| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
যাঁরা গল্প পছন্দ করেন - বিশেষ করে আমার গল্প - তাঁরা পড়তে পারেন দৈনিক ইত্তেকাকের এই লিংক থেকে: https://www.ittefaq.com.bd/768007/
ফুলশয্যার রাজপুত্র
এক.
ইজাজের বয়স ছয় কেবল। ক্লাস ওয়ানে পড়ে। সকালে সূর্য ওঠার আগেই ওর পা দুটো যেন নিজে নিজেই ছুটতে শুরু করে - কখনো বাড়ির উঠোনে, কখনো গলির মাথা পর্যন্ত। স্কুলে যায় দৌড়াতে দৌড়াতে, দুপুরে ফেরেও একই কায়দায়। চুপচাপ বসে থাকা তার অভিধানে নেই; এক মিনিট স্থির থাকলেও তার মনে হয় পৃথিবীর কোথাও বড়ো কোন অঘটন ঘটে গেছে।
আজ কিন্তু তার অস্থিরতার মাঝেও এক অন্য রকম উচ্ছ্বাস। তার ফুফু তিথির বিয়ে আজ।
তিথি, এ বাড়িতে ইজাজের সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা - যে তাকে লজেন্স দেয়, গল্প শোনায়, খেলায় হেরে গেলে চুপিচুপি জিতিয়ে দেয়। সবচেয়ে বড়ো কথা, ইজাজ যত বড়ো দুষ্টুমি করুক, তিথি তাতে বিরক্ত হয়না। ইজাজের কাছে তিথি মানে কেবলই ফুফু নয় - বন্ধুতা, নির্ভরতা, আশ্রয়।
তিথির বিয়ের কথা প্রথম শোনার দিন ইজাজ গম্ভীর হয়ে প্রশ্ন করেছিল, 'ফুপ্পি, তুমি বিয়ে করলে তো পালকি চড়ে অন্য বাড়ি চলে যাবে; তখন আমার সঙ্গে থাকবে কে?'
তিথি হেসে তার তুলতুলে গালে আলতো চিমটি কেটে বলে, 'আরে পাগল, আমি যেখানেই থাকি, তুই আমার কাছেই থাকবি।'
ইজাজ কথাটা মনে গেঁথে রেখেছিল। আর, আজ সে ঠিক করেছে, ফুফুকে একা ছাড়বে না, পালকিতে ফুফুর পাশে বসে সেও যাবে শ্বশুরবাড়ি।
দুই.
তিথির শ্বশুরবাড়ি পাশের গ্রামেই। মাঝখানে আরাকান সড়ক, সড়কের পূর্বে কিছু দূরে খান দীঘি। দীঘির উত্তর পাড়ে বাবলাদের বাড়ি, আর সড়কের পশ্চিমে, রৌশনহাট ছুঁয়ে আমিন বাড়িতে তিথিদের বসবাস।
এক বাড়ি হতে অন্য বাড়ি হেঁটে গেলে বড়জোর পনেরো মিনিটের পথ। কিন্তু বিয়ে কি আর হেঁটে হয়?
সন্ধ্যা নামতেই সড়কের দুপাশের দুই গ্রাম বিবাহের উৎসবে জেগে ওঠে। ঢাকের তালে তালে বুক কাঁপে, আতশবাজির আলোয় আকাশ ফেটে পড়ে, গান আর হাসিতে বাতাস ভারী হয়। আজ কিনা পালকিতে চড়ে বউ সেজে তিথি যাবে তার শ্বশুরবাড়ি।
ইজাজ তিথির হাত শক্ত করে ধরে বলে, 'ফুপ্পি, আমাকে ফেলে যেন চলে না যাও। আমি কিন্তু তোমার সাথেই যাবো।'
তিথি হাসে, আর আদরমাখা কণ্ঠে বলে, 'চিন্তা করিস নারে বোকা। তোকে তো আগেই বলেছি, তুই আমার সাথেই যাবি।'
তিন.
পালকিতে পাশাপাশি গা ঘেঁষে বসে আছে তিথি আর ইজাজ। শক্ত কাঠের কাঠামোয় তৈরি পালকির গায়ে সাদা রং, তার ওপর সবুজ আর মেরুন রঙে আঁকা নকশা; সাথে, লতা-পাতা, জ্যামিতিক রেখা আর ছোট ছোট তারকার মতো মোটিফ। কোথাও বাড়তি কোনো ঝলকানি নেই; আছে পরিমিতিবোধ আর রুচির ছাপ।
পালকির ভেতরে দুই পাশে রাখা তুলোর বালিশ, বালিশে মসলিনের কভার; ছুঁতেই ঠান্ডা, আরামদায়ক অনুভূতি। ছাদে ঝুলছে হালকা সাদা পর্দা; বাতাস চলাচলের সুযোগ রেখে নববধূকে লোকচক্ষুর আড়াল করেছে এ পর্দা। পর্দার কোণায় গুঁজে দেয়া হয়েছে সাদা টগর, বেলি আর জুঁই ফুল। তিথিদের বাড়ির সামনে যে পুকুরটি আছে, তার চারধার বলা চলে ফুলের বাগান। যুগযুগ ধরে পাশের গ্রামের সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পুজোর ফুলের মূল উৎসও এ বাগান। জবা, জারুল, কলকাসুন্দা, ঢোলকলি, বেলী, কী নেই এ বাগানে, ঠিক যেন বাংলাদেশের গ্রামে হল্যান্ডের আমস্টারডাম শহরের বড়ো কোন ফুলের বাগান।
তিথির গায়ে লাল পাড়ের শাড়ি, মাথায় নকশা করা ওড়না, মুখটা আলোয় ঝলমল। চোখভরা স্বপ্ন আর অজানা কৌতূহল তার। নতুন বর কেমন হবে, শাশুড়ি কেমন মানুষ - এমনতরো সব ভাবনা ভিড় করে আছে তার মাথায়। আর, পাশে ইজাজ; নতুন পাঞ্জাবি-পাজামা, মাথায় রঙিন টুপি - ভেতরে ভেতরে ছেলেটি আজ নিজেকে যেন রাজপুত্র ভাবে।
পরনে লুঙ্গি, গায়ে পাঞ্জাবি, মাথায় গামছা চার পাল্কিবাহকের। কাঁধে বাঁশের লাঠি তুলে তারা ধীর পায়ে এগোয়, পালকি দোলে। ওদিকে, পেছনে ফেলে আসা দাদি আর স্বজনদের চোখে আনন্দাশ্রু।
বাইরে ঠান্ডা হাওয়া, ভেতরে নরম গদি, কানে বাজে ঢাকের মোলায়েম তান। মিনিট দশেক না যেতেই ছোট্ট ইজাজের চোখ আধবোজা হয়ে আসে। দোলের সাথে তাল মিলিয়ে তার মাথা গড়িয়ে পড়ে তিথির কোলে। তিথি মাথা সোজা করে দিয়ে বলে, 'এই লক্ষীছাড়া, ঘুমাস কেন? বিয়েতে যাচ্ছিস তো!'
কিন্তু, একবার ইজাজের চোখ বন্ধ হলে আর কেউ তাকে জাগাতে পারে না। রাজ্যের ঘুম তার চোখে নেমে আসে।
পালকি ঘোরানোর রেওয়াজে মিনিট পনেরোর পথ ঘন্টাখানেকের যাত্রায় রূপ নেয়। আমিন বাড়ির দক্ষিণে পশ্চিমের রশিদাবাদ গ্রামে যাবার ইটের রাস্তা বরাবর প্রায় কিলোমিটার ঘুরে অবশেষে নববধূ নিয়ে বাবলাদের বাড়িতে পৌঁছে পালকি। তাও ইজাজের ঘুম ভাঙে না।
সে বাড়িতে তাকে আলাদা ঘরে, মশারির ভেতর, নরম বিছানায় শুইয়ে দেওয়া হয়। তার ফুফু তিথি লাজে, ব্যস্ততায় একবারও তাকে দেখে আসার ফুরসৎ করতে পারেনা; সে বাড়ির নববধূ বলে কথা!
চার.
রাত প্রায় দুটো বাজে। বাসরঘরে তিথি আর বাবলা মুখোমুখি বসে খুব কাছ হতে দুজন দুজনকে দেখে। তিথির মুখখানি পূর্ণিমার চাঁদের মতো কোমল, আর উজ্জ্বল। কাজল-কালো চোখজোড়ায় লুকিয়ে আছে নীরব অনুভূতির ভাষা। কপালে আলতো করে নেমে আসা চুলের গুচ্ছ দুটো তাকে দিয়েছে অনাড়ম্বর অথচ অনিন্দ্য এক রূপ। তার গভীর চোখ দু’টি শান্ত; ভ্রুর হালকা বাঁক মুখমন্ডলের আকৃতির সঙ্গে অবিশ্বাস্য রকমের মানানসই; ঠোঁটের কোণে লেপ্টে আছে মোহময় মৃদু হাসি। পরিষ্কার, কোমল ত্বকে ক্লান্তির ছাপ থাকলেও চেহারায় আত্মবিশ্বাসের দীপ্তি সুস্পষ্ট।
ঘরটির মাটির দেয়ালগুলো সকালে চুন-সুরকির প্রলেপে ঝকঝকে করে ধোয়া হয়েছে। দেয়ালের নিচে হাতে আঁকা আলপনার মতো নকশা - লতা-পাতা, শালুকফুল আর ঢেউখেলানো রেখারাশি। কোথাও রঙের বাহুল্য নেই, তবু পুরো ঘর জুড়ে আছে এক নরম উষ্ণতা।
ঘরের ঠিক মাঝখানে কাঠের পালঙ্ক। পালঙ্কের ওপর পাতা মোটা তুলোর গদি, তার ওপর ধবধবে সাদা চাদর। চাদরের চারদিকে নানা রঙের সুতোর সূক্ষ্ম কারুকাজ। বালিশগুলো সযত্নে সাজানো, পরিষ্কার মসলিনের কভারে মোড়া। পালঙ্কের চারপাশে ঝোলানো সাদা মশারি - একদমই নতুন। আলো পড়ে মশারির ভাঁজে ভাঁজে কোমল ছায়া তৈরী হয়েছে; ঘরময় এক আবদ্ধ অথচ নিরাপদ, মোহময় আবেশ।
রুমের এক কোণে রাখা কাঠের টুলে নতুন জামাকাপড়। বরের পাঞ্জাবি আর বউয়ের শাড়ি ভাঁজ করে রাখা তার উপর। পাশেই মাঝারি আকারের একখানা আয়না, তার সামনে চিরুনি আর আতরের শিশি। আতরের হালকা ঘ্রাণে ঘরটা পরের মনে হয়না তিথির।
তিথি-বাবলার কাছাকাছি বাড়ি। আগেও বহুবার দেখা হয়েছে তাদের। বিশেষতঃ তিথি যখন বান্ধবীদের সাথে নিয়ে দীঘির জলে ভেসে থাকা পদ্ম ফুল তুলতো, সে ফাঁকে বাবলা তিথিকে কতবারই না দেখেছে, যদিও তার ধারণা ছিল সেই কিশোরীটিই একদিন তার ঘরণী হবে। কিন্তু, আজকের দেখা বেশ আলাদা - আলোআঁধারি পরিবেশ, পিনপতন নীরবতা, অন্য কেউ তাদের আশপাশে নেই। সবচেয়ে বড়ো কথা, তিথি আজ তার একেবারে তার নিজের মানুষ - অন্য কারো নয়।
ঘোমটা সরিয়ে তিথির লাল টুকটুকে গালে বাবলা হাত বুলিয়ে দিতেই তিথি তার হাত ধরে ফেলে। ওর মনে পড়ে দাদির কথা। দাদি বলেছিলেন, বর যেন তাকে ছোঁবার আগে দু'রাকাত নফল নামাজ পড়ে নেয়। পাশের গ্রামের ছোট হুজুরের কাছ থেকে নেয়া একটি ছোট্ট তাবিজও তিথির হাতে গুঁজে দিয়েছিলেন দাদি, আর বলেছিলেন, সেটি যেন বরের বালিশের নিচে রাখে। তিথির প্রতি স্বামীর ভালোবাসায় ভাটা না পড়া নিশ্চিত করতেই নাকি সে তাবিজ।
তিথি তার গাল হতে হাত সরিয়ে দিয়েছে দেখে বাবলা কিছুটা অপ্রস্তুত হয়। ভাবে, তিথির কি তবে অন্য কাউকে পছন্দ ছিল? তাকে কি জোর করে তার সাথে বিয়ে দেয়া হয়েছে?
বিবাহের মাস দুয়েক আগে বাবলা ওমান থেকে দেশে ফিরেছে। টানা পাঁচ বছর সেদেশে ছিল। সেলসম্যানের কাজ করে ওখানে। তিথির সাথে অনেকদিন দেখা হয়নি; তাই, তার ধারণা নেই তিথি বিবাহের আগে কারো সাথে প্রেম-ভালোবাসায় জড়িয়েছিল কিনা।
গোল্ডেন জিপিএ পেয়ে উচ্চ-মাধ্যমিক পাশ করা বুদ্ধিমতী তরুণী তিথি। বাবলার সন্দেহ সে আঁচ করতে পারে। তাই, দাদির দেয়া নফল নামাজ পড়ার উপদেশ বাবলাকে খুলে বলে।
দ্রুত বিছানা হতে নেমে বাথরুমে গিয়ে বাবলা ওযু করে নফল নামাজ পড়তে রুমের মেঝেতে দাঁড়িয়ে যায়। কিন্তু, নামাজ শুরু না করে বোকার মতো এদিক ওদিক তাকায় কেবল। সত্য হলো, এর আগে সে কখনো নফল নামাজ পড়েনি। তাই, নামাজের নিয়ত তার জানা নেই। ভাবে, বিষয়টা তিথিকে জানাবে কিনা।
বাবলার জন্মের বেশ আগেই ওর দাদি-নানী পরপারে চলে গেছেন। ভাবি সম্পর্কের কেউও বাড়ি নেই। এ অবস্থায় তাকে বাসর ঘরের বিষয়াদি শিখিয়ে দেবেই বা কে? তা তো দাদি-নানী বা ভাবীদেরই কাজ। তাই, বাসর রাতে কি করতে হবে না হবে তার ধারণা পেতে সে এরই মাঝে ইউটিউব ভিডিও দেখেছে বিস্তর। কিন্তু, কোনো ইউটিউবার তো নববধূকে স্পর্শের আগেআগে নফল নামাজ আদায়ের কথা বলেনি!
দ্বিধাগ্রস্থ বাবলাকে দেখে তিথি এগিয়ে আসে। তারপর দুজন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে নফল নামাজ আদায় করে। গোপন প্রার্থনায় তিথি আল্লাহর কাছে দুহাত তুলে প্রার্থনা করে, 'হে মাবুদ, আমাদের বাবু হলে সে যেন দ্বীনদার ঈমানী বান্দা হয়।'
বাবলার আর তর সয়না, নামাজ শেষ হতে না হতেই তিথিকে জড়িয়ে ধরে ওর টসটসে গালে ছোট্ট একটা চুমু বসিয়ে দেয় সে। সাথে সাথে তিথির হৃদপিন্ড কাঁপে - রোমান্টিকতার ঘোর তাকেও পেয়ে বসে।
মশারি উঠিয়ে দুজন হাত ধরাধরি করে পালঙ্কে উঠতেই পাশের রুম হতে ইজাজের কান্নার আওয়াজ ভেসে আসে। বাইরে বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ। বাচ্চাটির কান্নার আওয়াজ আর বাতাসের শব্দ মিলে কেমন এক হইচই রব চারিদিকে।
পাঁচ.
কান্নার ফাঁকে ফাঁকে ইজাজ প্রশ্ন করে, 'ফুপ্পি কই? আমার ফুপ্পি গেলো কই?' অচেনা ঘরে ঘুম ভেঙে সে ভয় পেয়ে গেছে। এখানে জানালা দিয়ে বকুল ফুলের গন্ধ আসে না, পরিচিত সেই ঘড়িটি দেয়ালে নেই, মা-বাবাও নেই আশপাশে। অপরিচিত পরিবেশে বুক ধড়ফড় করে ওঠে ছোট্ট ইজাজের।
কান্না বাড়তে থাকে। তাকে কেউ লজেন্স দেয়, কেউবা মিষ্টি - কিছুতেই কিছু হয়না।
শেষমেশ সিদ্ধান্ত হয় তিথিকেই তার কাছে ডেকে আনতে হবে।
'আয় সোনা, আমি এখানে।' - দেরি না করে তিথি নিজেই ইজাজের ঘরে চলে আসে।
গলার আওয়াজ শুনেই ইজাজ ছুটে এসে তিথির বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে। কান্না থামে, তেব, তিথির বুক ছাড়ে না সে।
বাড়ির মেয়েরা হেসে বলে, 'কি আর করা! বাসরঘরেই ওকে নিয়ে যাও।'
তিথির মুখ লজ্জায় লাল, বাবলা অপ্রস্তুত, আর ইজাজ? - ফুফুকে খুঁজে পেয়ে তার খুশির সীমা নেই। তার উপর, গুছানো ফুলশয্যা দেখে সে যেন উৎসবে মেতে ওঠে।
ছয়.
বিছানার ঠিক মধ্যখানে গুটিশুটি মেরে ইজাজ বলে, 'আমি এখানেই শোব।'
তিথি বলে, 'না রে, তুই আমার ওপাশে শো।'
- 'না, আমি মাঝখানে থাকব।'
বাবলা মৃদু হেসে বলে, 'বাবা, তুমি ওদিকে যাও, তোমার ফুপ্পির সঙ্গে কথা আছে আমার।'
ইজাজ চোখ কুঁচকে তাকায় বাবলার দিকে।
- 'তুমি আবার কে?'
- 'উনি তোর ফুফা, আমার বর।' - তিথি জবাব দেয়।
উত্তর শুনে কি যেন ভাবে ইজাজ। নতুন কোনো প্রশ্ন তার মাথায় জাগে না। হয়তোবা সে তার মা-বাবার সাথেই এ যুগলকে মিলিয়ে নেয় ক্ষনিকের জন্য।
মাথায় হাত বুলিয়ে গল্প বলতে বলতে তিথি ইজাজকে ঘুম পাড়ায়।
দ্রুতই সে গভীর ঘুমে ঢলে পড়ে। সে সুযোগে বিছানার এক পাশে সরানো হয় তাকে।
সাত.
ঘুমের রাজ্যে হারিয়ে যাওয়া ইজাজ যেন আর দশটা শিশুর চেয়ে বেশ আলাদা। আধবোজা চোখ দুটো ঘুমের ভারে নরম হয়ে এসেছে তার, চোখের লম্বা পাপড়িগুলো গালের ওপর ছায়া ফেলে আছে। নিঃশ্বাসের ওঠানামায় ছোট বুকটা ধীরে ধীরে দুলছে, ঠিক যেন সিংহাসনে বসে থাকা কোনো রাজপুত্রের সুশান্ত নিঃশ্বাস। ঘুমের মাঝেও তার ঠোঁটের কোণে লেগে আছে একচিলতে অমলিন হাসি - স্বপ্নে সে কোন যুদ্ধে বিজয়ী হয়েছে হয়তোবা।
তার ছোট্ট মাথাটা বালিশে হেলানো, চুলগুলো এলোমেলো হয়ে কপালে নেমে এলো। গায়ের শার্ট কিছুটা কুঁচকে গেলেও সৌন্দর্য তার কিঞ্চিতও কমেনি। ঘরের কোনায় রাখা বাতি হতে মশারি ভেদ করে আসা নরম আলো আলোছায়ার এক মুকুট এঁকে দিয়েছে তার মুখায়বয়বে। পাখার বাতাসে সে নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে - কোনো ভয় নেই, দুশ্চিন্তা নেই এতটুকু, যেন চারপাশ হতে প্রশিক্ষিত প্রহরীর দল পাহারা দিয়ে রেখেছে এক রাজপুত্রকে।
অবশেষে বাতি নিভিয়ে তারা সকলে ঘুমায়।
ভোরের দিকে হঠাৎ তিথির শাড়িতে ঠান্ডা অনুভূত হয়। বাতি জ্বালাতেই দেখা গেল, বিছানা ভিজে একাকার। বুঝতে কষ্ট হয়না, ইজাজের “নীরব জলাধার” বাসরঘরের পালঙ্ক দখল করে নিয়েছে। গদি, চাদর, শাড়ি, বাবলার পাজামা - সবকিছু ভিজে একাকার সে জলে।
ইজাজ তখনো ঘুমে অচেতন।
বাবলা হতবাক, আর ওদিকে, তিথি হেসে কুটিকুটি।
ফুলশয্যায় ইজাজের উপস্থিতিতে বাবলা কতটা বিব্রত তা পরিষ্কার বোঝা না গেলেও তিথীর চোখে বরাবরই তার আদরের ইজাজ এক সাক্ষাৎ রাজপুত্র।
সকালে ঘুম ভেঙে ভেজা বিছানা দেখিয়ে ইজাজ বলে, 'এটা কে করেছে?'
- 'কে আবার হবে? তুই করেছিস লক্ষ্মীছাড়া।' - ফুফু জবাব দেয়।
- 'না, আমি না, আমি তো স্বপ্নে নৌকা চালাচ্ছিলাম।'
- 'চালাতে চালাতেই নৌকাটা ডুবিয়ে দিলি তো রে বোকা।' - তিথি মৃদু হেসে বলে।
ইজাজ আত্মবিশ্বাসের সাথে বলে, 'ফুপ্পি, আমি কিন্তু নৌকা ভালো চালাই, ডুবাতে যাবো কেন বলো?'
ছেলেটির জবাব শুনে বাবলা ফিসফিসিয়ে বলে, 'নৌকাটা কাল রাতে এতটা ভালো না চালালেও পারতে হে।'
লেখক: কানাডিয়ান অভিবাসন পরামর্শক, প্রকৌশলী, কলামনিস্ট ও কথাসাহিত্যিক
ফেইসবুক: https://www.facebook.com/moh.l.gani/
©somewhere in net ltd.
১|
১৬ ই জানুয়ারি, ২০২৬ রাত ১:৩০
স্বপ্নের শঙ্খচিল বলেছেন: বাবলা ফিসফিসিয়ে বলে, 'নৌকাটা কাল রাতে এতটা ভালো না চালালেও পারতে হে।'

........................................................................................................................
বিশেষ বিশেষ মর্হুতে নৌকা ভাল না চালালে, খবর আছে কিন্ত ।