| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
১.
রাত ১০:৩০।
গত কয়েকদিনের ভ্যাপসা গরম আজো বোধ হয় কাটবে না। বাহিরটা গুমোট হয়ে আছে, আকাশে লালচে মেঘের দল অস্থির হয়ে ছুটে বেড়াচ্ছে। কালো ভারী মেঘের দল সরে সরে যাচ্ছে।জৈষ্ঠ্যের শেষ অথচ এক ফোঁটা বৃষ্টির দেখা নেই।
কেবিন নং ১৩। মেডিক্যাল কলেজ।
ঘরটিতে তিনদিন আগে একজন রোগী ভর্তি হয়েছেন। নারী, বয়স আন্দাজ ৩০-৩২, ছিমছাম, শ্যামাঙ্গী। একটু পরই তাঁকে অপারেশন থিয়েটারে নেওয়া হবে। ডাক্তাররা আজ শেষ চেষ্টা করবেন। ধর্ষণ কেসের রোগী, হাসপাতালে ভর্তি করার পর পরই ডাক্তাররা তাঁদের দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় বুঝে নিয়েছিলেন আঘাত এতটাই মারাত্মক যে রোগীর বাঁচার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।
ডাক্তারদের অবাক করে দিয়ে ভদ্রমহিলা তিনদিন বেঁচে রইলেন, যদিও অবস্থার অবনতি ঘটেছে।এর আগে একদফা অপারেশন হয়ে গিয়েছে, আজ শেষ চেষ্টার পালা।
রোগীকে অপারেশন থিয়েটারে স্থানান্তর করা হয়েছে।এই কেসের জন্য গঠিত বোর্ডের প্রধান ডাক্তার অবনী বসু তাঁর দল নিয়ে ওটি তে প্রবেশ করলেন। সকলে প্রস্তুত হয়ে নিলেন, ৫ মিনিটের মধ্যে অপারেশন শুরু হবে।
পরবর্তী দু'ঘণ্টা ব্যাপী অপারেশনের মোড়কে চললো যমে-মানুষে টানাটানি। রোগীর শরীরের সমস্ত পাশবিক আঘাতের দাগ প্রমাণ করে দিচ্ছিল মানুষের আদিম বর্বর রক্তের প্রবাহকে, আর ডাক্তার বসু শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরেও হয়ে উঠছিলেন আরো বেশি ঘর্মাক্ত।
চিকিৎসকদের সমস্ত চেষ্টা ব্যর্থ করে রোগী মারা গেলেন রাত্রি দুটোয়। ডাক্তার বসু অপারেশন থিয়েটার থেকে বেরিয়ে এসে রোগীর আত্মীয় স্বজনের খোঁজ করতে লাগলেন। এক ভদ্রলোক এগিয়ে এলেন। ডাক্তার বসু জিজ্ঞেস করলেন,"আপনি রোগীর কে হন?"
- জ্বি আমি রোগীর কেউ হই না, কিন্তু আমিই ওনাকে ভর্তি করিয়েছি। কিছু কী হলো?
ডাক্তার বসু ভদ্রলোকের আপাদমস্তক দেখলেন- কালঘেঁষা হালকা গোঁফ দাড়ি ওয়ালা মাঝারি উচ্চতার বৈশিষ্ট্যহীন চেহারা। ডাক্তার বসু মুহূর্তক্ষণ থেমে বললেন, "দেখুন, রোগী মারা গিয়েছেন কিছুক্ষণ আগে। রেইপ কেস, থানা পুলিশের ব্যাপার আছে। রোগী সম্পর্কে কোনো কিছুই কী জানেন না? আর কীভাবে পেলেন তাঁকে?"
-গত ২২ তারিখ রাত আনুমানিক ১১:৩০ টার দিকে আমি গাড়ি চালিয়ে বাসায় যাচ্ছিলাম। বাসার প্রায় কাছাকাছি পৌঁছেছি,১৫ মিনিটের দূরত্ব হবে, একটা নতুন তৈরি হতে থাকা বিল্ডিংয়ের সামনে নিথর কী যেন পড়ে থাকতে দেখলাম। জায়গাটা একটু নির্জন, চারিদিকে তেমন আলো ছিল না, মানুষও দেখিনি, আর বুঝতেও পারছিলাম না যে সেটা মানুষ না অন্য কিছু। একটু এগিয়ে হেডলাইটের আলোয় দেখলাম নীল জামা পরা এক মহিলা পড়ে আছেন, যদিও তাঁর অবস্থা পুরোই বিধ্বস্ত ছিল- জামাকাপড় ছেঁড়া, চুল উষ্কখুষ্ক, ঠোঁটে জমাট রক্ত, অচেতন। এক মুহূর্ত দ্বিধা করলাম, পরেই মনে হলো বাঁচার সম্ভাবনা থাকতে পারে, ঝামেলার ভয়ে যদি হসপিটালাইজ না করি, মারা যেতে পারেন। এই ভেবে নিয়ে এলাম। আশেপাশে আর কাউকে দেখিনি, হয়তো মৃত ভেবে এঁকে ফেলে পালিয়েছে।
ডাক্তার বসু কিছুক্ষণ নীরব হয়ে রইলেন। ফের জানতে চাইলেন, "এঁর পরিচয় পাবার মত কিছু কী পেয়েছেন? আইডি কার্ড, মোবাইল ফোন..."
- আশেপাশে খুঁজেছিলাম, কিছুই পাইনি, ব্যাগ পর্যন্ত না।
"হুম", ডাক্তার বসু চিন্তিত গম্ভীর ভাবে বললেন, "তাহলে হয়তো দু'চারদিন পুলিশের তৎপরতা থাকবে, তারপর আবার সব যেই কে সেই হয়ে যাবে। বেওয়ারিশ লাশ, ব্যবস্থা করতে হবে এখন। আচ্ছা, আপনি এখন যেতে পারেন, পরে প্রয়োজনে জানাব।"
ভদ্রলোক মুহূর্ত ক্ষণ ইতস্তত করলেন। তারপর বললেন, "আপনি যদি কিছু মনে না করেন, একটা অনুরোধ করতে পারি? যদিও জানি না সেটা আইনসংগত কিনা।"
ডাক্তার বসু ঈষৎ বিস্মিত হয়ে বললেন, "কী অনুরোধ?"
- আমি যদি আমার ধর্মমতে মহিলাটির লাশের শেষ ব্যবস্থাটুকু করি, অনুমতি দেবেন?"
ডাক্তার বসু বিস্মিত অবস্থাতেই বললেন, "এমনটা আজকাল কেউ করে না, এক অপরিচিত মহিলা...বেশ, অটোপসি টা হোক, আনুষঙ্গিক ঝামেলা গুলো মিটে যাক...দেখছি।"
ভদ্রলোক খুশি হয়ে বললেন, "অনেক ধন্যবাদ আপনাকে স্যার। একটু দেখবেন। মহিলাটিকে আমি চিনি না, কিন্তু বিদায়ের বেলায় প্রতিটি মানুষেরই শেষ যত্ন আর মর্যাদা পাবার অধিকার থাকে...ব্যবস্থাটা করে দিতে পারলে অশেষ কৃতজ্ঞ থাকবো আপনার কাছে।"
ডাক্তার বসু একটু হেসে ফের ওটি'র পথ ধরলেন। আর ভদ্রলোক হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে এলেন...
২.
...আমি শ্রবণা মিত্র , একটু আগেই হাসপাতালের করিডোরে ডাক্তার বসু আর ঐ ভদ্রলোকটির কথোপকথন শুনছিলাম। আরো কত লোক গিজগিজ করছিল, সরকারি হাসপাতালে যা অবশ্যম্ভাবী; কত লোকের কত রোগ-শোক-দুঃখ সবটাই দেখছিলাম,শুনছিলাম। কিন্তু বিশেষ ভাবে শুনছিলাম এই দুই ভদ্রলোকের কথা, কারণ,তাঁরা যে আমাকে নিয়েই কথা বলছিলেন।
একটু আগে ঐ খাঁচাটা থেকে বেরোলাম। খাঁচাটার একটা নাম আছে- শরীর। আহ, কী যে সুখ হচ্ছে আমার! ঐ এক খাঁচার ভেতর আছে মস্তিষ্ক, আছে হৃদয়- সব, সব কিছু থেকে এদ্দিনে মুক্তি মিললো!
বের তো হলাম, এখন কী করবো তাই ভাবছি। পর্ণার কাছে যাবো? নাকি আমার প্রাক্তনের কাছে? নাকি শেষ পর্যন্ত যার প্রেমে পড়েছিলাম সেই অনিন্দ্য'র কাছে? যার কাছেই যাবো, পরিষ্কার জানি সে-ই ঘাবড়ে যাবে। কারণ, আমার যে আর শরীর নেই, সুতরাং ঠোঁটও নেই; তাই কথা বলতে গেলে যে কায়াহীন ঠোঁটহীন ভাবে কথা বলতে হবে!
থাক, কথা বলবার প্রয়োজন নেই। তার চেয়ে ভেসে বেড়াই খানিক। ৩ দিন আগেই আমার শরীরটা কেটে ছিঁড়ে রক্তাক্ত করে দিয়েছিল কারা যেন- অমানুষিক হিংস্রতায়। আমার এই আমিটা, এই যে যাকে লোকে আত্মা বলে- এটা ছটফট করছিল। কেন করছিল? কারণ এই আত্মা ক্লান্ত হয়েছিল বহু আগেই, হাসপাতালে ভর্তির পর যখন আমার শরীরটা মরোমরো হলো, তখন শুধু চাইছিল তাড়াতাড়ি অব্যাহতি। আজ তিনদিন পর সেই সৌভাগ্য হলো আমার।
আজ বড় ফুরফুরে লাগছে, আনন্দ হচ্ছে। একলা একলা কথা বলতে ইচ্ছে হচ্ছে। হ্যাঁ, আমি এখন তা-ই করবো। কথা বললেও কেউ শুনবে না, কেউ বুঝবে না- আমি তাই আরাম করে নিজেকেই নিজের কথা শোনাতে পারবো।
তার আগে একটা কোথাও চুপটি করে বসা দরকার। আমি আমার সেই পুরোনো ছাদটায় যাব, আমার পুরোনো বাসার ছাদে। আমরা থাকতাম সেখানে- আমি, মা, বাবা আর আমার ভাই অরূপ।
আমি নিয়ম করে সেই ছাদে বেড়াতাম; আকাশের দিকে, চাঁদের দিকে, তারার দিকে হাঁ করে চেয়ে থাকতাম আর উল্টোপাল্টা হিজিবিজি ভাবতাম। কী ভালো ছিল দিনগুলো!
ছাদটার কথা ভেবেই মনটা এত খারাপ হয়ে গেছে! এক্ষুনি যেতে হবে আমায়, নইলে বড় দেরি হয়ে যাবে; আমার যে সময় বড় অল্প...
৩.
আমার ছাদে এসে পৌঁছেছি মাত্র- আমার সেই ছাদ! আমার শৈশবে যেখানে প্রথম ছায়াপথ দেখেছিলাম, সপ্তর্ষিমণ্ডল দেখে হাঁ করে চেয়ে ছিলাম, যে ছাদে চাঁদ দেখে প্রথম তারুণ্যে কবিতা লিখেছিলাম- সেই ছাদ।
কতদিন এ ছাদের এক কোণায় বসে দুঃখ পেলেই একা কেঁদেছি- সে সব দিনের সাক্ষী তো কেবল এই ছাদ আর মাথার ওপরের ঐ শেষ না হওয়া আকাশটাই!
কিন্তু সে কথা যাক।
ছাদের কার্নিশে এসে বসেছি, এই মুহূর্তে কেউ নেই। রাত কত হবে? হয়তো দেড়টা-দুটো। পূর্ণিমা বোধ হয় আজ, পুরো ছাদ আলোর বানে ভেসে গেছে।সমস্ত ছাদে আমি একা! কতদিন এমন করে ছাদটাকে চেয়েছিলাম, কখনো পেয়েছি, কখনো না। আজ নিশ্চিন্তে পেয়েছি।
অনেক কথা মনে পড়ছে আজ। অনেক গল্প, অনেক কথা, অনেক হাসি, অনেক কান্না- অনেক কিছু!
সেদিনের কথা মনে পড়ছে যেদিন প্রথম এই বাসাটায় এলাম- মা-বাবার হাত ধরে গুটগুট করে। অরূপের বয়স তখন ১ বছর মনে হয়, আমি পাঁচে পড়েছি। নতুন বাসায় উঠলাম, কী আগ্রহ-আনন্দ বাসাটা ঘিরে! ড্রয়িং, ডাইনিং, দুটো বাথরুম, দুটো বেডরুম- প্রথম দিনে সব শুধু ঘুরে ঘুরে দেখেছি আর মুগ্ধ হয়েছি। আমাদের নতুন বাসা!
বাসায় ওঠার পর কয়েকদিন ধরে মায়ের সে কী গোছানোর হিড়িক! বাবা আর মা মিলে ঘর গোছাতেন আর আমি অরূপকে নিয়ে এ ঘর থেকে ও ঘরে ঘুরে বেড়াতাম।
ছোটবেলায় ছাদটাতে বড় একটা আসা হতো না। প্রথম আসতে শুরু করলাম বোধহয় ক্লাস ফাইভে পড়াকালীন সময়ে। ক্লাসটা কেমন মনে আছে এখনো, এই মৃত্যুর পরেও- অদ্ভুত না?
তখন বাবার সাথে আসতাম। বাবা আমায় আকাশের গল্প শোনাতেন, রাতের আকাশে ছায়াপথ দেখাবার চেষ্টা করতেন- যদিও শহরের আলোয় সবসময় দেখতে পেতাম না। বড় হবার পর সে দিনগুলো মনে পড়লে যেমন ভীষণ আনন্দ হতো, তেমনই হঠাৎ মন কেমন করতো। তরুণীকালে কত রাত ছাদে এসেছি, কিন্তু সেইসব একাকী রাত হার মেনে যেত আমার শৈশবের বিস্ময়মাখা রাতগুলোর কাছে, বাবার হাত ধরে অবাক বিস্ময়ে আকাশের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকার আনন্দের কাছে।
আচ্ছা, মৃত্যুর পরও কী কান্না পায়? অন্যদের কথা তো কিছু জানি না, আমার পাচ্ছে; মৃত্যুর পরও আমার অসম্ভব কাঁদতে ইচ্ছে করছে। চোখের জল তো আর এখন নেই, শুধু একটা কেমন বাষ্প এই অশরীরী ফুরফুরে আমায় ভারী করে দিতে চাচ্ছে। তবে আজ আমি আর নিজেকে ভারী হতে দেবো না। আজ আমার অনেক স্মৃতি হাতড়ে বেড়িয়ে জীবনের সাথে শেষ বোঝাপড়াটা করে নিতে হবে, সমস্ত আনন্দ-বেদনার হিসেব মিটিয়ে দিতে হবে...
৪.
স্কুল-কলেজের জীবনটা নির্বিবাদে নিরীহ ভাবেই কেটে গেল। পড়াশোনা, কালচারাল একটিভিটি নিয়ে পড়ে থাকতাম সারাদিন। চাপা প্রকৃতির ছিলাম, মানুষের সাথে মেলামেশা তেমন ছিল না। আর দশটি শহুরে শিশুর মতো করেই বড় হয়েছি। স্কুল আর বাসা, পরীক্ষা আর গানের রিহার্সাল আর দু'চারজন হাতে গোনা বন্ধু- এই নিয়েই গড়েছিলাম আমার সেই জীবনস্বর্গটা।
কলেজ পেরোলাম, ভালো একটি রেজাল্ট আর একবুক স্বপ্ন নিয়ে এলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। আকাশের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকার স্বভাব, কবিতায় আর্দ্র হয়ে ঘুমোবার অভ্যাস- ইংরেজি সাহিত্যে ভর্তি হলাম। এতদিনের রুটিন বাঁধা জীবন, চেনা ছোট্ট গণ্ডির বাইরে বেরিয়ে একটা মুক্তক্ষেত্রে নতুন অধ্যায় শুরু হলো।
এই মুক্তক্ষেত্রেই আমার চূড়ান্ত স্বর্গ রচিত হতে পারতো।
হলো না।
ফার্স্ট ইয়ারের শেষাশেষি একটি ছেলের প্রেমে পড়ি; একই ডিপার্টমেন্ট, এক বছরের বড়। হয়তো সেও পড়েছিল, অন্তত তার আচরণে তাই মনে হয়েছিল! প্রেমটা শুরু হলো-আমার প্রথম সম্পর্ক, প্রথম প্রেম; আবেগের চূড়ায় অধিষ্ঠান হয়েছিল। সে আমায় স্বপ্ন দেখালো; নিজের উচ্চাকাঙ্ক্ষা আর অমরত্বের স্বপ্ন বাদে অন্য যে স্বপ্ন কখনো দেখার কথাই ভাবিনি, সে তা-ই দেখালো- দু'জনের এক সংসার, হাজার বসন্ত একসাথে পাড়ি দেয়া...আজ ভাবতে বড় অদ্ভুত লাগছে!
সম্পর্কের দেড় মাসের মাথায় গণ্ডগোল শুরু হলো। একসাথে বেড়াতে যেতাম- কখনো রেস্তোরাঁয় তো কখনো লেকের ধারে। শুরুর দিকের সেই হাত ধরাধরি, ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলা- সব ফিকে হয়ে যেতে লাগলো। কতদিন এমন গিয়েছে, সে তার ফোন নিয়ে ব্যস্ত আর আমি তার পাশে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে বসে আছি।মাঝে মাঝেই জানতে চাইতাম ব্যস্ততার কারণ। শুরুতে উত্তর দিত না, শুধু বলতো, "আমার ব্যক্তিগত ব্যাপারে নাক গলিও না"। আমিও সেটা মেনেই নিয়েছিলাম-হাজার হোক, প্রথম প্রেমের প্রথম বানভাসি আবেগ; সে আবেগ আর শারদ প্রাতের ঝরে পড়া শিউলীর পবিত্রতায় যেমন ফারাক নেই,তেমনই এ দু'য়ের সমর্পণও খানিকটা বেশিই প্রবল। কিন্তু, জবায় যেমন দুর্গার পূজো হয় না, তেমনই ভুল পাত্র নিখাদ প্রেম ধারণ করতে চায় না।
যাই হোক, যা বলছিলাম। শুরুর সেই উদাসীনতা ক্রমে রূপ নিলো হিংস্রতায়। সম্পর্কের বয়স যখন আড়াই মাস- তখন এই ক্রমবর্ধমান অবহেলার জবাব দিতে শুরু করলাম। শুরুতে যেখানে প্রতি ঘণ্টায় ফোন না করলে প্রাণ আঁকুপাঁকু করতো, তখন সেটা একদিনে পরিণত হলো। কিন্তু, দিনে অন্তত একটিবার ফোন না করে থাকতে পারতাম না- তার কণ্ঠে যেন আমি আমার প্রাণ গচ্ছিত রেখেছিলাম। সারাদিন ফোন না করতে পেরে ভীষণ কষ্ট হতো,তবুও, সব ভুলে যেতাম রাতের একটিমাত্র কলে, যেটা স্থায়ী হত বড়জোর ৫০ সেকেণ্ড, টেনেটুনে ১ মিনিটের একটু বেশি। সেই একটুখানি কথায় মিশে থাকতো তার রাজ্যের বিরক্তি, অবহেলা-অবজ্ঞা। কিন্তু, কী আশ্চর্য, তারপরও প্রতিদিন একবার তাকে কল করার অভ্যাস ছাড়তে পারলাম না। এভাবে কাটলো আরো অর্ধেক মাস।
তিন মাস বাদে হিংস্রতা প্রথম মূর্তি গ্রহণ করলো। একটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের লক্ষ্যে সে আর আমি দেখা করলাম। রেস্তোরাঁয় খাবার অর্ডার দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, "শ্রেয়ান, তুমি কী চাইছো খুলে বলবে?"
- দেখো শ্রবণা, আমি এই সম্পর্কটা থেকে বেরিয়ে আসতে চাচ্ছি। আজ তোমার সাথে দেখা করতে রাজি হয়েছি কেবলমাত্র এই কথাটা স্পষ্ট ভাবে বলে দেবার জন্য।
- কিন্তু , তুমি প্লিজ বলবে কেন এটা চাইছো? জানাটা জরুরি।
- আমি এটাই বুঝতে পারছি না আমার কন্টিনিউয়াস ইগ্নোরেন্স সত্ত্বেও তুমি কেন বারবার ফোন করে আমাকে বিরক্ত করছো। দেখো, তোমায় আর ভালো লাগে না। কারণ জানতে চাইছিলে, এটাই কারণ।
- কিন্তু ভালো না লাগার কারণটা কী শ্রেয়ান? তুমি বলো প্লিজ, দেখো, আমি ঠিক করে নেব সব।
এই মুহূর্তে ওর ফোনটা বেজে উঠলো। ফোনস্ক্রিনটা আমার দিকেই ফেরানো ছিল, চোখে পড়লো একটি লাস্যময়ী তরুণীর ছবি, খেয়া নামে সেভ করা। শ্রেয়ান তাড়াতাড়ি ফোনটা তুলে নেবার চেষ্টা করতেই আমি ছোঁ মেরে তুলে নিলাম সেটা। ফোনটা কেটে তাকালাম ওর দিকে। ফোনটা খানিক ঘাঁটতেই বেরিয়ে এলো অনেকগুলো মেসেজ- বিভিন্ন লাস্যময়ীর সাথে কথোপকথন, গা ঘিনঘিন করে ওঠা ভাষায়।
ইতিমধ্যে শ্রেয়ান আমার হাত থেকে ফোনটা কেড়ে নেবার চেষ্টা করে করে অবশেষে সফল হলো। কেড়ে নিয়ে সে আমার দিকে যে দৃষ্টিতে তাকালো- আহত বাঘের দৃষ্টিও বুঝি তত হিংস্র হয় না। আমার চোখ বেয়ে নেমে যাচ্ছিল বাঁধ না মানা অশ্রুবন্যা, অথবা বলতে পারি, রক্তবন্যা।
শ্রেয়ান দেরি করেনি, মুহূর্তের মধ্যে সামনে সাজিয়ে রাখা একজোড়া কাঁটা চামচের একটি তুলে নিয়ে আমার বাঁ হাতে বসিয়ে দেয়। একেবারেই প্রস্তুত ছিলাম না, হাতের ভেতর চামচটি অনেকখানি গেঁথে যায়। আমার আর্তচিৎকারে আশপাশের মানুষেরা চমকে উঠে তাকায় আমাদের টেবিলের দিকে। ওয়েটার পড়িমরি করে ছুটে এসে আমার হাতের অবস্থা দেখে দৌড়ে ম্যানেজারকে খবর দেয়। ইতিমধ্যে শ্রেয়ান গটগটিয়ে হেঁটে বেরিয়ে যায় রেস্তোরাঁ থেকে, আমি কান্না-অপমান-লজ্জায় মাখামাখি হয়ে চেয়ে থাকি সেদিকে...
৫.
...চাঁদ হেলে পড়ছে ক্রমশ। একটি রাতজাগা পাখি মাথার ওপর দিয়ে উড়ে চলে গেল । সমস্ত শহর শুনশান, নিঝুম। একটি ট্রাক হর্ন বাজিয়ে চলে গেল পেছনের রাস্তা দিয়ে। কার্নিশের উল্টোদিকে কয়েকটা তৈরি হতে থাকা নতুন দালানের কঙ্কাল দাঁড়িয়ে আছে, আমার কৈশোর পর্যন্ত এদের দেখা পাইনি। শহরটা মরে যাচ্ছে...
কার্নিশ ছেড়ে এগিয়ে গেলাম ছাদের মাঝখানটায়। সময় বড় কম, ভোর হতে হয়তো আর এক-দেড় ঘণ্টা বাকি। এর মাঝেই আমার সমস্ত স্মৃতির ভাণ্ডার উজাড় করে পৃথিবীর বায়ুস্তরে রেখে যেতে হবে; নইলে যে মুক্তি মিলবে না আমার, আকাশের নীলে মিশে যাবার অনুমতি পাবো না!
সেদিন শ্রেয়ান রেস্তোঁরা থেকে বেরিয়ে যাবার পর আমি পর্ণাকে ফোন দেই, সেখান থেকে হাতে ব্যাণ্ডেজ বেঁধে বাসায় আসি। পথেই পর্ণাকে সবকিছু খুলে বলি, বাসায় পৌঁছে দেবার পর পর্ণাই পুরো পরিস্থিতি সামাল দেয়।
শ্রেয়ানের সাথে সম্পর্ক শেষ হওয়ার পর সাত মাস কেটে গেল। এই সাত মাস যেন সাত শতাব্দী হয়ে চেপে বসেছিল বুকের ওপর। দিনের কর্মব্যস্ত আলো চাপা দিয়ে রাখতো সবকিছু, কিন্তু রাত যত পাল্লা দিয়ে বাড়তো ততই যেন আঁধারের ভয়াবহ থাবা হৃদয় খুঁড়ে বের করে আনতো সমস্ত বেদনা, অপমান, লজ্জা, ক্রোধ। রাতের পর রাত কেটেছে ঘুমহীন, অন্ধকার ঘরে বিছানায় বসে হাঁটুতে মুখ গুঁজে কেঁদে। আমার সেসব রাত্রিযাপনের খবর পৃথিবী জানতো না, আজ পৃথিবীর বাতাসে রেখে গেলাম সেসব স্মৃতির বোঝা।
সাতটি মাসের এই অসহ্য শীতল মাঘ যাপনের পর আবার ফাগুন এলো। এবার এক সহপাঠী, নাম অনিন্দ্য ডি'সুজা। প্রগাঢ় বন্ধুত্ব দিয়ে শুরু, কথা হতো প্রায় রোজই- মেসেজে, মুখোমুখি। তার অনেক ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ,বিচার-সিদ্ধান্ত আলোচনা করতো আমার সাথে, কতবার তর্কও হয়েছে কথায় কথায়। তার হাবেভাবে মনে হতো যেন আকর্ষণ আছে, কতবার নিজে থেকে দেখা করতে চেয়েছে আমার সাথে, একান্তে। কথা বলতে বলতে মনে হতো সে-ই যেন আমার 'সে'!
ভাবছি আর হাসছি। ভীষণ হাসি পাচ্ছে এখন, আজকের এই রাতে। শুধু মনে হতো আর মনে হতো! এই 'মনে হতো'র ফাঁদে পড়েই আরো একবার প্রেমে ডুবলাম, আর তারপর একদিন হঠাৎ প্রসঙ্গ থেকে প্রসঙ্গাতরে যেতে যেতে মুখ ফুটে বলে ফেললাম ভালোবাসার কথা।
"And then they started living happily ever after..."
কী গো পৃথিবী, তাই মনে হচ্ছে বুঝি? ওহো, ভুলেই তো গেছিলাম, তুমি তো জানোই যে তারপর অনিন্দ্য প্রত্যাখ্যান করেছিল, বলেছিল, "দ্যাখ শ্রবণা, দুজনের ধর্ম ভিন্ন, এ হয় না। বন্ধু আছি, বন্ধুত্বই ভালো, এর বেশি চাইতে আসিস না।"
আমি শেষ একটা চেষ্টা করতে চাইলাম, বললাম,"অনি, একেবারেই কী হয় না? কতই তো ভিন্ন ধর্মের মানুষ বিয়ে করে, ভেবে দ্যাখ না একবার!"
- আমার পক্ষে সম্ভব নয়। এটা নিয়ে আমি আর কোনো কথা বলতে চাই না।
কান্নায় ভেঙে পড়ে বললাম, "তোকে ভালোবাসি, অনি। একটিবার ভেবে দ্যাখ। আজই কিছু জানাতে হবে বলছি না, সময় নিয়ে ভেবে দ্যাখ প্লিজ!" থরথর করে শরীর কাঁপছিল আমার, দু'হাতে মুখ ঢেকে ফেলেছিলাম।
- দ্যাখ তুই আমায় ভালোবাসলে সেটা তোর সমস্যা, আমার তো ইন্টারেস্ট নেই!
আমার সমস্ত পৃথিবী যেন ধ্বসে গেল। লেকের ধারে বসেছিলাম, চিৎকার দিয়ে বলে উঠলাম, "তাহলে কেন আমার এতটা কাছে এলি তুই?"
- যেটুকু যা তোকে বলেছি, যা করেছি সবকিছু বন্ধুর কর্তব্যেই করেছি। তুই সেটা অন্যভাবে নিলে তাতে আমার কিছু করার নেই!
এটুকু বলেই অনিন্দ্য আর দেরি করেনি, ঠিক শ্রেয়ানের মতো করেই গটগটিয়ে চলে গেল, একটিবার পেছন ফিরে তাকালো না।
এবারেও আমি শুধু চেয়ে রইলাম, কান্নায় ভিজে, আমার ভেতরের শ্রাবণধারায় ভিজে...
৬.
অনিন্দ্যের প্রত্যাখ্যানের পর কেটে গেছে তিনটি বছর। ইতোমধ্যে মাস্টার্স শেষ করে একটি প্রাইভেট ব্যাংকে চাকরি জীবন শুরু করেছি, আর টুকটাক করে লেখালেখির কাজ চালিয়ে যাচ্ছি, বিভিন্ন বই এর রিভিউ অনলাইনে প্রকাশ করছি। দাঁড়াতেই হবে- এই একটি মন্ত্র কানে বাজে সর্বক্ষণ।
অনিন্দ্যের সাথে সেই ১২ জুলাই আমার সর্বশেষ একান্তে কথা হয়েছে। সেদিন আর কাউকে ফোন দিইনি, রিকশা ধরে একাই বাসায় এসেছি। সমস্তটা পথ কান্না আটকাবার প্রবল চেষ্টা করতে করতে গুমরে কেঁদেছি, বাসায় এসে চোখমুখ ধুয়ে খাওয়া দাওয়া করে নিজের ঘরে গিয়ে দরজা আটকে আলো নিভিয়ে ঘর আঁধার করে কেঁদেছি। অদ্ভুত একটা ইচ্ছে হচ্ছিল তখন- ইচ্ছে হচ্ছিল বাবাকে দু'হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদি। ঠাণ্ডা-সর্দি ছিল, রাতে হঠাৎ জ্বর চলে এলো। যা হোক, মা-বাবার যত্নে সেটা আর বেশি বাড়তে পারেনি, পরের দিনই ঠিক হয়ে গেছিলাম।
কিন্তু, একটি ছেদ পড়ে গেল- ছেদটা পড়লো আমার আর অনিন্দ্যের বন্ধুত্বের স্বাভাবিকতায়। সেই ঘটনার পরও আমি চেয়েছি আমাদের বন্ধুত্বটুকু থাক, কিন্তু অনিন্দ্য আমায় এড়িয়ে চলা শুরু করলো। ধীরে ধীরে আমাদের যোগাযোগ কমতে লাগলো। প্রায় আট মাস পর জানতে পারলাম অনিন্দ্য একটি সম্পর্কে আছে। আমাদের যোগাযোগ সেই থেকেই নেই হয়ে গেল, শুধু সহপাঠী হবার সুবাদে আরো দু'বছর তাকে চোখের সামনে দেখতাম। প্রেমের রেশ রয়ে গিয়েছিল আরো প্রায় পাঁচ-ছ'মাস, ততদিন যতবার ওকে দেখেছি বুকে যেন নদীর ছলাৎ ঢেউ এর মতো কিছু একটার অস্তিত্ব অনুভব করেছি। তারপর, যেদিন ওর সম্পর্কের কথা জানলাম, সেদিন আর কাঁদিনি। কান্নার জল শুকিয়ে গিয়েছিল, কাজেকর্মে নিজেকে ডুবিয়ে দিয়েছিলাম।
চাকরিতে ঢোকার পর ব্যস্ততা বাড়ল- অফিসের চাপ, সাথে লেখালেখি। মন্দ কাটছিল না জীবনটা। অফিসের সবার সাথে কাজের ফাঁকে ফাঁকে গল্প-আড্ডা, এর ওর বাসায় বেড়ানো বা একসাথে অনেকে মিলে রেস্তোরাঁয় খেতে যাওয়া, মাঝে মাঝে শহরের বাইরে গিয়ে সপ্তাখানেক বেড়িয়ে আসা, পুরোনো বন্ধুদের সাথে মাঝে মাঝে দেখা করে বন্ধুত্ব ঝালিয়ে নেয়া- বেশ গুছিয়ে নিয়েছিলাম নিজেকে।
আমার সাতাশ বছরে মা গেলেন, ত্রিশে পিতৃহারা হলাম। যে বছর বাবা মারা গেলেন, সে বছরের শুরুতেই অরূপ চার বছরের জন্য নিউজিল্যান্ড গিয়েছে পড়তে। দেশে থাকার সুবাদে মায়ের শেষকৃত্যে অংশ নিতে পারলেও বাবার মৃত্যুর সময় সে আসতেও পারেনি।
আচ্ছা, আমার মৃত্যুর খবরটা কী আমার ভাইটা জানতে পারবে? কেউ যদি একটু জানিয়ে দেয় তো বড় ভালো হয়। ছোট্টবেলায় ওকে কোলে করে এঘর-ওঘর করেছি কতবার, ও-ও দিদি বলতে পাগল ছিল। স্কাইপ চ্যাটে কতবার আপসোস করেছে আমার কাছে কাছে থাকতে না পারার জন্য। ওকে একটু জড়িয়ে ধরে আদর করতে পারলাম না শেষ বেলায়...
যাই হোক, জীবনস্মৃতিতে ফিরে আসি। মায়ের মৃত্যুর পর কেমন যেন অসহায় লাগতো। বাবাও বড় একা হয়ে পড়েছিলেন। বাবা-মায়ের শোবার ঘরে টাঙানো মায়ের বাঁধাই করা ছবিটার দিকে বোবা চাহনিতে বাবা তাকিয়ে থাকতেন, আর তাঁর চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়তো।তাই চেষ্টা করতাম অফিসের পর বাবাকে বাকি সময়টা দিতে, অরূপও বাবাকে সঙ্গ দিত। রাতে খাওয়াদাওয়ার পর বাবাকে ঘুম পাড়িয়ে লিখতে বসতাম, আবার পরের দিন সকালে অফিস। এভাবেই রুটিন জীবন চলছিল।
বাবার মৃত্যুর পর ভয়ঙ্কর একাকীত্ব আমায় গ্রাস করতে শুরু করলো। আগে অফিস সেরে বাসায় এলে বাবা দরজা খুলে দিতেন, এখন রোজ চাবি দিয়ে দরজা খুলি। খালি বাসাটা দেখে হাহাকার জাগতো ভেতরে; দরজাটা বন্ধ করে কিছুক্ষণ চেয়ে থাকতাম, তারপর সকালে অফিসে বেরোবার আগে বন্ধ করে যাওয়া জানালা,বারান্দার দরজা খুলে ফ্রেশ হয়ে রান্নাঘরে ঢুকতাম। অল্প কিছু রান্না করে খেয়েদেয়ে অরূপের সাথে ঘণ্টাখানেক স্কাইপ চ্যাট করে লেখালেখির কাজ নিয়ে বসতাম। আমার ঘরে মা-বাবার সাথে আমার আর অরূপের একটি ছবি বড় করে বাঁধাই করে রেখে দিয়েছিলাম; মাঝরাতে কখনো ঘুম ভেঙে গেলে যখন ভয়াবহ কান্না পেত তখন ছবিটার দিকে তাকিয়ে থাকতাম অনেকক্ষণ, আস্তে আস্তে মন শান্ত হয়ে যেতো।
পূর্বা হাসান নামে অফিসের একটি মেয়ের সাথে বেশ ভালো বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছিল। চমৎকার হাসিখুশি মানুষ; আমার যেমন মানুষের সাথে মিশে যেতে সময় লাগতো, পূর্বার ঠিক উল্টো- পাঁচ মিনিটের মধ্যে সে মানুষকে আপন করে নিত।
আমার সেই প্রবল একাকিত্বের সময় দুজন মানুষ আমাকে দারুণভাবে সঙ্গ দিয়েছিল- পূর্বা আর পর্ণা। পর্ণা এখন প্রবাসী আর পূর্বার খবর জানি না। আজকের এই পূর্ণিমার আলোর কাছে আমি তাদের জন্য আমার অন্তরঢালা ভালোবাসা গচ্ছিত রেখে গেলাম, আমি জানি পূর্ণিমার আলো তাদের কাছে সেই ভালোবাসা পৌঁছে দেবে।
পূর্বারা দুই বোন, বাবা মারা গিয়েছেন, মায়ের সাথে ছোট্ট একটি ফ্ল্যাটে ভাড়া থাকে। বোনটি ক্লাস নাইনে পড়ে, মায়ের একটি ছোট এমব্রয়ডারির দোকান আছে।পূর্বার সাথে প্রতিদিনই দেখা হতো, কথা হতো। যেখানেই সে থাকতো, সেখানেই আসর জমিয়ে রাখতো।
অফিসে জয়েন করার পর চার বছর কেটে গেছে। কাজ করতে করতে পূর্বার সাথে কথা বলার জন্য পাশের ডেস্কে মুখ ফেরাতেই দেখলাম সে কেমন অন্যমনস্ক, চোখ কম্পিউটারে থাকলেও ভাবছে অন্য কিছু। জানতে চাইলাম, "কী রে পূর্বা, তুই ঠিক আছিস?"
পূর্বা খানিক চমকে আমার দিকে তাকালো, জোর করে মুখে হাসি ফুটিয়ে বললো,"উম, হ্যাঁ রে, ঠিক আছি। "
বুঝতে পারলাম সে এখন কিছু বলবে না। আমিও হেসে কাজে মন দিলাম।
লাঞ্চটাইমে পূর্বাকে সাথে নিয়ে ক্যান্টিনে খেতে গেলাম। খেতে খেতে জিজ্ঞেস করলাম, "এবার বল দেখি, কী হয়েছে?"
পূর্বা খাবার নাড়াচাড়া করতে করতে অন্যমনস্ক ভাবে বললো, "শ্রবণা, একটা কথা বলবো?"
- নিশ্চয়!
- আর কতটা শাস্তি পেলে আমার মুক্তি হবে বলতে পারিস?
পূর্বার চোখ কেমন ঘোলা, উদ্ভ্রান্ত দেখাচ্ছিল।আমার খাওয়া থেমে গেল, বললাম, "কী হয়েছে ক্লিয়ারলি বল না!"
- শ্রবণা…
পূর্বার কণ্ঠ কান্নায় বুজে আসছে। আমি তার হাতটা ধরে বললাম, "পূর্বা, আমায় অন্তত বিশ্বাস করতে পারিস। তোর যা বলার বল, তুই না চাইলে আমি কাউকে কিছু বলবো না, প্রমিস।"
অমন হাসিখুশি মেয়েটা হঠাৎ কান্নায় ভেঙে পড়লো, বললো, "শ্রবণা,, ঊর্বি হ্যাজ বিন রেইপড!"
পূর্বার ছোট বোন ঊর্বি। আমার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়লো। বেশ খানিকক্ষণ কোনো কথা বলতে পারিনি, পরে পূর্বাকে বললাম, "পূর্বা, আজ আমার বাসায় চল, তোর সব কথা শুনবো। ঊর্বি এখন কোথায়?"
- ঊর্বিকে নিয়ে মা হাসপাতালে আছে। কাল রাতে ওকে ভর্তি করা হয়েছে।
- বেশ! এখন শোন, মাথা ঠাণ্ডা রাখ, আমাদের অনেককিছু করতে হবে। অফিস সেরে হাসপাতালে যাবো, সেখান থেকে তুই আমার বাসায় যাবি।
পূর্বা রাজি হলো। সেদিন অফিস সেরে ঊর্বিকে দেখতে গেলাম। হাসপাতালের বেডে শোয়া মেয়েটা তখন অচেতন, হাতে স্যালাইন, পাশে আন্টি পাথরের মতো বসে আছেন- একবিন্দু কান্না নেই তাঁর মুখে, বরং যেন জ্বলছে। আন্টির হাত ধরে বসে রইলাম আধা ঘণ্টা। তিনি একটিবার শুধু তাকিয়ে দেখলেন, তারপর আবার মুখ ঘুরিয়ে নিলেন ঊর্বির দিকে।
ডাক্তার ওয়ার্ডে এলে জানতে চাইলাম রোগীর সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা সম্পর্কে। তিনি বললেন, "শী ইজ সিরিয়াসলি উন্ডেড। নিশ্চয়তা দিতে পারছি না এখনো, তবে সম্ভাবনা একেবারে নেই এমনটাও নয়। চেষ্টা করছি।"
ডাক্তার এবার পূর্বার মাকে অনুরোধ করলেন বাইরে অপেক্ষা করতে। আন্টি সে কথা শুনতে পাননি প্রথমে, শোনার পর যেতে চাইছিলেন না। আমি আর পূর্বা অনেক অনুরোধ করার পর তিনি আমাদের সাথে বের হলেন। বাইরে বেরিয়ে প্রথম তাঁর চোখে পানি দেখলাম।
আন্টিকেও বাসায় আনতে চেয়েছিলাম, রাজি হলেন না। অগত্যা আমি আর পূর্বা আমার বাসায় এলাম। সে রাতে পূর্বা আমায় সব খুলে বললো।
"তুই তো জানিস মায়ের এমব্রয়ডারির দোকান আছে। ছোট দোকান, তারপরও রোজগার মন্দ না। প্রায় তিন মাস আগে এলাকার এক পাওয়ারফুল নেতার নজর পড়ে দোকানটার ওপর, দোকানের জায়গা খালি করে দেয়ার জন্য নোটিস পাঠায়। মা নোটিস টা পাওয়ার পর সোজা না করে দেয়। এরপর আরো কয়েকবার তাড়া দিয়ে নোটিস পাঠায়, হুমকি-ধমকি দেয়; কিন্তু মা নড়েনি, তাঁর অনেক পরিশ্রমের দোকান ওটা, আর দোকানের জায়গাটিও আমাদের নিজেদের, অন্যের জায়গায় মা ভাগ বসায় নি।
এসবের মধ্যেই একদিন ঊর্বি স্কুল থেকে এসে বললো সেই নেতার ছেলে কয়েকদিন থেকে ওকে বিরক্ত করছে, এমনকি দেখে নেয়ার হুমকিও দিয়েছে। মা এবার ভয় পেয়ে গেল, পরের তিন-চারদিন ঊর্বিকে আর স্কুলে পাঠালো না। তিন-চারদিন পর থেকে মা নিজে গিয়ে ঊর্বিকে স্কুলে দিয়ে আসতো, কখনো আমি দিয়ে আসতাম, আর ছুটির পর মা স্কুলে গিয়ে নিয়ে আসত ওকে। স্কুল-বাসার বাইরে ঊর্বির বেরোনো বন্ধ হয়ে গেল।
এভাবে আড়াই মাস কাটলো। একদিন মাঝ রাতে আমার ঘুম ভেঙে গেছিল হঠাৎ, একটু পর শুনলাম বাইকের হর্ন, আমাদের বাসার খুব কাছে। জানালার পর্দা একটু ফাঁক করে দেখলাম একেবারে আমাদের জানালার বরাবর বাইকটা দাঁড়িয়ে আছে, রাইডারের মুখ দেখা যাচ্ছে না, শুধু হেডলাইটের আলো। হঠাৎ কাঁচের জানালা ঝনঝন করে উঠলো, পর্দার ফাঁক দিয়ে ঘরের ভেতর একটা মাঝারি ইটের টুকরো এসে পড়লো। আমি সময়মতো নিজেকে সরিয়ে নিতে পেরেছিলাম, নইলে আমার গায়ে এসে পড়তো। ঝনঝন শব্দে মা আর ঊর্বিরও ঘুম ভেঙে গেছিল। পরে সারাটা রাত আমরা জেগে কাটালাম।
পরের দিন সকালে মা থানায় গেল ডায়েরি করতে। বলাটা বাহুল্যই হবে, পুলিশ ডায়েরি নেয়নি। মা অনেকবার রিকোয়েস্ট করেছে, কিন্তু পুলিশ রাজি হলো না। মা বাসায় চলে এলো। এটা গত সপ্তাহের কথা।
গত পরশুদিন সকালে আমি অফিস যাওয়ার পথে ঊর্বিকে স্কুলে দিয়ে আসি। আগের রাতে মায়ের জ্বর এসেছিল, হাই ফিভার। সকালের দিকে কমে গেলেও দুপুরে আবার জ্বর এলো, মা আর সেদিন ঊর্বিকে আনতে যেতে পারেনি। ঊর্বি মায়ের জন্য কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে ওর দু'জন বান্ধবীর সাথে স্কুল থেকে বেরিয়ে যায়, স্কুল থেকে বাসার দূরত্ব ১৫মিনিট। ১০ মিনিট একসাথে চলার পর ওর ফ্রেন্ড দু'জন ওদের বাসার দিকে চলে যায়, ওদের বাসার রাস্তা ভিন্ন। ঊর্বি তখন একা বাসার দিকে এগোতে থাকে। ও যখন বাসার খুব কাছে, বড়জোর দু'মিনিটের ডিস্ট্যান্সে পৌঁছেছে, তখন একটা প্রাইভেটকার ওর একদম পাশ ঘেঁষে চলে আসে। গাড়িটাতে ঐ ছেলেটা ছিল, ঊর্বির হাত টেনে গাড়িতে তুলে নেয় ওকে।
ঊর্বির দেরি দেখে মা ওর বন্ধুদের ফোন দিতে থাকে, কেউ ওর খবর দিতে পারেনি।ঊর্বির সাথে মোবাইল ফোন ছিল না, মা সেই অসুস্থ শরীর নিয়ে নিজে ঊর্বির ঐ দুই বন্ধুর বাসায় যায়। সেদিন রাত ১২টার পর ঊর্বি বাসায় আসে, জানিস?" পূর্বা ক্ষণকাল থামলো, তার চোখে জল, "আমার বোনটা একাই বাসায় এসেছিল, বাসার সদরে। আমি মেইনগেটের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলাম, আমাদের এক প্রতিবেশী কাকা থানায় গেছিলেন। সেই সময় দেখলাম ঊর্বিকে গেটের সামনে, আর সঙ্গে সঙ্গে শুনলাম একটি প্রাইভেট কারের চলে যাওয়ার শব্দ। ঊর্বি মাটিতে পড়ে ছিল, আমি দৌঁড়ে ওকে তুলে নিয়ে বাসায় উঠে গেলাম। ভোরের দিকে সেই কাকার সাহায্যে ওকে হসপিটালাইজ করলাম।"
পূর্বার চোখের জল বাঁধহারা হয়ে উঠেছিল, চোখ ছাপিয়ে শুধু জলের ধারা নেমে আসছিল, "ঊর্বি বাসায় আসার পর ও নিজেই এগুলো বললো। ২০ মিনিট মতো জ্ঞান ছিল, পরে সারারাত অজ্ঞান ছিল।হাসপাতালে নেয়ার পর একবার জ্ঞান ফিরেছিল সামান্য সময়ের জন্য, তারপর চব্বিশ ঘণ্টার বেশি হয়ে গেল ওর জ্ঞান আর ফেরেনি। " কান্নায় ভেঙে পড়ল পূর্বা। আমি ওর হাত আমার হাতের মধ্যে শক্ত করে ধরে বসে রইলাম।
খানিক পর একটু শান্ত হয়ে পূর্বা বললো, "শ্রবণা,, জানিস,সেদিন রাতে যখন ঊর্বিকে ধরে ধরে বাসায় নিয়ে যাচ্ছিলাম, দোতলার এক আন্টি দেখে ফেলেছিলেন। তাঁর চোখ আমি দেখেছি, ঊর্বির দিকে ভয়ঙ্কর ঘেন্নার চোখে তাকিয়ে ছিলেন। " একটু থেমে করুণ হেসে পূর্বা বললো, "এই আন্টিই এক দেড় মাস আগে ঊর্বির জন্য বিয়ের প্রস্তাব এনেছিলেন, পাত্র তাঁর এক বোনের ছেলে। মা মুখের ওপরে না করে দিয়েছিল।"
একটু পর পূর্বা আবার বললো, "শ্রবণা, একটি দু' বছর বয়সী ব্যর্থ প্রেমের গল্প আমার আছে। অনার্স থার্ড ইয়ারে যখন বাবা মারা গেলেন তখন থেকে স্ট্রাগল করে যাচ্ছি। সেই একই বছরে ব্রেকাপটাও হলো। বাবার ধারদেনা শোধের চাপ, সংসারটা দাঁড় করানোর চাপের সাথে যখন এই ব্রেকআপের কষ্ট টা যোগ হলো, আমি ডিপ্রেশনে পড়ে গিয়েছিলাম, শুধু ঘুমোতে ইচ্ছে হতো। একবার অনেকগুলো ঘুমের ওষুধ একসাথে খাবো বলে জড়ো করেছিলাম, ওষুধ গুলোর দিকে তাকিয়ে কেন জানি না হঠাৎ ঊর্বির মুখটা মনে পড়লো। মুঠো করে ফেলে দিয়েছিলাম সেগুলো।" পূর্বা হাতে মুখ ঢেকে মাথাটা নিচু করে ফেললো।
আমি নিশ্চুপে পূর্বার দিকে শুধু চেয়ে ছিলাম। এমন সুন্দর প্রাণবন্ত হাসিমুখের আড়ালে কত গভীর ভগ্নস্তূপ লুকিয়ে আছে, তা পরিমাপ করা বুঝি স্বয়ং ঈশ্বরেরও অসাধ্য। তবে স্রষ্টা সেদিন আমায় আমার প্রতিবিম্বের সামনে যেন দাঁড় করালেন।
পূর্বাকে জড়িয়ে ধরে তার মাথায় হাত বুলোতে বুলোতে বললাম, "পূর্বা, সমাজের সবাই যে সেই দো'তলার আন্টির মতো হবে না, সেটা যেমন আমিও বিশ্বাস করি, তুইও কর। তোর প্রতিবেশী কাকার মতো দু'চারজন এখনো বেঁচে আছে। আর, তোর মত শক্ত মানুষের কান্না মানায় না। ঊর্বির জন্য ফাইট করতে হবে, এবং সেটা তোকেই করতে হবে। আর...আমি আছি তোদের সাথে!"
পূর্বা মুখ তুলে তাকালো, কৃতজ্ঞতা তার মুখে যেন উপচে পড়ছে। সে হেসে বললো, "জানিস কতদিন এই কথাটা, এই 'আমি আছি' কথাটা কেউ বলেনি আমায়? থ্যাংকস রে, আমি জানি না এখন কী করবো, কিন্তু হ্যাঁ...অনেককিছু করতে হবে!"
পরদিন সকালে পূর্বাদের স্থানীয় থানায় গেলাম কেস ফাইল করতে। থানার ইনচার্জ অত্যন্ত টালবাহানা করছিল, শেষ পর্যন্ত আমি যখন পুলিশের উপরমহলের সাথে দহরম-মহরমওয়ালা আমার পরিচিত এক সাংবাদিকের নাম বললাম, তখন নিমরাজি হয়ে কেস ফাইল করতে রাজি হলো। কেস ফাইল করে হাসপাতাল ঘুরে পূর্বাকে সেখানে রেখে সন্ধ্যায় বাসায় এলাম।
রাত প্রায় ১০ টার দিকে আমার মোবাইলে একটি কল এলো, আননোন নাম্বার থেকে। কল রিসিভ করলাম।
-হ্যালো।
-হ্যালো, আপনি কী শ্রবণা মিত্র বলছেন?
খানিকটা বিস্মিত হলাম, সামলে নিয়ে বললাম, "হ্যাঁ বলছি। আপনি?"
-জ্বি আমাকে চিনবেন না, দরকারও নেই অবশ্য। শুনুন, আজকে থানায় গেছিলেন কেন?
এবার আমার সম্পূর্ণ চমকে ওঠার পালা, থানায় যাওয়ার খবর আমি আর পূর্বা ছাড়া আর কেউ জানে না, এমনকি আন্টিও না। তবে বুঝতে পারলাম, পুলিশের থেকেই খবরটা বের হয়েছে এবং অপরাধীপক্ষ জেনে গেছে।
আমি বললাম, "যে জন্যই যাই, অপরিচিত কাউকে কৈফিয়ত দিতে বাধ্য নই আমি।"
- আপনি সারা হাসানের মেয়ের ব্যাপারে গিয়েছিলেন তাই তো? দেখুন একটা কথা বলি, পূর্বা আপনার বন্ধু হতে পারে, তাই বলে খামাখা ওদের বিপদের মধ্যে নিজেকে জড়াবেন না; ওদেরকে যা বোঝানোর বুঝিয়ে দিয়েছি, দরকার পড়লে আরো বোঝাবো। কিন্তু আপনার সাথে আমাদের কোনো ঝামেলা নেই, তাই আপনাকে কিছু বোঝানোর দরকারও মনে করছি না। অযথা বাধ্য করবেন না!
আমি কিছু বলার আগেই ফোনটা কেটে গেল। সারাটা রাত কাটলো দুঃস্বপ্নে আর অগভীর ঘুমে।
পরদিন সকালে অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইলাম আমার বিছানায়, মনে শুধু দ্বিধা আর দ্বন্দ্ব। মন দুটো ভাগে ভাগ হয়ে গেছে, এক ভাগ বলছে, "কী দরকার অন্যের দায় ঘাড়ে চাপানোর। এমনিতেও এ কেসের কিচ্ছু হবে না, কেউ শাস্তি পাবে না। দু'দিন পর ঊর্বি সুস্থ হয়ে যাবে, বড়জোর একটু অস্বাভাবিক হয়ে যাবে; প্রাণে তো বাঁচবে, মেরে তো আর ফেলেনি ওকে। এত কিসের দায়?"
আরেক ভাগ বলছে, "দায় এড়াতে চাইছো? তাহলে এটাও মনে রেখো তোমার যেদিন কেউ ছিল না, একাকীত্ব গ্রাস করে ফেলতো, সে সময় পূর্বা না থাকলে তুমি ভেতরে ভেতরে মরে যেতে। এখন যখন পূর্বার চূড়ান্ত বিপদ, তুমি পালাতে চাইছো?"
সিদ্ধান্ত নিলাম। পূর্বার পাশে আমায় থাকতেই হবে; ওর কাছে আমার ঋণ আছে, বন্ধুত্বের ঋণ।
কেস ফাইল করার পর এক সপ্তা'র বেশি কেটে গেছে,থানায় গিয়ে কোনো খবরই পাইনি। ঊর্বির অবস্থা এখনো স্থিতিশীল নয়, এই ভালো তো এই মন্দ। আন্টি কেমন পাথরের মত হয়ে গেছেন, মাঝে মাঝে শুধু বিড়বিড় করে বলেন, "আমি ছাড়বো না, কাউকে ছাড়বো না!"
পূর্বা আমার বাসায়ই থাকে, নিরাপত্তার ভয়ে আছি আমরা সবাই।
কেস ফাইল করার পর অর্ধেক মাস কেটে গেল। এর মধ্যে আরো দু'বার হুমকি দিয়ে ফোন এসেছিল। আমি আমার সেই পরিচিত সাংবাদিককে সবকিছু জানাই, তিনি কিছু একটা ব্যবস্থা করবেন বলে আশ্বাস দেন।
গত ২২ তারিখ অফিস সেরে বাসায় ফিরছিলাম। বাসে করে এসেছি, বেশি মানুষের ভিড় ছাড়া অনিরাপদ মনে হয়। পূর্বা সেদিন অফিস যায়নি, তার মায়ের সাথে হাসপাতালে ছিল, ঊর্বির অবস্থা আগের চেয়ে খারাপ হয়েছে।
বাসস্ট্যান্ড থেকে বাসার দূরত্ব হাঁটাপথে পাঁচ মিনিট। মাঝে একটা নির্জন রাস্তা পড়ে। রাস্তাটা দিয়ে পা চালিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলাম।
হঠাৎ একটি মাইক্রোবাস এসে থামলো একেবারে আমার গা ঘেঁষে। একটা অমানুষিক শক্ত হাত টেনে নিল আমাকে গাড়ির ভেতর। আমি চিৎকার করে সাহায্য চাইছিলাম, আমার মুখ চেপে ধরলো একজন। মুখে টেপ লাগিয়ে দিয়ে নাকে একটা রুমাল শোঁকালো কেউ। আমার চোখের সামনে একটা কালো পর্দা পড়ে গেলো।
৭.
জ্ঞান ফিরলো কতক্ষণ পর বলতে পারবো না। একটা ঘরে নিজেকে আবিষ্কার করলাম। ঘরটার দেয়ালে ইটের গাঁথুনি, কাঁচা মেঝে। কোনো জানালা নেই, শুধু সামনে একটি দরজা আর ঘরে একটা ডীমলাইট জ্বলছে। সম্ভবত কোনো নতুন তৈরি হতে থাকা বাড়ি।
আমি আমার শরীরের দিকে তাকালাম। সম্পূর্ণ নগ্ন,বিক্ষত; এখানে ওখানে জমাট রক্তের দাগ। ঠোঁটের পাশে জ্বালা করছিল, হাত দিয়ে দেখলাম সেখানেও রক্ত।ছেঁড়া জামাকাপড় পড়ে আছে মেঝেয়। আমার মাথা তখনো ঘুরছে, চোখ চেয়ে তাকাতে পারছি না, অসহ্য ব্যথায় মরে যেতে ইচ্ছে করছে।সেই অবস্থায় কাপড়চোপড়গুলো কুড়িয়ে কোনোমতে পরে নিলাম।
প্রায় সাথে সাথেই দরজায় চাবি ঘোরানোর শব্দ হলো, দেখলাম দুটো লোক এসে ঘরে ঢুকলো-শ্যামলা, একজনের চাপদাড়ি, আরেকজনের লম্বা দাড়ি,দুজনেরই মাঝারি উচ্চতা। একজন আমায় ঘরের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে জোরে চিৎকার করে উঠলো, "স্যার, মাল জাগছে!"
আমি ধপ করে বিছানার ওপর বসে পড়লাম, মাথাটা সাংঘাতিক ঘুরছে, ক্লান্ত লাগছে, ঘুম পাচ্ছে।
ঝাপসা চোখে দেখতে পেলাম আরেকটা লোক এসে ঘরে ঢুকলো। এ লোকটা ফর্সা, লম্বা, পরিষ্কার শার্ট-প্যাণ্ট পরা। এসে সে একেবারে আমার সামনে দাঁড়িয়ে জানতে চাইলো, "না করছিলাম না বারবার? এত কিসের দরদ তোর? মেয়েমানুষ হইয়া বুকের পাটা দেখাইতে শখ জাগছে না? মালাউন আছিস, মালাউনের মতো থাকলে আর কিছু কইতাম না। বেশি তেজ! তোর তেজ আমি শেষ করতেছি আজকে!"
এই বলে লোকটা আমার গলা টিপে ধরলো। দুটো শক্ত হাত, সেই হাত পাথরের মত আমার গলায় যেন চেপে বসতে লাগলো। আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেললাম।
মৃত্যু যদি তখনই হতো তো বড় ভালো হতো,কিন্তু হয়নি। পরে হাসপাতালে এসে অন্য সবার কথা থেকে শুনেছি আমায় নাকি এক ভদ্রলোক অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন। তিনদিন নাকি বেঁচে ছিলাম আমি।
তারপর…
তারপর এই আজ আমার নির্বাণ হলো।
৮.
আযান শুনতে পাচ্ছি। আকাশে শুকতারা দেখা যাচ্ছে, ভোর হয়েছে। একটু পরই সূর্য উঠবে, আর সেই সূর্যের প্রথম কিরণে আমি মিলিয়ে যাবো।
কী জানি কেন, হঠাৎ "Dover Beach" মনে পড়ছে।
"Ah love, let us be true to one another."
ম্যাথিউ আর্নল্ড সাহেব কবিতাটি লিখেছিলেন যখন তাঁর ধর্মবিশ্বাস বিজ্ঞানের জোয়ারে টালমাটাল হয়েছিল, তাঁর আজন্ম লালিত বিশ্বাসে সন্দেহের বিষ ঢুকেছিলো। সে সময় তিনি কেবল প্রেম ছাড়া আর কোনোকিছুতেই আস্থা খুঁজে পাননি;প্রেমই তখন একমাত্র শাশ্বত,অবিচল হিসেবে তাঁর কাছে প্রতীয়মান হয়েছিল। তাই প্রেয়সীর প্রতি তাঁর এ আহ্বান।
প্রেম, ভালোবাসা, পিরিতি,প্যায়ার, love!
এই এক ভালোবাসার সন্ধানেই মানুষের কাটে পুরো একটি জন্ম। এই যে আমার দেহ ক্ষত-বিক্ষত হলো, এ কোনো ক্ষতই নয়। আমি তো বিক্ষত হয়েছিলাম সেইদিন যেদিন শ্রেয়ান আমার বিশ্বাসে ভাঙ্গন ধরালো, যেদিন অনিন্দ্যর "ধর্মবিশ্বাস" এর কাছে আমার ভালোবাসা ঠুনকো হয়ে গেল।
আচ্ছা, পূর্বা, অরূপ- ওরা কী আমার কথা জানতে পারবে? জানতে পারলে ওরা আমার জন্য এক ফোঁটা চোখের জল ফেলবে?
নিশ্চয়ই ফেলবে, কিন্তু, জানতে পারবে তো? সমস্ত পৃথিবীর আর কেউ আমার পরিচয় না জানুক, তাতে আপত্তি নেই, আমি নয় নগণ্য হয়েই বিদায় নিলাম- কিন্তু ওরা জানবে তো?
সেদিনও অরূপ কথায় কথায় বললো এবার ছুটিতে এসে পুরো দেড় মাস আমার কাছে থাকবে, আমার জন্য নাকি একটা ঘড়ি কিনে রেখেছে। আগামী মাসের মাঝামাঝি ওর আসার কথা ছিল...
কত স্বপ্ন ছিল- অমর হবো, আমার মৃত্যুদিনে সমস্ত রাষ্ট্র, সমস্ত পৃথিবী আমার জন্য শোক করবে, চোখের জল ফেলবে। কিছুই আর হলো না।
মানুষ যে একাকীত্বকে তার দেখনদারি দিয়ে চাপা দিতে চায়, সেই কালো একাকীত্ব নিয়েই আমি বিদায় নিলাম। প্রকৃতি মহান, তার স্পর্শে আমার সেই একাকীত্ব সোনা হয়ে উঠবে, উষ্ণতায় রূপান্তরিত হবে, আমি বিশ্বাস রাখি…
পৃথিবীর কাছে আমার স্মৃতি রেখে গেলাম, নইলে যে আমার দহনের নির্বাণ হতো না!
সূর্য উঠে গেছে, প্রথম সোনালী রশ্মি আমায় ডেকে নিচ্ছে। পরজন্ম বলে কিছু থাকলে আবার মানুষ হয়ে এই পৃথিবীতেই আসবো আমি-আমার বাবার মুখে কবিতা শোনার জন্য, মায়ের আদরের জন্য, ভাইয়ের 'দিদি' ডাকের জন্য। পৃথিবীটা যে বড্ড সুন্দর, বড্ড মায়াবী….
সেই ছাদ থেকে দু'মাইল দূরে হাসপাতালের মর্গে শ্রবণা' র ক্ষত বিক্ষত লাশটিকে সেই ভদ্রলোকের দু'ফোঁটা চোখের জল ভিজিয়ে দিলো, তিনি দু'হাত তুলে স্রষ্টার কাছে প্রার্থনা করলেন।
__________________
( ব্লগে লেখা এই প্রথম গল্পটি আমার বন্ধু প্রয়াত মো.রিফাত হোসেনের স্মরণে উৎসর্গীকৃত
সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত: @ঋদভিকা পাল
২|
২০ শে ডিসেম্বর, ২০১৯ দুপুর ১:৫৫
ঋদভিকা পাল বলেছেন: ধন্যবাদ ভাইয়া! রিপ্লাই করতে একটু দেরি হয়ে গেল। পরবর্তীতে বড় পোস্ট গুলোর ক্ষেত্রে পর্বে ভাগ করে দেয়ারই চেষ্টা থাকবে, ব্লগে লেখা প্রথম বড় পোস্ট বিধায়ই একটু কনফিউজড ছিলাম পর্ব করার ব্যাপারে।
৩|
২৮ শে মার্চ, ২০২০ রাত ৯:২৮
পদাতিক চৌধুরি বলেছেন: একদম শুরুতে ভ্যাপসা গরম অথচ লালচে মেঘ! বিষয়টি বৈসাদৃশ্য লাগলো। বিশাল পোস্ট। সবটা পড়িনি। এক নম্বর সম্পর্কে বলতে চাই অবশ্য যদি কিছু মনে না করেন।
১-রেপ কেসের রোগী তিনদিন পরে আরেকটা অপারেশন। ডাক্তার বসু দু'ঘণ্টার অপারেশন পরে বেরিয়ে এলেন রাত দুটোয়।সে ক্ষেত্রে অপারেশন শুরু হল রাত বারোটায়?এত রাতে অপরশন হওয়ার মতো বাস্তবতা বোধহয় নেই।
২- ততক্ষণ পর্যন্ত একজন অপরিচিত ব্যক্তির বাইরে অপেক্ষা করাটা কতটা বাস্তব সংগত? পোস্ট অনুযায়ী ওই ব্যক্তি গাড়িচালক যিনি ভদ্রমহিলার অপরিচিত।
৩-রেইপ কেস অথচ পুলিশের ভূমিকা কেন থাকবে না? সবার আগে তো পুলিশকে ইনফরম করা দরকার ছিল। সার্বিকভাবে পোস্টটি ভালো হতো যদি আরো একটু সাজিয়ে গুছিয়ে লিখতেন।
৪-ডক্টর বসু তৃতীয় দিন অন্তিম অপারেশনের পর যে প্রশ্নগুলো করলেন সেগুলো প্রথম দিন প্রথম অপারেশনের পর অপরিচিত ব্যক্তির উদ্দেশ্যে কেন করলেন না?
যাইহোক লেখা চালিয়ে যান।
আগামী দিনে আরো ভালো হবে। শুভেচ্ছা নিয়েন।
০৯ ই এপ্রিল, ২০২০ বিকাল ৪:৫০
ঋদভিকা পাল বলেছেন: অনেক ধন্যবাদ। চেষ্টা থাকবে ভবিষ্যতে আরো বাস্তবসম্মত উপস্থাপনের।
©somewhere in net ltd.
১|
১৬ ই ডিসেম্বর, ২০১৯ বিকাল ৩:১৯
রূপম রিজওয়ান বলেছেন: এত বড় পোস্ট না দিয়ে প্রয়োজনে পর্বে ভাগ করে দিতে পারতেন। সুন্দর লিখেছেন(যতটুকু পড়েছি, সবটুকু পড়িনি)। আপনার লেখার ধরণের সাথে ব্লগার মেহরাব হোসেন খান ভাইয়ার লেখার মিল রয়েছে।
শুভ কামনা।