নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

মানুষ মরে গেলে পঁচে যায় আর বেঁচে থাকলে বদলায়

সৈয়দ কুতুব

নিজের অজ্ঞতা নিজের কাছে যতই ধরা পড়ছে প্রচলিত বিশ্বাসের প্রতি ততই অবিশ্বাস জন্মাছে!

সৈয়দ কুতুব › বিস্তারিত পোস্টঃ

সরকারের ১০০ দিন কেমন কাটলো ?

০১ লা জুন, ২০২৬ রাত ২:৫৬


যখন এই ব্লগটি লিখতে বসেছি তার কিছুক্ষণ আগেই সংবাদে দেখলাম সরকার বিশ্ববাজারের সঙ্গে সমন্বয় করার কথা বলে পেট্রোল ও অকটেনের দাম বাড়িয়েছে। জ্বালানির দাম বৃদ্ধির খবর এখন আর নতুন কিছু নয়। কিন্তু এই সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক প্রভাব সব সময়ই বড় হয়ে সামনে আসে। তাই ভাবলাম বিএনপি সরকারের প্রথম ১০০ দিন নিয়ে কিছু লেখা যাক। এই সরকারের ক্ষমতা গ্রহণের প্রেক্ষাপট আমাদের সবার জানা। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ১৮ মাস শাসনের পর গত ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনে ২১৩টি আসনে জয়ী হয়ে বিএনপি ক্ষমতায় আসে। তবে ক্ষমতা পাওয়ার পর থেকেই দলটিকে এক বিশাল অর্থনৈতিক চাপের মুখে পড়তে হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকার ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলের লুটপাটের বোঝা তাদের কাঁধে চেপে বসেছে। এর ওপর মরার ওপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে দেখা দিয়েছে ইরান যুদ্ধ, যা নতুন এক বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে ।

এই পরিস্থিতিতে জ্বালানি নিয়ে যে টানাপোড়েন তৈরি হলো সেটাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। ডিজেল, পেট্রোল ও অকটেন নিয়ে বাজারে অস্থিরতা দেখা গেল। অভিযোগ উঠল রাজনৈতিক পক্ষ, ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এবং কৃত্রিম সিন্ডিকেটের সমন্বয়ে পরিস্থিতি জটিল করা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত সরকার বিরোধী দলকে নিয়ে কমিটি গঠন করে এবং তেলের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়। দাম বাড়ার পর তেলের লাইনের সংকট কমে যায়। কিন্তু এখানেই প্রশ্ন শেষ হয় না। জনগণ জানতে চায় সংকটের মূল কারণ কী ছিল এবং সরকার ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি ঠেকাতে কী পরিকল্পনা নিয়েছে।

সরকারের ওপর আরেকটি বড় চাপ হলো যুক্তরাষ্ট্রের সাথে করা রেসিপ্রোকাল ট্যাক্স চুক্তি। এটি তারা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে। এই চুক্তি দেশের জন্য ভালো নাকি খারাপ, তা নিয়ে খোদ বিএনপির ভেতরেই এক ধরনের দ্বিধাদ্বন্দ্ব ও কোন্দল স্পষ্ট। যেমন : দলটির এমপি ফজলুর রহমান এক টকশোতে গিয়ে এই চুক্তিকে সরাসরি দেশবিরোধী বলেছেন। অন্যদিকে সরকারের শ্রম প্রতিমন্ত্রী ভিপি নুর একটি সোশাল মিডিয়ার পোস্টে দাবি করেছেন , ইউনূস সরকার মূলত বিএনপিকে ফাসিয়ে দিয়ে গেছে।

বিএনপির উচিত এই রেসিপ্রোকাল ট্যাক্স নিয়ে নিজেদের মধ্যে জরুরি আলোচনায় বসা। তাদের যদি কোথাও বোঝার ঘাটতি থাকে, তবে বিশেষজ্ঞদের নিয়ে বসে পুরো বিষয়টি জনগণের কাছে পরিষ্কার করা উচিত। কারণ নিজেদের লোক এভাবে সংশয় প্রকাশ করলে মানুষের মনে শঙ্কা বাড়বে। তা ছাড়া এই চুক্তি নিয়ে আওয়ামী লীগ ও তাদের দোসর মিডিয়াগুলো ব্যাপক প্রোপাগান্ডা ছড়াচ্ছে। দুঃখের বিষয় হলো, এই অপপ্রচারকে কাউন্টার করার মতো কোনো কার্যকর ভূমিকা বিএনপির মিডিয়া সেলের পক্ষ থেকে দেখা যাচ্ছে না, যা দলটির একটি বড় দুর্বলতা। একইভাবে হাম ইস্যু নিয়েও সরকারের মধ্যে এক ধরনের লুকোচুরি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তারা কখনো অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দোষ দিচ্ছে, কখনো আওয়ামী লীগকে জড়াচ্ছে, আবার কখনো বলছে কারো কোনো দোষ নেই। জনগণ আসলে জানতে চায় আসল অপরাধী কারা এবং তাদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পরিবর্তনের প্রক্রিয়াটি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সাবেক গভর্নর আহসান মনসুরের বিরুদ্ধে কিছু অভিযোগ নিশ্চয়ই ছিল। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের দিয়ে মব তৈরি করে গভর্নর তাড়িয়ে দেওয়ার যে অন্তর্বর্তীকালীন ধারা, তা বিএনপির মতো একটি গণতান্ত্রিক সরকারের বজায় রাখা ঠিক হয়নি। সাবেক গভর্নর মনসুর নগদ ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ে বিদেশি প্রাইভেট ইনভেস্টমেন্ট আনার পরিকল্পনা করছিলেন। সেখানে ঢাকা ১৪ আসনের এমপি ব্যারিস্টার আরমান প্রায় ১০০০ কোটি টাকার বিনিয়োগ এনে দেওয়ার ব্যবস্থা করছিলেন।

অনেকেই তখন আশঙ্কা করেছিলেন যে তুরস্ক বা মধ্যপ্রাচ্যের কোনো দেশ যদি এখানে ইনভেস্ট করে, তবে সেই সুযোগ জামায়াতে ইসলামী নিতে পারে। আরমানের হাতে গ্রাহকদের সব ডেটা চলে গেলে ভবিষ্যতে নির্বাচনে জামায়াত যে সেটি ব্যবহার করবে না, তার কোনো গ্যারান্টি ছিল না। বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর নগদ-এ কোনো প্রাইভেট ইনভেস্টমেন্ট আনা হচ্ছে না এবং আরমান সাহেবও এখন চুপ মেরে গেছেন। এসব কারণে গভর্নর মনসুরকে সরিয়ে দেওয়াটা সঠিক হয়েছে ।

আইনশৃঙ্খলার দিক থেকে বিএনপির এই ১০০ দিনে কিছু ভয়াবহ ঘটনা ঘটেছে। আমরা দেখলাম লালসালুর পীর শামিম রেজাকে মব জাস্টিসের নামে পিটিয়ে মেরে ফেলা হলো। শাহ আলীর মাজারে হামলা হলো। এসব কাজ কারা করেছে তা সবাই জানে, তবুও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কার্যত কোনো শক্ত ব্যবস্থা নিতে পারেননি। প্রশ্ন জাগে, বিএনপি কি বিরোধী দলকে কোনো কারণে ভয় পায়? তা না হলে যেভাবে গুজব, হেট স্পিচ এবং জাইমা রহমানসহ শীর্ষ নেতাদের নামে স্লাটশেমিং করছে বিরোধীরা বিএনপি তা চুপচাপ সহ্য করে কীভাবে? তারেক রহমান, খালেদা জিয়া কিংবা জাইমা রহমানকে এই কালের সবচেয়ে নোংরা কথা বলা হয়েছে, অথচ বিএনপির কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। বরং অতিমাত্রায় সুশীলতা দেখা যাচ্ছে। বাক স্বাধীনতার একটা সীমা আছে। সবকিছু এভাবে চুপচাপ মেনে নিলে সমস্যার সমাধান হবে না, বরং দলের ইমেজ নষ্ট হবে।

জামায়াত নেতা সেলিমের মন্তব্যটা নিয়ে সবচেয়ে অবাক হয়েছি। খুলনা থেকে নির্বাচনে হেরে এখন উত্তর ঢাকা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে দাঁড়ানোর কথা বলছেন তিনি। এই লোক সম্প্রতি বলেছেন তারেক রহমান যেকোনো সময় মারা যেতে পারেন, এরপর পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রস্তুত আছেন ডা শফিকুর রহমান । তিনি একজন চ্যালেঞ্জিং প্রধানমন্ত্রী হবেন। বিএনপির তৃণমূলে এই মন্তব্য নিয়ে তীব্র ক্ষোভ আছে বলে জানলাম। কিন্তু হাইকমান্ড একেবারে শান্ত। দলের প্রধান নেতাকে এভাবে বারবার হেয় করে কথা বলা হলে মানুষ বলতে শুরু করবে বিএনপি একটা মেরুদণ্ডহীন দল। বিএনপির সমর্থকরা এখন একটাই জিনিস দেখতে চায়, অ্যাকশন।

ছাত্রদলের প্রসঙ্গে একটু বলি। ছাত্রশিবির যেখানে প্রতিটি ক্যাম্পাসে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে, অনলাইনে লেখালেখি করছে, সেখানে ছাত্রদল পুরোপুরি নীরব। যুবদলের নয়ন সহ কয়েকজনের কার্যক্রম নিয়ে বিরোধী পক্ষ ট্রোল করছে। কিছুদিন আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তারেক রহমানের প্রটোকলে থাকা এসএসএফ ছাত্রদলের নেতা আমানের কলার ধরেছে। ইচ্ছাকৃত না অনিচ্ছাকৃত জানি না, কিন্তু এটা নিয়ে ব্যাপক ট্রোলের শিকার হয়েছে ছাত্রদল। সেই রেশ না কাটতেই গতকাল দেখলাম এক ছাত্রদল নেতা এসএসএফকে ধাওয়া করায় বহিষ্কার হয়েছে। এখন পাঠকবৃন্দ ভাবুন ছাত্রদলকে কারা চালাচ্ছে আর তাদের মাথায় কতটুকু ঘিলু আছে।

বিএনপি কি বিশ্ববিদ্যালয় রাজনীতিকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছে? ভবিষ্যতের নেতৃত্ব তৈরির জায়গা হিসেবে ক্যাম্পাসকে অবহেলা করা হলে তার রাজনৈতিক মূল্য দিতে হতে পারে। ডুয়েটে ভিসি নিয়োগ দিল বিএনপি, আর নিরপেক্ষ সেজে একদল শিক্ষার্থী তাণ্ডব চালাল। প্রায়ই দেখা যাচ্ছে সরকারের সিদ্ধান্তকে নানা গোষ্ঠী প্রকাশ্যে চ্যালেঞ্জ করছে। মতভেদ গণতন্ত্রের অংশ, কিন্তু সিদ্ধান্তের প্রতি ধারাবাহিক অস্বীকৃতি প্রশাসনের সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তোলে।

তবে বিএনপির প্রথম ১০০ দিনের কাজকে শুধু সমালোচনা করা ঠিক হবে না। কিছু ইতিবাচক উদ্যোগও রয়েছে। AI ভিত্তিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে ভালো প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির প্রসারও সম্ভাবনাময় উদ্যোগ হিসেবে দেখা যেতে পারে। এগুলোর সাফল্য বা ব্যর্থতা এখনই চূড়ান্তভাবে বলা সম্ভব নয়। অন্তত আরও এক বা দুই বছর সময় লাগবে বাস্তব ফল দেখতে।

সংগীত, খেলাধুলা ও সংস্কৃতিকে টার্গেট করে একটি ক্রিয়েটিভ ইকোনমি বা সৃজনশীল অর্থনীতি গড়ে তোলার যে পরিকল্পনা বিএনপি হাতে নিয়েছে , তা তরুণ প্রজন্মের কাছে ইতিবাচক মনে হয়েছে। বাংলাদেশে সংস্কৃতি ও বিনোদন খাত দীর্ঘদিন অবহেলিত ছিল। কর্মসংস্থান এবং সামাজিক প্রভাব দুই দিক থেকেই এটি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে এর জন্য সাংস্কৃতিক পরিবেশকে নিরাপদ এবং প্রাণবন্ত রাখা জরুরি। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মতো ঘটনা যদি বাড়তে থাকে তাহলে সরকারের ইতিবাচক উদ্যোগগুলোও আড়ালে চলে যাবে। যেমন সাম্প্রতিক একটি ঘটনার কারণে জিয়াউর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকী নিয়েও আলোচনা অনেকটাই ঢাকা পড়ে যায়।

সব মিলিয়ে বিএনপি সরকারের প্রথম ১০০ দিন ছিল চাপ, বিতর্ক, প্রত্যাশা এবং কিছু সম্ভাবনার মিশ্র সময়। তারা এখনো এমন এক পর্যায়ে আছে যেখানে ভুল শুধরে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু সেই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে শুধু প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, রাজনৈতিক যোগাযোগ, সাংগঠনিক শক্তি এবং সাংস্কৃতিক অবস্থান নিয়েও নতুনভাবে ভাবতে হবে। কারণ রাজনীতিতে শূন্যতা বলে কিছু থাকে না। আপনি জায়গা খালি রাখলে অন্য কেউ এসে সেটি পূরণ করবেই।




মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.