নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

মানুষ মরে গেলে পঁচে যায় আর বেঁচে থাকলে বদলায়

সৈয়দ কুতুব

নিজের অজ্ঞতা নিজের কাছে যতই ধরা পড়ছে প্রচলিত বিশ্বাসের প্রতি ততই অবিশ্বাস জন্মাছে!

সৈয়দ কুতুব › বিস্তারিত পোস্টঃ

মরহুম ওসমান হাদীর কারণে কবি নজরুলের জনপ্রিয়তা বেড়েছে?

০২ রা মে, ২০২৬ দুপুর ২:৫৯


ইনকিলাব মঞ্চের জাবের সাহেব মাইকের সামনে দাড়িয়ে যখন বললেন , শহীদ ওসমান হাদীর শাহাদাতের উসিলায় নাকি এদেশের মানুষ আজ কবি নজরুলের মাজার চিনতে পারছে, তখন মনে হলো ইতিহাস বোধহয় উল্টো রথে চড়ে মহাকাশে যাত্রা করেছে। জাবের সাহেবের এই 'বিপ্লবী' আবিষ্কার শুনে মনে হলো, এতদিন আমরা যারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বিদ্রোহী কবির কবরে শ্রদ্ধা জানাতাম, তারা বোধহয় আসলে ভুল করে কোনো পার্ক বা বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে থাকতাম। তার কথামতো নজরুল এখন আর নিজের মহিমায় পরিচিত নন, বরং তিনি হলো "হাদীর কবরের পাশের প্রতিবেশী। জাবের সাহেবের এই যুক্তি যতটা না হাস্যকর, তার চেয়ে বেশি বিস্ময়কর তার জানার সীমাবদ্ধতা দেখে।

সমস্যাটা জাবেরকে নিয়ে নয়, সমস্যা হলো সেইসব 'মহাজ্ঞানী' মহলের যারা এই অদ্ভুতুড়ে যুক্তিকে পাথেয় করে দেশ চালানোর খোয়াব দেখছেন এবং নজরুলকে একটি নির্দিষ্ট সাম্প্রদায়িক ছাঁচে ফেলার নীল নকশা করছেন। ওসমান হাদীর মৃত্যুতে এদেশের অধিকাংশ মানুষ শোকাহত ছিল এবং তাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কবর দেওয়া নিয়ে জনমনে কিছুটা অসন্তোষ থাকলেও শেষ পর্যন্ত মানুষ তা মেনে নিয়েছিল শোকের গুরুত্ব বিবেচনা করে।

কিন্তু সেই শোককে পুঁজি করে যখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চরম পর্যায়ের নোংরামি শুরু হয়, তখন তা মেনে নেওয়া কঠিন। ফেসবুকের পাতায় হাদীর ছবি ডিপি লাগিয়ে সাধারণ মানুষকে যেভাবে কটু কথা বলা হয়েছে এবং তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা হয়েছে, তা ছিল এককথায় অসহ্য। টকশোতে অনেককে দেখা গেছে দাবি তুলতে; তারা নজরুলের কবর সরিয়ে সেখানে কেবল হাদীর কবর রাখার কথা বলেছেন। তবে এই দাবির পেছনে একটি গভীর দুঃখ ও বিরক্তিও কাজ করেছে।

একদল 'হাদী-ব্যবসায়ী' সারাদিন হাদিকে নিয়ে এমন উন্মাদনা শুরু করেছিলেন , সাধারণ মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে অনেকটা ক্ষোভের মুখেই নজরুলের কবরের বিষয়টি টেনে এনেছেন। হয়তো এই কথাগুলো চরম মনকষ্ট বা সাময়িক উত্তেজনা থেকে বলা হয়েছে, কিন্তু নজরুলের মতো একটি অজাতশত্রু জাতীয় সত্তাকে এমন সস্তা আর নিচু স্তরের বিতর্কের মুখে দাঁড় করানোটা স্রেফ বিকৃত মানসিকতার পরিচয়। নজরুলের বিশালতাকে যারা একটি সাধারণ আবেগ দিয়ে প্রতিস্থাপন করতে চান, তারা আসলে জানেন না তারা কতটা আত্মঘাতী খেলায় মেতেছেন।

হাদি নজরুলের বিদ্রোহী কবিতা পাঠ করতেন কিংবা তার মুসলিম জাতীয়তাবাদী চেতনাকে ধারণ করার চেষ্টা করতেন, কিন্তু সেই চেষ্টা ছিল খণ্ডিত। নজরুলের বিদ্রোহ তো ছিল হিন্দু-মুসলিম সীমানা ছাড়িয়ে শোষিত মানুষের জন্য। অথচ এখন দাবি করা হচ্ছে হাদীর কারণে নাকি মানুষ নজরুলকে বেশি চিনছে। আমাদের প্রতিটি ক্লাসের পাঠ্যবইয়ে নজরুলের অন্তত একটি কবিতা বা গল্প থাকবেই, নজরুল আমাদের কাছে ছোটবেলা থেকেই ধ্রুবতারার মতো স্পষ্ট।

নজরুলকে যারা আজ কেবল 'মুসলিম পরিচয়' দিয়ে বন্দি করতে চাইছেন, তারা আসলে কবির জীবনীটাই কোনোদিন উল্টে দেখেননি। নজরুল ছিলেন এদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অসাম্প্রদায়িক শক্তি। এক হাতে তিনি যখন 'রমজানের ঐ রোজার শেষে' লিখে বাংলার মুসলিম ঘরে ঈদের আনন্দ পৌঁছে দিয়েছেন, ঠিক অন্য হাতে তিনি সমান মমতায় লিখেছেন মা শ্যামাকে নিয়ে কালজয়ী সব শ্যামাসঙ্গীত।

আমাদের শৈশব কৈশোরের সেই রমজান মাসের সেহরির কথা কি আমরা ভুলে যেতে পারি? শেষ রাতে রেডিও বা টিভিতে নজরুলের সেই দরদী গজলগুলো ছাড়া আমাদের সেহরি কি কোনোদিন পূর্ণ হতো? এমনকি ঈদে মিলাদুন্নবীর সময় নবীর শানে নজরুলের লেখা কত শত নাতে রাসুল আর গজল আমরা টিভিতে দেখে বড় হয়েছি তার কোনো ইয়ত্তা নেই। বিটিভির পর্দায় প্রতিদিন রবীন্দ্রসঙ্গীতের অনুষ্ঠান 'গীতবিতান' যেমন আমাদের সংস্কৃতির অংশ ছিল, তেমনি সমান গুরুত্বে প্রতিদিন প্রচারিত হতো নজরুলের অমর সৃষ্টি নিয়ে সঙ্গীতানুষ্ঠান 'সন্ধ্যামালতী'। যারা আজ মিথ্যা প্রচার করছেন যে রবীন্দ্রনাথের কারণে নজরুল আড়ালে চলে গেছেন, তারা আসলে ষড়যন্ত্রের সস্তা গল্প ফাঁদছেন। বরং বর্তমানে ওপার বাংলায় তথাকথিত আর্ট ফিল্মের নামে রবীন্দ্রনাথের গানের সাথে যেভাবে অ্যাডাল্ট সিন জুড়ে দিয়ে তাকে অপমান করা হচ্ছে, তার তুলনায় বাংলাদেশে নজরুল সবসময়ই রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক মর্যাদায় ভাস্বর ছিলেন।

আজও বড় বড় কনসার্টে যখন ব্যান্ডের গিটারে 'কারার ঐ লৌহ কপাট' বা 'শিকল পরা ছল' বেজে ওঠে, তখন হাজার হাজার তরুণের রক্তে যে উন্মাদনা জাগে তা-ই প্রমাণ করে নজরুল সবসময়ই আমাদের চেতনার কেন্দ্রে ছিলেন। তার বিদ্রোহী কলম যেমন শোষকের বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছিল, তেমনি তার ব্যক্তিগত জীবন ছিল অসাম্প্রদায়িকতার এক জীবন্ত দলিল। প্রমিলা দেবীকে বিয়ে করা বা নিজের ছেলেদের নাম 'অরিন্দম কাজী' আর 'কৃষ্ণ মোহাম্মদ' রাখা, এই যে এক সমন্বয়বাদী সত্তা, জাবের সাহেবদের ক্ষুদ্র মস্তিষ্কে কি তার গভীরতা পৌঁছানো সম্ভব?

নজরুল কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর বা হাদি সাহেবের মতো কোনো ব্যক্তির মাধ্যমে পাওয়া পরিচয় নন। তাই নজরুলের মাজার চেনার জন্য কোনো নতুন শহীদের রেফারেন্স খুঁজতে যাওয়াটা কেবল হাস্যকর নয় বরং আমাদের জাতীয় চেতনার ওপর এক ধরণের কুরুচিপূর্ণ উপহাস। যারা মনে করছেন নজরুলের জনপ্রিয়তার গ্রাফ হাদি সাহেবের হাত ধরে ঊর্ধ্বমুখী হচ্ছে, তাদের সাবধান হওয়া উচিত। ইতিহাস বিকৃতি কিন্তু কখনো দীর্ঘস্থায়ী হয় না বরং সময়ের আবর্তে এই অগভীর পাণ্ডিত্যই একদিন ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হবে।

মন্তব্য ৬ টি রেটিং +৩/-০

মন্তব্য (৬) মন্তব্য লিখুন

১| ০২ রা মে, ২০২৬ বিকাল ৩:৩৫

শ্রাবণধারা বলেছেন: জাতি যে শুধু বড় ডাকাত, জঙ্গি আর প্রতারকদের হাতে পড়েছে তা নয়, পাগলের হাতেও পড়েছে! :)

হাদির কিছু কিছু বক্তব্য শুনে আমি বুঝলাম যে, হাদি হলো যাকে বলে একটি কনস্ট্রাক্ট, মানে হাদিকে বানানো হয়েছে, এপস্টেইনের মতো করে। আবার তাকে মেরেও ফেলা হলো!

২| ০২ রা মে, ২০২৬ বিকাল ৩:৩৯

শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু বলেছেন: আমি ঠিক রাজনীতি সচেতন মানুষ নই। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে যে ছাত্র-জনতা গণ-অভ্যুত্থান হয়েছে তাতে মরহূম ওসমান হাদির ভূমিকা কতটা ছিলো? তাকে সামনের সারিতে বা দ্বিতীয় সারিতেও দেখা যায়নি।

আমরা তাকে চিনেছি ইনকিলাব মঞ্চ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যানারে বিভিন্ন মব এর নেতৃত্ব দিতে এবং টিভি ক্যামেরার সামনে অশ্লীল গালি-গালাজ দিতে। তার একটি ভাইরাল ডায়লগ তাকে ব্যপক প্রচার এনে দিয়েছিল, গোপালগঞ্জের আওয়ামীলীগদের শা*য়া-মা*য়া টেনে ছিড়ে ফেলা বিষয়টি নিয়ে।

এরপর আমরা হটাৎ করে তাকে দেখি সে ঢাকা-০৮ আসন থেকে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন এবং তফশিল ঘোষনার আগেই প্রচারনা শুরু করে দিয়েছিলেন। সেসময় তাকে তার আগের ইমেজ থেকে অনেকটা ক্লিন এবং শান্ত ইমেজে দেখতে পাই। আমার দেখা এবং জানা এই হচ্ছে ওসমান হাদি।

কিন্তু ২০২৪ সালের জুলাই মাসের আগে ওসমান হাদির দেশ এবং জাতীর প্রতি কি কন্ট্রিবিউশন ছিলো তা জানা নেই। আপনার জানা থাকলে বলতে পারেন। ধন্যবাদ।

৩| ০২ রা মে, ২০২৬ বিকাল ৩:৫২

কলিমুদ্দি দফাদার বলেছেন:
এইসব রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের সাধারণ কোন বিচার হয় না। তবে যোগ-বিয়োগ করলে হাদী হত্যাকাণ্ডের পর দেশে সংগঠিত মব সন্ত্রাস এবং মানুষের আবেগকে পুঁজি করে যে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা হয়েছে এর থেকে সবচেয়ে লাভবান হয়েছে জামায়াত। ২ বছরের বাচ্চা ছেলে ও বলছে-"আমরা সবাই হাদী হবো ইন্ডিয়াকে পারবো"

৪| ০২ রা মে, ২০২৬ বিকাল ৪:০৯

কলিমুদ্দি দফাদার বলেছেন:
শ্রাবণধারা বলেছেন- হাদির কিছু কিছু বক্তব্য শুনে আমি বুঝলাম যে, হাদি হলো যাকে বলে একটি কনস্ট্রাক্ট, মানে হাদিকে বানানো হয়েছে, এপস্টেইনের মতো করে। আবার তাকে মেরেও ফেলা হলো!
শুনলাম জামায়াতের নাকি সুইসাইড স্কোয়াড আছে; এদের তৈরি করা আদর্শগত প্রয়োজন নিজের জীবনকে উৎসর্গ করার জন্যে। B:-)

৫| ০২ রা মে, ২০২৬ বিকাল ৪:৩৫

রাজীব নুর বলেছেন: জাবের একটা ছাগল। জাস্ট ছাগল।

৬| ০২ রা মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১০

ধুলো মেঘ বলেছেন: এইটা তো একটা ফটোকার্ড, আর আমাদের অভিজ্ঞতা বলে যে ফটোকার্ড মানেই মিথ্যা। এই কথা যে জাবের বলেছে, তার প্রমাণ কি? কোন লিংক দিতে পারবেন? এই লোক গবেট, সেটা জানি। কিন্তু এত ডীপ লেভেলের গবেট না।

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.