নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

জুয়েল তাজিম

জুয়েল তাজিম

অলস হবেন, তো হতাশা পাবেন। শুরু করুন,শেষ হবেই। সামনে এগোতে থাকুন, পথ কমবেই।

জুয়েল তাজিম › বিস্তারিত পোস্টঃ

শব্দের কূটনীতি ও পাকিস্তানের চিরন্তন ‘সহায়তা’র আকুতি: তেহরানের মঞ্চে এক নিখুঁত রূপক

০৪ ঠা জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৩:১৭

তেহরানে আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির শেষ বিদায় ও সম্মাননা জানানোর রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানটি যেন হয়ে উঠেছিল এক নীরব, অথচ অত্যন্ত ধারালো মনস্তাত্ত্বিক রণাঙ্গন। কোনো প্রথাগত রাজনৈতিক ভাষণ নয়, কোনো কড়া কূটনৈতিক বিবৃতিও নয়—ইরান তাদের সুক্ষ্ম বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিল পবিত্র কুরআনের আয়াতের মোক্ষম ব্যবহারে। উপস্থিত প্রতিটি দেশের অতীত, বর্তমান এবং তাদের ভূ-রাজনৈতিক দোদুল্যমানতার ওপর ভিত্তি করে নিখুঁতভাবে বাছাই করা হয়েছিল একেকটি আয়াত। তুরস্কের নিষ্ক্রিয়তা আর সৌদি আরবের সুবিধাবাদী নীতিকে কুরআনের আয়নায় কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর পর, ইরানের এই সুক্ষ্ম তিরস্কারের রাডারে এবার ধরা পড়ল পাকিস্তান। তবে পাকিস্তানের ক্ষেত্রে দৃশ্যটি শুধু মনস্তাত্ত্বিক বার্তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকল না, বরং তাদের দীর্ঘদিনের রাষ্ট্রীয় চরিত্রের এক চমৎকার ও কিছুটা রসাত্মক মেলোড্রামায় রূপ নিল।

পাকিস্তানের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল যখন সম্মান জানাতে মঞ্চে এসে দাঁড়াল, তখন ইরানি ক্বারী তিলাওয়াত করলেন সূরা বনি ইসরাইলের (বা সূরা ইসরা) ৮০ নম্বর আয়াত। যেখানে বলা হয়েছে:

“হে আমার প্রতিপালক! আমাকে যেখানেই প্রবেশ করাবেন সত্য ও সম্মানের সাথে প্রবেশ করাবেন, আর যেখান থেকেই বের করবেন সত্য ও সম্মানের সাথে বের করবেন; এবং আপনার পক্ষ থেকে আমাকে এমন এক কর্তৃত্ব বা শক্তি দান করুন, যা আমাকে সর্বদা সাহায্য করবে।”

আপাতদৃষ্টিতে অত্যন্ত পবিত্র ও সুন্দর এই দোয়াস্বরূপ আয়াতটির অন্তরালে লুকিয়ে ছিল পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক ইতিহাসের এক চরম বাস্তবতার ইঙ্গিত। এই আয়াতের মূল সুর হলো একটি নিরাপদ ‘প্রবেশ ও প্রস্থান’ এবং একটি ‘সহায়ক শক্তি বা কর্তৃত্বের’ সন্ধান। পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির দিকে তাকালে এই আয়াতের চেয়ে যাতায়াত ও ক্ষমতার নিখুঁত উপমা আর হতেই পারে না। দেশটির একের পর এক সরকার, তা সে সামরিক হোক কিংবা বেসামরিক, কীভাবে ক্ষমতায় ‘প্রবেশ’ করবে এবং কীভাবে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই নাটকীয়ভাবে ক্ষমতা থেকে তাদের ‘প্রস্থান’ ঘটবে—এই চিরন্তন অনিশ্চয়তায় তারা সর্বদা ভুগেছে। একই সাথে, নিজের পায়ে দাঁড়ানোর চেয়ে সবসময় নেপথ্যের কোনো বড় শক্তি বা ‘সহায়ক কর্তৃত্বের’ (তা সে অভ্যন্তরীণ এস্টাবলিশমেন্ট হোক কিংবা ওয়াশিংটনের মতো কোনো বৈশ্বিক অভিভাবক) ওপর ভর করে চলাই যেন পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় নিয়তিতে পরিণত হয়েছে। ইরানের বাছাই করা এই আয়াত যেন পাকিস্তানের সেই চিরকালীন রাজনৈতিক সংকট এবং ‘সহায়তা’র জন্য আকুল আকুতিকেই আলতো করে ছুঁয়ে গেল।

তবে অনুষ্ঠানের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও সূক্ষ্ম রসাত্মক মুহূর্তটি তৈরি হলো আয়াত তিলাওয়াত শেষ হওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে। কূটনৈতিক মঞ্চে কোন দেশের প্রতিনিধিরা কেমন আচরণ করছেন, তা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছিল। দেখা গেল, অন্যান্য দেশের প্রতিনিধি দল, যেমন আফগানিস্তানের তালেবান প্রতিনিধিরা বা অন্য দেশের প্রতিনিধিরা, ক্বারীর তিলাওয়াত পুরোপুরি শেষ হওয়া পর্যন্ত শান্তভাবে অপেক্ষা করলেন এবং তিলাওয়াত শেষ হওয়ার পর প্রথানুযায়ী মোনাজাতের জন্য হাত তুললেন। কিন্তু পাকিস্তান ডেলিগেশনের ক্ষেত্রে ঘটল উল্টোটা। তারা ক্বারী সাহেব আয়াত শেষ করার আগেই, অনেকটা তড়িঘড়ি করে আগে থেকেই হাত তুলে মোনাজাতের ভঙ্গিতে বসে রইলেন।

পাকিস্তানের প্রতিনিধিদের এই আগ বাড়িয়ে হাত তুলে বসে থাকার দৃশ্যটি যেন তাদের সামগ্রিক পররাষ্ট্রনীতি ও জাতীয় চরিত্রের এক জীবন্ত প্রতীকী রূপ। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কোনো কিছু পাওয়ার বা পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হওয়ার আগেই হাত বাড়িয়ে তৈরি থাকা, অন্যের সাহায্যের আশায় আগাম প্রস্তুতি নিয়ে রাখা এবং নিজের সক্ষমতার চেয়ে অন্যের ‘অনুদান ও সহায়তার’ ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হওয়া—পাকিস্তানের এই মজ্জাগত অভ্যাসটিই যেন সেদিন তেহরানের শোকমঞ্চে অসতর্কতাবশত প্রকাশ পেয়ে গেল।

ইরান কোনো কটু কথা বলেনি, প্রটোকলের কোনো ব্যত্যয় ঘটায়নি। কিন্তু সূরা ইসরা’র সেই নির্দিষ্ট আয়াতের গভীর অর্থ এবং তার বিপরীতে পাকিস্তানি প্রতিনিধিদের সেই আগাম হাত তুলে বসে থাকার দেহভঙ্গি—সব মিলিয়ে পুরো পরিবেশটিতে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য তৈরি হলো। উপস্থিত সচেতন দর্শকদের কাছে এটি স্পষ্ট হয়ে উঠল যে, ইরান কীভাবে মাত্র একটি আয়াতের মাধ্যমে পাকিস্তানের রাজনৈতিক গোলকধাঁধাকে ফুটিয়ে তুলেছে, আর পাকিস্তানও কীভাবে তাদের চিরচেনা অবয়বটি অজান্তেই বিশ্বমঞ্চে মেলে ধরেছে। আধুনিক কূটনৈতিক লড়াইয়ে ইরান আরও একবার প্রমাণ করল, তারা শুধু শব্দের সুক্ষ্ম প্রয়োগেই পারদর্শী নয়, প্রতিপক্ষের অবচেতন মনকে দিয়ে তাদের নিজেদের আসল রূপটি স্ক্রিপ্ট ছাড়াই মঞ্চস্থ করিয়ে নেওয়ার শিল্পেও সমান অনন্য।

মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.