নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

কিছু গল্প

দীপালী

দীপালী › বিস্তারিত পোস্টঃ

ভালোবাসার সাতকাহন পর্ব১১

১১ ই ডিসেম্বর, ২০১৩ রাত ৩:১২

আনিতার জ্বর মতো এসেছে। তার কামরায় দরজা বন্ধ করে কম্বলমুরিয়ে শুয়ে আছে। নাহ কাল সাওয়ারটা নেয়া ঠিক হয়নি। সব বন্ধুরা বেরিয়েছে। আনিতাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য জড় করলেও আনিতা আর বেরলোনা। তারা রাগে গজগজ করতে করতে বেরিয়ে গেলো। দিলিপ মুখ ফসকে বলেই ফেলল যে আনিতা কে তাদের সাথে নিয়ে এসে কেমন ভুল কাজটাই না করে ফেলেছে।

অনেক বেলা পর্যন্ত বিছানায় গড়াগড়ি করলো আনিতা। ১১টা নাগাদ বিছানা ছেড়ে বাথরুমে গিয়ে চোখে মুখে পানি দিয়ে ড্রেসটা বদলে ফেলে সে। না এভাবে শুয়ে থাকলে সবাই বিরক্ত হবে। আনিতা নিজের প্রতিবিম্ব দেখে আয়নায়। কি রকম অসুস্থ অসুস্থ লাগছে। আয়নার সামনে থেকে সরে এসে ইন্টারকমের রিসিভার কানে তুলে। দ্রুত হাতে ডায়েল করে ব্রেকফাস্ট রুমে দিয়ে যেতে বলে রুম সার্ভিসকে। আবার আয়নার সামনে ফিরে যায়। দ্রুত মাথায় চিরুনির আঁচর দিয়ে ঠিকঠাক করে। চেহারার ছন্নছাড়া ভাবটা একটু কম লাগে।

বেল বাজছে। নিশ্চয়ই নাস্তা নিয়ে এসেছে। আনিতা গলায় ওড়নাটা ঝুলিয়ে দরজাটা খোলে। না নাস্তা নিয়ে আসেনি কেউ। দরজার ওপাশে তামিম দাড়িয়ে। একান ওকান বিস্তৃত এক হাসি নিয়ে আনিতার দিকে তাকিয়ে আছে। হাতে এক বক্স চকলেট। আনিতা দরজা খুলতেই হাতে চকলেটের বক্স টা এগিয়ে দেয়। আনিতা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায়। তামিম কে এই মুহূর্তে কোনমতেই আশা করেনি সে।

- সারপ্রাইজ!

তামিমের উৎফুল্ল কণ্ঠ শুনে সংবিৎ ফিরে আনিতার।

- তুমি এখন? এখানে? তোমার তো প্রমোশনের একটা প্রিপারেশন নেয়ার ছিল। এখন হঠাৎ এখানে?

এক সাথে হড়বড় করে অনেক প্রশ্ন করে ফেলে আনিতা।

- আরে আমার অনেক গুলো লিভ পাওনা ছিল। ভাবলাম তোমার সাথে থাকার এ রকম সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া না করি। তাই কালকেই বুকিং দিয়ে আজকের ফ্লাইটে চলে এলাম। তুমি খুশি হওনি?

- না মানে, খুশি হয়েছি। কিন্তু আমার বন্ধুরা কি ভাববে সেটা নিয়ে একটু ওয়ারিড। দ্যাটস অল।

আনিতা নিজের উত্তেজনা আর ভীতি লুকোতে রুমের দিকে ফিরে।

- কি ব্যাপার? এই কয়েকদিনে আমি মনে হচ্ছে বাইরের মানুষ হয়ে গেলাম? আমার পাত্তা কেটে অন্য কারো প্রেমে পড়লে নাকি?

তামিমের কণ্ঠে ঠাট্টার সুর।

আনিতা চমকে যায়। তামিম কি তাহলে তার আর রাহাতের ব্যাপারে জেনে গেছে? আনিতার বুক দুরু দুরু কাঁপতে থাকে। না এ ভাবে তার আর রাহাতের ব্যাপারটাকে মেস-আপ হতে দেয়া যাবে না। আবার তার মনে প্রশ্ন আসে কে জানাবে তামিমকে তার আর রাহাতের ব্যাপারে? রাই কি সেদিন তাদের সব কথা শুনেফেলেছিল ট্রেনে? না আনিতা কে আরও কঠিন হতে হবে।

- কি বলতে চাচ্ছ তুমি? আমি অন্য কারো সাথে ইনভল্ভড?

সহসা আনিতার কণ্ঠে ঝাঁজ।

- আরে বোকা মেয়ে! রাগ করছ কেন? আমি কি তাই বলেছি নাকি?

- তাহলে কি বোঝাতে চাইছ?

- আমি বোঝাতে চাইছি যে আমি এতক্ষণ ধরে বাইরে দারিয়ে আছি আর তুমি একবারও আমাকে ভেতরে আসতে বললে না। তাই ঠাট্টা করে বললাম।

- অহঃ সরি। আসো ভেতরে আসো।

কমল হয় আনিতা। না তামিম কিছু জানে না। সে তার জন্যই এখানে এসেছে। স্বস্তির শ্বাস ছাড়ে সে।

তামিম ঘরের ভেতর ঢুকে। আনিতার স্বভাব মতই এলোমেলো অগোছালো একটা ঘর। ব্যাড-সাইড টেবিল আর বিছানার উপর ছড়ান ছিটানো গল্পের বই। তামিম খুব গোছালো ছেলে। তাই অগোছালো কিছু দেখলেই তার অস্বস্তি হয়। আনিতা এটা জানে। তাই দ্রুত হাতে বই গুলো ব্যাগে ঢুকিয়ে কোনোমত বিছানাটা ঠিকঠাক করে। তামিম সোফায় বসে আনিতার কাজ দেখতে থাকে।

দ্বিতীয় বারের মতো বেল বাজলো। হ্যাঁ এইবার নাস্তাই নিয়ে এসেছে বেয়ারা। টেবিলে গুছিয়ে খাবার পরিবেশন করে চলে যায় সে। আনিতা তামিমের পাশে বসে। খুব ক্ষুধাবোধ হচ্ছে। পরটা, ডিম ভাজি আর সব্জি দেখে ক্ষুধাটা যেন আরও মাথা চারা দিয়ে উঠছে। তামিম কে জিজ্ঞেস করল

- খেয়েছ কিছু?

- না এখনো খাইনি কিছু।

- আসো একসাথে খাই। অনেক পরটা র সব্জি দিছে। আমাদের দুজনের হয়ে যাবে।

- না আমার ক্ষুধা হয়নি। তুমি খাও।

- আরে কি বলছ? এতো বেলা পর্যন্ত তোমার ক্ষুধা হয়নি? এ কথা টা আমাকে বিশ্বাস করতে বইল না প্লিজ। তোমার তো খাওয়ার জন্য কোন টাইম লাগে না। যখন যেটা খেতে ইচ্ছা করে খাও।

আনিতা তামিমকে জোর করে।

- না রে। আজ কেন জানি ক্ষুধা হয়নি।

- ফালতু কথা রাখো তো। ক্ষুধা হয়নি! দেখি হা করো। আমি খাইয়ে দেই।

আনিতা পরোটায় ডিম ভাজি নিয়ে তামিমের মুখের কাছে ধরে। তামিম না না করলেও আসলে তার ক্ষুধা লেগেছিল। সে জানে না করলে আনিতা জোর করে তার মুখে খাবার তুলে দিবে। এবং হলও তাই। তামিম মনে মনে খুশি হলেও চোখে মুখে একটা বিরক্তির ভাব ফুটিয়ে পরোটার টুকরাটা মুখে পুরে। তারপর ঝটপট খেতে থাকে। আনিতা কে কিছু খাবারের সুযোগ দেয়না।

- কি তোমার না ক্ষুধা হয়নি? তাহলে সব খেয়ে ফেলছ যে?

- ক্ষুধা হয়েছিল অনেক, কিন্তু তোমার হাতে খাওয়ার জন্য অভিনয় করছিলাম।

- কি দুষ্টু তুমি! আমি আরও ভাবলাম তুমি অসুস্থ নাকি! আর এখন আমার ভাগের পরোটা গুলাও খায়ে ফেলছ!

- আরে বোকা বাবু টা আমার। না খাইনি সব। তুমি আমাকে খাইয়ে দিলে আমি দিব না? দেখি হা করতো।

তামিম একটুকরা পরোটায় ডিম আর সব্জি নিয়ে আনিতার মুখের কাছে ধরে। যখন আনিতা সেটা খাওয়ার জন্য মুখ খুলে তখন তামিম পরোটা টা নিজের মুখে পুরে দেয়।

- অসভ্য দুষ্টু কথাকার! আমার খাওয়া কেড়ে নেয়া! দাঁড়াও দেখাচ্ছি মজা!

আনিতা সফার কুশন তুলে তামিমকে মারতে থাকে। তামিম নিজেকে বাঁচানোর জন্য হাত তুলে কুশনটা ধরে ফেলে। আনিতা হাতের কাছে আর কিছু না থাকায় বিছানা থেকে বালিশ নিয়ে আসে। তামিম আর আনিতার এবার কুশন বালিশ যুদ্ধ শুরু। তামিম হেরে জাচ্ছে দেখে লাফ দিয়ে বিছানায় উঠে যায়।

- আর না, আর না। আমি হারে গেলাম। হার স্বীকার করছি।

তামিম হাপাতে হাঁপাতে বলে। কিন্তু আনিতা বালিশ নিয়ে তামিমের পেছন পেছন ছুটে বেড়াতে থাকে। আর হাসতে থাকে। এই বালিশ দিয়ে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলায় সে সব সময় জয়ী হয়। তাই যতবারই সে জয়ী হয় খুব আনন্দ লাগে।

- আমার খাবার খাওয়ার মজা বুঝো। কে বলেছিল আমার মুখের কাছে ধরা খাবার খেতে? এখন?

- ওকে বাবা আমার ভুল হয়েছে। আর হবে না।

- না কোন মাফ নাই।

আনিতা হাতের বালিশ দিয়ে তামিমকে আঘতের চেষ্টা করতে থাকে। তামিম নিজেকে ডিফেন্স করতে করতে বিছানায় বসে পরে। আনিতা তামিমের পাশে বসে পরে। আবার বালিশ উঠিয়ে যখন তামিমকে আঘাত করতে যাবে তখন তামিম আনিতার হাত দুটো ধরে ফেলে। আনিতা নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করে। কিন্তু তামিম আরও শক্ত করে ধরে রাখে। তামিমের ঠোঁটে এক বিচিত্র হাসি। চোখের ভাষা ভিন্ন। এই তামিম আনিতার পরিচিত না।

- তামিম ছাড় আমাকে।

আনিতার গলা কেঁপে যায়। বুক দুরু দুরু করছে। কি হল আজ তামিমের? আগে কখনো তো এ রকম আচরণ করেনি সে। নিজের হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করছে আনিতা, কিন্তু তামিম আর শক্ত করে ধরে রাখে। আনিতাকে নিজের দিকে টেনে আনতে থাকে সে।

আনিতা চোখ বন্ধ করে ফেলে। কিন্তু তামিমের এতো কাছে সে যে তামিমের আফটার-শেভের সুগন্ধ নাকে আসছে। আনিতার দ্রুত নিঃশ্বাস পড়তে থাকে।

খুট করে একটা শব্দ হল। আনিতা চমকে চোখ খুলে দেখে রাহাত দাড়িয়ে তামিমের পেছনে। আনিতা তামিমকে মৃদু ধাক্কা দিয়ে উঠে দারায়। তামিম তখনো আনিতার হাত ধরে আছে। রাহাত একবার তামিমের দিকে আর একবার আনিতার দিকে দেখে ফিরে যাচ্ছিল।

- স্যার, একটু দাঁড়ান।

আনিতা নিজের হাত তামিমের হাত থেকে মুক্ত করে রাহাতের কাছে যায়।

- না আনিতা। আমি মনে হয় ভুল সময়ে তোমার ঘরে এসে পরলাম। সরি।

রাহাতের কণ্ঠের রাগ , অভিমান, ঘৃণা সব মিশ্রণ আনিতার কান এড়ালো না। নিজেকে খুব অপরাধী লাগছে। কেন সে আজ বন্ধুদের সাথে গেলো না? তাহলে তো এই সিচুয়েশনে পরতে হত না।

- আপনি আসলে যা ভাবছেন তা না। আমাদের সে রকম সম্পর্ক না। তামিম খুব ভালো ছেলে।

আনিতা সাফাই দেয়ার মতো বলে।

- হ্যালো! আমি তামিম, আনিতার ফিওন্সে।

তামিম উঠে নিজের হাত বাড়িয়ে দেয়। রাহাত তামিমের হাত টা ধরে একটু ঝাঁকিয়ে দেয়।

- আমি রাহাত কবির। এক সময় আনিতাদের পড়াতাম। এখন কোন কোর্স নেইনা। তাই আনিতার টিচার এর পদে আছি কি না জানি না।

শেষের কথা গুলো আনিতার দিকে তাকিয়ে বলল।

- আনিতা তোমার ট্রিপে যে তোমাদের টিচার আসবে বলনি তো। বেশ ভালই হল।

আনিতার দিকে ফিরে বলে তামিম।

- না মানে একদম শেষ মুহূর্তে স্যার আমাদের জয়েন করলো। তাই তোমাকে জানানো হয়নি।

আনিতার উত্তর।

- আসলে আমার আসার কথা ছিল না। কিন্তু কারো মাঝে আসার জন্যই হয়তো আমি এই ট্রিপে।

রাহাত খোঁচা দিয়ে কথাগুলো বলে।

- আপনার কথা কিছুই বুঝতে পারছি না। সে যাই হোক আপনার সাথে দেখা হয়ে ভালো লাগলো। বাই দ্যা ওয়ে , আপনি আনিতার ঘরে কেন এসেছিলেন? কোন কি দরকার ছিল?

- না আসলে আনিতার গতকাল রাত থেকে একটু জ্বর মতো। আজকে ওর বন্ধুদের সাথে বাইরে গেলো না। তাই ভাবলাম হয়তো বেশি অসুস্থ। দেখাশুনার কেউ তো নেই। তাই আমি ওষুধ নিয়ে এলাম। কিন্তু এসে মনেহয় ভুলই করে ফেললাম।

- না না তা কেন? দেন আমার কাছে দেন ওষুধটা।

তামিম ওষুধ টা বের করে আনিতার হাতে দিল। আনিতাকে নিজের হাতে গ্লাস ধরে পানি খাইয়ে ওষুধ টা মুখে পুরে দিল। আনিতার চোখ রাহাতের দিকে। রাহাত রাগে ফুঁসছে। আনিতার দিকে এক বারের জন্য দেখছে না। তামিম কি করছে দেখছে। ওষুধ খাওয়া শেষে যখন তামিম আনিতার কপাল আর গালে হাত দিয়ে জ্বর আছে কি না দেখছে তখন রাহাত আর থাকতে না পেরে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। আনিতা রাহাতকে আটকাতে গিয়েও পারলো না।



পর্ব ১ Click This Link পর্ব ২ Click This Link পর্ব ৩ Click This Link পর্ব ৪ Click This Link পর্ব ৫ Click This Link পর্ব ৬ Click This Link পর্ব ৭ Click This Link পর্ব ৮ Click This Link পর্ব ৯ Click This Link পর্ব ১০ Click This Link

মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.