| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
সৈয়দ কুতুব
নিজের অজ্ঞতা নিজের কাছে যতই ধরা পড়ছে প্রচলিত বিশ্বাসের প্রতি ততই অবিশ্বাস জন্মাছে!
দিন দিন সরকারপ্রধানের ফ্যান হয়ে যাচ্ছি। তাঁর চলাফেরা, সাধারণ মানুষের সঙ্গে মেলামেশা দেখে মানুষ বলতে শুরু করেছে, এ যেন আরেক জিয়া। আর “I have a plan” কথাটার অর্থ এত দিন কষ্ট করে বুঝতে হলেও এখন আস্তে আস্তে মাথায় ঢুকছে।নভেম্বর মাসে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথমবারের মতো সৌদি আরব সফরে যাচ্ছেন তিনি। সৌদি আরব বাংলাদেশের পুরোনো মিত্র। তাই এই সফর ঘিরে সরকার দলীয় মানুষের মধ্যে বেশ উৎসাহ দেখা যাচ্ছে।
আমিও খুব এক্সসাইটেড । বিশেষ করে একটা খবর পড়ে রীতিমতো অবাক হয়েছি। বাংলাদেশ সৌদি আরবের মাটিতে যৌথ বিনিয়োগে প্রথমবারের মতো কারখানা তৈরির আলোচনা করছে। ভাবা যায় ! আমাদের দেশ, যেখানে নিজেদের চালু কারখানাগুলো সচল রাখতেই হিমশিম খেতে হয়, সেই দেশ এবার বিদেশের মাটিতে কারখানা তৈরি করবে। তাও আবার যৌথ মালিকানায়। আসলে বাংলাদেশ ৫জি গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে।
সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় খনিজ ও সার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান Ma’aden-এর সঙ্গে বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগে ডিএপি সার কারখানা তৈরির আলোচনা হচ্ছে। প্রস্তাবিত কারখানার উৎপাদনক্ষমতা বছরে ১০ লাখ টন। বাংলাদেশের সরাসরি ইকুইটি বিনিয়োগ হবে ১৫ শতাংশ, সৌদি পক্ষেরও ১৫ শতাংশ। বাকি ৭০ শতাংশ অর্থ সৌদি আরবের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে ঋণ হিসেবে নেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। বাংলাদেশ আবার ২০ থেকে ২৫ বছর ধরে কারখানার উৎপাদিত সার কেনার নিশ্চয়তা দেবে।
সৌদি আরব থেকে সার কেনার জন্য বাংলাদেশের সঙ্গে Ma’aden-এর বাণিজ্যিক সম্পর্ক নতুন নয়। বাংলাদেশ আগে থেকেই সৌদি আরব থেকে ডিএপি সার আমদানি করে। এমনকি সার আমদানির অর্থায়নে ITFC বা International Islamic Trade Finance Corporation-এর অর্থায়ন ব্যবস্থাও রয়েছে। ITFC-এর অর্থায়নে বাংলাদেশ সার আমদানি করতে পারে, অর্থাৎ সার কেনার জন্য ঋণ বা বিলম্বিত পরিশোধের সুবিধাও আগে থেকেই আছে।
Ma’aden-এর কাছ থেকে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে ১০ লাখ টন সার কেনার নিশ্চয়তা দিলেই একই উদ্দেশ্য পূরণ করা যেত না? বিদেশের মাটিতে কারখানার ৫০ শতাংশ মালিকানা নেওয়া, ১৫ শতাংশ ইকুইটি বিনিয়োগ করা এবং ৭০ শতাংশ ঋণের ব্যবস্থা করার প্রয়োজনীয়তা কোথায় ? আমদানি অর্থায়ন আর বিদেশে কারখানায় বিনিয়োগ অবশ্য এক জিনিস নয়। কিন্তু কোন ব্যবস্থায় বাংলাদেশের মোট খরচ কম হবে, সেটার হিসাব তো জানা দরকার।
এখানে আমার মতো সাধারণ মানুষের কিছু সহজ সরল প্রশ্ন উঠে। বাংলাদেশের যখন সৌদি আরব থেকে ডিএপি সার আমদানির ব্যবস্থা আছে, তখন সৌদি আরবের মাটিতে ১০ লাখ টন উৎপাদনক্ষম কারখানা তৈরির প্রয়োজনীয়তা কতটুকু? কারখানার জমি কে দেবে, ঋণের দায় কার থাকবে, ২০ বা ২৫ বছর পর ঋণ পরিশোধ হয়ে গেলে মালিকানা কীভাবে থাকবে, আর সেখানে কতজন বাংলাদেশি চাকরি পাবেন? কারখানাটি পরিচালনা করবে কে? উৎপাদন খরচ আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় বেশি হলে কী হবে? অন্য দেশ থেকে কম দামে সার পাওয়া গেলেও কি এই কারখানা থেকেই সার কিনতে হবে?
সরকার বলছে, বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি) কে দিয়ে কারখানাটি পরিচালনার পরিকল্পনা আছে। এই খবর পড়ে বিসিআইসির পুরোনো ইতিহাস মনে পড়ে গেলো। যে প্রতিষ্ঠান ২৮ বছরের মধ্যে ২৪ বছর লোকসান করেছে তাদের হাতে এবার বিদেশে কারখানা পরিচালনার দায়িত্ব যাচ্ছে। বিসিআইসির নিজের দেশের সার কারখানাগুলোর দিকে তাকালেই অবশ্য আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায়।
আমাদের ডিএপি সার কারখানায় কাঁচামাল, বিশেষ করে ফসফরিক অ্যাসিডের সংকটে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। দরপত্র ডাকা হয়, কাঁচামাল আসে না, আবার দরপত্র ডাকা হয়। নিজের দেশের কারখানায় কাঁচামাল সরবরাহ নিশ্চিত করতেই যখন এত আয়োজন, তখন সৌদি আরবে গিয়ে কারখানা চালানোর পরিকল্পনা সত্যিই আশাব্যঞ্জক।
বিসিআইসির আরেকটি সুবিধা আছে। প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরে লোকসান করার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। ফলে নতুন প্রকল্পে লোকসান হলে সেটাকে একেবারে নতুন অভিজ্ঞতা বলতে হবে না। তবে এবার লোকসানটা হবে আন্তর্জাতিক মানের। অবশ্য সৌদি পক্ষ গ্যাস ও কাঁচামাল সরবরাহ করবে বলে আশা করা হচ্ছে। তাই বাংলাদেশের কারখানার মতো কাঁচামালের জন্য উৎপাদন বন্ধ রাখতে হবে না। বিসিআইসির পুরোনো সমস্যাগুলোও হয়তো সৌদি আরবের মাটিতে গিয়ে আর থাকবে না।
এত বছর ধরে লোকসান করা একটি প্রতিষ্ঠানকে বিদেশে বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে, এটাও তো একধরনের নতুন সম্ভাবনা। দেশের ভেতরে ব্যবসা করে লাভ করতে পারেনি, এবার বিদেশে গিয়ে ভাগ্য পরীক্ষা করবে। আর ১৫ শতাংশ বিনিয়োগের টাকা কোথা থেকে আসবে, সেটাও নিশ্চয়ই পরিকল্পনায় আছে। দেশের মানুষ এত দিন বিসিআইসির লোকসানের খবর শুনেছে, এবার বিদেশে তার সাফল্যের খবর শোনার অপেক্ষায় থাকবে।
তবে সৌদি সফর নিয়ে আমার প্রত্যাশা শুধু সার কারখানায় সীমাবদ্ধ নয়। সৌদি আরবে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কাজ করেন। তাঁদের নিরাপত্তা, আইনি অধিকার এবং কনস্যুলার সুরক্ষা নিয়ে সরকারের স্পষ্ট অবস্থান থাকা দরকার। সম্প্রতি বাংলাদেশিদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় বাংলাদেশ সরকার আগেভাগে পর্যাপ্ত তথ্য না পাওয়ার বিষয়টি সামনে এসেছে।
কোনো বাংলাদেশি গ্রেপ্তার হলে, মৃত্যুদণ্ড হলে কিংবা মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে বাংলাদেশ দূতাবাস যেন সময়মতো জানতে পারে, আইনি সহায়তা নিশ্চিত করতে পারে এবং পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ থাকে, এসব বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা চাই। বিদেশে কাজ করতে গিয়ে একজন বাংলাদেশি যেন বিচারপ্রক্রিয়া সম্পর্কে কিছু না জেনেই মৃত্যুর মুখে পড়ে না যান।
আর কোনো বাংলাদেশির মৃত্যু হলে তাঁর মরদেহ যেন পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থাও নিশ্চিত করা হয়। কারখানা তৈরির আলোচনা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, বিদেশে কর্মরত নাগরিকদের জীবন ও অধিকারও তেমন গুরুত্বপূর্ণ। সরকারকে বুঝতে হবে সাধারণ মানুষ বাংলাদেশী দুই জনের সাজা সউদি তে কার্যকর হওয়ায় বেশ হতাশ হয়েছেন ।
সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির সুযোগ আছে কিনা সেটা নিয়ে আলাপ হতে পারে । শুধু শ্রমবাজার বা সার আমদানির সম্পর্কের মধ্যে আটকে থাকলে চলবে না। সৌদি বাজারে তৈরি পোশাকসহ বাংলাদেশের অন্যান্য পণ্যের রপ্তানি বাড়ানোর জন্য সরাসরি ব্যবসায়ী, আমদানিকারক ও বড় খুচরা বিক্রেতাদের সঙ্গে আলোচনা করা যেতে পারে। সরকার ইতিমধ্যে জিসিসি ভুক্ত দেশগুলোর সাথে এফটিএ চুক্তি করা যায় কিনা সেটা নিয়ে পর্যালোচনা করছে ।
সৌদি আরবের গ্রিন ফাইন্যান্সিং ব্যবহার করে বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সৌরবিদ্যুৎ ও ব্যাটারি সংরক্ষণ প্রকল্পেও বিনিয়োগ আনার সুযোগ আছে। অর্থাৎ সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ক মানেই শুধু সার কেনা বা ঋণ নেওয়া নয়। বাংলাদেশও সেখানে পণ্য বিক্রি করতে পারে, বিনিয়োগ আনতে পারে এবং নিজেদের জ্বালানি খাতের উন্নয়নে অর্থায়ন পেতে পারে। সরকারকেও দেখলাম গ্রিন ফাইন্যান্সিং নিয়ে বেশ তৎপর । সৌদিতে আশা করি এই বিষয়ে আলাপ হবে দুই দেশের মধ্যে ।
এবার একটু পুরোনো দিনের আলাপে ফিরে যাই । শেখ হাসিনাও সৌদি আরব সফরে গিয়েছিলেন। সেই সফরকে কেন্দ্র করে ৫৬০টি মডেল মসজিদ নির্মাণে সৌদি অর্থায়নের কথা বেশ ঘটা করে প্রচার করা হয়েছিল। পরে সৌদি পক্ষ থেকে এমন অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি দেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করা হয়। শেষ পর্যন্ত মডেল মসজিদ নির্মাণের অর্থ বাংলাদেশ সরকারকেই দিতে হয়েছে।
সৌদি অর্থায়নের আশায় দেশে মসজিদের পরিকল্পনা করা হয়েছিল, কিন্তু বিলটা শেষ পর্যন্ত নিজেদেরই দিতে হয়েছে। বর্তমান সরকার এবার বিদেশে কারখানা নিয়ে প্রচার করছে। মসজিদের বদলে এবার কারখানা। পার্থক্য শুধু প্রকল্পের ধরনে; সৌদিতে কারখানা তৈরির কাজ শুরুর অপেক্ষা আর বাংলাদেশের অর্থায়নের দিকে সকলের নজর থাকবে ।
শেখ হাসিনার সৌদি সফরের সময়টাও মনে রাখার মতো। ২০১৮ সালের অক্টোবরে তিনি সৌদি আরব সফর করেছিলেন, জামাল খাশোগি হত্যাকাণ্ডের পরপরই। তখন সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্কের উষ্ণতা দেখাতে আমাদের খুব একটা সমস্যা হয়নি। অথচ আজ জাপান প্রতি বছর এক লাখ বাংলাদেশি কর্মী নেবে, এমন কোনো খবর বা বক্তব্য সামনে এলেই একদল মানুষ সেটাকে ভুয়া বলে হাসাহাসি করেন।
তাঁদের বলতে মনে চায় , বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে বড় বড় প্রতিশ্রুতি প্রচার করার ইতিহাস কি শুধু বর্তমান সরকারের আছে? মডেল মসজিদের সৌদি অর্থায়নের সেই গল্পটা কি তাঁরা ভুলে গেছেন? তখন সৌদি ডলার আসার আগেই মসজিদের হিসাব করা হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত এক টাকাও দেশে আনতে পারে নি ।
বর্তমান সরকারের প্রতিটি উদ্যোগের সমালোচনা করতে চাই না। বরং সৌদি সফর থেকে বাস্তব ফলাফল আসুক, সেটাই প্রত্যাশা। কৃষক যেন সময়মতো সার পান, সার আমদানিতে খরচ কমে, দেশের রপ্তানি বাড়ে, জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ আসে এবং প্রবাসী বাংলাদেশিরা আইনি সুরক্ষা পান।
শুধু সংবাদ সম্মেলনে বড় বড় ঘোষণা নয়, চুক্তির শর্তগুলোও যেন দেশের মানুষের সামনে প্রকাশ করা হয়। কারণ বিদেশের মাটিতে কারখানা তৈরি করা অবশ্যই বড় ব্যাপার। তবে যে বিসিআইসি এত দিন দেশের কারখানা সামলাতে গিয়ে হিমশিম খেয়েছে, তাকে বিদেশে পাঠানোর আগে একটু প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে কি না, সেটাও জানতে ইচ্ছা করে।
সৌদি আরবে ১০ লাখ টন সক্ষমতার সার কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা বাংলাদেশ সরকারের- ডেল্টা লেন্স
ফটোকার্ড : জগত নিউজ
©somewhere in net ltd.