| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
কিন্তু, শেষ পর্যন্ত মানুষ মার্জিত, শিক্ষিত প্রাণী, 'rational animal'।' rational' শব্দটি আপাতত দরকারি নয়, গোনায় ধরতে হবে 'animal' শব্দটিকে। এই একটি শব্দের ভেতর পুরে দেয়া আছে প্রবৃত্তির কাছে আত্মসমর্পণ তথা ইড এর ধারণা। সমাজ-সংস্কৃতি-ধর্ম-নীতি তৈরি করে মানুষ চাপা দিয়ে রাখে ইডকে। কিন্তু যখন সামনে আসে প্রতিযোগিতা, অধিকারের লড়াই- ইগো সমর্পিত হয় ইড এর গোঁড়া ইচ্ছার প্রতি , সুপার ইগো তথা নীতির কাঁচের আয়না ভেঙে হয় চুরমার। সুপার ইগোর সেই পরাজয়ই প্রতিফলিত হয় নিনার ব্ল্যাক সোয়ান হয়ে ওঠার প্রক্রিয়ায় যেখানে সে ধীরে ধীরে নিজের পূর্ববর্তী 'লক্ষ্মী মেয়ে'র অবয়ব ভেঙে বেরিয়ে আসে- সিনেমার প্রথমার্ধে 'পারফেকশন'এর উচ্চাকাংক্ষায় বেথ এর প্রসাধনী ও গয়না চুরি করে, লেরয়ের চুম্বন চেষ্টা ব্যর্থ করে, পরবর্তীতে নাচের অনুশীলনে সুস্থ্য স্বাভাবিক মস্তিষ্কে লেরয়ের যৌন আমন্ত্রণে সাড়া দেয়, লিলির সাথে লেরয়ের সঙ্গমের দৃশ্য দেখে তার যৌনঈর্ষা জাগ্রত হয় এবং তা চূড়ান্ত রূপ ধারণ করে গ্রীন রুমে- যখন তার লিলিকে ব্ল্যাক সোয়ান রূপে প্রস্তুত হতে দেখার বিভ্রম হয় এবং অবশেষে ধস্তাধস্তি ও খুন করে।
নিনাকে হিন্দু পুরাণ অনুযায়ী যথাক্রমে পার্বতী ও কালী রূপে অভিহিত করা যেতে পারে; কারণ সম্মতি গ্রহণ ছাড়া লেরয়ের চুম্বন চেষ্টা ব্যর্থ করে দেয়ার মাধ্যমে সে নিজের ন্যায়বিচার নিজে নিশ্চিত করেছে, এখানে সে কালী রূপিনী যেহেতু আত্মরক্ষার্থে সমাজনির্মিত 'ভদ্র' ইমেজ ভেঙে বেরিয়ে এসেছে। আর গড়পড়তায় শান্ত সৌম্য ভাব যা 'সভ্যতা'র কাম্য তা বজায় রাখার জন্য সে পার্বতীর মতও বটে। কিন্তু অধিকার এবং প্রতিযোগিতার বোধ তার মধ্যে যে অস্তিত্বের সংকট তৈরি করে ও ফলস্বরূপ ইড শাসিত ব্ল্যাক সোয়ানকে বের করে আনে তাকে একমাত্র গ্রীক দেবী আর্টেমিসের সাথেই তুলনা করা চলে- যিনি আকাশে 'সেলিন' বা চাঁদ হয়ে থাকেন আর পৃথিবীতে প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে নিষ্পাপ কুমারী ইফিজেনিয়ার বলি চান।
হ্যাঁ,ধর্ম, দর্শন ইত্যাদি মানুষের আদিম প্রাবল্য প্রশমিত করার জন্য বিভিন্ন অনুশাসন, দৃষ্টিভঙ্গি প্রণয়ন করেছে; 'নিহিলিজম' এসব নৈতিকতা, তুলনামূলক সংযত দৃষ্টিভঙ্গি নস্যাৎ করে 'instinct' বা প্ররোচনাকে অধিক মূল্যায়নের পক্ষে কারণ সেগুলোই অধিক স্বাভাবিক বা প্রাকৃতিক আর 'সভ্যতা' বড় কৃত্রিম, এতই কৃত্রিম যে তা মানুষের আদিম রক্তের ধারা নিয়ন্ত্রণে অসমর্থ; উত্তরাধুনিক সময়ে তাই নিহিলিজমের জয়জয়কার। শরীরধারীর মূলগত যা ধর্ম-কাম, ঈর্ষা, ক্রোধ, আত্মরক্ষার চেষ্টা - সবটাই প্রাকৃতিক, সুতরাং একেবারে খাঁটি, তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু ঐ যে, 'rational animal' বলে যে কথাটা আছে সেটাকে বারবার মাথায় আনতে বাধ্য হতে হয়। এ দফায় 'rational' শব্দটাই যাকে বলে প্রধান ছেঁড়াকাটার বিষয়।
নিহিলিজম আজকাল যতই স্বাগত হোক না কেন, মানুষের প্রথম সংযত হওয়ার কালে বন্য পশুর অযুক্তি ঝেড়ে যে যুক্তি তার রক্তে ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে, সেই রক্তের ধারা মানুষ আজও বহন করে চলেছে। আর তাই স্বাভাবিক মস্তিষ্কের মানুষ শরীরের চিৎকারের কাছে পুরো আত্মসমর্পণের পর অপরাধবোধে ভোগে, ফ্রয়েডের মতে সুপার ইগো তাকে শাস্তি দেয় যে শাস্তির চিত্র পাওয়া যায় 'ব্ল্যাক সোয়ান' ছবিটির শেষে, যেখানে নিনা শেষমেশ আবিষ্কার করে প্রতিযোগিতা আর লেরয়ের জীবনে নিজের অবস্থান নিশ্চিত করতে গিয়ে সে মূলত নিজেকেই নিজে হত্যা করেছে, নিজের 'হোয়াইট সোয়ান' সুলভ নীতি, নিয়ন্ত্রিত বা সংযতরূপকে কাঁচ মেরেছে।
মানুষ তার সভ্য হয়ে ওঠার প্রক্রিয়ায় কল্পিত স্বর্গের সুখ বা মানসিক শান্তিলাভের জন্যই ধর্ম, দর্শন, নৈতিকতাকে প্রতিষ্ঠিত করেছে এবং নিজেকে অন্য সকল প্রাণীর চেয়ে শ্রেষ্ঠ প্রমাণ করার জন্য সেগুলো কাজে লাগিয়েছে। কিন্তু শরীরধারীর অবধারিত আদিম দুর্বলতা বশত সে সভ্যতার মাঝে থেকেও ক্রমাগত পশুর চেয়েও ঘৃণ্য আচরণ করেছে, কখনো কখনো এমনকি নিজ মানসিক শান্তির জন্য প্রণীত ধর্মকে পর্যন্ত অস্ত্র করে স্বজাতি খুন করেছে, ফিটফাট পোশাক পরে, ভদ্র কথার ফুলঝুরি ছড়িয়ে পারমাণবিক বা জীবাণু অস্ত্র মজুদ করেছে শুধুমাত্র 'instinct' এর বশবর্তী হয়ে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মানুষ আবিষ্কার করেছে বর্বর, নীতি-যুক্তি ছাড়া কাজে সে নিজের পেটেই নিজে ছুরি মেরেছে, আর সেই বোধ থেকেই যুগে যুগে তার মাঝে জন্ম নিয়েছে হতাশা, আত্মহত্যার ইচ্ছা।
এই ছবিটিতে নারীবাদী দর্শনকে আলাদা করা যায় না, তবে সামগ্রিক ভাবে বলা যায় যে,এখানে নারীকে "angel" ধারণা থেকে বের করে আনা হয়েছে। ভিক্টরিয়ানদের "angel of the house" এর মত একটি অত্যন্ত passive ধারণা থেকে বের করে এনে এটাই দেখানো হয়েছে যে আদিম তাড়না নারীর মাঝেও পুরুষের মতোই বিদ্যমান এবং পুরুষের মতো করেই সেই তাড়নায় সাড়া দিয়ে নেতিবাচক ভাবে সেও "active" হয়ে উঠতে পারে।
'ব্ল্যাক সোয়ান' তাই স্বর্গের প্রতি এক শোকগাথা যেখানে স্বর্গ-নরকের ধারণার মাঝামাঝি অবস্থান করা মানুষের নিত্য দ্বন্দ্ব অগতানুগতিক গল্পের ধারায় ক্যারিশম্যাটিক ভাবে উপস্থাপিত হয়েছে।
ছবি: Pinterest
(সর্বস্বত্ত্ব সংরক্ষিত: ঋদভিকা পাল)
©somewhere in net ltd.