| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
সৈয়দ কুতুব
নিজের অজ্ঞতা নিজের কাছে যতই ধরা পড়ছে প্রচলিত বিশ্বাসের প্রতি ততই অবিশ্বাস জন্মাছে!
দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী বিমানবন্দরে আড়াই ঘণ্টা বসিয়ে রাখার পর প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান কলম্বোর পথ ধরে দেশে ফিরে আসেন । তিনি ভারতে ঢোকার অনুমতি পেয়েছিলেন শেষ পর্যন্ত, কিন্তু সেই অনুমতি প্রত্যাখ্যান করে ফিরে আসাটাই হয়ে গেল বার্তা। ঢাকায় ফিরে নিয়মিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি যা বললেন, তার মূল কথা হলো বাংলাদেশকে বিক্রি করে দিয়ে কোনো সম্পর্ক এই সরকার করবে না, সবার আগে বাংলাদেশ। কথাটা শুনতে ভালো, দেশপ্রেমের সুরে বাঁধা, কিন্তু এর পেছনের বাস্তবতাটা আসলে অনেক জটিল।
জাহেদ উর রহমান যেদিন এই কথাগুলো বললেন, সেদিনই তিনি একটা গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দিয়ে দিলেন। তিনি জানালেন, গঙ্গা পানি চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে এই বছরের ডিসেম্বরে, তিস্তা চুক্তি নিয়েও কথা আছে, আর বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে আরও তিপ্পান্নটা অভিন্ন নদী আছে যেগুলোর ব্যাপারে বাংলাদেশের অধিকার আছে। তিনি এমনও বললেন, এসব বিষয়ে কোনোভাবে ভূমিকা রাখার সুযোগ পেলে তিনি তা লুফে নেবেন। জাহেদ উর রহমানের দায়িত্ব তো তথ্য, সম্প্রচার, সংস্কৃতি আর নীতি-কৌশল বিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে। পানি বণ্টনের মতো স্পর্শকাতর দ্বিপক্ষীয় বিষয় নিয়ে আলোচনার এখতিয়ার তো পররাষ্ট্র বা পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের।
কূটনীতির একটা মৌলিক নিয়ম হলো কাউন্টারপার্ট টু কাউন্টারপার্ট আলোচনা। ভারত গঙ্গা বা তিস্তা নিয়ে বসবে তার সমপদস্থ মানুষের সাথে, একজন তথ্য উপদেষ্টার সাথে নয়। তাই জাহেদ উর রহমানের এই আগ্রহ যতটা আন্তরিক, ঠিক তততাই বাস্তবতা থেকে দূরে। তার ওপর তিনি ভারতের চোখে এমনিতেই একজন পরিচিত মুখ, যার ইউটিউব চ্যানেল ভারতে নিষিদ্ধ আর যিনি ভারত-বিরোধী বক্তব্যের জন্য পরিচিত। ফলে এই বিমানবন্দর কাণ্ডের পেছনে যত হয়রানির অভিযোগ থাকুক, পানি চুক্তি নিয়ে তার আলোচনায় বসার বাস্তব কোনো সুযোগ নেই, এটা স্পষ্ট।
কিন্তু এই গোটা ঘটনা একটা বড় প্রশ্নের দিকে আঙুল তুলে দেয়। সরকার যদি সত্যিই গঙ্গা চুক্তিকে এত গুরুত্ব দেয়, তাহলে এই বিষয়ে কথা বলার দায়িত্ব কেন একজন তথ্য উপদেষ্টার মুখে এসে পড়ে, আর প্রধানমন্ত্রী নিজে কেন এখনো ভারতে যাননি? কারণ আসল প্রশ্নটা জাহেদ উর রহমান নয়, আসল প্রশ্নটা তারেক রহমানের বিদেশ সফরের অগ্রাধিকার।
ফেব্রুয়ারিতে শপথ নেওয়ার পরপরই সবার আগে আমন্ত্রণ এসেছিল ভারত থেকে। লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা নিজে শপথ অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে মোদির চিঠি হাতে হাতে পৌঁছে দিয়েছিলেন। কূটনীতির ভাষায় এটা সাধারণ কোনো ভদ্রতা নয়, এটা একটা উচ্চ পর্যায়ের, ব্যক্তিগত উপস্থিতির মাধ্যমে দেওয়া সম্মান। তারপর এলো মালয়েশিয়া আর চীনের আমন্ত্রণ, কিন্তু সেগুলো এসেছিল ফোনে শুভেচ্ছার মধ্য দিয়ে বা দূতাবাসের মাধ্যমে, একই মাপের গুরুত্ব নিয়ে নয়। চার মাস পর যখন প্রধানমন্ত্রীর প্রথম বিদেশ সফরের তারিখ ঠিক হলো, দেখা গেল তিনি যাচ্ছেন একুশ ও বাইশ জুন মালয়েশিয়া, আর সেখান থেকে সরাসরি চীন। ভারতের কোনো নির্দিষ্ট তারিখ এখনো ঠিক হয়নি।
সরকারের ব্যাখ্যা শুনতে যুক্তিসঙ্গত লাগে। ভারত আর চীনের মধ্যে আঞ্চলিক প্রতিযোগিতার বাস্তবতায় কোনো একটা পক্ষের দিকে ঝুঁকে না পড়ে তৃতীয় একটা দেশকে বেছে নেওয়া, যাতে কাউকে অসন্তুষ্ট না করা হয়। মালয়েশিয়ায় আট লাখের বেশি বাংলাদেশি শ্রমিক কাজ করেন, তাই শ্রমবাজার নিয়ে আলোচনার একটা বাস্তব কারণও আছে। কিন্তু এই যুক্তি যতটা প্রশ্নের জবাব দেয়, ঠিক তততাই নতুন প্রশ্ন তোলে। যে দেশ চার মাস আগে সর্বোচ্চ পর্যায়ে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল, সেই দেশকে এড়িয়ে গিয়ে নিরপেক্ষতা দেখানো যায়, কিন্তু তারপরও ভারত সফরের একটা প্রতীকী তারিখ অন্তত আগেভাগে ঠিক করে রাখা যেত। নিরপেক্ষতা আর অগ্রাধিকার না থাকা এক কথা নয়।
এখানেই গঙ্গা চুক্তির প্রসঙ্গ আবার ফিরে আসে। তিরিশ বছরের পুরনো পানি বণ্টন চুক্তি, যার মধ্যে প্রবাহ সূত্র, সর্বনিম্ন নিশ্চিত পানির পরিমাণ আর জরুরি পরিস্থিতির ব্যবস্থা সবকিছু লেখা থাকে, এমন একটা চুক্তি নবায়নের জন্য দরকার দীর্ঘ কারিগরি আলোচনার সময়। ১৯৯৬ সালের চুক্তিও দশকের পর দশক আলোচনার ফসল ছিল। ডিসেম্বরের কাছাকাছি গিয়ে আলোচনা শুরু করলে দরকারি খুঁটিনাটি গুছিয়ে নেওয়ার সময়ই হাতে থাকবে না। বাংলাদেশ এই নদীগুলোর নিম্ন অববাহিকার দেশ, চুক্তি দেরি হলে বা না হলে ক্ষতি বাংলাদেশেরই বেশি হবে, ভারতের কম। তাই সময় যত গড়াবে, বাংলাদেশের দরকষাকষির জায়গা তত সংকুচিত হবে।
প্রথম সফরটা যদি ভারতেই হতো, তাহলে নেতৃত্ব পর্যায়ে একটা সম্পর্কের ভিত্তি আগেভাগে তৈরি হয়ে যেত, যার ওপর দাঁড়িয়ে গঙ্গা ও তিস্তা নিয়ে কারিগরি আলোচনা এগিয়ে নেওয়া অনেক সহজ হতো। আর তেমন একটা ভিত্তি থাকলে জাহেদ উর রহমানের বিমানবন্দর কাণ্ডের মতো ছোট একটা ঘটনা এতটা বড় হয়ে উঠতে পারত না। নেতৃত্ব পর্যায়ে সম্পর্ক পোক্ত থাকলে এই ধরনের আকস্মিক ঝামেলা সামলানোর একটা বাফার তৈরি হয়, যা এখন নেই। উল্টোদিকে, এই বিমানবন্দর কাণ্ডের পরদিনই, ষোলো জুন, একনেক বৈঠকে চীনের অর্থায়নে আনোয়ারায় চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চলের প্রকল্প অনুমোদন পেয়ে গেল, এমন একটা প্রকল্প যা বছরের পর বছর কাগজে কলমে আটকে ছিল আর গত নয় জুনই একবার বাতিল হয়ে গিয়েছিল।
এই সময়ের মিলটা নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করে না যে একটার সাথে আরেকটার সরাসরি সম্পর্ক আছে, কিন্তু প্রশ্ন তোলার মতো যথেষ্ট কাছাকাছি সময়ে ঘটনাগুলো ঘটেছে। আর এর মধ্যেই মে মাসে পাকিস্তানের সাথে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে দশ বছর মেয়াদী একটা গোয়েন্দা ও সীমান্ত নিরাপত্তা সমঝোতা স্মারক সইও হয়ে গেছে। তিন দিক থেকে তিন রকম গতি দেখা যাচ্ছে, পাকিস্তানের সাথে অগ্রগতি, চীনের সাথে অগ্রগতি, আর ভারতের সাথে শুধু কথার ফুলঝুড়ি ।
সরকার যে পথে যেতে চায় দেখতে হবে এই পথে গেলে সামনে কী বিপদ অপেক্ষা করছে। প্রথম বিপদ হলো সময়। ডিসেম্বরের দিকে গিয়ে যদি আলোচনা শুরু হয়, তখন আর দরকষাকষির সময় থাকবে না, বাংলাদেশকে অনেক বেশি ছাড় দিয়ে চুক্তি করতে বাধ্য হতে হতে পারে, বা চুক্তিই হবে না, যার ফল ভোগ করবে দেশের কৃষি আর খাবার পানির ওপর নির্ভরশীল মানুষ। দ্বিতীয় বিপদ হলো সংকেতের বিপদ। একটা দেশ যখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে সম্মান দেখিয়ে আমন্ত্রণ জানায় আর তার বদলে দেখে তাকে তৃতীয় কাতারে রাখা হয়েছে, তখন সেই সম্পর্কের মধ্যে একটা অবিশ্বাসের বীজ থেকে যায়, যা ভবিষ্যতের প্রতিটা আলোচনায় ছায়া ফেলবে। তৃতীয় বিপদ হলো অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বিপদ। জাহেদ উর রহমানের মতো ছোট ছোট ঘটনাকে যদি বড় জাতীয়তাবাদী বক্তব্যের উপকরণ বানানো হয়, অথচ পেছনে বাস্তব কূটনৈতিক অগ্রগতি না থাকে, তাহলে জনগণের প্রত্যাশা আর বাস্তবতার মধ্যে ফারাক তৈরি হবে, যা একদিন সরকারকেই প্রশ্নবিদ্ধ করবে।
সরকারের পক্ষের একটা যুক্তি অবশ্যই আছে, আর সেটাকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কারিগরি পর্যায়ের আলোচনা, মানে যৌথ নদী কমিশনের বৈঠকগুলো আগে পরিপক্ব হোক, তারপর নেতৃত্ব পর্যায়ের সফর হোক চুক্তি সিল করার জন্য, এই যুক্তিটাও কূটনীতিতে প্রচলিত একটা পথ। কিন্তু এই যুক্তি তখনই কাজ করে যখন কারিগরি আলোচনা সত্যিই সুনির্দিষ্ট একটা সময়সীমার দিকে এগোচ্ছে বলে স্পষ্ট প্রমাণ থাকে। এখন পর্যন্ত তেমন কোনো স্পষ্ট অগ্রগতি জনসমক্ষে দেখা যাচ্ছে না। আর ডিসেম্বর যত কাছে আসছে, এই অপেক্ষাটা তত বেশি ঝুঁকির হয়ে উঠছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে যে চুক্তি হয়েছিল, তার মধ্যে যত ভালো মন্দ থাকুক, বিএনপি নিজেকে দেশের একমাত্র যত্নশীল রাজনৈতিক শক্তি বলে নিজেকে দাবি করে, তাদের জন্য এই চুক্তির নবায়ন একটা আসল পরীক্ষা। মুখে সবার আগে বাংলাদেশ বলাটা সহজ, কিন্তু ডিসেম্বরের আগে টেবিলে বসে একটা ভালো চুক্তি আদায় করে আনাটাই হবে সেই কথার আসল প্রমাণ। মোদির ব্যক্তিগত আমন্ত্রণের জবাবে যদি প্রধানমন্ত্রী আগেভাগে দিল্লি সফর করতেন, তাহলে গঙ্গা চুক্তি নিয়ে একটা ইতিবাচক গতি তৈরির সুযোগ অনেক বেশি থাকত। আমেরিকা এই সিদ্ধান্তে কোনোদিনই অসন্তুষ্ট হতো না যদি ভারত সফর আগে হতো, শুধু চীনের প্রতিক্রিয়া কেমন হতো সেটাই ছিল আসল চিন্তার জায়গা। তবু এখন সময় চলে যায়নি। ডিসেম্বরের আগে এখনও কয়েক মাস হাতে আছে, আর এই সময়ের মধ্যেই গঙ্গা চুক্তি নিয়ে জোরেশোরে আলোচনা শুরু করাটাই এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ।
একটা অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, সরকারের পক্ষ থেকে একটা পদক্ষেপ আমি নিয়েছি'-বিবিসি বাংলা ।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফর মালয়েশিয়ায়- প্রথম আলো ।
প্রধানমন্ত্রীকে মোদীর চিঠি, দ্রুত সময়ের মধ্যে দিল্লি সফরের আমন্ত্রণ- জাগোনিউজ
©somewhere in net ltd.
১|
১৮ ই জুন, ২০২৬ ভোর ৫:২৭
স্বপ্নের শঙ্খচিল বলেছেন: ডিসেম্বরের আগে এখনও কয়েক মাস হাতে আছে,
...........................................................................
এই চুক্তির মাধ্যমে বিগত দিনে আমাদের কতটুকু লাভ
হয়েছে তা কেউ বলছেনা । যতটুকু জানি চুক্তির শর্ত
ভারত বারবার ভঙ্গ করেছে এবং চুক্তি মতে পানি আমরা
পাইনি । সুতরাং হটকারী চুক্তি ফেলে দিয়ে তিস্তা ব্যারেজ অতি
দ্রুত করা উচিৎ বলে মনে করি ।