নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

মানুষ মরে গেলে পঁচে যায় আর বেঁচে থাকলে বদলায়

সৈয়দ কুতুব

নিজের অজ্ঞতা নিজের কাছে যতই ধরা পড়ছে প্রচলিত বিশ্বাসের প্রতি ততই অবিশ্বাস জন্মাছে!

সৈয়দ কুতুব › বিস্তারিত পোস্টঃ

ইরানের পক্ষে বাংলাদেশ সরকারের সরাসরি দাঁড়ানো সম্ভব নয়

০৩ রা এপ্রিল, ২০২৬ রাত ১:১৫


ঢাকায় ইরানের রাষ্ট্রদূত যখন মাইক্রোফোনের সামনে কথা বলা শুরু করলেন , তখন তার চোখে রাগ ছিল না, ছিল এক ধরনের ক্লান্ত অভিমান। একটা মুসলিম দেশ, কোটি কোটি মুসলিম মানুষের দেশ... অথচ তারা একটা বিবৃতিও দিতে পারল না। একটা নিন্দাও জানাতে পারল না। রাষ্ট্রদূত সম্ভবত ভেবেছিলেন, ধর্মীয় সংহতির যে আবেগ বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের বুকে আছে, সেটা হয়তো সরকারের কণ্ঠেও একটু হলেও প্রতিধ্বনিত হবে। কিন্তু ঢাকা চুপ। একদম চুপ।

এই চুপ থাকাটাকে অনেকে বলতে পারেন কাপুরুষতা কিংবা সুবিধাবাদ। কিন্তু সত্যিটা আসলে এর চেয়ে অনেক বেশি জটিল, অনেক বেশি তিক্ত। বাংলাদেশ চাইলেই কি পারত ইরানের হাত ধরতে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আবেগের চশমাটা একটু খুলে রাখতে হবে, কারণ পেছনের ঘটনা ততটা সরল নয়।

মধ্যপ্রাচ্যে যখনই আগুন জ্বলে, বাংলাদেশের প্রথম ভয়টা আসে জ্বালানি নিয়ে। হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের এক পঞ্চমাংশ তেল চলাচল করে, আর সেই পথ যদি অচল হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়, তাহলে বাংলাদেশের মতো দেশের অর্থনীতি কয়েক ঘণ্টার মধ্যে থমকে যাবে। এই মুহূর্তে সৌদি আরবের রাস তানুরা বন্দরে আমাদের একটি জাহাজ এক লাখ টন অপরিশোধিত তেল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সেই তেল দেশে আসবে কি আসবে না, সেটা নির্ভর করছে এই যুদ্ধের আঁচ কতটা ছড়ায় তার উপর।

এই ভয় থেকেই বাংলাদেশ এখন বিকল্প পথ খুঁজছে। কাজাখস্তান থেকে এক্সনমোবিলের মাধ্যমে সস্তায় ডিজেল কেনার যে সুযোগ তৈরি হয়েছে, সেটা এমনি এমনি হয়নি। এর পেছনে আছে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ ছাড়, কেস টু কেস ভিত্তিতে দেওয়া অনুমতি। এটার মানে কী দাড়ায় ? মানে হলো বাংলাদেশ ধীরে ধীরে জ্বালানির জন্য আমেরিকার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। আর যে দেশের হাত ধরে বাঁচতে হয়, সেই দেশের শত্রুর পাশে দাঁড়ানোর দুঃসাহস খুব কম দেশই করতে পারে।

তবু যদি শুধু জ্বালানিই হতো, তাহলেও হয়তো কিছু একটা করার উপায় বের হতো। কিন্তু সমস্যাটা আরও গভীরে। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে এই মুহূর্তে প্রায় এক কোটি বাংলাদেশি আছেন। তারা রোদে পুড়ে, ধুলায় মেখে প্রতি মাসে যে টাকা পাঠান, সেটাই আমাদের রিজার্ভের মূল ভিত্তি। সৌদি আরব, কাতার, আমিরাত... এই দেশগুলো ইরানের সাম্প্রতিক তৎপরতায় ভেতরে ভেতরে ফুঁসছে। তাদের ভূখণ্ডে ইরানের হামলার আঁচ পড়ছে। এই অবস্থায় বাংলাদেশ সরকার যদি সরাসরি ইরানের পক্ষ নেয়, তাহলে গালফের দেশগুলো কী মনে করবে? তারা ভাববে ঢাকা আসলে তাদের নিরাপত্তার বিপক্ষে। আর সেই ভাবনা থেকে যদি ভিসা বন্ধ হয়, যদি শ্রমিক নেওয়া কমে যায়, তাহলে লাখো পরিবারের স্বপ্ন একরাতেই ভেঙে পড়বে।

আরেকটি ঘটনাও এর সাথে জড়িত, যদিও একটু পুরনো কিন্তু এখনও প্রাসঙ্গিক। ২০২৪ সালের নির্বাচনের আগে যখন আমেরিকান চাপ ঢাকার উপর তুঙ্গে ছিল, তখন ইরান আর রাশিয়া বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়েছিল। তেহরান ভেবেছিল, এই দেশটাও আমাদের মতো পশ্চিমা আধিপত্যের শিকার, আমরা একই নৌকার যাত্রী। কিন্তু জুলাই ২৪ এর পর যে সরকার এলো, তারা অন্য পথে হাঁটল। হোয়াইট হাউসে গিয়ে চুক্তি হলো, আমেরিকা থেকে সয়াবিন আর এলএনজি কেনা বাড়ল, মন্ত্রীরা মার্কিন জ্বালানি মন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে বসলেন। আর ঠিক এই সময়ে চীনের প্রভাবশালী মন্ত্রীর সফর বাতিল হয়ে গেল। তেহরান বুঝে গেল, বাংলাদেশ আর সেই বলয়ে নেই।

তাই রাষ্ট্রদূতের অভিমান আসলে শুধু একটা যুদ্ধের নিন্দা না পাওয়ার কষ্ট নয়, এটা একটা হিসাব মেলানোর ব্যর্থতার গল্প। ইরান ভেবেছিল বাংলাদেশকে পাশে পাবে, কিন্তু পেল না। ইরান কি বাংলাদেশ সরকারের এমন আচরণে অবাক হয়েছে? সম্ভবত না। তারা বোঝে, বাংলাদেশ যা করছে সেটা ইচ্ছায় নয়, বাধ্য হয়ে করছে। জ্বালানি লাগবে, রেমিট্যান্স লাগবে, রিজার্ভ বাঁচাতে হবে। এই তিনটা বাঁচাতে গেলে আমেরিকা আর গালফের বিরাগভাজন হওয়া যাবে না।

এখানে আরেকটা হিসাবও আছে। ইরানের হামলায় গালফের দেশগুলোতে প্রবাসী বাংলাদেশিদের প্রাণহানির ঘটনা ঘটার পরও বাংলাদেশ ইরানের বিরুদ্ধেও সরাসরি কিছু বলছে না, কারণ আমাদের জাহাজগুলোকে হরমুজ প্রণালী দিয়েই যেতে হয়। আর সেই প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ কার হাতে সেটা সবাই জানে। ইরানকে সরাসরি সমালোচনা করলে একটা জাহাজও নিরাপদে ফিরবে কিনা, সেই প্রশ্নটা ঢাকার কর্তাদের রাতের ঘুম কেড়ে নেওয়ার জন্য যথেষ্ট। তাই বাংলাদেশ সেই চেষ্টাই করে যাচ্ছে, প্রতিদিন, নিঃশব্দে... না আমেরিকাকে ছেড়ে, না ইরানকে শত্রু বানিয়ে।

সোশ্যাল মিডিয়ায় লাখো মানুষ ইরানের পক্ষে কথা বলছে, ফিলিস্তিনের জন্য কাঁদছে, আমেরিকার নীতির বিরুদ্ধে ফুঁসছে। তেহরান সেটা দেখছে, বুঝছে। জনগণের হৃদয় কোথায়, সেটা তাদের অজানা নয়। কিন্তু রাষ্ট্র চলে হৃদয় দিয়ে নয়, চলে হিসাব দিয়ে। আর সেই হিসাবে এই মুহূর্তে ইরানকে দূরে রাখাটাই বাংলাদেশের জন্য একমাত্র বাস্তবতা, তিক্ত হলেও।


ইরান যুদ্ধ ইস্যুতে ঢাকার অবস্থানে অসন্তোষ তেহরানের- ইনকিলাব

মন্তব্য ২ টি রেটিং +১/-০

মন্তব্য (২) মন্তব্য লিখুন

১| ০৩ রা এপ্রিল, ২০২৬ রাত ১:৩৮

মহাজাগতিক চিন্তা বলেছেন: আমাদের জন্য হুট-হাট কারো পক্ষ নেওয়া সহজ নয়।

২| ০৩ রা এপ্রিল, ২০২৬ রাত ১:৩৯

স্বপ্নের শঙ্খচিল বলেছেন: কিন্তু রাষ্ট্র চলে হৃদয় দিয়ে নয়, চলে হিসাব দিয়ে। আর
.................................................................................
আমরা গোলাম,
নবেল লরিয়েট ১৫ বৎরের জন্য আমেরিকার গোলাম বানায়ে রেখে গেছে ।
বিশ্ব দেখুক আমরা কতটা গোলামী খাটতে পারি ।

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.