সৈকতে, ফ্লুরসেণ্টের ফেনায় সাদা ঢেউয়ের আগা। আনিতা খানিক সেই দৃশ্য দেখল। কেমন মন খারাপ আর ভাললাগা মিশে যায় দেখে।

সারাদিনের ক্লান্তি, শঙ্কা, সবকিছু ফোয়ারার গরম পানির সাথে ধুয়ে চলে যাচ্ছে সুওরেজে। পুরনো আনিতা আর নেই। এই আনিতা অন্য এক আনিতা। নিজেকে আয়নায় দেখে নেয় একবার। না এই আনিতা কে সে চিনেনা। আগের আনিতার চোখে এরকম ঔজ্জ্বল্য দেখেনি, এতো উদ্যম তো ছিলোনা সে। নিজেকে নতুন করে আবিস্কার করে আনিতা। সাওয়ার টা নিয়ে আনিতা চুল একটা শুভ্র তাওয়েল দিয়ে ঘষে ঘষে মুছতে থাকে। বাথরুম থেকে বেরিয়ে হেয়ার ড্রইআর দিয়ে চুলটা শুকে নেয়।ড্রায়ারের গরম বাতাসের হল্কা গালে লাগে থেকে থেকে। ব্যাগ খুলে ময়সচারাইজার বের করে হাতে পায়ে আলতো হাতে লাগাতে থাকে। একটা মেরুন রঙের জামা বের করে। আনিতা কে এই রঙটা খুব মানায়। তাওয়েল টা সরিয়ে জামাটা গায়ে দেয়। মেরুন জামা আর সাদা চুড়িদার-ওড়নায় ভালোই ম্যাচ করেছে। দ্রুত হাতে চখের পাতায় আইলাইনার ঘষে চুলটা আঁচড়ে নিচে নামে। লিফটে করে নিচে লবিতে এসে দেখে সবাই তার জন্য অপেক্ষা করছে। চাবিটা রিসেপশনে দিয়ে তারা বেরিয়ে পরে সমুদ্রের উদ্দেশ্যে।

সমুদ্র এই সেই সমুদ্র। শিতের রাতের কুয়াশাচ্ছন্ন সমুদ্রকে কেমন যেন রহস্যময় দেখায়। দিলিপ, নাঈম, রাই, আঁখি আর বাকিরা সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পরে। আনিতা সৈকতে দারিয়ে থাকে। সে নামবে না। অন্তত আজ না। হিমেল হাওয়া দিচ্ছে। আনিতা কাঁপছে একটু একটু। নাহ এখন সাওয়ার নেয়াটা ঠিক হয়নি। জ্বর হয়ে গেলে সে নিজে না যত বিপদে পড়বে তার থেকে বেশি বিপদে ফেলবে বন্ধুদের। শালটাও যে কেন আনল না! নিজের উপর নিজের রাগ হতে থাকে আনিতার। সে কি ফিরে যাবে হোটেলে? না থাক। বাকিরা সবাই বিরক্তই হবে তার উপর। এম্নিতেই তাকে সমুদ্রে নামাতে না পেরে সবাই বিরক্ত। রাই তো বলেই ফেলল সে নাকি বইয়ের জগতের বাইরে আর কিছুই এনজয় করতে জানে না।

আনিতা বালিয়াড়ির উপর বসে পরল। খুব শীত শীত লাগছে তার। দূরে দেখতে পাচ্ছে সব বন্ধুরা সমুদ্রের পানিতে স্নান করছে। ঢেউয়ের সাথে কেউ কেউ পাল্লা দিয়ে লাফাচ্ছে, যারা ভালো সাঁতার জানেনা ঢেউয়ের একেকটা ধাক্কায় তীরের দিকে আসছে আবার ফিরে যাচ্ছে। দেখতে খুব ভালই লাগছে আনিতার। কি উদ্দ্যমি সকলে। আনিতার খুব ইচ্ছা করছে তাদের সাথে মিশে যেতে। তামিমের কথা মনে পরে যায় হঠাৎ। তামিম খুব এডভেঞ্চার প্রিয়। ও সাথে আসলে আনিতাকে এভাবে বসে থাকতে দিতো না হয়তো। তামিমকে সমুদ্র আকর্ষণ করে প্রবল ভাবে। সময় পেলেই চলে আসে কক্সবাজারে। কি এনার্জি তামিমের, ভাবতেই অবাক লাগে।

রাহাত আসছে। হাতে একটা প্যাকেট। ট্রেন থেকে নামার পর রাহাতের সাথে কথা হয়নি আনিতার। হোটেল থেকে তাদের সাথে আসলেও মার্কেটের দিকে নেমে যায় সে। এখন ফিরে এসেছে। সবাই পানিতে হুটপুটী করছে, আনিতা দেখছে। কুয়াশার জন্য বেশ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না। তবে নাঈম আর জেবাকে একটু বাকিদের থেকে আলাদা হতে দেখে আপন মনেই হাসল আনিতা। এরা পারেও বটে, যেখানেই সুযোগ পায় প্রেমটা ঝালিয়ে নেয়। এতো কিসের গল্প করে এরা আনিতা বুঝে না। সবসময় ঝগড়া দিয়ে এই প্রেমালাপের সমাপ্তি ঘটে।

- এই যে ম্যাডাম একা একা কি দেখে হাসছেন?

রাহাতের হাসিমুখে প্রশ্ন। আনিতা কে তার দিকে ফিরতে দেখে হাসিটা আরও প্রসারিত হল।

- ওহঃ আপনি! না তেমন কিছু না। নাঈম আর জেবাকে দেখে হাসছি। আপনি কথায় ছিলেন এতক্ষণ?

- এইতো মার্কেটের দিকে। একটা শাল কিনলাম?

- শাল? কার জন্য? আজকেই তো এলাম আর এর মাঝেই শপিং শুরু করে দিলেন? সময় তো আছে।

- আরে বোকা মেয়ে এটা তোমার জন্য। লবিতে দেখলাম তোমার রুমের তাওয়েল বদলে দিতে বললে তখনি মনে হোল হয়তো শাওয়ার নিয়েছ আর এরকম ফিনফিনে একটা ওড়না গলায় যে এই শিতে তোমাকে জমে যেতে হবে। তাই শালটা কিনলাম।

- আরে তার তো দরকার ছিল না। আমার ব্যাগে প্রতিটা জামার সাথে ম্যাচিং করে শাল এনেছি।

- তাতে কি হয়েছে? আমি কি আমার আনুর জন্য একটা শাল কিনতে পারিনা?

- পারবেন না কেন? আচ্ছা দিনতো আমার কাছে শাল টা!

আনিতা শালটা রাহাতের হাত থেকে নিয়ে গায়ে জড়ায়। এক আরামদায়ক ওমওম ভাব আছে শালটায়। নীল জমিনে হলদে উলেন ফুলের কাজ। দেখতে যেমন চমৎকার তেমনি আরামদায়ক। আনিতার চখে প্রায় পানি এসে যায়। এরকম ভাবে কেউ তার খেয়াল রেখেছে কিনা মনে পড়েনা। অনেক ছোট বেলায় বাবা কে হারায় সে, বাবার কথা মনেও নেই। বাবা চলে যাবার পর মা তাকে নিয়ে মামা বাড়ি খালা বাড়ি থেকে বেড়ায় কিছুদিন। কিন্তু সবার অবহেলা মা মেনে নিতে পারে না। অবশেষে আনিতাকে নিয়ে ঢাকায় চলে আসে দিলশাদ আক্তার। চাকরি করে মেয়েকে বড় করতে হয়েছে বলে আনিতার ছোটোখাটো অনুভূতির দিক গুলো দেখতে পাননি। দিলশাদ আক্তারের বিষয়ে পরে বিস্তর আলোচনা করা হবে। আমরা মূল গল্পে ফিরে যাই।

আর তামিম কখনই আনিতার উপর জড় করে কিছু চাপাতে চায়নি বলেই আনিতার কোন ব্যাপারে একবার অসম্মতিকেই মেনে নিয়েছে। আনিতাও এসব ব্যাপারে অভ্যস্ত ছিল। কিন্তু আজ এখনি তার মনে হচ্ছে জড়করে কেউ খেয়াল রাখলে খুব খুশিই লাগে। রাহাতের প্রতি ভালবাসা মুহুর্মুহু বাড়ছে। রাহাতের প্রতিটা ছোট ছোট কিন্তু আকর্ষণীয় দিক আনিতার কাছে উন্মুক্ত হতে থাকে। আনিতা তামিম আর রাহাতের মাঝে যতবার কম্পেয়ার করতে যায় প্রতিবার রাহাতেরই জিৎ হয়। না সে তামিমকে দূরে সরিয়ে কোন অপরাধ করেনি। রাহাতের মতো এরকম কাউকে কখনোই পেতো না।

রাহাতের কাঁধে মাথা রাখে আনিতা। দূরে বন্ধুদের দেখতে পায় পানিতে লাফাচ্ছে। তীরে আছড়ে পড়ছে অগনিত ঢেউ। বার বার। নাঈম আর জেবার ঝগড়া শুনা জাচ্ছে। কিন্তু আনিতা রাহাতের কাঁধে মাথা অন্য কোন এক ভুবনে বিচরণ করছে। যেখানে শুধুই ঢেউ আর ঢেউ আর আনিতা রাহাত আছে। পৃথিবী শূন্য , কোথাও কোন জনমানব নেই। এখন আনিতার মরন এলেও কোন কষ্ট থাকবে না। এটাই কি সেই ভালবাসা? যার জন্য এতো বুভুক্ষু ছিল সে?

রাহাত পরম আদরে জরিয়ে ধরে আনিতাকে। এই সেই স্বপ্নের দেশের পরী যে তার শূন্য পৃথিবী একটা জাদুর কাঠি ঘুরিয়ে এক লহমায় ভালবাসায় পূর্ণ করে দিলো। এটা যদি কোন সিনেমা বা নাটক হতো তাহলে ব্যাকগ্রাউণ্ডে নজরুল গীতি দেয়া জেত,

“ হে মদিনা বাসি

প্রেমে ধরো হাত ম ম ...”

অথবা রবীন্দ্র সঙ্গীতও বাজতে পারত,

“ মোরা আর জনমে

হংস মিথুন সাঁজে”

কিন্তু এটাতো কোন নাটক বা সিনেমা না বাস্তব জগৎ । তাই গানের বদলে আনিতার বন্ধুদের হৈচৈ আর ঢেউয়ের আছড়ে পরার শব্দ বাজতে থাকে। হিমেল বাতাস মাঝে মাঝে কাপিয়ে দিয়ে যাচ্ছে আর মাথার উপর হিম পড়ছে। আনিতার বার বার মনে হচ্ছে কেন এই মুহূর্তটা এখানেই থেমে যাচ্ছে না?



পর্ব ১ Click This Link পর্ব ২ Click This Link পর্ব ৩ Click This Link পব ৪ Click This Link পর্ব ৫ Click This Link পর্ব ৬ Click This Link পর্ব ৭ Click This Link পর্ব ৮ Click This Link পর্ব ৯ Click This Link

মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.