| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
গল্পের টোনা
লেখালেখির প্রতি সীমাহীন ভালোবাসা আমার। সেই ভালোবাসা থেকেই একটু একটু চেষ্টা করি লেখার।
দীর্ঘশ্বাস- প্রথম পত্র
জেলার জিরো পয়েন্ট থেকে শহরমুখী যতোই ভেতরে যাওয়া যায়, ঘরবাড়ির শ্রীবৃদ্ধি আর রাস্তাঘাটের বেহাল দশা সমানভাবে চোখে পড়ে।
এ অঞ্চলে সংসদীয় হোমরা-চোমরারা খুব একটা আসেনা। হয়তো ক্ষমতায় থাকার পাঁচ বছরে একবার আসতে হয় বলে আসা। এজন্যই অবকাঠামোগত উন্নয়নের জোয়ারে ভাসানোর তেমন আবশ্যকতা চোখে পড়েনা। এমন একটা অ্যানালগ বাস্তবতায় গড়ে ওঠা শহরের মানুষজনও বেশিরভাগই অ্যানালগ মেন্টালিটির ধারক-বাহক-পোষক। ইট-কাঠের ঘর এদের গোছালো সুন্দর হলেও কারো কারো ভেতরের ঘরটা বেয়াড়া রকমের অগোছালো অসুন্দর। সংস্কারের বর্মে আবৃত। সে আবরণ কবে অদৃশ্য হবে বা আদৌ হবে কিনা- এমন প্রশ্নের আমরা কেন, তারা নিজেরাও হয়তো সদুত্তর পায়না। কিন্তু আসল সমস্যাটা যেখানে হচ্ছে, সেটার সমাধান করা দূরে থাক, সেটা চিহ্নিত করতেই কেউ আসেনা। ইভটিজিং কেন হয়? একটা ছেলে কেন গার্লস স্কুল, গার্লস কলেজের সামনে দাঁড়ায়? ছেলেদের মুখে শিস বাজে কেন? কী দেখে বাজে? কাদের দেখে বাজে? মেয়েরা এমন কীই বা দেখায়? মেয়েরা হাসে কেন? কাশে কেন? রাস্তায় ছেলেদের পাশেই বা কেন? ইত্যাদি হাজারটা আজুরে প্রশ্ন বানানোর কর্মে যারা বেকার হয়েও কর্মব্যস্ত, তারা প্রয়োজনীয় প্রশ্নগুলোর সদুত্তর পেতে ব্যর্থ হতেই পারে। এদের থেকে জাত নতুন প্রজন্মের মোটামুটি সবাই একটু ভিন্ন ধাতুতে গড়া। বিশ-ত্রিশ বছর আগের ‘প্রেম অস্পৃশ্য’ মতবাদের এরা ঘোর বিরোধী। কিন্তু কারো কারো ইচ্ছাসত্ত্বেও পরিবাররূপী খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসা হয়ে ওঠেনা। যেমনটা হয়নি নাসরিনের। তাই হয়তো ও মতিনের সাথে অল্প একটু অভিমান করেই ক্ষান্ত দেয়, এর বেশি কিছু করতে যাওয়া ওর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। ও খুব রাগী হলেও সে রাগের প্রভাব মতিনের ওপর ফেলতে পারেনা। কারণটা সম্ভবত চুপচাপ জন্ম নেয়া ভালোবাসা।
মতিন ধরা দিয়েও দেয়না। অন্য ছেলেদের থেকে অনেক আলাদা ও। কোনো প্যাঁচ নাই কথাবার্তায়। সহজ সাবলীল প্রকাশ। কথায় যেন কাব্যের হাঁটাহাঁটি, নীরবতায় যেন হাজারো সরব গল্পের দৌড়াদৌড়ি। মাঝেমধ্যে ফেসবুক দেয়ালে সাঁটায় কবিতা, নিজের লেখা। ভালোই লাগে নাসরিনের। মাঝে মাঝে তা প্রকাশও করে কমেন্টে- ‘Wow!!! At last my FbF started writing poems…’
এই পর্যন্তই। মানে ফেসবুকের বুক চিরে ভিতরকার মতিনকে আবিস্কার করাটা হয়না ওর। চাইলেও পারেনা। একটাই সুখের কথা- মতিন ইনবাকশোতে তার সাথে যোগাযোগ রাখে। ভালো-মন্দ খোঁজ-খবর নেয়। এইতো সেদিন ফিজিক্স প্র্যাক্টিক্যাল পরীক্ষার জন্য সাজেশন করে যে মেসেজটা পাঠিয়েছিলো, সেটা না হলে পরদিন ল্যাব আর ভাইভা বোর্ডে যথেষ্ট নাকানি চুবানি খেতে হতো ওকে। ভালোই কেয়ারিং ছেলে। এমন একটা বয়ফ্রেন্ড হলে মন্দ হয়না। ছোটবেলায় যখন বিটিভিতে মুস্তাফা মনোয়ারের ‘মনের কথা’ প্রোগ্রামটা দেখতো তখন মাঝে মাঝে ওর মনে হতো, মন আবার কীভাবে কথা বলে?
সেই প্রশ্নের উত্তর এখন এই দুরন্ত কলেজ জীবনে এসে মিলতে শুরু করেছে। আস্তে আস্তে ও বুঝতে পারছে মনের কথা কী জিনিস। সংজ্ঞাটা ওর কাছে এমন, যে কথার ভারে মনের বমিভাব হয় অথচ বমি হয়না সে কথাই মনের কথা। যে কথা ইনবাকশোতে পাঠানো যায়, অথচ যে লেখায় চিকা মারলে বিপদ এবং আপদ একসঙ্গে পেয়ে বসে তাই মনের কথা। কিন্তু ‘ওয়ান ফোর থ্রি’ লিখতে গিয়ে বারবার এলোমেলো করে ফেলেছে ও। এক লিখতে আর হয়ে গেছে বারবার। সিদ্ধান্তেই আসতে পারছে না মতিনকে প্রপোজ করা যায় কি যায়না। তাই এই অবস্থায় ওর স্বাভাবিক মেসেজিং আর ওয়াল পোস্ট-কমেন্ট ছাড়া আর কোনো উপায় থাকেনা। ওয়াল স্টোরি নিয়ে হাজারো লোকের নাক গলুনি আর প্রাণ জ্বলুনি হয় ভেতরে ভেতরে। এদেরই দু একজন দু এক কথা বলতে ছাড়ে না। কেউ কেউ বলতে চেয়েও পারেনা। প্রাণ জ্বললে সেটা ত কেউ দেখে না, কিন্তু অযথাই যাদের নাক গলে সমস্যাটা বাধে তাদের নিয়েই। তিন-চার মাস হয় মুন ত বলেই ফেললো, মতিন ভাইয়ার সাথে কি তোমার কিছু আছে নাকি? নাসরিন ত মহা অবাক, তার সাথে আবার আমার কী থাকবে? মুনের জবাবটা ভাবিয়ে তোলে নাসরিনকে, ভেবে দ্যাখো আরেকবার, তার ফ্যামিলি ভালো, ছেলেও ভালো। এর কোনো উত্তর না দিয়ে ঐ দিন কলেজ থেকে বাসায় চলে যায় ও। পথে যেতে যেতে ভাবে, ইশ! মোবাইল থাকলে এখনই আচ্ছামতো ঝেড়ে দিতাম আহাম্মকটাকে! কেন যে এমন আবেশে জড়ালো! না পারি ভুলতে, না পারি এড়াতে। আর মেয়েগুলাও যে কী করে!
বাসায় পৌঁছে বড় ভাইয়ার মোবাইল থেকে ফেবুতে লগইন করে মতিনকে একটা মেসেজ পাঠায়, Apni ki apnar babar college e aste paren kal ekbar?
ও জানে মতিন শহরে আছে। সেদিন বিকেলে দেখেছে মালঞ্চতে। যেচে কথা বলার সাহস হয়নি। যাই হোক, মতিন আসেনি কলেজে। কী একটা সমস্যা আছে নাকি। মেজাজ খারাপ হয় নাসরিনের। ওর সমস্যা বাধিয়ে এখন নিশ্চয়ই নিজের সমস্যার কথা বলে কেটে পড়তে চাচ্ছে আহাম্মকটা। এভাবে কয়েকবার আসবে-আসবেনা করে শেষমেশ আর দেখাই করেনা মতিন ওর সাথে। বিরক্তির সমানুপাতে ভালোবাসাও নিশ্চুপে বাড়ে নাসরিনের মনে। ভাষা পায়না শুধু। যা ও বা পায়, পেতে পেতে হারায়। অপেক্ষা করতে আর ভালো লাগেনা ওর। ভাবে, সবই হয়তো বৃথা।
ভাবতে ভাবতে যখন ফেসবুকে লগইন করলো Inbox(1) দেখে যথারীতি হৃৎকম্পন বেড়ে গেলো। হ্যাঁ, মতিনের মেসেজ। বাহ! বেশ উন্নতি দেখা যাচ্ছে আহাম্মকের। মোবাইল নাম্বার দিয়ে দিলো! মেঘ না চাইতেই জল! কিন্তু না, এখনই না। ফোন করে চমকে দিতে হবে। এই মুহূর্তে তেমন মুড নেই নাসরিনের। তাছাড়া সে জন্য রিহার্সেলেরও ব্যাপার আছে। ইম্প্রেস করতে হবে না আহাম্মককে? শুধু মিষ্টি কথায় চিড়ে ভিজলে ত ফেসবুকেই মাথা খেয়ে ফেলা যেতো, কিন্তু প্রেমের ক্ষেত্রে সংবিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ- ফেসবুক প্রেমের জন্য ক্ষতিকর। সিদ্ধান্তে আসে প্রেম শুরুর সাথে সাথেই ফেসবুক এ্যাকাউন্ট বন্ধ করবে ও, আহাম্মকও যাতে আর না চালায় সে ব্যবস্থাও করবে। লেজ হারিয়ে সগোত্রীয়ের লেজ কাটানো আর কি! মুহূর্তেই কল্পনার জগতে চলে যায় নাসরিন। যে জগতে শুধুই ওরা দুজন। আর কেউ নেই, থাকবেনা কোনোদিন।
এমন কল্পনায় কি মতিনও ভাসে কখনও ওকে নিয়ে? জানার বড্ড ইচ্ছে নাসরিনের। সে ইচ্ছে পূরণ করতেই রাত পৌনে একটায় ফোন করে মতিনকে, যার রাত সাড়ে দশটার পর থেকে ফোন রিসিভ করা নিষিদ্ধ। বাবার কড়া নির্দেশ। ততোধিক কড়া চক্ষুর চাহনি উপেক্ষা করে মাঝে মাঝে ফেসবুক চালালেও ফোন রিসিভ করেনা বাধ্য ছেলে। তার ওপর পরদিন সকালের বাসে ঢাকা যাবে, তাই একটু তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়তে হলো। তাই পৌনে একটায় নাকের ডাকের ঠেলায় ফোনের ডাক শুনতে পায়নি। শুনতে পেলো সকালে বাবার ডাক- উঠে পড়্ বাবা, যাবি না? সাড়ে আটটায় ত তোর বাস। এখন সাড়ে ছয়টা বাজে। আটটার আগেই নামা দরকার। গোসল সেরে রেডি হয়ে নে বাবা।
রিক্সায় আব্বার সাথে ইদানিং মাস-দুমাস পরপর বড়জোর দুতিনবারের জন্য চড়া হয়। অথচ রিক্সায় বসার আদব-লেহাজ এই আব্বাই চুপচাপ শিখিয়েছে ওকে। বাপ-ছেলে এভাবেই ডান-বাম করে বসতে হয় নাকি। মোয়াজ্জেম স্যার জোরেশোরে শিখিয়েছেন পরে। জোরেশোরে মানে রাখঢাক না করে। কারণ, সে শিক্ষায় প্রেমও ছিলো। গার্লফ্রেন্ড নিয়ে কীভাবে রিক্সায় বসা যুক্তিযুক্ত- সেটা জেনেছে মতিন এই বান্দার ক্লাসেই। আব্বারা এসব শিখান না, এটা সে বোঝে। ত, মাঝখানের সময়টা রিক্সার শহর হেঁটে বেড়ায় মতিন- কখনো হেডফোন কানে একা, কখনোবা কাউকে অথবা কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে। একা অথবা জুটি বেঁধে হাঁটাই মজার বেশি। দলাদলি বিশ্রী একটা ব্যাপার। যাহোক, মনেই ছিলোনা মোবাইলটা এনেছে কিনা। এর মধ্যে বেজে উঠলো ওটা। আননোন নাম্বার। কী আর করা? মতিন পড়েছে মোগলের হাতে। খানা না খেয়ে উপায় নেই। আব্বার সামনে যখন মোবাইল বেরই করেছে, তখন রিসিভ করার বিকল্প নেই। রিসিভ করে ইনিয়ে বিনিয়ে যা বললো তাতে সম্ভবত আব্বা বুঝেই ফেলেছে যে কলটা কোনো মেয়ের ছিলো। শিক্ষক মানুষের এই এক ব্যাপার। অনেক কিছু সহজে আঁচ করতে পারা। যাক সেকথা। সেই কলের জের ধরেই বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত বাকি পথটা সঠিক বন্ধু নির্বাচনের ওপর এক বিরাট বক্তৃতা শুনিয়ে দিলো ছেলেকে। ঐদিন পরে দুতিনবার ফোনালাপ হয় ওদের। জার্নিটা বেশ ভালোই উপভোগ করলো মতিন। কেন করলো? প্রথম আলাপেই ওদের মধ্যে অনেক মান-অভিমানের নাটক মঞ্চস্থ হওয়ার কারণেই হয়তো। থাক, সে প্রশ্নটার উত্তর না খুঁজে আমরা আমাদের গল্পে এগিয়ে চলি। ঠিক যেমন করে মতিন হাজারো ‘কেন’ এড়িয়ে অনেকটা নিজেরও অজান্তে নাসরিনের ব্যাপারে অনেকখানি সামনে এগিয়ে গেছে একদিনের আলাপেই।
কিন্তু শাপলার অপর পিঠে বাঘ থাকে- এই সূত্রে নাসরিন ধরা পড়ে গেলো ওর বোন সাদিয়ার কাছে। কট অ্যান্ড বোল্ড। ভুলটা মতিনের। ঠিক ভুলও না। টর্টের ভাষায় স্ট্রিক্ট লায়াবিলিটি বলা যায় ব্যাপারটাকে। এই দেশের আইনে বিচার নেই বলেই রক্ষা তার। নাসরিন ব্যাপারটাকে ওর নিজের দিকে টেনে নেয়। হয়তোবা ভালোবাসার টান থেকেই। শেষমেশ সেবারের মতো যোগাযোগ বন্ধ। পরে যোগাযোগের সুযোগ পেয়েও কাজে লাগাতে পারেনা মতিন। শুধু আক্ষেপ করে, মেয়েটার সাথে আর দেখা করা হলোনা। আর আর্কাইভ্ড মেসেজ পড়ে মাঝে মাঝে হাসে নিজের অজান্তে। যেখানে নাসরিনের দীর্ঘশ্বাস মতিনকে উপহাস করে- ‘Take care. Konodin ki amader dekha hobe?? Don’t Know. So good bye.’
পুনশ্চঃ এই দীর্ঘশ্বাসের অর্থ কি বুঝতে পেরেছিলো মতিন? বুঝলে কি ঠিক বুঝেছিলো? নাকি এখানেও টর্টশ্রেণীর ভুল ছিলো তার? থাকলে নাসরিন কি ক্ষমা করতে পেরেছিলো তাকে? এমন হাজারো প্রশ্ন থাকতে পারে পাঠকের মনে। আমরা এর উত্তর খুঁজে ক্লান্ত। সফল হলে কোনো একদিন হয়তো আবার ফিরবো ‘দীর্ঘশ্বাস- দ্বিতীয় পত্র’ নিয়ে। ততোদিন পর্যন্ত বিদায়।
দীর্ঘশ্বাস - দ্বিতীয় পত্র
২|
২৮ শে জুন, ২০১৩ দুপুর ১২:৫২
গল্পের টোনা বলেছেন: অনেক ধন্যবাদ। ![]()
©somewhere in net ltd.
১|
২৬ শে জুন, ২০১৩ রাত ১০:৩৩
অপূর্ণ রায়হান বলেছেন: ভালো লিখেছেন ++++++