| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
সৈয়দ কুতুব
নিজের অজ্ঞতা নিজের কাছে যতই ধরা পড়ছে প্রচলিত বিশ্বাসের প্রতি ততই অবিশ্বাস জন্মাছে!
আওয়ামী লীগ করেন এমন অনেক মানুষ বিষয়টি নিয়ে অস্বস্তি বোধ করেন। শেখ হাসিনা কেন কওমি জননী উপাধি গ্রহণ করলেন? আসলে সবাই যা বলতে চান,আওয়ামী লীগের রাজনীতি তো এমন কোনোদিন ছিল না। এরকম রাজনীতি করে মূলত বর্তমান সরকার ও বিরোধী দল। কিন্তু শেখ হাসিনা কেন এই রাজনীতিতে জড়াতে গেলেন ? দাওরায়ে হাদিসকে কেন মাস্টার্স বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রির সমমানের মর্যাদা দিতে গেলেন ?
আচ্ছা, দাওরায়ে হাদিসকে মাস্টার্সের সমমান দেওয়ার ফলে কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের চাকরির ক্ষেত্রে কতটা সুযোগ-সুবিধা বেড়েছে? বাস্তবে তেমন কিছু বাড়েনি। বরং চাকরির বাজারে তাদের আলিয়া মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হয়। বিয়ের কাজি হওয়াসহ কিছু ছোটখাটো পেশায় তাদের অংশগ্রহণ বেড়েছে, কিন্তু সেটি উল্লেখ করার মতো বড় কোনো পরিবর্তন নয়।
শেখ হাসিনার আমলে কওমি মাদ্রাসার সংখ্যা অনেক বেড়েছে। বাংলাদেশের কওমি শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৭০ লাখ বলে দাবি করা হয়। অথচ পাকিস্তানের মতো দেশেও কওমি শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৩০ লাখের বেশি হবে না । এখন শেখ হাসিনার আমলে দাওরায়ে হাদিসকে মাস্টার্সের সমমান দেওয়ার কারণেই কওমি শিক্ষার্থীর সংখ্যা এত বেড়েছে, এমন সিদ্ধান্ত গবেষণা ছাড়া বলা যাবে না । এর পেছনে আরও অনেক সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণ থাকতে পারে।
সাধারণ শিক্ষার মান ও পরিবেশ ইচ্ছাকৃতভাবে কেউ খারাপ করে দিয়েছে কি না, সেটি সবার আগে দেখতে হবে। অনেক অভিভাবক সন্তানকে স্কুলে পাঠাতে নিরাপত্তাহীনতা বোধ করেন। স্কুলের পরিবেশ নিয়েও তাঁদের অভিযোগ আছে। সমাজের কালো টাকার একটি অংশ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও মাদ্রাসায় অনুদান হিসেবে গিয়েছে কিনা তা দেখতে হবে । এর পাশাপাশি ওয়াজ ও মাহফিলের প্রভাবও বিবেচনায় নিতে হবে।
আমাদের দেশের অনেক ওয়াজি ডিজিটাল মিডিয়াকে হারাম বললেও মিডিয়ার মাধ্যমে যে আয় হয়, সেটিকে হারাম মনে করেন না। আগে কোনো একজন হুজুরকে শুধু একটি এলাকার মানুষ চিনত। এখন ইউটিউব ও ফেসবুকের মাধ্যমে তাঁর পরিচিতি অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ছে। ওয়াজ মাহফিলে যেসব বক্তা বক্তব্য দেন, তাঁরা সুর, আবেগ ও বক্তব্যের মাধ্যমে মানুষের মনে প্রভাব বিস্তার করতে পারেন। এ কারণে আমি অনেক সময় তাঁদের ইসলামিক মোটিভেশনাল স্পিকার বলে থাকি।
এঁরা সাধারণত এমন শ্রেণির মানুষের মধ্যে বেশি প্রভাব বিস্তার করেন, যাঁরা সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন, মানসিক ভাবে পেরেশানিতে রয়েছেন , বিচ্ছেদের মধ্য দিয়ে গেছেন কিংবা দিনের বেলায় ঘুষ খেলেও রাতের বেলায় ঘুমাতে গেলে পরকালে কী জবাব দেবেন, সেই চিন্তায় অস্থির থাকেন। এসব পরিবারের সন্তানদের একটি অংশ বেশি মাদ্রাসায় যাচ্ছে। আবার শিক্ষার উপকরণের দাম বৃদ্ধি, বিয়ের পর কিংবা বিয়ের বাইরে সন্তান হওয়ার পর পুরুষের দায়িত্ব না নেওয়ার মতো ঘটনাকে বিবেচনায় রাখতে হবে । এই ধরনের সমস্যায় জর্জরিত নারীরা সন্তানকে মাদ্রাসায় বেশি পাঠিয়ে থাকেন ।
সব মিলিয়ে বলতে গেলে, বিশ্বায়নের যুগে আমাদের সামাজিক সম্প্রীতি ও প্রচলিত সামাজিক কাঠামোর মধ্যে একধরনের বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে। শেখ হাসিনার ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রচারণা সেই প্রক্রিয়াকে আরও গতিশীল করেছে। ডিজিটাল মিডিয়ার কারণে ধর্মীয় বক্তাদের প্রভাব, পরিচিতি ও সাংগঠনিক যোগাযোগ আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে।
যাঁরা সেক্যুলার ঘরানার, তাঁদের অনেকেরই একটি অভিযোগ, শেখ হাসিনা কেন ২৫০টি মডেল মসজিদ নির্মাণ করলেন? তিনি তো মসজিদের পাশাপাশি ৫০টি মন্দির ও ৫০টি প্যাগোডাও নির্মাণ করতে পারতেন। আমি যদি আরও একটু এগিয়ে বলি, শেখ হাসিনা ২৫০টি সংস্কৃতি-বিষয়ক কলেজ নির্মাণ করলেও হয়তো বেশি উপকার হতো। কিন্তু লীগের চিন্তাভাবনা ছিল ভিন্ন ।
২০১৩ সালের ৫ই মে শাপলা চত্বরের ঘটনা শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের মনে বড় ধরনের ভীতি তৈরি করেছিল। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই পরবর্তী সময়ে এসব পরিকল্পনার রাজনৈতিক কাঠামো তৈরি হয়েছিল। শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ চেয়েছিল ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক শক্তিকে তৎকালীন বিরোধী দলের বলয় থেকে আলাদা করে ফেলতে।
আওয়ামী লীগ জানত, দেশে যত নামেই আলাদা ধর্মভিত্তিক দল থাকুক, জামায়াতের সঙ্গে তাদের কোনো না কোনোভাবে যোগাযোগ রয়েছে । এ কারণে জামায়াত কে কাবু করতে চরমোনাই কে আওয়ামী লীগ বেশি করে পৃষ্ঠপোষকতা করতে শুরু করে। ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একটি প্রধান শক্তি হিসেবে তাদের জায়গা তৈরি করে দেওয়ার চেষ্টা চলে।
একই সময় জঙ্গি দমনের নামে আসল-নকল নানা অভিযানও সমান্তরালে চলছিল। আওয়ামী লীগ চেয়েছিল হেফাজতে ইসলামের রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা সফল হয়নি। আওয়ামী লীগের এমপি, মন্ত্রী ও দলীয় প্রভাবশালীদের একাধিক কওমি মাদ্রাসার সঙ্গে যোগাযোগ বা পৃষ্ঠপোষকতার সম্পর্ক ছিল। আওয়ামী লীগ যে ইসলামবিরোধী দল নয়, সেটি প্রমাণ করতে লাখ লাখ টাকা খরচ করে ওয়াজ মাহফিলের জন্য বক্তা আনা হতো।
তারপরও আওয়ামী লীগ হেফাজতে ইসলাম কে বশে আনতে পারেনি। তৌহিদি জনতা কিংবা হেফাজতে ইসলাম, যে নামেই ডাকি না কেন, তাদের বড় একটি অংশ আওয়ামী লীগকে সব সময় ঘৃণা করেছে। আওয়ামী লীগের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক রেখে অনেকে সুযোগ-সুবিধা নিয়েছে, কিন্তু তাদের মূল রাজনৈতিক সমর্থন সব সময় বিএনপির দিকেই ছিল। আওয়ামী লীগ বিষয়টি বুঝতে পারেনি, এমনটা পুরোপুরি বিশ্বাস করা কঠিন।
আমার মনে হয়, লীগ চেয়েছিল দেশে তৌহিদি জনতার সংখ্যা ও প্রভাব বাড়ুক। তারা জানত, ভবিষ্যতে ক্ষমতা হারালে এই ধর্মীয় আবেগ ও রাজনৈতিক শক্তিকে কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি হবে। তৌহিদি জনতার পছন্দের সরকার যখন ক্ষমতায় যাবে, তারা স্বাধীনতার অপব্যবহার করবে। আর সেই অপব্যবহারের দায় শেষ পর্যন্ত তাদের প্রিয় সরকারের ওপরই পড়বে। বাস্তবে এখন অনেকটা তেমন পরিস্থিতিই তৈরি হয়েছে।
৫ই আগস্ট আওয়ামী লীগের পতনের পরপরই সবার আগে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে থেকে শেখ মুজিবুর রহমানের নাম পরিবর্তন করে মুসলিম জাতির পিতা ইব্রাহিম (আ) নামকরণ করা হলো। এরপর বিভিন্ন জায়গায় ভাস্কর্য ও মূর্তি ভাঙার ঘটনা ঘটল, যেখানে তৌহিদি জনতার সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল। এসব ঘটনাকে রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগানোর সুযোগ কারা পেল ?
আওয়ামী লীগ আমলে তৌহিদি জনতার উগ্র কর্মকাণ্ড ছাড়া বড় ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের খবর সংবাদমাধ্যমে তেমন একটা আসত না। মামুনুল হক কিংবা রফিকুল মাদানির মতো কয়েকজনের ঘটনা ছাড়া সামগ্রিকভাবে এই গোষ্ঠীর অন্য অপরাধগুলো খুব বেশি আলোচনায় আসেনি। কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলেছে।
বর্তমান সরকারের আমলে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে তৌহিদি জনতার অপরাধের মাত্রা প্রকাশ্যে আসার ক্ষেত্রে। প্রতিদিন তাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ধর্ষণ ও যৌন হয়রানির খবর সামনে আসছে। যেহেতু ঘটনাগুলো তাদের পছন্দের সরকারের আমলে ঘটছে, তাই আগের মতো তারা সহজে নিজেদের ভিকটিম হিসেবে উপস্থাপন করতে পারছে না।
একই ঘটনা আওয়ামী লীগ আমলে ঘটলে তারা খুব সহজেই নিজেদের ভিকটিম হিসেবে উপস্থাপন করতে পারত এবং সাধারণ মানুষের সহানুভূতি আদায় করত। কিন্তু এখন সেই সুযোগ অনেক কম। তবে এসব অপরাধ প্রকাশ্যে আসার আরেকটি প্রভাব পড়ছে সমাজে। মানুষ মাদ্রাসার শিক্ষা ও পরিবেশ নিয়ে একধরনের আতঙ্ক অনুভব করতে শুরু করেছে। এভাবে চলতে থাকলে কিছু মাদ্রাসায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমতে পারে। যদিও সামগ্রিকভাবে সেটি খুব বড় শতাংশে হবে বলে মনে হয় না।
সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, এখন যা ঘটছে তাকে বিদ্যমান কোনো রাজনৈতিক দল বা নেতার মস্তিষ্কপ্রসূত পরিকল্পনা বলে মনে করি না। বরং এর পেছনে কোনো গোয়েন্দা সংস্থার ভূমিকা থাকতে পারে। তারা হয়তো অনেক আগে থেকেই জানত, দেশের মাদ্রাসাগুলোর ভেতরে কী ঘটছে; সমাজ কোন দিকে যাচ্ছে এবং ধর্মীয় আবেগকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করার পরিণতি কী হতে চলেছে । এখনই সবচেয়ে ভালো সময় বিষয়গুলো সামনে আনার ।
ফটোকার্ড: ডিবিসি নিউজ অনলাইন
©somewhere in net ltd.