| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
হিমন
ভিন্নমত সহ্য করতে পারা এক বিরাট গুণ। সকল ভিন্নমত উদার দৃষ্টিতে দেখার চেষ্টায় আছি।
হোমো ইরেক্টাসদের প্রায় বিশ লাখ বছর আগের আগুনের ব্যবহার থেকে শুরু করে ছয় হাজার বছর আগের চাকা আবিষ্কার, ১৮৩১ সালের বিদ্যুৎ, গত শতাব্দীর অ্যান্টিবায়োটিক, আর এই সেদিনের ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন— শিম্পাঞ্জি ও মানুষের সাধারণ পূর্বপুরুষ থেকে প্রায় সত্তর লাখ বছরের বিবর্তনের পথে মানবজাতির প্রতিটি বড় আবিষ্কার সভ্যতার গতিপথ বদলে দিয়েছে। কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এমন এক প্রযুক্তি, যা একাই সম্ভবত পূর্ববর্তী সব প্রযুক্তিগত বিপ্লবের সম্মিলিত অভিঘাতকেও ছাড়িয়ে যেতে যাচ্ছে, এবং তা আমাদের অনেকের জীবদ্দশাতেই।
বলা হচ্ছে, ২১০০ সাল নাগাদ মানবসভ্যতা যে বৈজ্ঞানিক, প্রযুক্তিগত ও অর্থনৈতিক অগ্রগতি অর্জন করতে পারত, এআইয়ের কল্যাণে ২০৩৫ সালের মধ্যেই তা সম্ভব হয়ে যেতে পারে। কেমন হবে সেই পৃথিবী? মানুষ কি প্রস্তুত এমন এক পরিবর্তনের জন্য, যেখানে শুধু শ্রম নয়, চিন্তা, জ্ঞান, শিক্ষা, সৃজনশীলতা, এমনকি ধর্মীয় কর্তৃত্বও প্রশ্নের মুখে পড়বে?
অতীতের যেকোন যুগান্তকারী আবিষ্কারের অভিঘাত টের পেতে বহুক্ষেত্রে বহু সময় লেগেছে। যেমন ধরুন ১৮৩১ সালের প্রথম বিদ্যুৎ আবিষ্কার হলেও, এখনো এমন অনেক মানুষ এটির উপকার হতে বঞ্চিত। এআই এর দরুণ আগামী ৫ বছরেই প্রায় পঞ্চাশ শতাংশ বেকারত্ব তৈরি হওয়ার আশংকায় সমাজ রাষ্ট্র আর রাজনীতিতে যে প্রতিঘাত তৈরি হতে যাচ্ছে, তার স্বাদ পৃথিবী পেতে যাচ্ছে ২০৩০ সালের মধ্যেই। এ নিয়ে বিস্তারিত দ্বিতীয় পর্ব লিখবো ভাবছি।
এআই এর শক্তি বুঝতে একটি উদাহরণই যথেষ্ট। ধরুন, প্রায় আশি বছর আগে গত শতাব্দীর চল্লিশের দশকের শুরুতে হিটলারকে ঠেকানোর জন্য "ম্যানহাটন প্রকল্প" নামে পদার্থবিদ ওপেনহাইমারের নেতৃত্বে মাত্র ১৫ জন বিজ্ঞানী মিলে প্রায় পাঁচ বছরের প্রচেষ্টায় যে পরমাণু বোমাপ্রযুক্তি তৈরি করে, যা দিয়ে এই গ্রহকে কয়েকবার চূর্ণ-বিচূর্ণ করা যাবে, সেই ১৫ জনের চাইতে শতগুণ বেশি জ্ঞান নিয়ে আপনি ঘুরছেন যদি chatGPT আপনার মুঠোনফোনে থাকে। ভাষা আর চিন্তা দিয়ে মানুষের পক্ষে যা যা সম্ভব, তার সবই সম্ভব এই প্রযুক্তি দিয়ে।
ধরুন, ২০৪১ সালের পৌষের কোন এক বুধবার সন্ধ্যায় নিউইয়র্কের হাডসন নদীর তীরের বাসায় খালেদ মহিউদ্দিনের ভাটা পড়া যৌবনকালে হঠাৎ যৌনতাড়নায় পেয়ে বসলো, স্ত্রীকে ডাকবেন, সাথে সাথে মনে পড়ে গেল সেই হাদিস, বুধবারে স্ত্রীসহবাসের ফলে যদি কোন সন্তান জন্মে, সে হিজরা হবে। এখন কী করবেন খালেদ?
অথবা ধরুন, দুটি পয়সার জন্য দেশ ছেড়ে আপনি ইতালি থাকেন, কিন্তু সহি ইসলাম অনুযায়ী আপনি বিশ্বাস করেন, কোন মুসলমানের দেশ ছেড়ে বিধর্মী দেশে যাওয়া হারাম, তাই আপনি মনে করেন বিধর্মী দেশে আপনার পড়ালেখা হারাম না হলেও, চাকরি করা হারাম, যত আয়রোজগার করেন তাও হারাম, সেই হারাম টাকায় বিয়ে করেছেন সেটিও হারাম, সপ্তাহে অন্তত তিনবার স্ত্রীসহবাসকে জেনা মনে করেন, ঔরসজাত সন্তানকেও বৈধ মনে করেন না। যদিও মনকে সান্ত্বনা দিতে ধর্মচর্চা বাড়িয়েছেন বহুগুণ, তবু নিজেকে বুঝাতে পারেন না, কারণ মনে মনে আপনি ঠিকই জানেন, আপনি বিধর্মী দেশে আছেন দুটো পয়সার জন্য। এখন উপায়?
এমতাবস্তায় খালেদ মহিউদ্দিন অথবা আপনি ইসলামী বিশ্বের একমাত্র খলিফা এনায়েতুল্লা আব্বাসীকে জিজ্ঞেস করতে চাইছেন সঠিক ইসলাম অনুযায়ী আপনাদের করণীয় কী। কিন্তু পশ্চিমে যখন সন্ধ্যা, প্রাচ্যে আব্বাসী তখন জুম মিটিং এ জাতিকে তাহাজ্জুত শেখাচ্ছেন, তাহলে আপনি অথবা খালেদ জীবনের এই কঠিনতম প্রশ্নের উত্তর কোথায় পাবেন?
কয়েকবছরের মধ্যেই এ নিয়ে আর চিন্তার কিছু থাকবে না। আব্বাসীর বুদ্ধিমত্তার দাবী নিশ্চয়ই তাঁর অনুসারীরাও করেন না। তবু ধরে নিলাম তিনি আইনস্টাইনের চেয়েও দ্বিগুণ মেধাবী। তবু তাঁর পক্ষে পৃথিবীর সব বই পড়া সম্ভব নয়, পড়লেও তাৎক্ষণিক স্মৃতিচারণ সম্ভব নয়। কিন্তু, ১৪৪০ এর দশকে জার্মানিতে মুদ্রণযন্ত্র আবিষ্কারের পর থেকে বিগত ছয়শো বছরে এই বিশ্ববহ্মাণ্ডে শুধু আপনার ধর্ম নিয়ে নয়, পৃথিবীর চার হাজার ধর্মের সব ঐশীগ্রন্থ, সেই গ্রন্থ নিয়ে হাজার হাজার বছরে সুদূর নিউইয়র্ক হতে নিয়ে সেই হাটহাজারীর হালদা নদীর ধারে বসে যে যা লিখেছে, অনলাইনে ভিডিও ছেড়েছে, তার সবই ওই এআই জানে, এবং যেকোন মানুষের থেকে অধিকগ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা দিতে পারবে। স্ত্রীসহবাসের আগে খালেদকে, অথবা নিজের সন্তান সত্যিই অবৈধ কিনা তার জন্যে আব্বাসীর জন্য অপেক্ষার প্রয়োজন নেই। মোবাইল খুলে এআইকে জিজ্ঞেস করলেই হয়ে যাবে।
তাহলে কি ধীরে ধীরে এই মোল্লাদের দিন শেষ হয়ে যাবে? ২০৩০ এর পর থেকে বেকারত্বের কারণে দেশে সরকার পতন হওয়া শুরু হলেও, মানুষের নির্বুদ্ধিতা অসীম হওয়ার কারণে মোল্লাতন্ত্রের পতন হয়ত আরো দেরীতে হবে, মোল্লাদের থেকেও এআই নিখুঁত ধর্মীয় প্রশ্নের উত্তর দিতে পারলেও। কিন্তু, তা হবেই।
আপনার বয়স যদি ৩২ হয়, তাহলে আপনি পৃথিবীতে বেঁচে আছেন মাত্র এক বিলিয়ন সেকেন্ড ধরে। মানুষের গড় আয়ু আড়াই বিলিয়ন সেকেন্ড। এই পৃথিবীতে প্রাণের উদ্ভব ঘটে সাড়ে চার বিলিয়ন বছর আগে (সাড়ে চারশ কোটি বছর)। মোটাদাগে এককোষী প্রাণী এমিবা থেকে এই অল্পনীয় দীর্ঘ সময়ের বিবর্তনে মানুষ এই পর্যায়ে এসেছে। আজকের এই কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা ওই এমিবার পর্যায়ে আছে, প্রতি সাত মাসে কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তার শক্তি দ্বিগুণ হচ্ছে। চার বিলিয়ন বছর তো দূর কি বাত, কল্পনা করুন আগামী মাত্র এক বিলিয়ন সেকেন্ডে (৩২ বছর) এই কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে।
৭ই জুন ২০২৬
বার্লিন থেকে
জাহির কবীর হিমন
(এআই কে বলেছিলাম আমার একটা ছবি করে দে, দিয়েছে, কিন্তু বয়স অনেক বাড়িয়ে প্রায় চল্লিশ করে দিয়েছে
©somewhere in net ltd.