| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
সৈয়দ কুতুব
নিজের অজ্ঞতা নিজের কাছে যতই ধরা পড়ছে প্রচলিত বিশ্বাসের প্রতি ততই অবিশ্বাস জন্মাছে!
নট আউট নোমান ইউটিউব চ্যানেলের ক্রীড়া সাংবাদিক নোমান ভাই একজন খাঁটি দেশপ্রেমিক। বাংলাদেশে এখন আমরা এমন এক পরিস্থিতির মধ্যে বাস করছি যেখানে প্রকৃত দেশপ্রেমিক আর ভুয়া দেশপ্রেমিকের পার্থক্য করা কঠিন হয়ে পড়েছে। তবুও কিছু লিটমাস পেপার থাকে যার মাধ্যমে বোঝা যায় কে আসলে দেশকে ভালোবাসে আর কে দেশপ্রেমিকের ছদ্মবেশে স্বার্থপর। নোমান ভাইয়ের প্রসঙ্গ এই ব্লগে আসার কারণ একটা ভিডিও। বাংলাদেশ যখন পাকিস্তানের প্ররোচনায় ক্রিকেট খেলতে ভারতে গেল না, সেদিন নোমান ভাই ক্যামেরার সামনে ডুকরে কেঁদে ফেলেন। কারণ তিনি জানেন বাংলাদেশ মাত্র একটা বৈশ্বিক ইভেন্টে খেলার সুযোগ পায়, আর সেই সুযোগটাও হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে ভুয়া জাতীয়তাবাদীদের নোংরা রাজনীতির কারণে।
সেদিন কান্নায় ভেঙে পড়ে নোমান ভাই বলেছিলেন যে একটা কালো শক্তি চায় না বাংলাদেশে আর একটা সাকিব আল হাসান জন্মাক, আর একটা মাশরাফি বিন মর্তুজা জন্মাক, আর একটা তামিম ইকবাল ভাঙা হাতে খেলার মাঠে যুদ্ধ করুক। ভিডিওটা দেখে মন খারাপ হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু একটা বিষয় খুব অদ্ভুত লেগেছে। নোমান ভাই সাকিবকে পছন্দ করতেন না। জুলাই কোটা আন্দোলনের সময় সাকিবের নীরবতা নিয়ে তিনি অনেক সমালোচনা করেছেন। সাকিবের বিরুদ্ধে আরও আগে থেকে নানা অভিযোগ ছিল এবং নোমান ভাই সেগুলো নিয়ে সবসময়ই সরাসরি কথা বলতেন। সেই মানুষটা যখন ক্রান্তিকালে সাকিবকে স্মরণ করছেন, তখন মনে হলো তিনি আসলে খড়কুটো ধরে বেঁচে থাকার শেষ আশাটা করছেন।
এই হাহাকারের বিপরীতে যখন সুদূর তামিলনাড়ুর দিকে তাকাই তখন বুকটা জ্বলে ওঠে। তামিল মুভি সুপারস্টার থালাপাথি বিজয় তার দল তামিলাগা বেট্রি কাঝাগাম (TVK) নিয়ে ২০২৬ সালের নির্বাচনে পুরনো সব দলকে হারিয়ে দিয়েছেন। ২৩৪টি আসনের মধ্যে ১০৮টি আসন জিতে তিনি এখন সবথেকে বড় শক্তি। ডিএমকে আর এআইএডিএমকে-র মতো বাঘা বাঘা দলগুলো তার কাছে মুখ থুবড়ে পড়েছে। এটি তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে এক ঐতিহাসিক পরিবর্তন।
বিজয়ের বেশ কয়েকটি মুভি আমিও দেখেছি। সেগুলোতে সবসময় একটা সামাজিক বার্তা থাকত। জিএসটি, কৃষকের অধিকার, কর্পোরেট লোভ কিংবা নারী ক্ষমতায়ন নিয়ে তিনি রুপালি পর্দায় লড়েছেন। তার 'সরকার' মুভিটা দেখেই মনে হয়েছিল এই লোকের একটা গভীর ভিশন আছে। এখন দেখছি সেই অনুমান একদম সঠিক ছিল। মুভিগুলো আসলে ছিল তার রাজনৈতিক ইশতেহারের মহড়া মাত্র। বিজয়ের এই প্রস্তুতি কিন্তু একদিনের নয়। ২০০৯ সাল থেকে তিনি 'বিজয় মক্কাল ইয়াক্কাম' প্রতিষ্ঠা করে গ্রামীণ মানুষের কাছে পৌঁছানোর কাজ শুরু করেন। ওই সময় এক জনসভায় তিনি বলেছিলেন যে রাজনীতি সিনেমার চেয়ে অনেক গভীর এবং তিনি সেটার জন্য নিজেকে তৈরি করছেন। ২০০৯ সালে লাগানো সেই চারাগাছ আজ ১৬ বছর পর ফল দিয়েছে।
বিজয়ের দলের নির্বাচনী ইশতেহার দেখলে মাথা নষ্ট হওয়ার জোগাড়। ৫ লক্ষ নতুন চাকরি, প্রতিটি পরিবারকে ৬টি করে ফ্রি সিলিন্ডার, নারীদের মাসিক ভাতা এবং বেকারদের জন্য আর্থিক সহায়তা। হয়তো এসব বাস্তবায়ন করা অনেক কঠিন কারণ বর্তমানে ইরান যুদ্ধের প্রভাবে এলপিজি সংকট চলছে এবং রাজকোষের ওপর চাপ বাড়বে। কিন্তু তার যে একটা ভিশন আছে সেটা কেউ অস্বীকার করতে পারবে না। থালাপাথি বিজয়ের এই রাজকীয় উত্থান দেখে মনটা উদাস হয়ে যায়। আমাদেরও তো এমন সুপারস্টার ছিল। মুভিতে তেমন কেউ না থাকলেও ক্রিকেটে গ্লোবাল স্টার ছিল সাকিব আল হাসান। আঞ্চলিক সুপারস্টার ছিল মাশরাফি বিন মর্তুজা আর চট্টগ্রামের পোস্টার বয় ছিল তামিম ইকবাল। এরা কেন বিজয়ের মতো ভাবতে পারলেন না?
সাকিব আল হাসানের উত্থানও কিন্তু সেই ২০০৮ সাল থেকেই। ভাগ্যদেবতা সাকিবকে দুই হাত ভরে দিয়েছেন। কিন্তু সেই সুযোগ তিনি দেশের মানুষের জন্য কাজে লাগাননি। জুয়ার বিজ্ঞাপন, ফিক্সিংয়ের অভিযোগ, ব্যাংক থেকে টাকা নিয়ে না ফেরত দেয়া থেকে শুরু করে ফ্যানকে পেটানো সবকিছুতেই তার জুড়ি মেলা ভার। তবু মানুষ তাকে মনে রেখেছে তার অদম্য জেদ আর মানসিকতার জন্য। কিন্তু সেই মানসিকতা দিয়ে কি একটা মহৎ কিছু করা যেত না?
ক্রিকেটারদের মধ্যে সবার আগে আওয়ামী লীগে যোগ দেন 'নড়াইল এক্সপ্রেস' মাশরাফি। দলমত নির্বিশেষে সবাই তাকে পছন্দ করত। বারবার হাঁটুতে অপারেশন করিয়েও খেলতে মাঠে নেমে পড়তেন। পাগলাটে এই মানুষটাকে নিয়ে আমাদের গর্বের শেষ ছিল না। কিন্তু যেদিন তিনি আওয়ামী লীগে যোগ দিলেন সেদিন থেকে তার ফ্যান কমতে লাগল। কারণ তখন আওয়ামী লীগ ছিল পুরোদস্তুর মাফিয়াদের হাতে জিম্মি। মানুষ মনে করল মাশরাফি স্রেফ নিজের আখের গোছাতে যোগ দিয়েছেন ।
সাকিব আল হাসানের রাজনীতিতে যোগ দেওয়াটা ছিল আরও নাটকীয়। প্রথমে বিএনপি থেকে নমিনেশন নিতে চাইলেন কারণ সেখানে জেতা সহজ ছিল। পরে ডিগবাজি দিয়ে চলে গেলেন আওয়ামী লীগে। তার নামে যুক্ত হলো আরও এক নতুন দুর্নাম। এখন শুনছি তিনি নাকি ফুলটাইম রাজনীতি করবেন এবং ভারতে গিয়ে শেখ হাসিনার সাথে দেখা করে এসেছেন। যেন তিনিই দলের পরবর্তী কাণ্ডারি। এমনকি তামিম ইকবালও সেই পুরনো পথেই হাঁটছেন এবং বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন।
কেন বাংলাদেশের তারকাদের সবসময় পুরনো আর ঘুণে ধরা রাজনৈতিক দলেই যোগ দিতে হবে? তাদের যে পরিমাণ ফ্যান ফলোয়ার আছে তা দিয়ে তারা নিজেরা একজোট হয়ে নতুন দল খুলতে পারতেন। মাশরাফিকে বলা হয় 'ক্যাপ্টেন ফ্যান্টাসটিক'। তাকে সাথে নিয়ে সাকিব যদি শুরু করতেন তবে আজ আমরা ভিন্ন কিছু দেখার সুযোগ পেতাম । বিজয় প্রমাণ করে দিয়েছেন যে সাফল্য একদিনে আসে না। তিনি ১৬ বছর ধরে পরিকল্পনা করেছেন এবং ফ্যান ক্লাবগুলোকে সংগঠিত করেছেন। জনপ্রিয়তা আমাদের সাকিব বা মাশরাফিদেরও নিজ দেশে কোনো অংশে কম ছিল না। সাকিব তো গ্লোবাল স্টার।
কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো তাদের কোনো ভিশন ছিল না। একমাত্র লক্ষ্য ছিল দেশের পোশাক গায়ে দিয়ে টাকা কামানো , নাম বেচে এমপি হওয়া এবং সুযোগ সুবিধা ভোগ করে কোটি কোটি টাকা বানানো। এটা হয়তো আমাদের দেশের সুবিধাবাদী রাজনৈতিক চেতনারই প্রতিফলন। তারা সমাজকে নাড়া দেওয়ার বদলে নিজেরাই সেই ঘুণে ধরা ব্যবস্থার অংশ হয়ে গেলেন। থালাপাথি বিজয় প্রমাণ করে দিলেন যে নায়ক মানে শুধু পর্দায় মারামারি করা নয় বরং নায়ক মানে রুখে দাঁড়ানোর সাহস দেখানো। আমাদের তারকারা মাঠের খেলায় জিতলেও মানুষের ভালোবাসার ময়দানে চূড়ান্তভাবে পরাজিত। 
©somewhere in net ltd.