| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
সৈয়দ কুতুব
নিজের অজ্ঞতা নিজের কাছে যতই ধরা পড়ছে প্রচলিত বিশ্বাসের প্রতি ততই অবিশ্বাস জন্মাছে!
বিশ্বজুড়ে থরথর কম্পন শুরু হয়ে গেছে। মার্কিন মুল্লুক থেকে মহাখালী, সবাই আজ বাকরুদ্ধ। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন বিস্ফোরণ ঘটেছে। বিশ্বস্ত সূত্রে, অর্থাৎ ভারতীয় কয়েকটি বেনামী ফেসবুক পেজ এবং মানবজমিন পত্রিকার মারফতে জানা গেছে, ব্রিকস সম্মেলনের আড়ালে আমাদের সাবেক নেত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে একান্তে ফোনে কথা বলেছেন স্বয়ং রুশ ডিক্টেটর ভ্লাদিমির পুতিন। আর এই যোগাযোগের নেপথ্য কারিগর আর কেউ নন, খোদ ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল।
খবরটি শোনার পর আওয়ামী লীগের সাইবার যোদ্ধাদের ফেসবুক উল্লাস দেখে মনে হচ্ছে, ডোনাল্ড ট্রাম্প কিংবা পুতিন নিজে এসে তাদের হাতে ক্ষমতার চাবি দিয়ে গেছেন। কেউ কেউ হয়তো ইতোমধ্যে মন্ত্রিসভার তালিকাও বানিয়ে ফেলেছেন। খবরটি সত্য কি না, সেটি অবশ্য একটু পরের বিষয়। আপাতত খবরটি এসেছে, এটাই যথেষ্ট। তবে একটু গভীরে গেলে এই উল্লাসের মধ্যে একটা দীর্ঘশ্বাসও শোনা যায়। দলটার বোধহয় এখনো কোনো শিক্ষা হয়নি। ধরা যাক, খবরটি সত্য। পুতিন সত্যিই শেখ হাসিনাকে ফোন করেছেন। তাহলে আমার ধারণা, কথোপকথনের শুরুটা খুব একটা রাজনৈতিক হবে না। পুতিন হয়তো প্রথমেই বলবেন, ম্যাডাম, আপনি আমাদের একটা বিপদের মধ্যে ফেলে গেলেন।
রূপপুরের পেমেন্ট নিয়ে ঝামেলা চলছে। তার ওপর পুলিশ বাহিনীর জন্য দুটো হেলিকপ্টার কিনে ৭০ শতাংশ টাকা দিয়ে দিলেন। এখন বর্তমান সরকার বলছে, হেলিকপ্টার লাগবে না, টাকা ফেরত দাও। তোমার হেলিকপ্টার তোমার কাছেই রাখো। পুতিন হয়তো একটু চুপ করে থেকে আবার বলবেন, ম্যাডাম, আপনি হেলিকপ্টার কিনলেন কেন? উত্তর আসবে, পুলিশের আধুনিকায়নের জন্য। তখন পুতিন হয়তো বলবেন, আধুনিকায়ন ঠিক আছে। কিন্তু হেলিকপ্টার তো এখনো বাংলাদেশ ডেলিভারি নিল না। সমস্যাটা আসলে সেখানেই।
২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর রাশিয়ার ওপর একের পর এক পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা আসছে। যে প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে হেলিকপ্টার কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, সেটিও মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতায় ছিল। সেই সময়েই বাংলাদেশ রাশিয়ার কাছ থেকে পুলিশের জন্য হেলিকপ্টার কেনার পথে এগোল। শেখ হাসিনা হয়তো নিজেকে ভারতের নরেন্দ্র মোদি ভাবতে শুরু করেছিলেন। মোদিও রাশিয়া থেকে S-400 কিনেছেন। তবে ভারত আর বাংলাদেশ তো এক জিনিস নয়। ভারত আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্রকে জানিয়ে রেখেছিল, তাদের নিরাপত্তার জন্য এই অস্ত্র দরকার। পরে CAATSA আইনের আওতায় ভারত কিছুটা ছাড়ও পেয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তেমন কোনো বড় কূটনৈতিক সমঝোতা হয়েছিলো কিনা কারো জানা নেই ।
তার ওপর হেলিকপ্টার কেনার সময় সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের রাশিয়ার সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলার ছবিও সামনে এসেছিল। পরে বেনজীর আহমেদের বিপুল সম্পদের খবরও প্রকাশ্যে আসে। দুটো ঘটনাকে সরাসরি এক সুতোয় বাঁধার মতো প্রমাণ অবশ্য নেই। তবে একই গল্পে দুটো ঘটনা থাকায় পাঠকের কৌতূহল হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, শেখ হাসিনা সরকারের সময়ই হেলিকপ্টার দুটো দেশে আনার মতো পরিস্থিতি তৈরি হলো না। এখন বর্তমান সরকারও সেই একই হেলিকপ্টার নিয়ে বিপদে পড়েছে। টাকা দেওয়া হয়েছে, কিন্তু হেলিকপ্টার আনা যাচ্ছে না। আবার টাকা ফেরত চাইলেও সেটি খুব সহজ বিষয় নয়।
রাশিয়ার সঙ্গে অর্থ পরিশোধের জন্য যে ব্যাংকিং ব্যবস্থা ব্যবহারের কথা ছিল, তার ওপরও নিষেধাজ্ঞার প্রভাব পড়েছে। এ অবস্থায় পুতিন যদি ফোন করে থাকেন, তাহলে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করার আগে হেলিকপ্টারের ভবিষ্যৎ নিয়েই কথা বলার সম্ভাবনা বেশি। আওয়ামী লীগের কিছু সমর্থক যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী প্রচারে এমনভাবে নেমেছেন, মনে হচ্ছে বাংলাদেশের সব সমস্যার মূল ঠিকানা ওয়াশিংটন। ফেসবুক খুললে মনে হয় আমেরিকা ছাড়া পৃথিবীতে আর কোনো দেশ নেই, আর বাংলাদেশের সঙ্গে আমেরিকার সম্পর্কটাও যেন কাল সকালেই বাতিল করা সম্ভব।
শেখ হাসিনার কোনো ফোনালাপে আমেরিকার নাম নিয়ে কী বলেছেন, সেটি আলাদা বিষয়। কিন্তু কিছু সমর্থকের মার্কিনবিরোধী প্রচারের মাত্রা দেখে মনে হচ্ছে, নেত্রীর হয়ে তারা নিজেরাই পররাষ্ট্রনীতি চালু করে দিয়েছেন । যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রিসিপ্রোকাল ট্যাক্স চুক্তি নিয়েও তাদের ক্ষোভের শেষ নেই। যেন শেখ হাসিনা ক্ষমতায় থাকলে বাংলাদেশকে কোনো বাণিজ্যিক সমঝোতাই করতে হতো না। বাস্তবতা অবশ্য একটু অন্যরকম। শেখ হাসিনা ক্ষমতায় থাকলেও দেশের স্বার্থে এমন কোনো সমঝোতা করতে হতোই। কারণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে সরকার পরিবর্তন হয়, কিন্তু বাজার থাকে।
এরপর আসে বোয়িং । শেখ হাসিনা ২০০৯ সালে ক্ষমতায় এসে বোয়িং কেনার পথে গিয়েছিলেন। এখন বর্তমান সরকারও একই পথে হাঁটছে। দেখে মনে হচ্ছে, বাংলাদেশে ক্ষমতায় আসার সঙ্গে বোয়িং কেনার একটা অলিখিত লাইসেন্স জুড়ে গেছে। সরকার বদলাবে, রাজনৈতিক স্লোগান বদলাবে, কিন্তু বিমান কেনার আলোচনা ঠিকই থাকবে। বিমান কেনা অবশ্যই খারাপ কিছু নয়। তৃতীয় টার্মিনাল বানানো হয়েছে, বিমানবন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে হলে বিমানও লাগবে। সমস্যা বিমান কেনায় নয়। সমস্যা হলো, দেশের অর্থনীতি, জ্বালানি পরিস্থিতি, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ এবং বিমান কেনার খরচ সবকিছুকে একসঙ্গে হিসাব করতে হয়।
তার ওপর ইউরোপীয় ইউনিয়নও সরকারকে মনে করিয়ে দিচ্ছে, শুধু বোয়িং কিনলেই হবে না, Airbus-এর কথাও ভুললে চলবে না। শেখ হাসিনা আমলে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশ সফরে এসে Airbus কেনার বিষয়ে সমঝোতার কথা বলে গিয়েছিলেন। এখন ইউরোপও সেই কথাটা মাঝেমধ্যে মনে করিয়ে দিচ্ছে। থার্ড টার্মিনাল বানিয়ে যদি বিমান না থাকে, তাহলে সেটি তো আর জাদুঘর বানানোর প্রকল্প নয়। বিমান লাগবেই।
আওয়ামী লীগের কিছু সমর্থকের প্রচারের সঙ্গে বাস্তবতার সংঘর্ষ দেখা যায়। একদিকে তারা আমেরিকার বিরুদ্ধে খুব ক্ষুব্ধ। অন্যদিকে চীনের সঙ্গেও নানা বিষয়ে আপত্তি। চীনের সঙ্গে তৃতীয় ফ্লোটিং এলএনজি টার্মিনাল নিয়ে আলোচনা হলেই তাদের মাথায় হাত। সমস্যা হলো, বাংলাদেশের বর্তমান দুটি ফ্লোটিং এলএনজি টার্মিনালের কার্যক্রমের সঙ্গেই মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জি জড়িত। আমেরিকার সাথে দেশের এত বিশাল অর্থনৈতিক স্বার্থ জড়িয়ে আছে, অথচ তাদের বিরুদ্ধে এই ফালতু প্রোপাগান্ডা চালিয়ে আদতে দেশের কী লাভ হচ্ছে, কে জানে !
পুতিনের সঙ্গে ফোনালাপের গুঞ্জন সত্যি হোক বা না হোক, ক্রেমলিনের দিকে তাকিয়ে রাজনীতিতে কামব্যাক করার স্বপ্ন দেখা ভালো কথা নয় । ওয়াশিংটনের চোখরাঙানির চোটে যখন দেশের ব্যাংকে পেমেন্টের টাকা আটকে আছে, তখন পুতিন ফোন ধরে যদি বলেন "আগে বকেয়া চুকিয়ে দিন," সেই টাকা ক্রেমলিনের কোন কাউন্টারে গিয়ে জমা হবে তা হয়তো গুগলেও খুঁজে পাওয়া যাবে না। রাজনীতিতে ফেরার টিকিট সত্যি ক্রেমলিনে বিক্রি হয় কি না জানা নেই, তবে এই যুগের বাজারে টিকিটের দাম শোধ করতে গিয়ে দেশটাই যে আবার গ্যাঁড়াকলে পড়বে, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
আওয়ামী লীগের ছড়ানো গুজব দিয়ে মানবজমিনের অফিসে ‘বিশ্ব তোলপাড়’- the dissent
©somewhere in net ltd.