| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
িজল্লুল
আমি ইকবাল জিল্লুল মজিদ। গত প্রায় ৪৫ বছর ধরে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে কাজ করে আসছি—গ্রাম থেকে শহর, মাঠ থেকে নীতিনির্ধারণের টেবিল পর্যন্ত। এই দীর্ঘ সময়ে আমার কাজের কেন্দ্রবিন্দু ছিল মানুষের মৌলিক অধিকার, বিশেষ করে প্রাইমারি হেলথ কেয়ার ও কমিউনিটি উন্নয়ন। আমার কাজ কোনো এক জায়গায় সীমাবদ্ধ ছিল না। গ্রামীণ জনপদে কাজ করতে গিয়ে যেমন বাস্তব দারিদ্র্য, অবহেলা ও বঞ্চনাকে খুব কাছ থেকে দেখেছি, তেমনি শহরের প্রান্তিক এলাকাগুলোতে দেখেছি ভিন্ন রূপে একই অসহায়ত্ব। এই অভিজ্ঞতাগুলো আমাকে শিখিয়েছে—উন্নয়ন মানে কেবল অবকাঠামো নয়, উন্নয়ন মানে মানুষের মর্যাদা নিশ্চিত করা। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পরিসরে কাজের অভিজ্ঞতা এই দীর্ঘ সময়ে আমি বিভিন্ন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পেয়েছি। প্রতিটি কাজ আমাকে নতুনভাবে চিন্তা করতে শিখিয়েছে—সংস্কৃতি, বাস্তবতা ও মানুষের প্রয়োজন বোঝার বিষয়ে। বিশেষ করে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা আমাকে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর শক্তি ও সীমাবদ্ধতা দুটোই বুঝতে সাহায্য করেছে। কাগজে যে নীতিমালা থাকে, মাঠপর্যায়ে তার প্রয়োগ কতটা কঠিন—এটি আমি কাছ থেকে দেখেছি। ফলে আমার দৃষ্টিভঙ্গি সবসময় বাস্তবভিত্তিক থেকেছে। নীতিনির্ধারণ ও বোর্ড পর্যায়ের অভিজ্ঞতা কর্মজীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে আমি কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বোর্ড মেম্বার হিসেবে কাজ করে আসছি। এই দায়িত্ব আমাকে শিখিয়েছে—নীতিনির্ধারণ মানে ক্ষমতা নয়, নৈতিকতা। সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় মানুষের প্রভাব, স্বচ্ছতা ও দীর্ঘমেয়াদি ফলাফল বিবেচনা করা কতটা জরুরি, তা আমি এই অভিজ্ঞতা থেকে উপলব্ধি করেছি। আল ইনসান ইউম্যান কেয়ার ফাউন্ডেশনের সঙ্গে পথচলা গত ৪৪ বছর ধরে আমি নিজের তৈরি আল ইনসান ইউম্যান কেয়ার ফাউন্ডেশন–এর মাধ্যমে মানুষের পাশে থাকার চেষ্টা করে যাচ্ছি। এটি আমার জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই ফাউন্ডেশনের কাজ আমাকে শিখিয়েছে—সেবা কখনো এককালীন নয়, সেবা একটি ধারাবাহিক অঙ্গীকার। এই দীর্ঘ সময়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কাজ করতে গিয়ে আমি মানুষের আস্থা, কষ্ট ও প্রত্যাশাকে খুব কাছ থেকে দেখেছি। এই অভিজ্ঞতাগুলোই আমাকে বারবার মনে করিয়ে দিয়েছে—মানুষের পাশে দাঁড়ানো কোনো প্রকল্প নয়, এটি একটি দায়িত্ব। চিকিৎসা সাধনা: হোমিওপ্যাথির দীর্ঘ পথ গত ৪৪ বছর ধরে নিয়মিত হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা বিজ্ঞান চর্চা করে আসছি। চিকিৎসা আমার কাছে শুধু পেশা নয়, এটি একটি মানবিক সাধনা। রোগীর শরীরের পাশাপাশি তার মানসিক অবস্থা, পারিবারিক বাস্তবতা ও সামাজিক প্রেক্ষাপট বোঝার চেষ্টা করেছি সবসময়। এই চিকিৎসা অভিজ্ঞতা আমাকে আরও সংবেদনশীল, আরও ধৈর্যশীল এবং আরও দায়িত্ববান করে তুলেছে। লেখালেখি: নিজের সঙ্গে নিজের কথোপকথন ছোটবেলা থেকেই লেখালেখির অভ্যাস ছিল। সময়ের সাথে সাথে এই অভ্যাস এখন আরও গভীর হয়েছে। লেখালেখি আমার কাছে আত্মপ্রকাশ নয়, আত্মপর্যালোচনা। সমাজ, রাষ্ট্র, মানুষ এবং নিজের অবস্থান—সবকিছুর সাথেই লেখার মাধ্যমে আমি কথোপকথন চালিয়ে যাই। আমি বিশ্বাস করি, লেখা হলো সময়ের সাক্ষ্য রেখে যাওয়ার একটি দায়িত্বশীল উপায়। শেষ কথা আমার জীবনের এই দীর্ঘ পথচলায় আমি কোনো পূর্ণতার দাবি করি না। আমি চেষ্টা করেছি শেখার, বোঝার এবং যতটা সম্ভব মানুষের পাশে থাকার। ভুল করেছি, শিখেছি, আবার পথ চলেছি।
রমজান এমন একটি মাস, যেখানে মানুষ নিজের ভেতরের দিকে তাকানোর সুযোগ পায়। বছরের অন্য সময় আমরা ব্যস্ত থাকি কাজ, পরিবার, প্রতিযোগিতা ও দুনিয়াবী চিন্তায়। কিন্তু রমজান এসে আমাদের থামতে শেখায়। এই থামার মধ্যেই শুরু হয় আত্মশুদ্ধির প্রথম ধাপ—তাওবা ও ইস্তিগফার। অন্তর পরিষ্কার করার কাজ বাইরে থেকে নয়, ভেতর থেকে শুরু হয়। আর সেই ভেতরের পরিশুদ্ধির চাবিকাঠি হলো আন্তরিক অনুতাপ।
আল্লাহ তাআলা আল-কুরআন-এ বলেন, “হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর কাছে খাঁটি তাওবা কর।” (৬৬:৮)। এই খাঁটি তাওবা মানে কেবল মুখে ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ বলা নয়; বরং ভুল স্বীকার করা, অনুতপ্ত হওয়া এবং আর সেই ভুলে ফিরে না যাওয়ার দৃঢ় সংকল্প করা। যখন মানুষ নিজের ভুল স্বীকার করে, তখন তার অহংকার ভেঙে যায়। আর অহংকার ভাঙা ছাড়া অন্তর পরিষ্কার হয় না।
গুনাহ মানুষের অন্তরে একটি দাগ সৃষ্টি করে। হাদিসে এসেছে, মানুষ যখন পাপ করে, তার অন্তরে একটি কালো দাগ পড়ে; আর তাওবা করলে সেই দাগ মুছে যায়। অর্থাৎ তাওবা হলো হৃদয়ের ধোয়ার প্রক্রিয়া। আমরা প্রায়ই বাহ্যিক পরিচ্ছন্নতার দিকে যত্নবান, কিন্তু অন্তরের পরিচ্ছন্নতা ভুলে যাই। রমজান সেই ভুলে যাওয়া কাজটি মনে করিয়ে দেয়। ক্ষুধা, সংযম ও ইবাদতের পরিবেশ মানুষকে সংবেদনশীল করে তোলে। তখন সে নিজের ভুলগুলো স্পষ্টভাবে দেখতে পায়।
ইস্তিগফার মানে ক্ষমা প্রার্থনা। এটি কেবল শব্দ নয়, এটি আত্মার আর্তনাদ। যখন মানুষ বলে “আস্তাগফিরুল্লাহ”, তখন সে আল্লাহর কাছে স্বীকার করে—আমি দুর্বল, আমি ভুল করেছি, আমি আপনার ক্ষমা চাই। এই স্বীকারোক্তি অন্তরকে নরম করে। কঠিন হৃদয় নরম না হলে আলোর প্রবেশ ঘটে না। রমজানের রাতের নির্জনতা, তাহাজ্জুদ, দোয়া—এসব মুহূর্ত ইস্তিগফারকে গভীর করে তোলে।
মুহাসাবা বা আত্মসমালোচনা হলো তাওবার অপরিহার্য অংশ। প্রতিদিন কিছু সময় নিয়ে নিজেকে প্রশ্ন করা—আজ আমি কাকে কষ্ট দিলাম? কোথায় মিথ্যা বললাম? কোথায় অহংকার দেখালাম?—এই প্রশ্নগুলো মানুষকে ভেতর থেকে জাগিয়ে তোলে। রমজানের পরিবেশ এই আত্মসমালোচনাকে সহজ করে। কারণ এই মাসে মানুষ স্বাভাবিকভাবেই সংযত থাকে, তাই তার বিবেক বেশি সক্রিয় থাকে।
রমজান আমাদের শেখায়, গুনাহবোধ কোনো দুর্বলতা নয়; এটি ঈমানের লক্ষণ। যে ব্যক্তি ভুল বুঝতে পারে না, সে সংশোধনও করতে পারে না। কিন্তু যে ব্যক্তি ভুল স্বীকার করে এবং ক্ষমা প্রার্থনা করে, সে ধীরে ধীরে অন্তরের কালিমা দূর করতে পারে। তাওবা অন্তরকে হালকা করে, ইস্তিগফার হৃদয়কে প্রশান্ত করে এবং মুহাসাবা মানুষকে সৎ ও সচেতন করে তোলে।
এই মাসে রহমতের দরজা উন্মুক্ত থাকে। তাই তাওবা দ্রুত কবুল হওয়ার আশা থাকে। যখন মানুষ আন্তরিকভাবে ফিরে আসে, তখন তার অতীতের অন্ধকার ধীরে ধীরে আলোয় রূপান্তরিত হয়। তাওবা মানে শুধু পাপ থেকে ফিরে আসা নয়; এটি আল্লাহর দিকে ফিরে যাওয়া।
সবশেষে বলা যায়, অন্তর পরিষ্কার করার প্রথম ধাপ হলো নিজের ভুল স্বীকার করা। রমজান সেই সাহস দেয়। তাওবা ও ইস্তিগফার মানুষকে নতুনভাবে শুরু করার সুযোগ দেয়। যেমন বৃষ্টির পানি ধুলোমাখা জমিনকে পরিষ্কার করে, তেমনি আন্তরিক তাওবা হৃদয়ের কালিমা ধুয়ে দেয়।
রমজান আমাদের আহ্বান জানায়—নিজের ভেতরের দিকে তাকাও, ভুলগুলো স্বীকার করো, ক্ষমা চাও এবং নতুন মানুষ হয়ে উঠো। কারণ পরিষ্কার অন্তরই আল্লাহর নিকটতম হওয়ার প্রথম শর্ত।
©somewhere in net ltd.