| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
সৈয়দ কুতুব
নিজের অজ্ঞতা নিজের কাছে যতই ধরা পড়ছে প্রচলিত বিশ্বাসের প্রতি ততই অবিশ্বাস জন্মাছে!
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ২৮ ফেব্রুয়ারির হামলা কেবল মধ্যপ্রাচ্যেই আগুন জ্বালায়নি। এর ভয়াবহ ধাক্কা হরমুজ প্রণালি থেকে শুরু করে জাপান সাগর পর্যন্ত পুরো এশিয়াজুড়ে অনুভূত হচ্ছে। এই সংঘাত এশিয়ার আঞ্চলিক জ্বালানি ব্যবস্থার ভঙ্গুরতাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। একইসঙ্গে এটি বৈশ্বিক কূটনীতির ভারসাম্যকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। সরকারগুলোকে এমন সব কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করছে, যা তারা দীর্ঘদিন ধরে এড়িয়ে আসছিল। বেশিরভাগ এশীয় দেশের জন্য এটি ভৌগোলিকভাবে দূরের যুদ্ধ হলেও এর ভয়াবহ পরিণতি কড়া নাড়ছে একেবারে ঘরের দরজায়।
হামলার পর থেকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলের জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ। অথচ এই পথটি এশিয়ার জ্বালানি নিরাপত্তার 'লাইফলাইন' বা প্রধান ধমনি। জাপান তার প্রয়োজনীয় তেলের প্রায় ৯৫ শতাংশই মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করে, যার ৭০ শতাংশই আসে এই হরমুজ প্রণালি হয়ে। সংকট সামাল দিতে জাপান এখন ২৫৪ দিনের সমান জরুরি রিজার্ভ বা মজুত থেকে তেল ব্যবহার করছে। কিন্তু এই মজুত একসময় ফুরিয়ে যাবে, এটি কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। ফুকুশিমা পারমাণবিক বিপর্যয়ের পর জাপান পারমাণবিক বিদ্যুৎ থেকে সরে আসায়, এখনও তাদের প্রাথমিক জ্বালানির ৩৪ দশমিক ৮ শতাংশ তেলের ওপর নির্ভরশীল। তেলের এই সংকটে জাপানের শেয়ারবাজার একপর্যায়ে ৪ হাজার ২০০ পয়েন্ট পড়ে যায়। ডলারের বিপরীতে ইয়েনের মানও কমেছে আশঙ্কাজনক হারে। যুদ্ধে সরাসরি যুক্ত না হয়েও জাপানের প্রায় ৮৫ শতাংশ মানুষ এখন এই যুদ্ধের প্রভাব নিয়ে চরম উৎকণ্ঠায় দিন পার করছে।
তেলের জন্য পুরোপুরি আমদানিনির্ভর দক্ষিণ কোরিয়াও মারাত্মক চাপে পড়েছে। বাধ্য হয়ে সিউল তিন দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো জ্বালানির ওপর ‘প্রাইস ক্যাপ’ বা সর্বোচ্চ মূল্য নির্ধারণ করে দিয়েছে। শেয়ারবাজার কসপি-তে ধস নেমেছে ৬ শতাংশেরও বেশি।
সবচেয়ে বেশি ও বহুমুখী সংকটে পড়েছে ভারত। তাদের অপরিশোধিত তেলের ৮৮ শতাংশই আমদানি করা, যার অর্ধেক আসে হরমুজ দিয়ে। ওয়াশিংটন আপাতত ভারতকে রাশিয়া থেকে তেল কেনার জন্য ৩০ দিনের একটি ছাড় দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু মূল সংকট অন্য জায়গায়। হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় ভারতের এলএনজি আমদানির ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ এবং এলপিজি বা রান্নার গ্যাসের ৮০-থেকে ৮৫ শতাংশ সরবরাহ হুমকির মুখে পড়েছে। ভারতের কোটি কোটি পরিবার এই রান্নার গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। রিফাইনারিগুলোতে বড়জোর দুই-তিন সপ্তাহের এলপিজি মজুত আছে।
এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে ভারতের শিল্প খাতেও। গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় ছোট ইস্পাত কারখানা, রেস্তোরাঁ, সিরামিক ও সার কারখানাগুলো বন্ধ হওয়ার উপক্রম। ভারতের কৃষিখাতের প্রয়োজনীয় সারের প্রায় অর্ধেকই উপসাগরীয় দেশগুলোর সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল। সংকট দীর্ঘায়িত হলে নয়াদিল্লিকে হয় সারের পেছনে আরও ১৯ বিলিয়ন ডলার ভর্তুকি দিতে হবে, নয়তো কোটি কোটি কৃষকের ক্ষোভের মুখে পড়তে হবে। ইতিমধ্যেই যুদ্ধের প্রতিবাদে ও কৃষিসংকটের আশঙ্কায় ভারতে কৃষকরা বিক্ষোভ শুরু করেছেন।
অর্থনৈতিক এই ধাক্কার পাশাপাশি এশিয়ার সরকারগুলো এক চরম কূটনৈতিক চোরাবালিতে আটকে গেছে। নীতি ও জোটের বাধ্যবাধকতার মধ্যে এক অদ্ভুত টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে।
জাপানের অবস্থা সবচেয়ে নাজুক। চীনের আধিপত্য রুখতে টোকিও সবসময় আন্তর্জাতিক নিয়মনীতি ও বলপ্রয়োগের বিরোধিতার কথা বলে এসেছে। অথচ, মিত্রদের সঙ্গে কোনো আলোচনা না করেই ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের এই একতরফা হামলার বিষয়ে জাপানের প্রধানমন্ত্রী তাকাইচি সানাই প্রকাশ্যে তেমন কিছুই বলতে পারছেন না। অন্যদিকে, দক্ষিণ কোরিয়ার মাটি থেকে যুক্তরাষ্ট্র তাদের ‘প্যাট্রিয়ট এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম’ মধ্যপ্রাচ্যে সরিয়ে নিচ্ছে। প্রেসিডেন্ট লি জে-মিয়ুং প্রকাশ্যে এই অসহায়ত্ব স্বীকার করেছেন। এর ফলে পূর্ব এশিয়ার মিত্রদের মাঝে এই বার্তা যাচ্ছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের নিজের স্বার্থে টান পড়লে তারা যেকোনো সময় এশিয়াকে কম গুরুত্ব দিতে পারে।
ইরান যুদ্ধ মূলত এশিয়ার অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত দীর্ঘদিনের কিছু পূর্বানুমানকে ভুল প্রমাণিত করেছে। ‘হরমুজ প্রণালি সবসময় খোলা থাকবে’, ‘যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ছাতা সবসময় কাজ করবে’—এই ধারণাগুলো এখন অকার্যকর। এই যুদ্ধ প্রমাণ করছে যে, শুধু আমদানিকৃত জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভর করা কতটা বিপজ্জনক।
ভারতের ভারসাম্য রক্ষার কূটনীতিও বড় ধরনের হোঁচট খেয়েছে। উপসাগরীয় দেশগুলোতে ইরানের হামলার নিন্দা জানালেও, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের প্রাথমিক হামলার বিষয়ে মোদি সরকার নীরব। বিরোধী দলগুলো একে ‘নেতৃত্বের অভাব’ বলে সমালোচনা করছে। এছাড়া, ভারতীয় নৌবাহিনীর ‘মিলান-২০২৬’ মহড়ায় অংশ নেওয়া তিনটি ইরানি রণতরীকে ভারতের বন্দরে নোঙর করতে দেওয়ার সিদ্ধান্ত কূটনৈতিক উত্তেজনা আরও বাড়িয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর বিষয়টিকে সমর্থন করলেও, ভারত ও শ্রীলঙ্কায় আশ্রিত ৪৩৪ জন ইরানি নাবিকের উপস্থিতি প্রমাণ করে, বর্তমান নীতি দিয়ে এই অপ্রত্যাশিত সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়।
অর্থনীতির একটু নিচের দিকে থাকা দেশগুলোর অবস্থা আরও শোচনীয়। জ্বালানি সংকট গভীর হওয়ায় বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, জ্বালানি রেশনিং চালু করা হয়েছে এবং সরকার বাধ্য হয়ে চড়া দামে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কিনছে। পাকিস্তান তাদের সরকারি কর্মী অর্ধেক করা, সপ্তাহে চার দিন কাজ, সরকারি গাড়ির জ্বালানি কমানো এবং স্কুল বন্ধ রাখার মতো কঠোর কৃচ্ছ্রসাধন নীতি গ্রহণ করেছে, যা অন্তত ৪ কোটি শিক্ষার্থীর ওপর প্রভাব ফেলছে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর (ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড) তেলের বড় অংশই আসে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে। গত এক দশকে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন কমে যাওয়ায় আমদানিনির্ভরতা তাদের আরও বিপদে ফেলেছে। পর্যটননির্ভর দেশ ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্রগুলোও চরম হুমকির মুখে। আকাশসীমা নিষেধাজ্ঞার কারণে ভারতের বিমান পরিবহন খাতও বিশাল লোকসানের সম্মুখীন।
এই সংকটে সবাই যে ভুক্তভোগী তা কিন্তু নয়। বিশ্লেষকদের মতে, চীনের কাছে প্রায় এক বিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেলের বিশাল মজুত রয়েছে। তাছাড়া, চীনের জ্বালানি ব্যবহারের এক-চতুর্থাংশই আসে বিদ্যুৎ থেকে, যার বড় অংশই কয়লা ও নবায়নযোগ্য শক্তির ওপর নির্ভরশীল। দেশটিতে নতুন গাড়ির বিক্রির প্রায় অর্ধেকই এখন বৈদ্যুতিক গাড়ি (ইভি)। গত এক দশকের এই কৌশলগত প্রস্তুতি চীনকে তেলের দামের ওঠানামা থেকে অনেকাংশেই সুরক্ষিত রেখেছে।
বেইজিং এখন চুপচাপ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং নিজেদের একটি ‘নির্ভরযোগ্য বাণিজ্যিক বিকল্প’ হিসেবে তুলে ধরছে। যুক্তরাষ্ট্রের এই একতরফা পদক্ষেপ এই ধারণাকেই শক্ত করছে যে, যুক্তরাষ্ট্রই বর্তমানে ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার সবচেয়ে বড় উৎস। অন্যদিকে, এই সংকটের সুযোগে রাশিয়া চড়া দামে ভারতের কাছে তেল বিক্রি করে লাভবান হচ্ছে।
এই যুদ্ধের সুদূরপ্রসারী প্রভাব আরও ভয়াবহ। যুক্তরাষ্ট্র একাধিক ফ্রন্টে জড়িয়ে পড়ায়, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়াকে এখন নিজেদের সুরক্ষার জন্য সামরিক শক্তি বাড়াতে হবে। বিশেষ করে, দূরপাল্লার মিসাইল ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার দিকে তাদের ঝুঁকতে হবে। চীনের ক্রমবর্ধমান সামরিক শক্তি এবং তাইওয়ান ইস্যু এই শঙ্কাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
অন্যদিকে, উত্তর কোরিয়া এই যুদ্ধ থেকে বড় একটি ‘শিক্ষা’ নিচ্ছে। কিম জং উন এখন সহজেই যুক্তি দিতে পারবেন যে, পারমাণবিক অস্ত্র থাকলেই কেবল একটি রাষ্ট্রের টিকে থাকা সম্ভব। এই যুদ্ধ উত্তর কোরিয়াকে পরমাণু অস্ত্রমুক্ত করার বদলে তাদের জেদকে আরও পাকাপোক্ত করবে।
ইরান যুদ্ধ মূলত এশিয়ার অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত দীর্ঘদিনের কিছু পূর্বানুমানকে ভুল প্রমাণিত করেছে। ‘হরমুজ প্রণালি সবসময় খোলা থাকবে’, ‘যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ছাতা সবসময় কাজ করবে’—এই ধারণাগুলো এখন অকার্যকর। এই যুদ্ধ প্রমাণ করছে যে, শুধু আমদানিকৃত জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভর করা কতটা বিপজ্জনক। দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের জন্য এশিয়াকে দ্রুত নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝুঁকতে হবে, কৌশলগত মজুত বাড়াতে হবে এবং আঞ্চলিক সমন্বয় জোরদার করতে হবে।
আপাতত, এশিয়ার সরকারগুলো জোড়াতালি দিয়ে, রেশনিং করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু ভয়ের বিষয় হলো, ইরান যুদ্ধ হয়তো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এটি সামনে আসতে যাওয়া ভূ-রাজনৈতিক, জলবায়ু ও অর্থনৈতিক দুর্যোগগুলোর একটি পূর্বাভাস মাত্র। আর এই দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য এশিয়া যে এখনও মোটেও প্রস্তুত নয়, তা আজ দিবালোকের মতো স্পষ্ট।
লেখক: আমেরিকান ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ের অধ্যাপক
(দ্য ডিপ্লোম্যাট থেকে লেখাটি ভাষান্তর করেছেন মুজাহিদুল ইসলাম )
মুল লেখা : মধ্যপ্রাচ্যের আগুনে পুড়ছে এশিয়া; এক অপ্রত্যাশিত যুদ্ধের মাশুল- জন ক্যালাব্রেস
©somewhere in net ltd.