| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
গল্পের টোনা
লেখালেখির প্রতি সীমাহীন ভালোবাসা আমার। সেই ভালোবাসা থেকেই একটু একটু চেষ্টা করি লেখার।
দীর্ঘশ্বাস - প্রথম পত্র
দীর্ঘশ্বাস- দ্বিতীয় পত্র
১...
নাহ্! মতিন পারেনি। সব ভুল ছিলো। ওটা বোধহয় দীর্ঘশ্বাসই ছিলোনা। মিজান স্যার ভুল বলেননি সেদিন। ভাদ্রের বর্ষণ আর নারীর মন সমান বেয়াড়া। কোনোকালেই কোনো ব্যাকরণ মেনে চলা সম্ভব না এই দুইয়ের পক্ষে। মতিন হয়তো সে নিয়মেই ব্যর্থ হয়েছে নাসরিনের মন বুঝতে। তাই মিজান স্যার যখন তার বাবার মারফত খবর পাঠায় দেখা করার জন্য, তখন খুব স্বাভাবিকভাবেই নাসরিনকে ভুল বোঝে সে- ‘মেয়েটা এতো বোকা? ইদের দিনের ঘটনাও শেয়ার করতে হবে প্রিয় স্যারের সাথে? এই মেয়ে শেয়ারের ব্যাবসায় নির্ঘাত শাইন করতে পারবে সায়েন্সের ছাত্রী হয়েও’। এসব ইতিউতি ভাবতে ভাবতে মহিলা কলেজে স্যারের রুমে ঢুকে পড়লো সে। সালাম দিয়ে দুটো কথা বলতেই ভুল ভাঙলো নাসরিন সম্পর্কে। ও বলেনি। স্যারও জানেন না। স্যার আসলে একজন এক্স-ঢাকা ইউনিভার্সিটি। এই ব্যাপারটা জানতো না মতিন। ফিজিক্সের শিক্ষক হয়েও যথেষ্ট রসবোধসম্পন্ন এই লোক। আলাপটা উপভোগই করলো মতিন। উপরি হিসেবে পরোক্ষভাবে নাসরিনের দেখাও মিললো। অবেলায় চা খাওয়ার অভ্যাস বদলে ফেলেছিলো কীভাবে কীভাবে যেন। কিন্তু স্যার খাওয়াবেনই। না করলো না মতিন। চা-সিঙ্গারা-মিষ্টি খেয়ে খোশগল্প শেষে যখন যাবে যাবে করছে, ঘড়ি বলছে প্রায় দুপুর দুইটা। স্যারের একান্ত বাধ্যগত ছাত্রীরা একে একে আসতে শুরু করেছে ব্যাচে। এরই মধ্যে সবকিছু ভেঙেচুরে নাসরিনের আবির্ভাব। স্যারের রুম ক্রস করে যেতে হয় ক্লাসরুমে। স্বভাবতই মতিনকে দেখে ফেললো ও। কিন্তু কিছু বুঝতে না দিয়ে চুপচাপ ক্লাসে চলে গেলো। এর মধ্যে কে একজন স্যারের পাঞ্জাবি নিয়ে রসিকতা শুরু করলো। কণ্ঠটা পরিচিত ঠেকলেও অত গা না করে মতিন সোজা বাসার পথ ধরলো। বাবা কয়েকবার ফোন করেছে। ফোন করেছে আরিফও। ফোন স্ক্রিনে অবশ্য Bura লেখা উঠেছে। কী এক অজানা নারীঘটিত কারণে তরুণ আরিফ বন্ধুমহলে ‘বুড়া’ নামে সমাদৃত।
২...
সিমুকে ফোন করেছিলো মতিন বের হবার সময়। পাজিটা ফোন ধরেনি। তাই এক বাবা আর মা ছাড়া অন্য কারো ফোন রিসিভ করবে না বলে ঠিক করলো। অতি উৎসাহী পাঠকরা ভেবে বসতে পারেন সিমু এমন কে যার কারণে ফোন রিসিভ করা বন্ধ করে দিলো মতিন। যাদের মনে মতিনের চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন জাগছে, তাদের অবগতির জন্য বলা দরকার, সিমু মতিনের আপন ছোট বোন। ময়মনসিংহ গার্লস ক্যাডেট কলেজে ইন্টারমিডিয়েট পড়ে। নাসরিন ওর বান্ধবী, ওল্ডের গোল্ড। যাহোক, এরপরও প্রথম দিকে মতিন এই ব্যাপারটা, মানে এই দীর্ঘশ্বাসের ব্যাপারটা ওকে জানায়নি। কারণ, তাহলে তার সকল আশা মাঠে যাওয়ার আগেই ঘরের কোণে মারা পড়বে। শেষে বালিশ ধরে বালিকা কাঁদবে না। বালক সারাটি জীবন দিবস-রজনী জেগে কাঁদতে কাঁদতে পাড়ি দেবে। আর এইসব আশঙ্কাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে শেষমেশ যেদিন জানালো, সিমুকে অবাক হতে দেখে যারপরনাই বিরক্ত হলো সে। পাজিটা নিশ্চয়ই এখন জেরা শুরু করবে। করলোও তাই। কবে থেকে? কী দেখে? এতোদিন বলেনি কেন? ইত্যাদি ইত্যাদি। যাই হোক, মতিন জানালো সবই সিমুকে। কীভাবে পরিচয়, ফোনের আহাম্মকি, নাম্বার হারিয়ে ফেলা ইত্যাদি ইত্যাদি। চোর পালালে আসলেই বুদ্ধি বাড়ে। নাম্বারটা সেভ করে রাখলেই হতো। বয়সের সাথে মানুষের স্মৃতিশক্তি দুর্বল হয়ে যেতেই পারে। যেমন কমে যেতে পারে স্বাস্থ্য। এই জন্যই সারা ঢাকা শহরের ৫-৬ টা জিপি কেয়ার সেন্টার ঘুরেও মতিন প্রমাণ করতেই পারলো না ০১৭৩৬****** নাম্বারটার প্রকৃত মালিক সে। একবার জিপির ওপর মেজাজ খারাপ হয়, তো আরেকবার নিজের চুল ছিঁড়তে মন চায়। কিছুতেই ওরা বুঝলোনা ০১৭৪৮****** নাম্বারটা কোনোভাবে খুঁজে পেয়ে গেলেই ৮ জুলাই, ২০১২ প্রথম প্রেম প্রায় হয়ে যায় মতিনের। যাই হোক, তা আর হয়নি। চিন্তাধারা সবসময় মিলে গেলে সেটা হয় বাংলা সিনেমা। জীবনটা সিনেমা হলে হয়তো বেশ হতো! আফসোস, ফ্যান্টাসি দিয়ে জীবন চলেনা। মতিনের জীবনের পরবর্তী কয়েকটা দিন চলেছে সিমুর সাথে নাসরিনের স্মৃতিচারণ করে। তারপর মোড় নিয়েছে নতুন পথের দিকে। আমরা জেনে গেছি সে পথে হাঁটতে হাঁটতে একসময় আবার দেখা হয়ে গেছে তাদের দুজনের। কিন্তু এবার পরিস্থিতি আর বাস্তবতা অনেকখানি ক্রিয়াশীল। চলুন দেখে আসি সেই ক্রিয়াশীল বাস্তবতা...
৩...
দুই মাস পরের কথা। বেশ কিছুদিন ধরেই একটা আননোন এয়ারটেল নাম্বার মতিনকে খুব মিস করছে। ঠিক ততোটাই, যতোটা মতিন মিস করছিলো নাসরিনকে। জিপি থেকে অন্য অপারেটরে কল করা ছোটখাটো বোকামি না। পাঁচ-সাতদিন নিরুত্তর থেকে শেষমেশ মতিন একরকম বিরক্ত হয়েই কলব্যাক করলো এশাকে। কিন্তু এশার অ্যাপ্রোচে একইসাথে মুগ্ধ এবং হতভম্ব হলো। ফল যা হবার তাই। ফ্রেন্ডশিপ করার ফন্দি দিয়ে প্রেমযমুনা দেখিয়ে ফেললো এশা মতিনকে। সে যমুনার জল ঘোলা হতে হতে এতোটাই জমাট বেঁধে গেলো যে, সেই বরফ কেটে মতিন আর নাসরিনের মুখদর্শন করতে পারলোনা বহুদিন। লোহা বেকার পড়ে রইলে তাতে অবশ্যই মরিচা ধরবে। সে নিয়মে নাসরিনকে একরকম ভুলেই গেলো সে। নাসরিনও পরীক্ষা-পরিবার ইত্যাদি ইত্যাদি হাজারো পরির পরিমণ্ডলে আটক হয়ে মতিনকে মোটামুটি ভুলে রইলো।
মতিন-এশা ততোদিনে পরস্পরের বাধ্য এবং ভক্ত বিএফ-জিএফ। তাই একজন অন্যজনকে এর-ওর সাথে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে হুটহাট। হারানোর ভয় থাকলে অবশ্যই দিতো না। তারা এমনি সুস্থির বিশ্বাসবন্দি জুটি। সেটাই কাল হতে পারতো। অবশেষে হয়নি। প্রেম এমনি অরাসায়নিক শক্তি, যার বন্ধন অতি উচ্চ গলনাঙ্কের জৈব যৌগের বন্ধনশক্তিকেও হার মানায়।
এশার পক্ষ থেকেই এমন পরিচয় করানোটা বেশি হতো। ওর বাবা স্থানীয় একটা কলেজের গণিত শিক্ষক। ঘটনা অথবা দুর্ঘটনাক্রমে ওর ইমিডিয়েট জুনিয়র নাসরিন গালিবউজ্জামান স্যারের কাছে যাবতীয় গাণিতিক সমস্যা সমাধান করতে আসতো। সেই সূত্রে নাসরিন আর এশা পরস্পরের পরিচিতা। সেই পথ বেয়েই চূড়ান্ত সমস্যায় উপনীত হলো নাসরিন। হয়তো মতিনও।
মতিনের অনুপ্রেরণায় প্রতিবছর দু-একজন করে ছাত্র-ছাত্রী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পায়, যদিও এশা সে দলের না হয়ে ইডেন কলেজে ভর্তি হয়েছে। মতিনের বিষয়টা এশা জানতো। নাসরিনও যে জানতো না তা না। তারপরও যখন সেই বিবেচনায় এশা তাকে বললো, ‘আজ তোমাকে তোমার জিজুর সাথে পরিচয় করিয়ে দেবো, ও তোমাকে অনেক হেল্প করবে, দরকারি সাজেশন দেবে’; নাসরিন বুঝতে পারেনি তার জিজু যে তারই ক্র্যাশ।
নিস্ক্রিয়তায় হারানো প্রিয়জনের মুখোমুখি হওয়া সম্ভবত জীবনের কঠিনতম কাজগুলোর একটা। সেই ঘোরেই হয়তো দশ মিনিট চুপচাপ ছিলো মতিন আর নাসরিন এশার সামনে। ওদের দুজনের বিব্রত ভাব দেখে এশা নিজেও খানিকটা বিব্রত হলো। ছোঁয়াচে রোগাক্রান্ত রোগীর মতো ঠিক।
৪...
ফেসবুকে না, এবার আহাম্মকের মোবাইলে মেসেজ পাঠালো নাসরিন, Apni ki oi jaygatay abar aste paren kal ekbar? Eka….. pls… r konodin aste hobena. Ekbar shudhu. Mone thake jeno…. Eka……
সেই মেসেজটার প্রায় অনুরূপ একটা ইনভাইটিং মেসেজ। এবার মতিন দেখা করলো।
-এটা আপনি কী করলেন?
-কোনটা বলো তো!
-আমাকে এতোবড় একটা ধাক্কা দিলেন?
-কতোবড়?
-আমি আপনাকে ভালোবাসি।
-আরও একজন বাসে, খারাপ না, ভালোই বাসে সেও।
-আমি ওসব জানিনা।
-তাহলে আমার কী করার?
-একই প্রশ্ন আমিও ত আপনাকে করছি।
-শুনতে পাইনা।
-আমার দীর্ঘশ্বাস আকাশ-বাতাস সবাই শুনতে পায়, আর আপনি মানুষ। মানুষ সব পারে।
-শুধু পারেনা এক মন দুজনকে দিতে। একটা দীর্ঘশ্বাস আজীবন বুকে চেপে রাখতে। আমি একটু বাঁচতে চেয়েছিলাম। তাই ‘মন ধরে রেখে কার আশায় বাঁচবো’ ভাবতে বাধ্য হয়েছি। এখন তুমি যাও। আর ভালো থেকো খুব। শুভ কামনা...
পুনশ্চঃ
দীর্ঘশ্বাস কাউকে ছাড়েনা। বিজয়ী হোক, হোক সে পরাজিত। প্রেম এমন এক অনুভূতি যে সময়ে দাম না পেলে কারো জন্যই বসে থাকেনা। উপহার হিশেবে রেখে যায় স্মৃতির থলেভর্তি দীর্ঘশ্বাস।
©somewhere in net ltd.