| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
সৈয়দ কুতুব
নিজের অজ্ঞতা নিজের কাছে যতই ধরা পড়ছে প্রচলিত বিশ্বাসের প্রতি ততই অবিশ্বাস জন্মাছে!
২০২২ সালের কথা। মিরপুর ১২ নম্বর, বর্ধিত পল্লবী আবাসিক এলাকা দিয়ে হাঁটছিলাম। খুব স্বাভাবিক একটা রাত। রাস্তায় মানুষজন, রিকশা, গাড়ি—সবকিছু চলছে। হঠাৎ আমার ঠিক সামনে ধপ করে একটা শব্দ। এমন শব্দ যেটা কখনো ভোলা যায় না। আমার পুরো শরীরে একটা শিহরণ বয়ে গেল। মনে হলো হৃৎপিণ্ড থেমে গেছে। কাছে গিয়ে দেখি একজন মানুষ পড়ে আছে। তার মাথা ফেটে গেছে। মাটিতে রক্ত। আমি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। মস্তিষ্ক কাজ করছিল না। শুধু একটা চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছিল—আরেকটু সামনে হাঁটলে এই লোকটা আমার মাথার ওপর পড়ত। আমার ঘাড় ভেঙে দুজনের একসাথে ভবলীলা সাঙ্গ হতো।
কিছুক্ষণ পর যে বাড়ি থেকে লোকটা পড়েছিল, সেখান থেকে মানুষজন বের হলো। মুহূর্তেই প্রচণ্ড ভিড় জমে গেল। চিৎকার, হইচই, কান্নাকাটি। পরে খোঁজ নিয়ে জানলাম লোকটা মানসিকভাবে অসুস্থ ছিল। কিন্তু আমার মাথা থেকে সেই দৃশ্যটা আর যাচ্ছিল না। আরেকটু এগিয়ে গেলেই আমার পরিবার হয়তো আজ আমার লাশ নিয়ে যেত। এটা কোনো সিনেমা না, এটা ঢাকা শহর। এখানে মৃত্যু আমাদের পাশ দিয়ে হেঁটে যায় প্রতিদিন।
ঢাকায় বেঁচে থাকা মানে এক ধরনের যুদ্ধ। সকালে ঘর থেকে বের হলে আমরা জানি না কী অপেক্ষা করছে। হয়তো নির্মাণাধীন ভবন থেকে পড়বে ইট। হয়তো রড। হয়তো মেট্রোরেলের বিয়ারিং প্যাড। হয়তো কোনো মানসিক রোগী লাফিয়ে পড়বে আমাদের ওপর। কোনটা হবে জানি না। শুধু জানি যে কিছু একটা হতে পারে। এই শহরে আর কোনো নিরাপদ জায়গা নেই। ফুটপাত নিরাপদ না। রাস্তা নিরাপদ না। এমনকি নিজের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থাকাও নিরাপদ না।
মিরপুরে আমার যে অভিজ্ঞতা, সেটা তো একটা মানসিক রোগীর দুর্ঘটনা। কিন্তু মগবাজারে দিপু সানা? তিনি তো শুধু অফিস থেকে বাসায় ফিরছিলেন। হাঁটছিলেন একটু স্বাস্থ্যের জন্য। ওপর থেকে একটা ইট পড়ল। মুহূর্তেই শেষ। তিন বছরের ছেলে ঋষি রাজ অনাথ হয়ে গেল। স্বামী তরুণ কুমার বিশ্বাস ফোনে জানলেন স্ত্রী আর নেই। কী অপরাধ ছিল দিপু সানার? হেঁটেছিলেন বলে?
গুলশানে আশফাক চৌধুরী পিপলু দাঁড়িয়ে ছিলেন ফুটপাতে। কারও সাথে কথা বলছিলেন। হয়তো বন্ধুর সাথে। হয়তো সহকর্মীর সাথে। স্বাভাবিক একটা দুপুর। কাজের ফাঁকে একটু বিরতি। ওপর থেকে রড পড়ল কনকর্ডের নির্মাণাধীন ভবন থেকে। শেষ। কী অপরাধ ছিল পিপলুর? ফুটপাতে দাঁড়িয়েছিলেন বলে?
ফার্মগেটে একজন পথচারী হাঁটছিলেন। মেট্রোরেলের বিয়ারিং প্যাড পড়ল মাথায়। ঘটনাস্থলেই মৃত্যু। এই লোকটা হয়তো ভেবেছিলেন মেট্রোরেল হলো উন্নয়ন। আধুনিক পরিবহন ব্যবস্থা। নিরাপদ যাতায়াত। কিন্তু সেই মেট্রোরেলের যন্ত্রাংশই তার মাথায় পড়ে প্রাণ নিল। কী অপরাধ ছিল তার? মেট্রো স্টেশনের নিচ দিয়ে হাঁটছিলেন বলে?
এই শহরে আমাদের অপরাধ হলো বেঁচে থাকা। আমাদের অপরাধ হলো ঘর থেকে বের হওয়া। আমাদের অপরাধ হলো স্বপ্ন দেখা যে আমরা কাজ করব, পরিবার নিয়ে সুখে থাকব, সন্তান মানুষ করব। কিন্তু এই শহর আমাদের সেই সুযোগ দেবে কিনা জানি না। যে শহরে ফুটপাতে হাঁটা মানে জীবন বাজি রাখা, সেখানে স্বপ্ন দেখাটা বিলাসিতা।
নির্মাণাধীন ভবনের নিচ দিয়ে যাওয়ার সময় আমরা ওপরের দিকে তাকাই। দেখার চেষ্টা করি কোনো ইট, রড বা সিমেন্টের বস্তা ঝুলছে কিনা। কিন্তু আমরা কি সবসময় ওপরের দিকে তাকিয়ে হাঁটব? তাহলে সামনে কী আছে দেখব কীভাবে? আর সামনে তাকালে ওপর থেকে কিছু পড়বে কিনা জানব কীভাবে? এটা এক ধরনের অসম্ভব সমীকরণ। যার কোনো সমাধান নেই।
মেট্রোরেলের নিচ দিয়ে যাওয়ার সময় আমরা ভাবি এটা সরকারি প্রকল্প। নিশ্চয়ই নিরাপদ হবে। কিন্তু সেপ্টেম্বরে স্প্রিং খসে পড়েছিল। তারপরও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলাফল? বিয়ারিং প্যাড পড়ে একজন মারা গেল। তদন্ত হবে। রিপোর্ট আসবে। কিছুদিন পর সবাই ভুলে যাবে। আরেকজন মরবে। আবার তদন্ত। এই চক্র চলতেই থাকবে।
সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ব্যাপার হলো দায়মুক্তি। দিপু সানার মামলায় আসামি করা হয়েছে অজ্ঞাতপরিচয়দের। অজ্ঞাতপরিচয়! ভবনের মালিক জানা। নির্মাণ কোম্পানি জানা। ঠিকাদার জানা। কিন্তু আসামি অজ্ঞাতপরিচয়। এর মানে কী? এর মানে হলো কাউকে শাস্তি দেওয়া হবে না। মামলা চলবে বছরের পর বছর। কোর্টে তারিখ পড়বে। শেষে হারিয়ে যাবে ফাইলের স্তূপে।
পিপলুর ক্ষেত্রে আরও ভয়ঙ্কর। কনকর্ডের নাম পর্যন্ত মূলধারার মাধ্যমে আসছে না। কেন? কারণ প্রভাবশালী রিয়েল এস্টেট কোম্পানি। তাদের বিজ্ঞাপন দিতে হবে। তাদের সাথে সম্পর্ক রাখতে হবে। তাই একজন মানুষের মৃত্যুর চেয়ে বিজ্ঞাপনের টাকা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এই হলো আমাদের অগ্রাধিকার।
যারা বলে ঢাকা ছেড়ে চলে যাও, তারা ভুল বলে না। কিন্তু সবাই তো পারে না। পরিবার এখানে। জীবন এখানে। তাহলে যাব কোথায়? কিন্তু থাকব কীভাবে? প্রতিদিন ভয়ে ভয়ে? প্রতিটা পা ফেলার সময় চিন্তা করে যে এটা শেষ পা হতে পারে? ঢাকা শহর এখন একটা বিশাল অপরিকল্পিত নির্মাণযজ্ঞ। চারদিকে ভবন উঠছে। কোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেই। সেফটি নেট নেই। ব্যারিকেড নেই। সতর্কতা চিহ্ন নেই। শুধু লোভ আছে। তাড়াতাড়ি বানাতে হবে। তাড়াতাড়ি বিক্রি করতে হবে। তাড়াতাড়ি টাকা তুলতে হবে। এর মাঝে কারও মাথায় ইট পড়লে কী হবে? কারও গায়ে রড পড়লে কী হবে? সেসব নিয়ে কে ভাবে?
মেট্রোরেল হওয়ার কথা ছিল আশার প্রতীক। যানজট কমবে। যাতায়াত সহজ হবে। কিন্তু সেই মেট্রোরেলের যন্ত্রাংশ পড়ে মানুষ মরছে। সেপ্টেম্বরে সতর্কবার্তা ছিল। স্প্রিং খসে পড়েছিল। কিন্তু কেউ কি শুনেছে? কেউ কি ব্যবস্থা নিয়েছে? না। ফলাফল সবার সামনে। এটাই এই শহরের বাস্তবতা। সতর্কবার্তা আসে। উপেক্ষা করা হয়। মানুষ মরে। তদন্ত হয়। কিছু হয় না। পরের সতর্কবার্তা আসে। আবার উপেক্ষা। আবার মৃত্যু। চক্রটা অসীম।
দিপু সানার স্বামী যে প্রশ্নটা করেছিলেন—কেন এমন হলো? কেন মুহূর্তেই সব শেষ হয়ে গেল?—এই প্রশ্নের উত্তর কেউ দেয়নি। মাঝে দিয়ে কেটে গেল দুই বছর। কোনো উত্তর নেই। কোনো পরিবর্তন নেই। শুধু মৃত্যু বাড়ছে। শুধু পরিবার ভাঙছে। শুধু স্বপ্ন মরছে।
ঢাকা শহর থেকে পালাতে পারলেই বাঁচি। এই অনুভূতি এখন প্রতিটা মানুষের। কিন্তু পালাব কোথায়? আর পালিয়ে গেলেই বা কী হবে? যারা থেকে যাবে তারা? তারা কি প্রতিদিন মৃত্যুর ভয়ে বেঁচে থাকবে? এটা কোনো সমাধান না। সমাধান হলো জবাবদিহিতা। সমাধান হলো আইনের শাসন। সমাধান হলো নিরাপত্তা মান কঠোরভাবে মানা। কিন্তু সেসব হবে কবে? কতজনের মৃত্যুর পর?
এই শহর আমাদের গ্রাস করছে। ধীরে ধীরে। একজন একজন করে। আমরা দেখছি। আমরা জানি। কিন্তু আমরা অসহায়। কারণ যারা পরিবর্তন আনতে পারে, তারা ব্যস্ত অন্য কাজে। ব্যস্ত ভবন বানাতে। ব্যস্ত টাকা কামাতে। ব্যস্ত ক্ষমতা ধরে রাখতে। আর আমরা সাধারণ মানুষ? আমরা শুধু বাঁচার চেষ্টা করি। প্রতিদিন। প্রতি মুহূর্তে। জেনে যে হয়তো আজই শেষ দিন।
আমরা ফুটপাতে দাঁড়িয়েছিলাম, এটাই ছিল আমাদের অপরাধ। আমরা হেঁটেছিলাম, এটাই ছিল আমাদের অপরাধ। আমরা বাঁচতে চেয়েছিলাম, এটাই ছিল আমাদের অপরাধ। আর এই অপরাধের শাস্তি এই শহর প্রতিদিন দিয়ে যাচ্ছে। কখনও ইট দিয়ে। কখনও রড দিয়ে। কখনও বিয়ারিং প্যাড দিয়ে। শাস্তিটা একই। মৃত্যু। তাৎক্ষণিক। নিশ্চিত। অনিবার্য।
https://www.prothomalo.com/bangladesh/district/tpbvmguuts
২৫ শে জানুয়ারি, ২০২৬ রাত ১:১৬
সৈয়দ কুতুব বলেছেন: ঢাকা বসবাসের অযোগ্য হয়ে গেছে।
২|
২৫ শে জানুয়ারি, ২০২৬ রাত ১:২৯
কলিমুদ্দি দফাদার বলেছেন:
ঢাকার কিছু আবাসিক এলাকার ঘটন এবং মানুষের লাইফস্টাইল পশ্চিমা অনেক দেশের মতোই। গ্রোসারি, শপিং মল সবকিছু পরিকল্পিত। মিরপুর ডিওএইচএস, ক্যান্টনমেন্ট, গুলশান-বনানী অভিজাত এলাকার ভিতরে গেলেই দেখবেন। শাহবুদ্দিন এন্ড পিংক সিটির পাশের পার্কে গিয়েছেন?
৩|
২৫ শে জানুয়ারি, ২০২৬ রাত ১:৪৬
আলামিন১০৪ বলেছেন: এ দেশে জন্মই যেন আজন্ম পাপ
©somewhere in net ltd.
১|
২৫ শে জানুয়ারি, ২০২৬ রাত ১:০৩
কলিমুদ্দি দফাদার বলেছেন:
উওরা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের গার্ডার পরে গাড়িতে পিষে একই পরিবারের কয়েকজন মারা যাওয়াটা ছিলো আরো মর্মান্তিক। এই একই ঘটনা কিছুদিন আগে আরো একটি দেশে হয়েছে দেখলাম। দরিদ্র- উন্নয়নশীল দেশগুলোর কমন সমস্যা। আর ঢাকার বিকেন্দ্রীকরণ বা জনসংখ্যার চাপ না কপালে আর এক যুগ পর বাস করাটা কঠিন হয়ে যাবে।