| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
সৈয়দ কুতুব
নিজের অজ্ঞতা নিজের কাছে যতই ধরা পড়ছে প্রচলিত বিশ্বাসের প্রতি ততই অবিশ্বাস জন্মাছে!
কয়েকদিন ধরে সোশ্যাল মিডিয়া খুললেই একটাই দৃশ্য—হতাশার গল্প আর সমালোচনার স্রোত। বিশেষ করে শিক্ষামন্ত্রী ড. এহছানুল হক মিলন সাহেবকে নিয়ে নানামুখী আলোচনা বেশ জমে উঠেছে। ক্ষমতায় আসার দুই মাসও পেরোয়নি, তার আগেই সাধারণ মানুষ হতাশ! কিন্তু প্রশ্ন হল : আমরা আসলে কী চাই? আমরা কি নিজেরাও সেটা জানি?
গতকাল থেকে সোশ্যাল মিডিয়ায় নেপালের শিক্ষামন্ত্রীর সাথে মিলন সাহেবের তুলনা শুরু হয়েছে। নেপালের মন্ত্রী পেরেছেন, আমাদের জন কেন পারছেন না? কথাটা শুনতে চমৎকার লাগে, কিন্তু 'দূরের ঘাস সবসময়ই বেশি সবুজ' দেখায়। নেপালে সংস্কার সম্ভব হয়েছে কারণ সেখানে সব রাজনৈতিক দলের মধ্যে একটা নূন্যতম বোঝাপড়া ছিল। কেন্দ্রীয়ভাবে সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল বলেই সেটা বাস্তবায়ন করা গেছে। আমাদের এখানে সেই পরিবেশ কই?
এখন একটা বড় দাবি উঠেছে যে, মিলন সাহেব কেন ছাত্র রাজনীতি বন্ধে কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছেন না। কিন্তু এই দাবিটা কি আসলেও শিক্ষামন্ত্রীর একার পক্ষে সমাধান করা সম্ভব? CUET-এ যখন ছাত্রদল প্রভাব বিস্তার করতে চেয়েছিল, তখন DACSU কিন্তু ছাত্র রাজনীতি বন্ধের বিষয়ে একদম চুপ ছিল। মুখে দলগুলো অনেক বড় বড় কথা বলে, কিন্তু বাস্তবে বাংলাদেশের কোনো রাজনৈতিক দলই তাদের ছাত্র সংগঠন বন্ধ করতে আগ্রহী নয়। এটা কেন্দ্রীয়ভাবে সব দল মিলে সিদ্ধান্ত না নিলে একা মিলন সাহেব কী করবেন? তবুও সব কথা শুনতে হচ্ছে তাকেই।
আরেকটা সমালোচনা চলছে , মিলন সাহেব নাকি শুধু নকল ঠেকানোর পেছনে পড়ে আছেন, শিক্ষার মান বাড়াতে কিছুই করছেন না। কিন্তু একটু খোঁজ নিলেই দেখা যায়: মাত্র ১৮০ দিনের পরিকল্পনায় তিনি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মিড-ডে মিল, বিনামূল্যে স্কুল ড্রেস, ৩৭ হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সরকারি করা, ২০০০ গ্রামে নতুন প্রাথমিক বিদ্যালয় আর বিনামূল্যে ট্যাব ও ওয়াইফাই সুবিধার মতো পরিকল্পনা রেখেছেন। এর মধ্যে খারাপ কোনটা ? বাস্তবায়ন হলে তো দেশেরই মঙ্গল। মজার ব্যাপার হলো, নেপালের শিক্ষামন্ত্রীর পরিকল্পনা আমরা মুখস্থ বলতে পারি, অথচ নিজের দেশের সরকারের পরিকল্পনা কয়জন জানি? এটাই আমাদের ট্র্যাজেডি।
এবার রমজানে স্কুল বন্ধ রাখার ঘটনায় আসি। বছরের শুরুতে ২৮ জানুয়ারি বই দেওয়া শেষ হলো, ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন হলো-এর মধ্যে পড়াশোনা তেমন হয়নি বললেই চলে। তার ওপর রমজানে স্কুল বন্ধ রাখার একটা ‘পপুলিস্ট’ সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো। এই সিদ্ধান্তে সবচেয়ে বেশি খুশি হয়েছে কোচিং ব্যবসায়ীরা। স্কুলে ক্লাস বন্ধ মানেই কোচিং সেন্টারে ভিড় বাড়া। অথচ কোচিংয়ে ২৭ রমজান পর্যন্ত ক্লাস চললেও শিক্ষার্থীদের বা অভিভাবকদের তেমন আপত্তি ছিল না। অনেক স্কুলে এখনো প্রথম মাসিক পরীক্ষাই হয়নি, করোনার আগে মার্চ মাসের মধ্যেই প্রথম পরীক্ষা হয়ে যেত। আগামী কয়েক বছরও জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে রমজান পড়বে, তাই এখনই একটা সুনির্দিষ্ট বার্ষিক পরিকল্পনা খুব দরকার।
ক্লাস ওয়ানের লটারি বাতিলের বিষয়টাও বেশ মজার। হাসনাত আব্দুল্লাহ দাবি তুললেন, আর মিলন সাহেব মেনে নিলেন। এখন সমালোচনা হচ্ছে যে বাচ্চাদের ওপর পড়ার চাপ বাড়বে, কোচিং ব্যবসায়ীদের পোয়াবারো হবে। কথাটা ঠিক। কিন্তু হাসনাত আব্দুল্লাহ নিজেই একজন কোচিং ব্যবসায়ী-সেটা নিয়ে কেউ একটা কথাও বলছে না! সব সমালোচনার তীর শুধু ওই মিলন সাহেবের দিকেই।
অনলাইন ক্লাসের ইস্যুতে আরেক দফা ঝড় উঠেছে। জ্বালানি সাশ্রয়ের কথা ভেবে অনলাইন ক্লাসের পরিকল্পনা এলো। বিরোধী দল বলছে ‘সরকারের পতন অনিবার্য’, অভিভাবকরা বলছেন ‘বাচ্চাদের মোবাইল আসক্তি বাড়বে’। সমালোচনাগুলো হয়তো ঠিক, কিন্তু এর মাঝেই আবার একদল দাবি করছেন-হামের প্রাদুর্ভাবের কারণে দুই সপ্তাহ সব স্কুল বন্ধ রাখতে হবে ! অর্থাৎ একদল বলছে বাচ্চাদের অনলাইনে ঠেলে দেওয়া যাবে না, আরেকদল বলছে স্কুলই বন্ধ রাখো। শেষমেশ মিলন সাহেব সিদ্ধান্ত নিলেন ‘তিন দিন অনলাইন, তিন দিন সরাসরি ক্লাস’। এতেও কারও মন ভরেনি। কেউ কেউ এখন বলছেন অনলাইন ক্লাস না করে তিন দিন ছুটিই দিয়ে দাও!
আসল কথাটা এবার বলে ফেলি। স্কুলে ক্লাস বন্ধ থাকলে সবচেয়ে বেশি খুশি হয় দুই ধরনের মানুষ: কোচিং ব্যবসায়ীরা আর সেই 'মোটাবুদ্ধি'র অভিভাবকরা, যারা স্কুলে বেতন দিতে রাজি আছেন কিন্তু স্কুলে ক্লাস হোক সেটা চান না। স্কুলে ক্লাস হলে তাদের শত আপত্তি, অথচ কোচিংয়ে ক্লাস হলে সেই একই অভিভাবক দৌড়ে যাচ্ছেন। এভাবে চলতে থাকলে একদিন স্কুলে শুধু পরীক্ষা হবে, আর ক্লাস হবে কোচিং সেন্টারে। সচ্ছল পরিবারের সন্তানরা শিক্ষিত হবে, আর বাকিরা হয় ঝরে পড়বে নয়তো মাদরাসায় গিয়ে ভর্তি হবে। প্রত্যন্ত অঞ্চলে এটা এখনই হচ্ছে, কিন্তু সেটা নিয়ে কারও মাথাব্যথা নেই।
মিলন সাহেব আসলে এই বিশাল প্রত্যাশার চাপ সামলাতে গিয়ে খাবি খাচ্ছেন। জনগণকে খুশি রাখতে গিয়ে একের পর এক পপুলিস্ট ডিসিশন নিয়ে যাচ্ছেন ঠিকই, কিন্তু দিনশেষে কাউকেই খুশি করা যাচ্ছে না। কারণ, জনগণ নিজেই জানে না তারা আসলে কী চায়। একটু ভেবে দেখুন-আমরা চাই শিক্ষার মান বাড়ুক, কিন্তু স্কুলে ক্লাস হলে আমাদের আপত্তি। আমরা চাই সংস্কার হোক, কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলো ছাত্র সংগঠন ছাড়তে নারাজ।
মিলন সাহেবকে নিয়ে হতাশার কথা বলার আগে একবার নিজেদের জিজ্ঞেস করা দরকার: আমরা আসলে ঠিক কেমন শিক্ষামন্ত্রী চাই? আর সেই মন্ত্রী যদি আসলেও কোনোদিন সত্যিকারের কঠিন সিদ্ধান্ত নেন, আমরা কি তাকে সাপোর্ট করব? নাকি আবার এই সোশ্যাল মিডিয়াতেই তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ব? উত্তরটা আমরা সবাই জানি, শুধু মানতে চাই না।
©somewhere in net ltd.