| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
সৈয়দ কুতুব
নিজের অজ্ঞতা নিজের কাছে যতই ধরা পড়ছে প্রচলিত বিশ্বাসের প্রতি ততই অবিশ্বাস জন্মাছে!
নওগাঁর বদলগাছীতে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ১৫ জন শিক্ষার্থীর মাথার চুল কাঁচি দিয়ে এলোমেলোভাবে কেটে দিয়েছেন। তাঁর যুক্তি, শিশুদের চুল বড় হয়ে চোখের ওপর পড়ছিল, দেখতে খারাপ লাগছিল। তাই তিনি নিজেই কাঁচি দিয়ে চুল কেটে দিয়েছেন। ঘটনাটি পড়ে আমার নিজের কলেজ জীবনের একটি পুরোনো স্মৃতি মনে পড়ে গেল।
তখন আমি ক্যান্টনমেন্টের একটি কলেজে ইন্টারমিডিয়েট প্রথম বর্ষে পড়ি। একদিন কলেজে ঢুকতেই দেখি, কয়েকজন শিক্ষার্থীকে সারিবদ্ধ ভাবে মুরগির মতো বসিয়ে রাখা হয়েছে। প্রথমে বুঝতে পারছিলাম না, ঘটনা কী! কিছু সময় পার হওয়ার পর দেখি, একজন নাপিত এসে শিক্ষার্থীদের মাথার সিঁথির মাঝখানের চুল কেটে দিচ্ছেন। কারও মাথার মাঝখানে চুল কেটে এমন অবস্থা করা হয়েছে যে, বাইরে থেকে দেখলে হাসি পাওয়ার কথা। কিন্তু যাদের সঙ্গে ঘটনাটি ঘটছিল, তাদের মুখের দিকে তাকানো যাচ্ছিল না ।
সেদিন আমি খুব ভয় পেয়েছিলাম। মনে মনে ভাবছিলাম, ভাগ্যিস আমার চুল ছোট ছিল ! নইলে হয়তো আমাকেও ওই সারিতে বসতে হতো। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় ছিল, শিক্ষার্থীদের শাস্তি দেওয়ার পাশাপাশি নাপিত মামা প্রত্যেকের কাছ থেকে ১৫ টাকা করে নিচ্ছিলেন। অর্থাৎ অপমানিত হওয়ার শাস্তি তো ছিলই, নিজের পকেটের টাকাও খরচ করতে হচ্ছিল।
আমাদের ক্লাসের দুজন ছিল ফরহাদ ও রিপন। তারাও সেদিন এই শাস্তির শিকার হয়েছিল। সারাটা দিন তাদের মন খারাপ করে বসে থাকতে দেখেছি। কলেজে আমাদের প্রতিদিন সাতটি ক্লাস হতো। সেদিন তারা একবারের জন্যও শ্রেণিকক্ষ থেকে বের হয়নি। তাদের চুলের অবস্থা দেখে বারবার ফুটবল খেলোয়াড়দের কথা মনে হচ্ছিল। কিন্তু তাদের বিষন্ন মুখ দেখে ঠাট্টা করার সাহস হয়নি। দুজনই পরবর্তী সাত দিন কলেজে আসেনি।
এরপর কয়েক দিন কেটে গেল। একদিন খেয়াল করলাম, কলেজের পাশের সেই নাপিত মামার দোকান বন্ধ। পরে জানতে পারলাম, যেসব শিক্ষার্থীর চুল কেটে দেওয়া হয়েছিল, তাদের কয়েকজন মিলে সেই নাপিত মামা কে মারধর করেছে। ভাষানটেক এলাকার শিক্ষার্থীদের বেশ দাপুটে হিসেবেই সবাই জানত । নাপিত মামাকে এমন মারধর করা হয়েছিল যে, ভয়ে তিনি আর দোকান খোলার সাহস পাননি। দোকান ছেড়ে দিয়েছিলেন ।
শিক্ষার্থীদের হাতে নাপিতের মারধরের শিকার হওয়াটাও কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। তিনি কলেজ কর্তৃপক্ষের নির্দেশে কাজটি করেছিলেন। আবার নিজের পেশাগত কাজ হিসেবেও করেছিলেন। কিন্তু শিক্ষার্থীদের অপমান করার পরিণতি যে এমন হতে পারে, সেটি হয়তো তিনি ভাবেননি। অপমানের প্রতিশোধ নিতে কাউকে মারধর করা কোনো সমাধান নয়।
আমরা এখন জেন-জি পেরিয়ে জেন-আলফার যুগে প্রবেশ করেছি। বর্তমান প্রজন্মের শিক্ষার্থীরা ছোটবেলা থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ইন্টারনেট ও ভিন্ন ধরনের সাংস্কৃতিক পরিবেশে বড় হচ্ছে। তাদের আত্মসম্মানবোধ, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য এবং নিজের চেহারা ও ব্যক্তিত্ব নিয়ে সচেতনতা আলাদা। বিশেষ করে বড়ো শিক্ষার্থীদের সঙ্গে এমন আচরণ করে পার পাওয়ার সুযোগ কম । ছোট শিশুরা হয়তো ভয়ে চুপ করে থাকবে, কিন্তু বড় শিক্ষার্থীরা এমন আচরণ কে সহজভাবে নাও নিতে পারে। কখনো কখনো তার প্রতিক্রিয়া আরও ভয়াবহ হতে পারে। আমার কলেজের সেই নাপিতের ঘটনা তার একটি উদাহরণ।
নওগাঁর প্রধান শিক্ষক হয়তো ভেবেছেন, ছোট বাচ্চাদের চুল একটু কেটে দিলে তেমন কিছু হবে না। তারা প্রতিবাদ করবে না, অভিভাবকের কাছে গিয়ে অভিযোগ করলেও হয়তো বিষয়টি সামান্য শাসন হিসেবেই দেখা হবে। কিন্তু শিশুদেরও আত্মসম্মান আছে। তাদেরও নিজের চেহারা নিয়ে পছন্দ-অপছন্দ আছে। চুল বড় হলে অভিভাবককে জানানো যেত। প্রয়োজনে স্কুলের নিয়ম মেনে চুল ছোট করার পরামর্শ দেওয়া যেত। কিন্তু কাঁচি দিয়ে এলোমেলো করে কেটে দেওয়ার প্রয়োজন কী ?
শিক্ষার্থীদেরও প্রতিষ্ঠানের নিয়ম মানতে হবে। শিক্ষকের কথা শুনতে হবে। কোথাও ভুল করলে সেই ভুল স্বীকার করতে হবে। কিন্তু শিক্ষক বলেই শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত মর্যাদা উপেক্ষা করার অধিকার কেউ পান না। শাসন আর অপমানের মধ্যে পার্থক্য আছে। সেই পার্থক্যটি শিক্ষকদের বোঝা জরুরি।
ফরহাদ আর রিপনের সেই বিষন্ন মুখ আজও মনে আছে। এত বছর পর নওগাঁর ঘটনাটি পড়ে আবার তাদের কথা মনে হলো। সময় চলে যায়, প্রজন্ম বদলায়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দেয়ালও হয়তো নতুন রং পায়। কিন্তু শিক্ষার্থীদের মনে শিক্ষকদের আচরণের কিছু স্মৃতি থেকে যায় বহু বছর।
ফটোকার্ড ক্রেডিট : সারা বাংলা এবং ডেলটা লেন্স
শিক্ষার্থীদের চুল কেটে দেওয়ার অভিযোগ প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে- সারা বাংলা
©somewhere in net ltd.