| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
সৈয়দ কুতুব
নিজের অজ্ঞতা নিজের কাছে যতই ধরা পড়ছে প্রচলিত বিশ্বাসের প্রতি ততই অবিশ্বাস জন্মাছে!
ছোটবেলা থেকে বিটিভির টকশো শোনার একটা অভ্যাস ছিল আমার। বাসার সবাই হাসাহাসি করত, এই ছেলে নাটক সিনেমা বাদ দিয়ে বুড়ো মানুষদের কথাবার্তা শোনে কেন। সেই অভ্যাসটা এখনো যায়নি। যারা দেশের বড় বড় জায়গায় চাকরি করেছেন, তাদের কথা মন দিয়ে শুনি, ভাবি এত পড়াশোনা করা মানুষ নিশ্চয়ই এমন কিছু বলবেন যা আমার মতো সাধারণ মানুষের চোখ খুলে দেবে।
সম্প্রতি সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুর সাহেবের একটা টকশো দেখলাম। বিশ্বব্যাংক আর আইএমএফের মতো জায়গায় কাজ করা মানুষ, বিশাল পাণ্ডিত্য, কথায় কথায় পরিসংখ্যান। তিনি বললেন যদি এখনো তিনি গভর্নর থাকতেন তাহলে নীতি সুদহার আরো বাড়িয়ে বারো শতাংশ করে দিতেন। শুনে চমকে উঠলাম। এত সহজে একটা মানুষ কী করে বলতে পারেন যে সুদহার আরো বাড়াতে হবে, যখন গত দেড় বছরের বাস্তবতা তার উল্টো কথা বলছে।
নীতি সুদহার বা পলিসি রিপো রেট হলো এমন একটি হার যে হারে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে ধার দেয়। এই হার বাড়লে ব্যাংকগুলোর ধার করার খরচ বাড়ে এবং ফলস্বরূপ তারা তাদের গ্রাহকদের মানে ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের ঋণের সুদহার বাড়িয়ে দেয়। এর উদ্দেশ্য হলো বাজারে অর্থের সরবরাহ কমিয়ে মূল্যস্ফীতি বা জিনিসের দাম নিয়ন্ত্রণ করা। বর্তমানে বাংলাদেশের নীতি সুদহার ১০ শতাংশ যা বেশ চড়া কারণ দেড় বছরের বেশি সময় ধরে মূল্যস্ফীতি কমছে না বরং ৯ শতাংশের উপরে অবস্থান করছে যেখানে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৭ শতাংশ।
ব্যাংক ঋণের সুদহার এখন ১৫ থেকে ১৭ শতাংশে পৌঁছেছে আর বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ নেমে এসেছে ২২ বছরের মধ্যে সর্বনিম্নে অর্থাৎ মাত্র ৬১ শতাংশ। নির্বাচনের পর নতুন সরকার এসে গভর্নর বদলে দিয়েছে, তবু নতুন গভর্নরও এই জুন মাসের মুদ্রানীতিতে সুদহার দশ শতাংশেই রেখে দিয়েছেন। মানে যে ওষুধ দেড় বছর ধরে কাজ করছে না, সেই একই ওষুধের পরিমাণ আরো বাড়ানোর কথা বলছেন সাবেক গভর্নর ।
গবেষকরা বারবার বলছেন বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি চাহিদাজনিত না, সরবরাহজনিত। গ্যাসের সংকট, চাহিদার তুলনায় সরবরাহ প্রায় ত্রিশ শতাংশ কম। ডলার সংকটের কারণে টাকা দুর্বল হচ্ছে, বিশ্ববাজারে পণ্যমূল্য কমলেও দেশের বাজারে তার সুফল মিলছে না। চট্টগ্রাম বন্দরে সার্ভিস চার্জ একচল্লিশ শতাংশ বেড়ে গেছে, প্রতিটা কনটেইনারে বাড়তি খরচ বাইশ হাজার আটশো টাকা পর্যন্ত। এলসি খোলাই এখন কঠিন কাজ। এই সবকটা সমস্যার সাথে সুদহারের কোনো সম্পর্ক নেই।
সুদহার বাড়িয়ে চাহিদা কমানো মানে হলো রোগীর পায়ে ব্যথা, আর ওষুধ দেওয়া হচ্ছে মাথার জন্য। ফলাফল কী হলো, রোগও সারল না, উল্টো নতুন রোগ তৈরি হলো। উচ্চ সুদের কারণে ব্যবসায়ীরা ঋণ নিতে পারছেন না। যারা খেলাপি হয়ে গেছেন তারা নতুন ঋণ বা এলসি পাচ্ছেন না, কাঁচামাল আনতে পারছেন না, কারখানা চালাতে পারছেন না, আরো খেলাপি হচ্ছেন। এই দুষ্টচক্রে পোশাক খাতে খেলাপি ঋণের হার এখন একত্রিশ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। গত তিন বছরে চারশোর বেশি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে, হাজার হাজার শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন। সরকার ষাট হাজার কোটি টাকার তহবিল ঘোষণা করেছে, পাঁচ শতাংশ প্রণোদনার কথা বলেছে, কিন্তু যাদের সবচেয়ে বেশি সাহায্য দরকার, যারা খেলাপি হয়ে গেছেন, তারাই এসব সুবিধার বাইরে থেকে যাচ্ছেন।
এখন সবচেয়ে অদ্ভুত অংশে আসি। ঠিক এই সময়েই সরকার নবম পে স্কেলের ঘোষণা দিয়েছে। বেতন আর পেনশন মিলিয়ে বাজারে ঢুকবে প্রায় এক লাখ একত্রিশ হাজার কোটি টাকা। একদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজার থেকে টাকা তুলে নিতে চাইছে সুদহার বাড়িয়ে, অন্যদিকে সরকার নিজেই বিশাল অঙ্কের টাকা বাজারে ছেড়ে দিচ্ছে। একদিকে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি, অন্যদিকে সম্প্রসারণমূলক রাজস্বনীতি, দুটো একসাথে চলছে বিপরীত দিকে। সরকার যখন বাজার থেকে বিশাল ঋণ নেবে পে স্কেলের টাকা জোগাড় করতে, তখন বেসরকারি খাতের জন্য ঋণযোগ্য টাকা আরো কমে যাবে। আর বাড়তি চাহিদা এমন একটা সময়ে আসছে যখন কারখানা বন্ধ হয়ে সরবরাহ ক্ষমতা কমে গেছে। মানে একই সাথে দুই ধরনের মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা।
টকশোতে মনসুর সাহেব সুদহার নিয়ে অনেক কথা বললেন, কিন্তু পে স্কেল নিয়ে একটা শব্দও উচ্চারণ করলেন না। যে কমিশন তার নিজের আমলেই গঠিত হয়েছিল, সেই সিদ্ধান্তের অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে তিনি সম্পূর্ণ নীরব। একজন মানুষ যিনি মুদ্রা সরবরাহ কমানোর জন্য এত সোচ্চার, তিনি লাখ কোটি টাকা বাজারে ঢোকার প্রশ্নে চুপ থাকেন কী করে। এই নীরবতাটাই আসলে সবচেয়ে জোরে কথা বলে।
যে মানুষটা এত বড় বড় ডিগ্রি নিয়ে, এত সম্মানজনক পদে কাজ করে এসেছেন, তার কাছ থেকে আমরা কী পেলাম। কাগজে কলমে দেশের সবচেয়ে মেধাবী মানুষরা যখন নীতিনির্ধারণের চেয়ারে বসেন, আমরা আশা করি তারা পুরো সমাজের কথা ভাববেন, শুধু একটা সংখ্যার পেছনে ছুটবেন না। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে একটা হাতিয়ার নিয়ে গোঁ ধরে বসে থাকা, সেই হাতিয়ার গত দেড় বছরে কাজ করেনি জেনেও একই কথার পুনরাবৃত্তি করা।
এদিকে যাদের সিদ্ধান্তের ভার বহন করতে হচ্ছে, তারা কারা ? কারখানার শ্রমিক, যারা সারাজীবন কষ্ট করে কাজ করেন, বয়স বাড়ার সাথে সাথে শরীরে নানা রকম সমস্যা বাসা বাঁধে, তারপরও দেশের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা আয় করে যান। এই মানুষগুলো জানেনও না যে তাদের চাকরিটা চলে যাওয়ার পেছনে কোনো একটা মিটিং রুমে বসে নেওয়া সিদ্ধান্ত কাজ করেছে। হাজারো শ্রমিক ছাঁটাই হওয়া বা কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া মনসুর সাহেবদের মতো মানুষের কাছে শুধুমাত্র কিছু সংখ্যা ছাড়া কিছুই নয়।
শিক্ষিত মানুষ ভালো সিদ্ধান্ত নেবেন এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই, এই সত্যিটা মেনে নিতে কষ্ট হয়। ডিগ্রি অনেক কিছু শেখায়, কিন্তু দায়বদ্ধতা শেখায় না। যে মানুষ অক্ষরজ্ঞানহীন, সে হয়তো একটা মালগাড়ির একটা বগি চুরি করতে পারে, কিন্তু উচ্চশিক্ষিত মানুষ চাইলে পুরো মালগাড়িটাই উধাও করে দিতে পারেন, শুধু কাগজে কলমে সব ঠিকঠাক দেখিয়ে। শিক্ষা তখন সম্পদ থাকে না, বরং একটা সূক্ষ্ম অস্ত্র হয়ে ওঠে। দেশের শিক্ষিত শ্রেণি আসলে দেশের সম্পদ, নাকি এমন এক বোঝা যেটা বহন করতে গিয়ে সবচেয়ে বেশি কষ্ট পোহাতে হয় তাদের, যারা কখনো টকশোতে ডাক পান না, শুধু নীরবে কাজ করে যান আর একদিন হঠাৎ শুনতে পান কারখানার গেটে তালা ঝুলছে।
আমি এখন থাকলে নীতি সুদহার ১২ শতাংশ করতাম’… সাবেক আহসান এইচ মনসুর
photocard courtesy: citizens voice
©somewhere in net ltd.