| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
সৈয়দ কুতুব
নিজের অজ্ঞতা নিজের কাছে যতই ধরা পড়ছে প্রচলিত বিশ্বাসের প্রতি ততই অবিশ্বাস জন্মাছে!
আমি আসলে জন্মগতভাবেই খুব আশাবাদী মানুষ। সত্যি বলছি। ২৯ মার্চ ২০২৬ তারিখে যখন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় নতুন নীতিমালা জারি করল, আমি মনে মনে বললাম , অবশেষে কেউ অন্তত ভাবল। ১২ সদস্যের কমিটি হবে, অভিভাবক থাকবেন, ওয়ার্ড কমিশনার থাকবেন, আর কাছের মাদ্রাসা থেকে একজন শিক্ষক থাকা বাধ্যতামূলক। খবরটি পড়ে এতটাই অভিভূত হলাম যে প্রশ্নটা মাথায় এলই না ; প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কমিটিতে মাদ্রাসার শিক্ষক কেন থাকবেন? তবে এই ধরনের প্রশ্ন যারা ভাবে তাদের সমাজে ভালো চোখে দেখা হয় না।
একই দিনে ক্রীড়া মন্ত্রণালয় জানাল যে চতুর্থ শ্রেণি থেকে ফুটবল, ক্রিকেট, সাঁতার বাধ্যতামূলক। চমৎকার উদ্যোগ! কিন্তু কমিটিতে একজন ক্রীড়া প্রতিনিধির কথা কেউ ভাবলেন না। আমাদের দেশে উন্নয়ন নিজেই নিজের পথ খুজে নেয় ; সমন্বয়ের ঝামেলায় যাওয়ার দরকার কী।
২০২৫ সালের আগস্টে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সংগীত ও শরীরচর্চা শিক্ষকের পদ তৈরি হলো। শিশুরা গান শিখবে, দৌড়াবে; এই ভেবে খুশি হয়েছিলাম। কিন্তু তারপরই কিছু মানুষ রাস্তায় নামলেন এবং দাবি তুললেন যে সংগীত শিক্ষক নয়, বরং আরও ধর্ম শিক্ষক চাই। ফলস্বরূপ, নভেম্বরেই সরকার সংগীত ও শরীরচর্চা শিক্ষকের পদগুলো বাতিল করে দিল। সাংবাদিকরা যখন প্রশ্ন করলেন এটি কি চাপের ফল কি না, তখন অতিরিক্ত সচিব উত্তর দিলেন যে আপনারা বিষয়টি খতিয়ে দেখতে পারেন। এর চেয়ে সৎ এবং মার্জিত উত্তর পৃথিবীতে আর হয় না।
শিশু হারাল সংগীত শিক্ষক। আইসিটি প্রতিনিধি কখনো আসেননি, পুষ্টিবিদ ভাবনার অতীত। বিনিময়ে নয় হাজার আলাদা ধর্মীয় শিক্ষক পদ এখন প্রক্রিয়াধীন। অথচ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ধর্মীয় শিক্ষা আগে থেকেই ছিল, সাধারণ শিক্ষকরাই পড়াতেন, কোনো শূন্যতা ছিল না। তারপরও নয় হাজার নতুন পদ কেন ? এই প্রশ্নটিও বোধহয় ভালো চোখে দেখা হয় না।
এই বিশেষ দিকটিতে বাংলাদেশ সত্যিই বিশ্বে অনন্য। তুরস্ক সেকুলার রাষ্ট্র ; সেখানে কমিটিতে মাদ্রাসার শিক্ষক বাধ্যতামূলক নয়। সৌদি আরব, ইরান, পাকিস্তান, মালয়েশিয়া -কোথাও নেই। একটি সেকুলার সংবিধানের দেশ হিসেবে আমরা এককভাবে এই পথ আবিষ্কার করেছি। অনেকে একে অগ্রগতি বলছেন। আমিও বলছি কারণ স্রোতের বিপরীতে সাঁতার কাটার অভ্যাস আমার কখনো ছিল না।
ইতিহাস অবশ্য একটু বিরক্তিকর জিনিস। পাকিস্তানে জিয়াউল হক ১৯৭৭ সালে ক্ষমতায় এসে পাঠ্যক্রম সাজালেন 'ইসলামী মূল্যবোধ' অনুযায়ী, মাদ্রাসার সনদ পেল বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রির সমমান। ১৯৮৮ সালের মধ্যে মাদ্রাসার সংখ্যা কয়েকগুণ বেড়ে গেল এবং পাকিস্তান রাজনৈতিক ইসলামের কেন্দ্রে পরিণত হলো। তবে জিয়া সামরিক শাসক ছিলেন ; মানুষ সহজেই বুঝতে পেরেছিল কী হচ্ছে। গণতান্ত্রিক নীতিমালার মোড়কে একই পথ হাঁটলে বোঝা কঠিন হয়। প্রতিরোধও।
এখানে সৎ থাকতে হলে একটা কথা বলতেই হবে - এই গল্পের প্রথম অধ্যায় শেখ হাসিনার হাতে লেখা। ২০১৮ সালে কওমি মাদ্রাসার দাওরায়ে হাদিস সনদকে মাস্টার্সের সমমান, পাঠ্যবই থেকে অসাম্প্রদায়িক লেখা অপসারণ, হেফাজতকে রাজনৈতিক স্বীকৃতি। দল ভিন্ন, সরকার ভিন্ন, কিন্তু শিশুদের শিক্ষার অভিমুখ একই দিকে। একে কাকতালীয় ভাবার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই।
আমি এখনো আশাবাদী। মাদ্রাসার শিক্ষক কমিটিতে এসে নিশ্চয়ই বৈপ্লবিক কিছু করবেন, নয় হাজার ধর্ম শিক্ষক শিশুদের বিজ্ঞানমনস্ক করে তুলবেন, আর সংগীত না শিখলেও সৃজনশীলতার কোনো ক্ষতি হয় না ; ফিনল্যান্ড, জাপান, সিঙ্গাপুর ভুল পথে হাঁটছে। রাতে ঘুমানোর আগে শুধু একটা কথাই মনে হয়: শিশুর মন যেদিকে ঘোরানো যায়, সমাজও সেদিকে যায়। পার্থক্য শুধু, আমরা এখন আর প্রশ্ন করি না - কে ঘোরাচ্ছে, আর কেন।
©somewhere in net ltd.