| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
সৈয়দ কুতুব
নিজের অজ্ঞতা নিজের কাছে যতই ধরা পড়ছে প্রচলিত বিশ্বাসের প্রতি ততই অবিশ্বাস জন্মাছে!
চায়ের দোকানে বসে তিনজন। ইমরান, ফয়সাল আর আকরাম। তিনজনের চোখেই একই স্বপ্ন—বড়লোক হওয়া, পরিবারকে সচ্ছল জীবন দেওয়া, গ্রামে ফিরে গর্ব নিয়ে হাঁটা। কিন্তু বাস্তবতা? তিনজনেরই হাতে শূন্য। শিক্ষা আছে, দক্ষতা আছে, কিন্তু সুযোগ নেই।
ইমরান বিএ পাস করেছে। কত জায়গায় দৌড়েছে, কত সিভি জমা দিয়েছে—ফলাফল একই, "আমরা জানাবো।" বাবা মাঠে হাড়ভাঙা খাটুনি করেন। মা প্রতিদিন একবেলা খেয়ে সন্তানদের দুবেলা খাওয়ান। এই দারিদ্র্য ইমরানের বুকে পাথরের মতো চেপে বসেছে। ফয়সাল জগন্নাথপুরের রাস্তায় আতর বিক্রি করে, মসজিদের সামনে সারাদিন দাঁড়িয়ে থাকে। কয়েকশ টাকার জন্য রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে। কিন্তু পাঁচ ভাইবোনের সংসার, দিনমজুর বাবা—এভাবে কি চলে? আর আকরাম? সে ওয়েল্ডিং শিখেছে, ভেবেছিল হাতে কাজ থাকলে চাকরি মিলবেই। কিন্তু না। প্রতিটা জায়গায় "পরিচয়" লাগে, "তদবির" লাগে। গরিবের ছেলে হলে শুধু দক্ষতা দিয়ে কিছু হয় না।
রাতে টিভিতে তারা দেখে —বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মানুষ কী সুখে আছে! দুবাই, রাশিয়া, ইতালি—কোথায় নেই সুযোগ ! তিনজনই স্বপ্ন দেখে। কিন্তু জানে না, এই স্বপ্নই একদিন তাদের কাল হবে।
ফয়সালের মনে একটা দ্বন্দ্ব চলছিল অনেকদিন ধরে। সে নিয়মিত ওয়াজ শুনত। কিছু বয়ানে জিহাদের কথা শুনত। ইসলামের শত্রুরা কীভাবে মুসলমানদের ওপর অত্যাচার করছে, আফগানিস্তানে কীভাবে "ইসলামি ইমারত" গড়ে উঠছে—এসব কথা ফয়সালের মাথায় গেঁথে যেত। একদিন কে যেন তাকে বলল, "তুমি কি সত্যিকারের মুসলমান হতে চাও? তাহলে দুবাই যাও। সেখান থেকে পাকিস্তান। সেখানে আসল ইসলামের জন্য লড়াই হচ্ছে।" ফয়সালের মনে হলো—হ্যাঁ, এটাই তো পথ! দেশে কী আছে? বেকারত্ব, দারিদ্র্য, অপমান। কিন্তু পাকিস্তানে গেলে হয়তো সে একজন "যোদ্ধা" হতে পারবে। আফগানিস্তান তো এখন ইসলামি ইমারত! সেখানে গেলে সম্মান পাবে, আল্লাহর পথে লড়তে পারবে।
মাকে বলল, "আম্মা, দুবাই যাচ্ছি। হিজামা সেন্টারে কাজ পেয়েছি।" মা চায়না বেগম আশায় বুক বাঁধলেন। ছেলে বিদেশে যাচ্ছে! হয়তো ভালো থাকবে। কিন্তু ফয়সাল গেল পাকিস্তানে। যোগ দিল তেহরিক-ই-তালিবান-এ। তার মনে হচ্ছিল, সে এখন একজন "মুজাহিদ"। কিন্তু বাস্তবতা? সে হয়ে গেল একটা সশস্ত্র সংগঠনের ছোট একটা পণ। তাকে কেউ জিজ্ঞেস করেনি, সে কী চায়। তাকে শুধু একটা বন্দুক ধরিয়ে দিয়ে বলা হলো, "যুদ্ধ করো।" একদিন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অভিযানে গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল ফয়সাল। তার পকেট থেকে বের হলো বাংলাদেশের আইডি কার্ড। পাকিস্তানের গণমাধ্যমে ছবি এলো। মা চায়না বেগম সেই ছবি দেখলেন—বুকটা ফেটে গেল। "ও কারও খপ্পরে পড়ে পাকিস্তানে গেছে," চায়না বেগম কাঁদতে কাঁদতে বললেন। কিন্তু এখন আর কিছু করার নেই। ফয়সাল চলে গেছে—চিরদিনের জন্য।
আকরামের টিভিতে একদিন বিজ্ঞাপন দেখল। রাশিয়া ওয়েল্ডারদের নিয়োগ দিচ্ছে। মাসিক বেতন ৩০ হাজার রুবল—বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৫০ হাজার! আকরামের চোখ ছানাবড়া। এত টাকা! এত টাকা পেলে তো সংসার সামলানো যাবে। টিভিতে নিয়মিত আসে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের খবর, কিন্তু আকরাম সেদিকে মনোযোগ দেয়নি। সে শুধু দেখেছে টাকা, সুযোগ। আকরাম মনে মনে ভাবত, "রাশিয়া তো ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে। কিন্তু আসল যুদ্ধ তো আমেরিকার বিরুদ্ধে। আমেরিকা তো মুসলমানদের সবচেয়ে বড় শত্রু। ইরাক, আফগানিস্তান, ফিলিস্তিন—কোথায় নেই তাদের হাত? এই দেশটা ধ্বংস হোক।" আকরাম রাশিয়াকে সমর্থন করত। মনে মনে ভাবত, রাশিয়া তো মার্কিনদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে আছে। সুতরাং রাশিয়া গেলে খারাপ কী?
আকরাম রাশিয়া গেল। প্রথম কয়েক মাস কাজ করল একটা চায়না কোম্পানিতে। ওয়েল্ডিং করত। বেতন তেমন না হলেও পরিবারে কিছু টাকা পাঠাতে পারত। সংসারে স্বস্তি ফিরেছিল। কিন্তু হঠাৎ একদিন কোম্পানির লোকজন আকরামকে মারধর করা শুরু করল। খাবার দেওয়া বন্ধ করে দিল। একদিন কয়েকজন এসে তাকে জোর করে একটা কাগজে সই করাল। রুশ ভাষায় লেখা। আকরাম কিছু বুঝল না। তাকে বলা হলো, "এটা চুক্তিপত্র। তুমি রাশিয়ান সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছ।" আকরাম আঁতকে উঠল। "কী বলছেন? আমি তো ওয়েল্ডার! আমি যুদ্ধে যাব কেন?" কিন্তু কেউ শুনল না। তাকে বলা হলো, "তোমার আর ফিরে যাওয়ার উপায় নেই। যুদ্ধ করতেই হবে।" পরিবার জানতে পারল। মা মোবিনা বেগম কাঁদতে কাঁদতে বললেন, "আমার ছেলে যুদ্ধে যাবে কেন? ওকে ফিরিয়ে আনো!" কিন্তু কে শুনবে?
আকরামকে ট্রেনিং দেওয়া হলো। তারপর পাঠানো হলো ইউক্রেনের সীমান্তে। সম্মুখ সারিতে। মিসাইল হামলার ঝুঁকিতে। ১৩ এপ্রিল থেকে আকরামের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেল। পরিবার উদ্বিগ্ন। ১৭ এপ্রিল রাতে একজন সহযোদ্ধা ফোন করল। বলল, "আকরাম মারা গেছে। ইউক্রেনীয় মিসাইল হামলায়।" বাবা মোরশেদ মিয়া কাঁদতে কাঁদতে বললেন, "দালাল বলেছিল পোল্যান্ড পাঠাবে। আমার কাছ থেকে সাড়ে ৯ লাখ টাকা নিয়ে গেল। আর আমার ছেলেটা মরে গেল যুদ্ধে। আমার ছেলেটার লাশ ফিরিয়ে দাও।" কিন্তু লাশও ফেরেনি। আকরামের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ৪ লাখ টাকা জমা হয়েছিল—যুদ্ধের বিনিময়ে। কিন্তু সেই টাকা দিয়ে কি প্রাণ ফেরানো যায়?
ইমরান স্বপ্ন দেখত ইতালি যাওয়ার। সে শুনেছিল, ইতালিতে গেলে মাসে লাখ টাকা আয় করা যায়। ইউরোপ! সেখানে গেলে জীবন বদলে যাবে। একদিন শিপন খান নামের এক দালাল ইমরানের সঙ্গে দেখা করল। বলল, "২০ লাখ টাকা দাও। ইতালি পৌঁছে দেব।" ইমরানের বোন ফাতেমা আক্তার সব শুনলেন। ভাইয়ের কয়েকজন বন্ধুও যাচ্ছে। ফাতেমা শিপনকে বললেন, "দেখো, আমার ভাইকে সরাসরি ইতালি পৌঁছে দিও। কোনো ঝামেলায় জড়িও না।" শিপন আশ্বাস দিল। পরিবার জমি বিক্রি করল। কিস্তিতে কিস্তিতে ৪২ লাখ টাকা দিল শিপনকে। কিন্তু ইমরান ইতালি পৌঁছাল না। তাকে আটকে রাখা হলো লিবিয়ায়। ফোন এলো, "তোমার ভাইকে মাফিয়ারা ধরে রেখেছে। নির্যাতন করছে। আরও টাকা পাঠাও।"
ফাতেমা কাঁদতে কাঁদতে আরও টাকা পাঠালেন। কিন্তু টাকা শেষ হয়ে গেল। শিপন আরও চাইল। পরিবার দিতে পারল না। একদিন খবর এলো—ইমরান ভূমধ্যসাগরে ডুবে গেছে। নৌকা উল্টে গেছে। অন্য ১৭ জন বাংলাদেশিও মারা গেছে। ফাতেমা চিৎকার করে কেঁদে উঠলেন। "স্থানীয় মাফিয়াদের কারণে আমার ভাই হারিয়ে গেছে!" শিপন আর তার ভাই সেলিম—দুজনেই বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে গেছে। তারা গত এক বছরে ৫০ জনেরও বেশি তরুণকে এভাবে পাঠিয়েছে। কিন্তু কে তাদের ধরবে? ইমরানের লাশও ফেরেনি। পরিবার শুধু কাঁদছে। আর অপেক্ষা করছে।
বাংলাদেশে এখন তরুণরা দেশে থাকতে পারছে না। কারণ? বেকারত্ব। শিক্ষিত হয়েও চাকরি নেই। দক্ষতা অর্জন করেও সুযোগ নেই। প্রতিদিন হাজার হাজার তরুণ বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছে—জীবনের ঝুঁকি নিয়ে। বিশ্বের মানুষ ভালো জীবন যাপন করছে। ইউরোপে, আমেরিকায়, মধ্যপ্রাচ্যে—মানুষের জীবনমান উন্নত। কিন্তু বাংলাদেশের তরুণদের কী অবস্থা? তাদের শুধু দুটো পথ: হয় দারিদ্র্যের মধ্যে পড়ে থাকা, নয়তো দালালের খপ্পরে পড়ে প্রাণ হারানো।
রাজনীতিবিদদের কোনো হুঁশ নেই। তারা নিজেদের ক্ষমতা নিয়ে ব্যস্ত। তরুণরা কোথায় যাচ্ছে, কেন যাচ্ছে—কেউ খোঁজ নেয় না। পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, "কেউ যদি লোভে পড়ে যুদ্ধে জড়ায়, তা ঠেকানো আমাদের পক্ষে কঠিন।" কিন্তু এটা কি শুধুই "লোভ"? নাকি চরম দারিদ্র্য আর অসহায়ত্ব? ইমরান, ফয়সাল, আকরাম—এরা কেউ খারাপ ছেলে ছিল না। তারা শুধু বাঁচতে চেয়েছিল। পরিবারকে সচ্ছল করতে চেয়েছিল। কিন্তু দেশে সুযোগ না থাকায় তারা দালালদের খপ্পরে পড়ল।
ফয়সালের মা চায়না বেগম এখন প্রতিদিন ছেলের ছবি নিয়ে বসে থাকেন। কাঁদেন। আর বলেন, "আমার ছেলেটা ফিরে আসবে কবে?" আকরামের মা মোবিনা বেগম প্রতিদিন আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকেন। মনে হয়, হয়তো একদিন ছেলে ফিরে আসবে। কিন্তু জানেন, ছেলে আর ফিরবে না। ইমরানের বোন ফাতেমা আক্তার রাতে ঘুমাতে পারেন না। চোখ বন্ধ করলেই দেখেন, ভাই ভূমধ্যসাগরের ঢেউয়ে ডুবে যাচ্ছে। চিৎকার করছে, "বোন, আমাকে বাঁচাও!" কিন্তু কে বাঁচাবে? কোথায় যাবে পরিবার?
তিনজন বন্ধু—ইমরান, ফয়সাল, আকরাম। তিনজনের স্বপ্ন ছিল একই। কিন্তু তিনজনেরই পরিণতি একই—মৃত্যু। এখন তাদের পরিবার শুধু কাঁদে। আর ভাবে—কোথাও কেউ নেই। কেউ নেই তাদের জন্য। কেউ নেই এই দেশের তরুণদের জন্য। কেউ নেই শোনার জন্য। কেউ নেই বাঁচানোর জন্য।
[এই গল্পটি বাস্তব ঘটনা অবলম্বনে লেখা। ফয়সাল মোড়ল, মোহাম্মদ আকরাম হোসেন, এবং আরও অনেক বাংলাদেশি তরুণ এভাবেই প্রাণ হারিয়েছেন। তাদের আত্মার শান্তি কামনা করি।]
https://www.prothomalo.com/opinion/column/7csztpuoji
©somewhere in net ltd.
১|
৩০ শে নভেম্বর, ২০২৫ রাত ১:১০
হুমায়রা হারুন বলেছেন: সুন্দর ভাবে বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছেন।