| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
সৈয়দ কুতুব
নিজের অজ্ঞতা নিজের কাছে যতই ধরা পড়ছে প্রচলিত বিশ্বাসের প্রতি ততই অবিশ্বাস জন্মাছে!
জুলাই কোটা আন্দোলনের প্রায় দুই বছর পূর্ণ হতে চলেছে। গত দুই বছরে দেশে অনেক কিছু বদলেছে। সমাজের অনেক কুৎসিত দিক নতুন করে সামনে এসেছে। অনেক মানুষকে নতুন করে চেনা গেছে যাদের সম্পর্কে আগে অন্য ধারণা ছিল। কিন্তু যেটা সবচেয়ে বেশি লক্ষণীয়, সেটা হলো জুলাই নিয়ে অনলাইনে এনসিপি আর তাদের সমর্থকদের একটা যুদ্ধংদেহী মনোভাব। যেন জুলাই মাসটা তাদের পেটেন্ট করা, আর বাকি সবাই সেই পেটেন্ট লঙ্ঘন করে বেঁচে আছে।
এনসিপির মূল লক্ষ্য হলো জুলাই সনদকে বাংলাদেশের বিদ্যমান সংবিধানের উপরে প্রাধান্য দেওয়া, জুলাইকে যেকোনো মাসের চেয়ে শ্রেষ্ঠ ঘোষণা করা এবং জুলাই আন্দোলনকে পুঁজি করে ব্যবসা করা। এনসিপি নেতা সারজিস আলমসহ আরও অনেকের কাছে জুলাই আর জুলাই সনদ হলো হামের টিকার চেয়েও প্রিয়। এখন পর্যন্ত সব ঠিকই আছে, মানুষের পছন্দের স্বাধীনতা আছে। সমস্যা হলো অন্য জায়গায়।
জুলাইতে যে কোটা আন্দোলন দিয়ে শুরু হয়েছিল সেটা তারা জুলাইয়ের পর থেকেই বিলকুল ভুলে গেছেন। কোটা না মেধা রব তুলতে তুলতে ডিসি, এসপি এবং বিচারপতি এনসিপি কোটায় নিয়োগ দেয়া হয়েছিলো। আর এই কাজে সমর্থন ছিল প্রফেসর ইউনূসের। তিনি সরাসরি বলেছিলেন ছাত্ররা জীবন দিয়েছে তাই তারা যা চায় সব করতে পারে। কোটাবিরোধী আন্দোলনের জায়গায় নতুন কোটা চালু করাটা রীতিমতো একটা শিল্প হয়ে উঠে।
গত বারোই ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জামায়াত সমর্থিত জোটকে ক্ষমতায় বসানোর সব রকম মেকানিজম বা কলকাঠি নাড়ানো হয়েছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই পরিকল্পনা আর কাজে আসেনি। এদিকে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পরেই খুব চতুরতার সাথে জুলাই সনদের বেলুনটা পাংচার করে দিয়েছে। তারা এসেই আলী রিয়াজকে একেবারে খালি রিয়াজ বানিয়ে ছেড়েছে। বদিউল আলম মজুমদার সাহেব যে বাংলাদেশ ব্যাংকের সিএসআর ফান্ড থেকে নিজের এনজিও সুজনের জন্য দুই কোটি টাকা এনেছিলেন, সেই গোপন তথ্যও ফাঁস হয়ে গেল। জানা গেল, ওই টাকা নেওয়া হয়েছিল গণভোটে হ্যাঁ ভোটের প্রচার চালানোর জন্য।
বিএনপির যারা আছেন, তাদের কারোরই জুলাই মাস বা জুলাই সনদ নিয়ে কোনো সময় বাড়তি মোহ ছিল না। আর সত্যি বলতে, দেশের নব্বই শতাংশ সাধারণ মানুষের মনোভাবও কিন্তু একই রকম। দেশের এক পার্সেন্ট লোকও হয়তো ভালো করে বোঝে না যে গণভোট বা জুলাই সনদ জিনিসটা আসলে কী ছিলো। তবে সাধারণ মানুষ খুব ভালো করেই বুঝে গিয়েছিলো সংস্কারের নাম করে মূলত একটা মূলা ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিলো, যাতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তাদের ক্ষমতার মেয়াদটা ইচ্ছেমতো লম্বা করতে পারে। আমার নিজের ভোটকেন্দ্রের কথাই যদি বলি, সেখানকার বেশিরভাগ মানুষ ঠিকমতো লিখতে কিংবা পড়তে পারেন না। তাদের সামনে ব্যালট পেপার দিলে আগে থেকেই হ্যাঁ ভোটের ঘরে টিক চিহ্ন দিয়ে রাখা হয়।
বিএনপি ক্ষমতায় এসে যখনই নিজেদের নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নের দিকে মনযোগ দিল, অমনি তারা জুলাই সনদ থেকে বেশ কায়দা করে দূরে সরে গেল। তবে এটা নিয়ে তারা কিন্তু কোনো হৈচৈ বা চিল্লাচিল্লি করেনি, একদম চুপচাপ নিজেদের কাজ গুছিয়ে নিয়েছে। এর মধ্যেই যখন দেশে হাম রোগের প্রকোপ দেখা দিল, বিএনপি তখন হামের টিকা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
এখন ওই জুলাই সনদ কোন ফাইলের নিচে চাপা পড়ে ধুলো খাচ্ছে, তা আর কেউ জানেও না। এনসিপি বাহিনী এখন মুখে ফেনা তুলে বলছে যে বিএনপি নাকি জাতির সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। এখানে জাতি বলতে তারা আসলে শুধু জামায়াত সমর্থকদেরই বোঝাচ্ছে। কারণ দেশের সাধারণ মানুষের খেয়েদেয়ে তো আর কাজ নেই যে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না হলে তারা নিজেদের প্রতারিত ভাববে।
সাধারণ মানুষের মাথায় চিন্তা করার মতো এর চেয়ে অনেক বড় বড় বিষয় আছে। এবার আসা যাক পলাতক আওয়ামী লীগ এবং তাদের সমর্থকদের কথায়। তারা পারলে জুলাই মাসকে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার থেকে মুছে দেয়। আওয়ামী লীগ এখন নিরপেক্ষ মানুষের ভঙ্গি ধরে বলার চেষ্টা করছে জুলাইয়ে তারা প্রতারিত হয়েছে, শেখ হাসিনার সাথে অন্যায় হয়েছে। তখন পাল্টা প্রশ্ন করতে মন চায় শেখ হাসিনার সাথে কীভাবে প্রতারণা হয়েছে? তিনি নিজেই তো কারো না কারো আশীর্বাদে ক্ষমতায় টিকে ছিলেন। তাঁর জনপ্রিয়তা ছিল একদম শূন্য। শতকরা দশ জনের মধ্যে আট জন আওয়ামী লীগ সরকারকে চোর সরকার বলত। এ কারণে মানুষ বিদেশ থেকে হুন্ডির মাধ্যমে টাকা পাঠাত।
প্রবাসী রেমিট্যান্স একসময় দুই বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে গিয়েছিল। আজ একক মাসে তিন থেকে সাড়ে তিন বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স আসছে। প্রবাসীরা এখন বৈধ চ্যানেলে টাকা পাঠাচ্ছেন, আর কিছু চোরও প্রণোদনার লোভে পাচার করা টাকা দেশে ফিরিয়ে আনছে। আওয়ামী লীগের সমর্থকরা বোধহয় এখন ওই পাচারকারী আর চোরদের কথাই দিনরাত ভেবে কাঁদছেন।
সরকার যখন জনসমর্থনহীন হয়ে পড়ে, তখন চারপাশ থেকে সবাই সুযোগ নেবে, এটাই তো দুনিয়ার চিরন্তন নিয়ম। আওয়ামী লীগের বুদ্ধিজীবীরা এখন জুলাই আন্দোলনকে মেটিকুলাস ডিজাইন বলে প্রচার করছেন। অবশ্য তাদের এই দোষ দিয়ে লাভ নেই, কারণ খোদ ডক্টর ইউনূস সাহেবই তো আমেরিকায় গিয়ে বুক ফুলিয়ে বলে এসেছেন যে এটা একটা মেটিকুলাস ডিজাইন ছিল।
তবে এ রকম উন্নত মানের ডিজাইন না হলেও, এর চেয়ে অনেক সস্তা আর থার্ড ক্লাস ডিজাইন কি আমরা আওয়ামী লীগকে করতে দেখিনি? বিনা ভোটে একশো তিপান্ন জন এমপি বানানোর কথা না হয় বাদই দিলাম, রাতের অন্ধকারে যেভাবে ভোট ডাকাতি করা হয়েছিল, কিংবা ডামি নির্বাচনের যে নাটক তারা সাজিয়েছিল, সেগুলো কি ডিজাইন ছিল না? আপনি যখন নিজে বিভিন্ন ফর্মে ডিজাইন করে বছরের পর বছর ক্ষমতায় টিকে থাকতে চাইবেন, তখন আপনার ওপরেও যে একদিন অন্য কেউ একই রকম ডিজাইন অ্যাপ্লাই করবে, সেটাই তো স্বাভাবিক। হয়েছেও ঠিক তাই।
আওয়ামী লীগ সমর্থকরা এখন কথায় কথায় ডীপ স্টেটের বদনাম করে বেড়ায়। অথচ এই ডীপ স্টেটের সাহায্য নিয়েই তারা ২০১৩ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত মহাসুখে সিংহাসনে বসে ছিলেন। তখন কিন্তু ডীপ স্টেটকে তাদের একটুও খারাপ লাগেনি। ডীপ স্টেট আসলে আওয়ামী লীগের বিরোধী দলগুলোকে পছন্দ করত না বলেই এদের এত বছর সহ্য করে গিয়েছিল।
কিন্তু যখনই স্বার্থের সংঘাত দেখা দিল, ডীপ স্টেটও সময়মতো এদের টিস্যু পেপারের মতো ছুঁড়ে ফেলে দিল। আওয়ামী লীগ এখন আবার হঠাৎ করে খুব সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী দল সেজে গেছে। তারা এখন দারুণভাবে আমেরিকা বিরোধী হয়ে উঠেছে এবং সারাদিন প্রচার করছে যে আমেরিকা নাকি বাংলাদেশকে গোলাম বানানোর চুক্তি করছে। এই বিষয়টাকে পুঁজি করে তারা এখন নতুন করে জনমত গড়ার সস্তা চেষ্টা চালাচ্ছে। তাদের ভাবখানা এমন যে এখন যদি মানুষ তাদের আবার ক্ষমতায় বসিয়ে দেয়, তবে তারা আমেরিকার সাথে সব চুক্তি বাতিল করে দেশকে রক্ষা করবে। তারা প্রতিদিন নতুন নতুন রূপকথা ছড়াচ্ছে যে শেখ হাসিনা নাকি আমেরিকাকে টেক্কা দিয়ে দেশ বাঁচিয়েছিলেন।
অথচ যে আমেরিকার আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে ২০২৪ সাল পর্যন্ত তারা ক্ষমতার মধু খেলেন, আজ তাকেই ভিলেন বানাচ্ছেন। তাছাড়া ২০০৮ সালে তারা যে বিশাল মেজরিটি নিয়ে ক্ষমতায় এসেছিল, সেটা কার আশীর্বাদে হয়েছিল, তা তো সবারই জানা। এবার তারা শুধু মুখই ফিরিয়ে নেয়নি, একেবারে পাততাড়ি গুটিয়ে বিদায় করে দিয়েছে।
এই পুরো ঘটনার ভেতরে যদি একটা সত্যি বিষয় থেকে থাকে, তবে তা হলো দেশের সাধারণ মানুষ। যাদের শাসন করার জন্য এই রাজনৈতিক দলগুলো সারাদিন কামড়াকামড়ি করে, সেই জনগণের আসলে এই পুরো প্রক্রিয়ায় কোনো ভূমিকাই ছিল না। মানুষের বিশ্বাস বড়জোর দুর্বল হয়, কিন্তু আন্দোলন করে সরকার ফেলার মতো ক্ষমতা বা সচেতনতা এখনো এ দেশের আমজনতার তৈরি হয়নি।
জুলাই নিয়ে এখন কেবল জামায়াত, এনসিপি আর আওয়ামী লীগ ছাড়া আর কেউ তেমন কোনো মাথাব্যথা দেখাচ্ছে না। কারণ দেশের সাধারণ মানুষের সকাল থেকে রাত পর্যন্ত যে বেঁচে থাকার কঠিন সংগ্রাম, এলপিজি গ্যাস আর রান্নার তেলের বাজারের যে আগুন, সেখানে আওয়ামী লীগ বা এনসিপি কারও মুখের কথাই কোনো কাজে আসে না।
জুলাই আন্দোলনের পর থেকেই মানুষ বলা শুরু করেছিল যে এর পর কী হবে, সামনে আমাদের জন্য কী অপেক্ষা করছে। কারণ কোনো রাজনৈতিক দলই আজ পর্যন্ত জনগণের সামনে একটা পরিষ্কার বা ভবিষ্যৎমুখী ভিশন তুলে ধরতে পারেনি। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ তাই এখন এনসিপি আর আওয়ামী লীগের ফাঁকা অনলাইন হইচই আর কাদা ছড়াছড়িতে কান না দিয়ে, মুখ বুজে নিজেদের রুটি রুজির লড়াই করে যাচ্ছে।
২৯ শে মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৩২
সৈয়দ কুতুব বলেছেন: জুলাই কোটা আন্দোলনকে আমি কোনোদিনই বিপ্লব মনে করিনি। আসলে এটাকে বিপ্লব বলা হচ্ছিল, সেটাই আমি জানতাম না। পরে মিডিয়ায় শুনি যে হাসনাত ও সারজিসরা জুলাই কোটা আন্দোলনকে বিপ্লব বলছেন। জুলাই কোটা আন্দোলনের মূল বিষয় ছিল কোটা ব্যবস্থা বাতিল করা। অন্যরা এটিকে একটি সূক্ষ্ম পরিকল্পনার অংশে পরিণত করেছে। কিন্তু কোটা আন্দোলনের যে মূল উদ্দেশ্য ছিল, সেটাই এখন হারিয়ে যেতে বসেছে। সব বয়সী মানুষের তুলনায় তরুণদের অংশগ্রহণই ছিল বেশি।
২|
২৯ শে মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৩৫
মাথা পাগলা বলেছেন: বাংলাদেশের ইতিহাসে তৃতীয় শক্তির হস্তক্ষেপ ছাড়া কখনো ক্ষমতার পরির্তন হয়নি।
অবস্থার উণ্ণতি হলে জুলাই বিপ্লব নিয়ে কোন কথা হতো না। জনগনের সাথে স্ক্যাম করা হয়েছে। দেশ এখন রাজাকার জঙ্গিদের হাতে।
তারেক সাহেব দেশ চালাচ্ছেন নাকি মিলিটারি/ডিপস্টেটের কথায় উঠা বসা করছেন?
২৯ শে মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৪৮
সৈয়দ কুতুব বলেছেন: জুলাই আন্দোলনের সময় জনগণের কাছে কেউ কোনো প্রতিশ্রুতি দেয়নি। মানুষ গত ১২/১৩ বছর ধরে উন্নয়নের নামে যে ধরনের স্ক্যাম দেখে এসেছে, তার বিরুদ্ধে হালকা-পাতলা প্রতিবাদ করতেই মাঠে নেমেছিল। মূল ভ্যানগার্ড ছিল তরুণরা—আরও নির্দিষ্ট করে বললে চাকরিপ্রার্থী যুবক-যুবতীরা। কিছু ইস্যু নিয়ে আগে থেকেই অসন্তোষ ছিল। কোটা পুনর্বহাল করতে গিয়ে পরিস্থিতিকে আরও ব্লান্ডার করে ফেলেছিল আওয়ামী লীগ।
তারেক রহমানই ভালো বলতে পারবেন আসলে কি ঘটছে ।
৩|
২৯ শে মে, ২০২৬ রাত ৮:২৯
শ্রাবণধারা বলেছেন: এই আনিস আলমগীরকে কঠোর শাস্তির আওতায় আনতে হবে। শাস্তিটা এমন কঠিন হওয়া চাই যে, আনিস যেন বেঁচে থাকতে আর হাসিনার নাম না নেয়।
জুলাই আন্দোলন ব্যর্থ হওয়ার অর্থ ডাকাত-রাণী হাসিনার চুরি-ডাকাতি, গণহত্যা, হেলমেট -হাতুড়ি বাহিনীর তাণ্ডব সঠিক হয়ে যাওয়া নয়।
২৯ শে মে, ২০২৬ রাত ৮:৫৫
সৈয়দ কুতুব বলেছেন: আনিস আলমগীর দালালি করছেন-এটি কোনো অপরাধ নয়। সরকার যদি তাকে গ্রেফতার করে, তাহলে সেটি একটি খারাপ সিদ্ধান্ত হবে। আওয়ামী সরকার নানা খারাপ কাজ করেছে, কিন্তু বর্তমান সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের দেখে মনে হয় তারা সঠিক বিচার প্রতিষ্ঠার চেয়ে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি ও অর্থ উপার্জনেই বেশি আগ্রহী। বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নরকে আবারও ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান করা হয়েছে। এই ডেপুটি গভর্নর ছিলেন দুর্নীতিগ্রস্ত গভর্নর আবদুর রউফ তালুকদারের অধীনে, যিনি আবার এস আলমের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত। এবার হিসাব মিলিয়ে দেখুন।
©somewhere in net ltd.
১|
২৯ শে মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৪
তানভীর রাতুল বলেছেন: কথিত “জুলাই বিপ্লব”কে যেভাবে একটি স্বতঃস্ফূর্ত গণঅভ্যুত্থান হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছিল, সময় যত যাচ্ছে ততই সেই বয়ানের ভেতরের অসংখ্য অসঙ্গতি সামনে আসছে। এখন স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে, এটি কেবল কোনো অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক আন্দোলন ছিল না; বরং এর সাথে আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতি, অর্থনৈতিক স্বার্থ, কৌশলগত প্রভাব বিস্তার এবং রেজিম চেইঞ্জ রাজনীতির গভীর সম্পর্ক ছিল।
বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসে “গণতন্ত্র”, “মানবাধিকার”, “জনগণের আকাঙ্ক্ষা” — এসব শব্দকে ব্যবহার করে অসংখ্য দেশে সরকার পরিবর্তনের প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে। ল্যাটিন আমেরিকা থেকে মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা থেকে এশিয়া—প্রতিটি অঞ্চলে একই ছক দেখা গেছে। বাংলাদেশেও “জুলাই”কে ঘিরে যে অস্বাভাবিক আন্তর্জাতিক আগ্রহ, কূটনৈতিক তৎপরতা, মিডিয়া ন্যারেটিভ এবং এনজিও-অ্যাক্টিভিস্ট সমন্বয় দেখা গিয়েছিল, তা কোনো বিচ্ছিন্ন কাকতালীয় ঘটনা ছিল না বলেই আজ অনেকের কাছে মনে হচ্ছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ এই প্রকল্পে অংশ নিয়েছিল মূলত আবেগ, ক্ষোভ, হতাশা ও পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা থেকে। অনেকে হয়তো সত্যিই বিশ্বাস করেছিলেন যে তারা একটি “গণজাগরণ”-এর অংশ। কিন্তু ইতিহাসের নির্মম বাস্তবতা হলো, বহু সময় জনগণের ন্যায্য ক্ষোভকেও বড় শক্তিগুলো নিজেদের কৌশলগত স্বার্থে ব্যবহার করে। মানুষ ভাবে তারা ইতিহাস লিখছে, অথচ বাস্তবে তারা অন্য কারও আঁকা স্ক্রিপ্টে অভিনয় করছে।
আরও ভয়াবহ প্রশ্ন হলো—এই আন্দোলনকে ঘিরে যে রক্তপাত, সহিংসতা ও হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, সেগুলোর কতটুকু ছিল স্বতঃস্ফূর্ত সংঘর্ষ আর কতটুকু ছিল পরিকল্পিত উত্তেজনা সৃষ্টির অংশ? ইতিহাসের বহু রেজিম চেইঞ্জ অপারেশনে দেখা গেছে, “শহীদ” তৈরি করা, রাষ্ট্রকে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগে ঠেলে দেওয়া, আন্তর্জাতিক সহানুভূতি আদায় করা—এসব ছিল কৌশলের অংশ। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও ভবিষ্যতের গবেষণা হয়তো একদিন আরও গভীর সত্য সামনে আনবে।
দুনিয়ার ইতিহাসে পুরো জাতিকে বিভ্রান্ত করার উদাহরণ নতুন কিছু নয়। ইরাককে “গণবিধ্বংসী অস্ত্র”-এর মিথ্যে গল্পে ধ্বংস করা হয়েছিল। লিবিয়াকে “মানবাধিকার রক্ষা”র নামে ভেঙে ফেলা হয়েছিল। ইউক্রেন, সিরিয়া, জর্জিয়া—প্রতিটি জায়গায় জনঅসন্তোষকে ভূরাজনৈতিক খেলায় রূপান্তরিত করা হয়েছে। ফলে বাংলাদেশেও যদি একই ধরনের প্রকল্প কাজ করে থাকে, তাহলে সেটি কোনো অসম্ভব কল্পনা নয়; বরং বিশ্ব রাজনীতির পরিচিত বাস্তবতারই অংশ।
সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো—এই পুরো প্রক্রিয়াকে “বিপ্লব” নামে রোমান্টিসাইজ করা হয়েছে। অথচ বাস্তবে একটি রাষ্ট্রের ভেতরে দীর্ঘমেয়াদি অস্থিতিশীলতা, প্রতিষ্ঠানবিরোধী মনোভাব, ঐতিহাসিক চেতনার অবমূল্যায়ন এবং সামাজিক বিভাজন তৈরি করা হয়েছে। “পরিবর্তন”র নামে এমন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে যেখানে আবেগ তথ্যকে হারিয়ে দেয়, স্লোগান বিশ্লেষণকে প্রতিস্থাপন করে, আর প্রোপাগান্ডা বাস্তবতার জায়গা দখল করে নেয়।
তাই এই সময়ের সৎ, নিরপেক্ষ ও গভীর ডকুমেন্টেশন অত্যন্ত জরুরি। কারণ ক্ষমতাসীনদের লেখা ইতিহাস যেমন বিপজ্জনক, তেমনি বিদেশি স্বার্থ ও প্রোপাগান্ডা দ্বারা নির্মিত ইতিহাসও সমান বিপজ্জনক। বাংলাদেশের মানুষের সাথে কী ঘটেছিল, কেন ঘটেছিল, কারা লাভবান হয়েছিল, কোন শক্তি কী ভূমিকা পালন করেছিল—এসব একদিন অবশ্যই লেখা হবে।
ইতিহাসের সবচেয়ে বড় প্রতারণাগুলো প্রথমে “জনগণের বিজয়” হিসেবেই হাজির হয়। পরে, বহু বছর পর, মানুষ বুঝতে পারে তারা আসলে কোন খেলায় ব্যবহৃত হয়েছিল। বাংলাদেশের “জুলাই” নিয়েও হয়তো ভবিষ্যৎ প্রজন্ম একদিন সেই প্রশ্নই তুলবে।