| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
চট্টগ্রামের “ও.আর. নিজাম রোড”—নামটি চট্টগ্রামবাসীর কাছে খুবই পরিচিত। প্রতিদিন হাজারো মানুষ এই সড়ক দিয়ে যাতায়াত করেন। পাশে রয়েছে হাসপাতাল, ক্লিনিক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও আবাসিক এলাকা। কিন্তু এই ব্যস্ত সড়কের নামের পেছনে যে মানুষটির দীর্ঘ ও বর্ণময় জীবনগাথা রয়েছে, তাঁকে আমরা কতজনই বা চিনি?
তিনি ওবায়দুর রহমান নিজাম—সংক্ষেপে ও.আর. নিজাম।
একজন চট্টগ্রামবাসী থেকে তিনি হয়ে উঠেছিলেন আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ী, Sarawak-এর প্রশাসনিক কর্মকর্তা, সমাজসেবী, পৌর নেতৃত্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি এবং বাঙালি উদ্যোক্তাদের ব্যাংক প্রতিষ্ঠার ইতিহাসের একজন গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার।
চট্টগ্রাম থেকে সুদূর Sarawak
ও.আর. নিজামের জন্ম চট্টগ্রামে। তাঁর জন্মসন নিয়ে বিভিন্ন উৎসে ১৯০২ ও ১৯০৩—দুই ধরনের তথ্য পাওয়া যায়। শৈশব ও শিক্ষাজীবন কাটে চট্টগ্রামে। পরবর্তী সময়ে তিনি বিদেশে পাড়ি জমান এবং কর্মজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় কাটান তৎকালীন ব্রিটিশ মালয় অঞ্চলে, বিশেষ করে Sarawak-এ।
সেখানে তিনি Borneo Company-তে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে উন্নীত হন। সে সময় একজন বাঙালির পক্ষে ঔপনিবেশিক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে এতটা গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে পৌঁছানো ছিল নিঃসন্দেহে ব্যতিক্রমী ঘটনা।
তাঁর দক্ষতা ছিল হিসাবরক্ষণ, ব্যবসা পরিচালনা ও প্রশাসনিক কাজে। কর্মদক্ষতা, সততা ও নেতৃত্বের গুণে তিনি স্থানীয় ব্যবসা ও প্রশাসনিক পরিমণ্ডলেও পরিচিত হয়ে ওঠেন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং এক অসাধারণ অধ্যায়
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ তাঁর জীবনেও গভীর ছাপ ফেলে।
জাপানি বাহিনী Sarawak দখল করার পর ও.আর. নিজাম বন্দিত্বের শিকার হন। যুদ্ধের পর ব্রিটিশ প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ তাঁকে Sarawak-এর Administrator হিসেবে দায়িত্ব দেয়।
অর্থাৎ একজন বাঙালি মুসলমান, যিনি একসময় চট্টগ্রাম থেকে কর্মজীবনের সন্ধানে বিদেশে গিয়েছিলেন, তিনি এক পর্যায়ে সুদূর Sarawak-এর প্রশাসনিক দায়িত্বে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন।
এই অধ্যায়টি তাঁর জীবনের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিকগুলোর একটি।
দেশে ফিরে চট্টগ্রামের জন্য কাজ
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ও.আর. নিজাম নিজ দেশে ফিরে আসেন।
এরপর তাঁর কর্মজীবনের বড় অংশ জুড়ে যায় চট্টগ্রামের সঙ্গে। ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পের পাশাপাশি তিনি নগরের সামাজিক ও নাগরিক উন্নয়নেও ভূমিকা রাখতে শুরু করেন।
তিনি চট্টগ্রাম পৌরসভার Vice-Chairman হিসেবে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করেন। তখনকার এই পদটি বর্তমান অর্থে নগর নেতৃত্বের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অবস্থান ছিল।
প্রায় ১৫ বছর ধরে পৌর নেতৃত্বে থাকার কারণে চট্টগ্রামের নগরজীবনের ইতিহাসে তাঁর নাম স্থায়ীভাবে জায়গা করে নেয়।
আজকের ও.আর. নিজাম রোড সেই নাগরিক অবদানেরই একটি স্মারক।
শুধু ব্যবসায়ী নন, উদ্যোক্তাও
ও.আর. নিজামের আরেকটি বড় পরিচয়—তিনি ছিলেন বাঙালি উদ্যোক্তা শ্রেণির একজন অগ্রগামী প্রতিনিধি।
১৯৫৯ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় Eastern Mercantile Bank Limited প্রতিষ্ঠিত হয় কয়েকজন বাঙালি উদ্যোক্তার উদ্যোগে। ব্যাংকটির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান হিসেবে ও.আর. নিজামের নাম বিভিন্ন ব্যাংক-সংক্রান্ত নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই ব্যাংক প্রতিষ্ঠার পেছনে একটি বড় উদ্দেশ্য ছিল—তৎকালীন সময়ে যেসব বাঙালি ব্যবসায়ী সহজে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাংকঋণ পেতেন না, তাঁদের জন্য নিজস্ব উদ্যোক্তা-নিয়ন্ত্রিত ব্যাংকিংয়ের সুযোগ তৈরি করা।
আজকের Pubali Bank PLC সেই Eastern Mercantile Bank-এরই উত্তরসূরি।
অর্থাৎ চট্টগ্রামের একটি রাস্তার নামের সঙ্গে যে মানুষটির স্মৃতি জড়িয়ে আছে, তাঁর সঙ্গে বাংলাদেশের বেসরকারি ব্যাংকিংয়ের ইতিহাসও গভীরভাবে যুক্ত।
Eastern Mercantile Bank থেকে Pubali Bank
১৯৫৯ সালে যাত্রা শুরু করা Eastern Mercantile Bank স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে জাতীয়করণ করা হয় এবং নাম হয় Pubali Bank।
পরবর্তীতে ১৯৮৩ সালে ব্যাংকটি পুনরায় বেসরকারি খাতে ফিরে আসে এবং Pubali Bank Limited নামে নতুন পর্ব শুরু করে।
এভাবেই একটি বাঙালি উদ্যোক্তা-উদ্যোগ থেকে জন্ম নেওয়া ব্যাংক রাষ্ট্রীয় মালিকানার একটি অধ্যায় পেরিয়ে আবার বেসরকারি ব্যাংকিংয়ের জগতে ফিরে আসে।
এই দীর্ঘ পথচলাই পূবালী ব্যাংকের ইতিহাসকে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের অন্যতম পুরোনো ধারাবাহিক গল্পে পরিণত করেছে।
২০২৬-এ পূবালী ব্যাংক—৬৭ বছরের পথচলা
১৯৫৯ থেকে ২০২৬।
অর্থাৎ ৬৭ বছর।
ছয় দশকের বেশি সময় ধরে ব্যাংকটি বাংলাদেশের অর্থনীতির বিভিন্ন পর্যায়ের পরিবর্তনের সাক্ষী।
স্বাধীনতার পূর্ববর্তী পূর্ব পাকিস্তান, স্বাধীন বাংলাদেশ, জাতীয়করণ, পুনঃবেসরকারিকরণ, আশির দশকের অর্থনৈতিক পরিবর্তন, নব্বইয়ের দশকের বাজার অর্থনীতি, একবিংশ শতাব্দীর ডিজিটাল ব্যাংকিং—সবকিছুর মধ্য দিয়েই পূবালী ব্যাংক তার যাত্রা অব্যাহত রেখেছে।
২০২৫ সালের সর্বশেষ পূর্ণাঙ্গ আর্থিক তথ্য অনুযায়ী ব্যাংকটির মোট আমানত প্রায় ৮৯,৫১৯ কোটি টাকা এবং মোট Advances প্রায় ৭১,১৪১ কোটি টাকা। একই বছরে ব্যাংকটির রপ্তানি ব্যবসার পরিমাণ ছিল প্রায় ৩৮,৬৬৪ কোটি টাকা এবং নিট মুনাফা প্রায় ১,০৮০ কোটি টাকা।
২০২৫ সালের আর্থিক ফলাফলে ব্যাংকটি operating profit-এর ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি দেখিয়েছে।
আর ২০২৬ সালে এসে ব্যাংকের নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী এর নেটওয়ার্ক দাঁড়িয়েছে ৫১৯টি শাখা, ২৮১টি উপশাখা এবং ২১টি ইসলামিক ব্যাংকিং শাখা/উপশাখা/উইন্ডোতে।
অর্থাৎ ১৯৫৯ সালে যে উদ্যোগের জন্ম হয়েছিল কয়েকজন বাঙালি উদ্যোক্তার স্বপ্ন থেকে, ২০২৬ সালে সেটি একটি বৃহৎ জাতীয় ব্যাংকিং নেটওয়ার্কে পরিণত হয়েছে।
একটি রাস্তা, একটি মানুষ, একটি ঐতিহ্য
চট্টগ্রামের ও.আর. নিজাম রোড দিয়ে প্রতিদিন আমরা হয়তো দ্রুত চলে যাই।
কখনো হাসপাতালের কাজে, কখনো অফিসে, কখনো বাজারে, কখনো বাসায় ফেরার পথে।
কিন্তু রাস্তার নামটি যেন একটু থামিয়ে আমাদের মনে করিয়ে দিতে পারে—
এই নামের পেছনে ছিলেন এমন একজন মানুষ, যাঁর জীবন শুধু চট্টগ্রামের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না।
চট্টগ্রামের এক তরুণ বিদেশে গিয়েছিলেন নিজের ভাগ্য গড়তে।
তিনি Sarawak-এ ব্যবসা ও প্রশাসনে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন।
যুদ্ধ ও বন্দিত্বের কঠিন সময় পেরিয়েছেন।
নিজ দেশে ফিরে চট্টগ্রামের নাগরিক জীবনে ভূমিকা রেখেছেন।
এবং বাঙালি উদ্যোক্তাদের ব্যাংকিং উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হয়ে এমন একটি প্রতিষ্ঠানের ভিত্তি নির্মাণে অংশ নিয়েছেন, যার উত্তরসূরি আজও দেশের অর্থনীতিতে সক্রিয়।
তাই “ও.আর. নিজাম রোড” শুধু একটি রাস্তার নাম নয়।
এটি চট্টগ্রামের একজন বিস্ময়কর মানুষের স্মৃতি।
আর সেই স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের ব্যাংকিং ইতিহাসেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়—
Eastern Mercantile Bank থেকে Pubali Bank PLC—১৯৫৯ থেকে ২০২৬, ৬৭ বছরের এক দীর্ঘ ঐতিহ্যের পথচলা।
একটি রাস্তা আমাদের প্রতিদিনের চলার পথ দেখায়।
কিন্তু কিছু রাস্তার নাম আমাদের ইতিহাসের পথও দেখায়।
ও.আর. নিজাম রোড তেমনই একটি রাস্তা।
©somewhere in net ltd.
১|
০২ রা অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৩:০২
মোঃ খালিদ সাইফুল্লাহ্ বলেছেন: সশ্রদ্ধ সালাম! উনার পরিচয় জেনে গর্বিত। পোস্টদাতাকে ধন্যবাদ!