| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
সৈয়দ কুতুব
নিজের অজ্ঞতা নিজের কাছে যতই ধরা পড়ছে প্রচলিত বিশ্বাসের প্রতি ততই অবিশ্বাস জন্মাছে!
ফ্যাসিবাদকে পরাজিত করা গেছে, কিন্তু পুরোপুরি নির্মূল করা যায়নি। অন্তত প্রযুক্তির দিকে তাকালে এমনটাই মনে হচ্ছে। যে আওয়ামী লীগ এতদিন মানুষের ভোট, মতামত, রাজপথ, রাষ্ট্রযন্ত্র সবকিছুর ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে রেখেছিল, সেই আওয়ামী লীগ এখন ডিজিটাল জগতের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ফ্যাসিবাদ যখন এতটা উন্নত হয়ে যায় যে ক্ষমতায় না থেকেও মানুষের সোশাল মিডিয়া ফিড দখল করে ফেলে, তখন বিষয়টিকে আর সাধারণভাবে দেখার অবকাশ নেই। একে মোকাবেলা করতে হলে রাষ্ট্রকেও সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোতে হবে।
সম্প্রতি Anthropic এমনই এক ভয়াবহ প্রযুক্তিগত অগ্রগতির সন্ধান পেয়েছে। গাইবান্ধার একজন আওয়ামী লীগপন্থী ব্যক্তি প্রায় ১৬ মাস ধরে এআই চ্যাটবট Claude ব্যবহার করে বিপুল পরিমাণ ভুয়া রাজনৈতিক কনটেন্ট তৈরি করেছেন। ২৯টি Claude account ব্যবহার করা হয়েছে। অর্থাৎ ফ্যাসিবাদ আপাতত মাঠে না থাকলেও cloud এ বেশ সক্রিয়। একজন মানুষ একা এত বড় কাজ করেছেন বলেই বিষয়টি আরও ভয়ংকর। Claude দিয়ে একসঙ্গে ১৫টি headline, ৩টি fabricated story এবং ১৫টি image prompt তৈরি করার জন্য Python script ব্যবহার করা হয়েছে। পরে সেই কনটেন্ট audio video তে রূপান্তর করে YouTube, Facebook ও TikTok এ ছড়িয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
Anthropic এর হিসাবে অন্তত ১,৫০০টি fabricated headline, ৩০০টি false narrative এবং ১,৫০০টি image prompt তৈরি হয়েছিল। অর্থাৎ আমরা এতদিন যে ফ্যাসিবাদকে মিছিল, বক্তৃতা আর পোস্টার দিয়ে চিনতাম, সেটি এখন Python script দিয়েও চিনতে হবে। Anthropic অবশ্য সরাসরি বলেনি যে আওয়ামী লীগ এই কাজ করেছে। তারা একজন আওয়ামী লীগপন্থী ব্যক্তির operation শনাক্ত করেছে এবং দলটি এটি পরিচালনা বা অর্থায়ন করেছে এমন কোনো প্রমাণ পায়নি।
এই খবর পড়ে নেটিজেনদের মাথায় একটাই প্রশ্ন ঘুরছে। একজন মানুষ একা বসে যদি এই লেভেলের অপারেশন চালাতে পারেন, তাহলে দলের সম্মিলিত শক্তি ব্যবহার হলে কী হতে পারে সেটা চিন্তা করলেই গা শিউরে ওঠে। বিরোধী দলগুলোর তো তাহলে এআই যুগে টিকে থাকাই কঠিন হয়ে যাবে। সৌভাগ্যক্রমে ঠিক এই সময়েই একটা স্বস্তির খবর কানে এলো। সরকার তরুণদের জন্য এআই প্রশিক্ষণ চালু করছে। চৌষট্টি জেলায়, দুই মাস মেয়াদি, সঙ্গে দৈনিক দুইশ টাকা ভাতাও থাকছে। শুনে ভরসা হলো, রাষ্ট্র তাহলে বিষয়টা গুরুত্ব দিয়ে দেখছে।
এমন একটা সময়ে যখন একজন মানুষ একাই AI, Python আর automation ব্যবহার করে রাজনৈতিক প্রচারণার এত বড় ব্যবস্থা দাঁড় করিয়ে ফেলতে পারেন, তখন গোটা একটা প্রজন্মকে এআই শিখিয়ে দেওয়াটা নিঃসন্দেহে দূরদর্শী পদক্ষেপ। এই মহৎ উদ্যোগের পেছনে আছে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের বাজেটও নেহাত কম নয়। ফলে তরুণদের নিয়ে বড় ধরনের চিন্তা করার মতো সামর্থ্য তাদের আছে বলেই ধরে নেওয়া যায়। বিজ্ঞপ্তি ঘেঁটে দেখা গেল, এই প্রশিক্ষণের জন্য এইচএসসি পাস, বেসিক আইসিটি জ্ঞান এবং ইংরেজিতে দক্ষতা চাওয়া হয়েছে। বয়স ১৮ থেকে ৩৫ বছর। দুই মাসের প্রশিক্ষণ, সঙ্গে প্রতিদিন ২০০ টাকা ভাতা।
কোর্স শেষে একজন তরুণ ঠিক কী কী করতে পারবেন, কতজন চাকরি পাবেন, কতজনের আয় বাড়বে, কতজন freelancing করবেন কিংবা কতজন বাস্তবে AI দিয়ে কোনো কাজ তৈরি করবেন, এসব নিয়ে অবশ্য বিজ্ঞপ্তিতে খুব বেশি কিছু বলা নেই। তবে নিশ্চয়ই পরিকল্পনাকারীদের কাছে এসবের হিসাব আছে। সব হিসাব জনগণের জানার প্রয়োজন নেই। কোর্সের বিষয়বস্তু মূলত ChatGPT বা Claude এর মতো AI tool কীভাবে ব্যবহার করতে হয়, prompt কীভাবে লিখতে হয়, এই ধরনের basic বিষয়। এগুলো অবশ্য ইন্টারনেটে অনেক জায়গায় বিনামূল্যে শেখা যায়। কিন্তু সরকারি ব্যবস্থাপনায় দুই মাস ধরে ভাতা নিয়ে শেখার মধ্যে নিশ্চয়ই আলাদা একটা মর্যাদা আছে। নইলে সরকারই বা এত আয়োজন করবে কেন।
তবে আমার শুরু থেকেই যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের বাজেট নিয়ে একটু খটকা আছে। তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন অবশ্যই দরকার। কিন্তু এই মন্ত্রণালয়কে দক্ষতা উন্নয়নের বিভিন্ন কোর্স পরিচালনা করা এবং ক্রীড়ার জন্য অবকাঠামো তৈরির বাইরে বড় পরিসরে কী ধরনের measurable outcome তৈরি করতে দেখা যাচ্ছে, সেটাও জানা দরকার। কিছু মানুষ অবশ্যই এসব প্রশিক্ষণ থেকে উপকৃত হচ্ছেন। সেটি অস্বীকার করার কারণ নেই। কিন্তু বড় প্রশ্ন হলো, এতগুলো প্রশিক্ষণ কর্মসূচি মিলিয়ে বছরে কতজন তরুণ সত্যিকার অর্থে দক্ষ কর্মীতে পরিণত হচ্ছেন? প্রশিক্ষণ শেষ করার পর কতজনের চাকরি হচ্ছে? কতজন আয় করছেন? কতজন বিদেশের শ্রমবাজারে যেতে পারছেন? কতজন নিজের উদ্যোগে কাজ তৈরি করছেন?
এসব প্রশ্নের উত্তর না থাকলে প্রশিক্ষণ নিজেই একটা outcome হয়ে যায়। অর্থাৎ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে, তাই কাজ হয়েছে। ক্রীড়ার অবস্থাও খুব আশাব্যঞ্জক নয়। নিয়মিত আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নতুন খেলোয়াড় উঠে আসছে না, দীর্ঘমেয়াদি player development pipeline নিয়ে প্রশ্ন আছে। তারপরও মন্ত্রণালয়ের বড় বাজেট আছে। ফলে সেই টাকা কোথায় কতটা কার্যকরভাবে খরচ হচ্ছে, এই প্রশ্নটা করা অন্যায় হওয়ার কথা নয়।
বরং মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা যদি বসে চিন্তা করেন, এত টাকা কীভাবে আরও ভালোভাবে খরচ করা যায়, তাহলে AI course এর কথা মাথায় আসতেই পারে। পৃথিবীতে AI জনপ্রিয় হয়েছে, যুবকদের AI শেখানোও ভালো শোনায়, একটা প্রকল্প করা যায়, প্রশিক্ষণ দেওয়া যায়, ভাতা দেওয়া যায়, শেষে বলা যায় তরুণদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা বাড়ানো হচ্ছে। দিন শেষে প্রকল্পের খাতায় একটা খরচও দেখানো যাবে।
এখানে AI এর কোনো দোষ নেই। দোষ থাকলে সেটা আমাদের ভাবনার মধ্যে। কারণ একটি কোর্স চালু করা এবং একটি দক্ষতা তৈরি করা এক জিনিস নয়। এই কোর্সে সবচেয়ে বেশি অংশগ্রহণ করা উচিত সরকারের রাজনৈতিক দলের তরুণ নেতাকর্মীদের। কারণ তাদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ইতোমধ্যেই AI নিয়ে বেশ এগিয়ে গেছে। গাইবান্ধার একজন মানুষ যদি Claude দিয়ে এত কিছু করতে পারেন, তাহলে সরকার দলের তরুণ রাজনৈতিক কর্মীরা কেন পিছিয়ে থাকবেন?
তাদের অন্তত basic AI training নেওয়া দরকার।এতে এক ঢিলে দুই পাখি মারা যেতে পারে। একদিকে তারা AI শিখবে, অন্যদিকে দুই মাস একটা কাজে ব্যস্ত থাকবে। তার সঙ্গে প্রতিদিন ২০০ টাকা ভাতাও আছে। সারাদিন রাজনৈতিক কর্মসূচি, মিছিল, পোস্টার কিংবা সামাজিক মাধ্যমে ঝগড়াঝাঁটির বদলে যদি দুই মাস AI শেখায় ব্যস্ত থাকে, সমাজের কিছুটা লাভ হতে পারে। এমনকি দুই মাসের জন্য চাঁদাবাজির বাজারেও সামান্য চাপ কমতে পারে।
অবশ্য একটা বিষয় নিয়ে আমি পুরোপুরি নিশ্চিন্ত আছি । এতদিন তরুণদের জন্য নানা ধরনের প্রশিক্ষণ হয়েছে, এবার সেখানে এআইও যুক্ত হলো। ফলে ভবিষ্যতে কোনো প্রশ্ন উঠলে অন্তত বলা যাবে, তরুণদের জন্য আমরা কিছু একটা করেছি। প্রশিক্ষণ হয়েছে, ভাতা দেওয়া হয়েছে, সার্টিফিকেট দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় অর্থ যথাযথভাবে তরুণদের পেছনেই ব্যয় হয়েছে। তারা প্রশিক্ষণ নিয়ে কী করবে, সেটা অবশ্য তাদের ব্যক্তিগত বিষয়। রাষ্ট্রের দায়িত্ব ছিল সুযোগ তৈরি করা। সুযোগ তৈরি হয়েছে। এখন সেই সুযোগ কাজে লাগানো গেলে ভালো, না লাগালেও প্রশিক্ষণ তো আর বাতিল হয়ে যাবে না। আর সবচেয়ে বড় কথা, দুই মাস পর প্রকল্প শেষ হয়ে যাবে। এরপর আরেকটা প্রযুক্তি জনপ্রিয় হলে সেটার জন্যও নিশ্চয়ই নতুন করে ভাবার সুযোগ থাকবে।
https://starnews.com.bd/national/22822/free-ai-training-across-64-districts-daily-allowance-of-tk-200.html
৬৪ জেলায় ফ্রি এআই প্রশিক্ষণ, দৈনিক মিলবে ২০০ টাকা ভাতা
এআই দিয়ে আওয়ামী লীগের পক্ষে ১৬ মাসে দেড় হাজার ভুয়া খবর, নেপথ্যে এক ব্যক্তি
https://banglastream.net/news/bsxqn6uh04ce
©somewhere in net ltd.