| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
পড়ুন আমার নতুন গল্প: বটের ছায়ার দুই জীবন।
পত্রিকা হতে সরাসরি: https://bangla.bdnews24.com/arts/2d8afbd10ffd
১.
বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের সামনের সেই পুরোনো বটগাছটা কেবল একটি গাছ ছিল না; তার শেকড় ছড়িয়ে ছিল মাটির গভীরে, আর ডালপালা ছায়া ফেলত এক যুগলের অজস্র বিকেলের ওপর। এ গাছেরই ছায়াতলে বসে প্রবীর প্রথম বুঝেছিল - জীবন মানে পরিকল্পনার কোন সরলরেখা নয়; জীবন মানে হঠাৎ থেমে যাওয়া বাস, ভুল স্টেশনে নামা, আর এমন কিছু ঘটনা, যা মানুষের সারাজীবনের জন্য প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।
ইতিহাস বিভাগের অনার্স তৃতীয় বর্ষে পড়ছিল প্রবীর। ক্লাসে বসে সে পড়ত রাজা-বাদশাহের উত্থান-পতন, সাম্রাজ্যের ভাঙন - কিন্তু নিজের জীবনের ইতিহাসটাও সে যুগপৎ নীরবেই লিখে যাচ্ছিল নিজেরই অজান্তে। এই মাসে কয়টা টিউশন, কত টাকা আসবে, মায়ের ডায়াবেটিসের ওষুধ, বাসা ভাড়া, ছোট বোনের বইখাতা, কতোই না খরচ তার। বাবার সড়ক দুর্ঘটনার পর সংসারের ভার এমনভাবে তার কাঁধে চেপে বসেছিল যে বয়সের আগেই সে যেন ক্লান্ত-শ্রান্ত বয়োবৃদ্ধ এক মানুষে রূপান্তরিত হলো। সেই ক্লান্ত জীবনের জটিল সমীকরণে আচমকা যোগ হয় রোকসানা নামের এক তরুণী।
উচ্চ মাধ্যমিকের ছাত্রী রোকসানা। প্রবীরের নতুন ছাত্রী। প্রবীর তাকে ইংরেজি পড়াতো। ভালো ইংরেজি জানায় ইংরেজির টিউটর হিসেবে তার বেশ নামডাক। রোকসানার এক বান্ধবীর বড়বোন প্রবীরের কাছে ইংরেজি পড়ে বেশ ভালো ফল করেছিল। রোকসানারও একই প্রত্যাশা।
প্রথম দিন পড়তে এসে রোকসানা দরজার কাছে একটু থমকে দাঁড়িয়েছিল, প্রবীরের মতো মার্জিত এবং সুদর্শন যুবক রোকসানা এর আগে খুব বেশি দেখেনি। স্বভাবতই, মেয়েটির দৃষ্টি অবনত, কণ্ঠে লাজুকভাব।
প্রথম দিনের টিউটোরিংয়েই প্রবীর বুঝতে পারে এই মেয়ে অন্য অনেকের চেয়ে আলাদা। খাতা খুলে তাকে প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে যেত রোকসানা। তাছাড়া, তার চোখে ভয় বা সংকোচ ছিল না; ছিল নিঃশব্দ দৃঢ়তা। সে জানে পড়াশোনায় ভালো ফল করা সহজ নয়, তবে তা অসম্ভবও নয়। সে জানে বিজ্ঞানের ছাত্রছাত্রীরা গণিত বা বিজ্ঞানে ভালো নম্বর পেলেও এই ইংরেজি বিষয়টা তাদের অনেক ভোগায়; দক্ষ টিউটর প্রবীরের সহায়তায় সে তা হতে দেবে না কোনভাবেই।
- স্যার, এই জায়গাটা একটু বুঝিয়ে দেবেন, মানেটা আমি ঠিক ধরতে পারছি না।
- তুমি কি বুঝেছো আমাকে আগে বলো, ভুল হলে আমি শোধরে দেব।
রোকসানা কিছুটা অপ্রস্তুত হলে প্রবীর অভয় দিয়ে বলে, 'ভুল না হলে শেখা হয় না। প্রশ্ন করাই সবচেয়ে বড় সাহস।'
কথাগুলো শুনে রোকসানা আরো আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠে। এমন করেই প্রবীরের হাত ধরে তার পড়াশোনা আগায়।
রোকসানার পরিবার ছিল খুব রক্ষণশীল। মেয়ের বাইরে যাওয়া, ছেলেদের সঙ্গে কথা বলা - সবই কঠোর নিয়ন্ত্রিত এ পরিবারে। তবু, রোকসানার ডাক্তার হবার স্বপ্নপূরণে তার পড়াশোনার উন্নয়নে হিন্দু যুবকের কাছে পাঠাতেও দ্বিধা করেননি মা-বাবা। বাবা-মা চাইছিলেন ডাক্তার হয়ে তার নিজের জীবনের আর্থিক নিশ্চয়তার পাশাপাশি মানুষের সেবা করার সুযোগটাও সে অর্জন করুক। রোকসানাও সে স্বপ্নের ভার কাঁধে নিয়েই পড়াশোনা করতো গভীর মনোযোগে, রাত জেগে। বন্ধুবান্ধবের সাথেও সে অযথা সময় কাটাতো না। তার চেয়ে বরং প্রবীরের সাথে ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে গালগল্পই তার বেশি ভালো লাগতো। তার বেশি নজর কেড়েছে পত্রপত্রিকায় ইংরেজিতে প্রবীরের লেখালেখির বিষয়টি। সে নিয়মিত লেখে।
পড়ার ফাঁকে ফাঁকে ক্রমশঃ দুজনের কথা বাড়ে। ইংরেজি সাহিত্যের পাশাপাশি প্রবীর গল্প করে ক্যাম্পাস নিয়ে। পাঠদান কক্ষের বাইরেও তাদের বিচরণ শুরু হয়। লাইব্রেরির নীরবতা, টিএসসির ভিড়, আর, কলাভবনের সিঁড়িতে বসে মাঝেমাঝেই বর্ষার বৃষ্টি দেখে দুজন। অঝোরধারার বৃষ্টি-বাতাস রোকসানার মনে আবেশ জাগায়। মুগ্ধ হয়ে শুনে প্রবীরের গল্প। রোকসানা কম কথা বলা মেয়ে, তার শুনতে ভালো লাগে বেশি, বিশেষতঃ প্রবীরের কণ্ঠস্বর হলে তো কথাই নেই।
একদিন সে হঠাৎ জিজ্ঞেস করে, “স্যার, আপনি কি কখনো ভয় পান?”
প্রবীর একটু ভেবে বলে, “পাবো না কেন? তবে, ভয় কে জয় করাই তো জীবন।”
প্রবীর খুব সাধারণ ভঙ্গিতে এ উত্তর দিলেও তার কথাগুলো রোকসানার মনে নতুন ভাবনার জন্ম দেয়। বলা চলে, রোকসানার হৃদযন্ত্রের খুব গভীরে কোথাও গেঁথে গিয়েছিল প্রবীরের এ আপাতঃ সরল জবাব। তার মনে এ প্রশ্নও জাগে, প্রবীর কেন জানতে চাইলেন না হঠাৎই ভয় বা আতংক নিয়ে রোকসানার প্রশ্ন কেন? তবে কি প্রবীর ভিন্ন কিছু বুঝে নিয়েছে?
দিন গড়ায়, সময় এগিয়ে চলে, সাথে বাড়ে পরীক্ষার চাপ, ভবিষ্যতের দুশ্চিন্তা। রোকসানার মেডিক্যালে পড়ার আশা পূরণ হবে তো?
কিছুদিন যেতেই প্রবীর ফোন কল পায়, রোকসানা মেডিকেলে চান্স পেয়েছে। ফোনের ওপাশে সে কাঁদছিল। কান্নাটা ছিল আনন্দের, জয়ের, আর দীর্ঘ অপেক্ষার।
- আমি পেরেছি, স্যার।
প্রবীর তখন টিএসসির সামনে দাঁড়িয়ে। মানুষের ভিড়ের মধ্যে আনন্দের বন্যায় ভাসছিলো নিঃশব্দে।
- আমি জানতাম। তুমি পারবেই।
- স্যার, আমি কিন্তু বাবা-মাকেও খবরটা এখনো জানাই নি, ফল দেখে আপনাকেই প্রথম জানালাম।
রোকসানার কণ্ঠে উচ্ছাস দেখে প্রবীর বুঝতে পারে তাদের দুজনের সম্পর্কটা স্রেফ শিক্ষক-ছাত্রীতে বাঁধা নেই আর। প্রবীর ভাবে, কত ছাত্র-ছাত্রীই না তার মেডিক্যাল বা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে চান্স পেয়েছে, এদের কেউ তো এতো গুরুত্ব দিয়ে তাকে সে সুখবর কখনো দেয়নি। এভাবে নানা এলোমেলা ভাবনায় এর পরের কয়েকটি দিন রোকসানাই প্রবীরের মনের পুরোটা দখল করে রেখেছিল। আর্থিক দৈন্যতা সামাল দিতে পড়াশোনার পাশাপাশি নানা ব্যস্ততায় প্রেম-ভালোবাসা বলে যে পৃথিবীতে একটি বিষয় আছে তা ভাবার ফুরসৎ প্রবীরের হয়ে উঠেনি আজতক। অথচ তেমন প্রশ্নেরই মুখোমুখি সে আজ। ভেবে পায়না, তার জীবনে এ সুযোগ, না চ্যালেঞ্জ, নাকি অন্যকিছু?
২.
ভালোবাসাবাসি স্বীকার করতে আরো কয়েকমাস সময় লেগেছিল তাদের। ভয় ছিল সমাজের, ভয় ছিল পরিবারের, ভয় ছিল এ অসম ভালোবাসা যদি দুটি জীবন বা পরিবার ভেঙে তছনছ করে দেয়!
নিজেদের অজান্তেই লুকিয়ে ফোনালাপ, চুপিচুপি দেখা, ভবিষ্যৎ নিয়ে বলা না বলা স্বপ্ন - সব মিলিয়ে তারা নিজেদের একটি ছোট পৃথিবী বানিয়ে ফেলে এরই মাঝে।
রোকসানা একদিন ফিসফিস করে বলে, “আমার পরিবার জানলে এ সম্পর্ক মেনে নেবে না।”
প্রবীর বলে, “আমি জানি। তবু আমি চাই না তুমি মিথ্যা বলে বেঁচে থাকো, সত্যই সাহস।”
বাস্তবতা কল্পনার চেয়ে অনেক বেশি কঠিন। দিন যায়, মাস যায়, বছরও গড়িয়ে যায়। মেডিকেলে পড়ার দ্বিতীয় বর্ষেই রোকসানাকে পরিবার থেকে জানানো হলো, তার বিয়ে ঠিক হয়েছে। পাত্র ডাঃ জামাল, অঙ্কোলজিস্ট, মানে ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ, একজন প্রতিষ্ঠিত ডাক্তার।
জামাল সাহেব ডাক্তার হিসেবে নতুন হলেও এ শহরে শীর্ষ অঙ্কোলজিস্টদের তালিকায় নাম লিখাতে সক্ষম হয়েছেন এরই মাঝে। পাশাপাশি, মেডিক্যাল কলেজে অধ্যাপনাও করেন তিনি। পরিবারের পছন্দ, সমাজের চোখেও আদর্শ পাত্র ডাঃ জামাল। পাত্র নির্বাচনে সব হিসাব মিলে গেছে, শুধু রোকসানার মনটা পড়েছে বাদ।
রোকসানা অঝোর কান্নায় মায়ের হাত ধরে বলেছিল, “মা, আমি অন্য কাউকে ভালোবাসি। এ প্রস্তাব 'না' করে দাও।”
মা চোখ নামিয়ে বলেছিলেন, “কল্পনার ভালোবাসা দিয়ে জীবন চলে না, মা; তাছাড়া, এমন সোনার টুকরো পাত্র বারবার আসেও না।”
একপ্রকার জোরজবরদস্তিতে বিয়ে হয় রোকসানার। বিয়ের দিন লাল শাড়ি, সাজগোজ আর গহনার আড়ালে রোকসানার চোখ জুড়ে ছিল অতল শূন্যতা। প্রবীর সেদিন ক্যাম্পাসে এসে বটগাছটার নিচে বসে ছিল ঘন্টার পর ঘন্টা। চারপাশে চলছিল তরুণ তরুণীদের হাসি, আড্ডা; আর, প্রবীরের ভেতরে চলছিল বন্যার তোড়ে পদ্মা পাড়ের নিষ্ঠুর ভাঙ্গন।
বোধগম্য কারণেই, বিয়ের পর সংসারে মন বসেনি রোকসানার, যদিও জামাল মানুষ খারাপ ছিলেন না, বরং, তিনি ছিলেন দায়িত্ববান, ভদ্র এক সজ্জন। তিনি রোকসানাকে আগলে রাখতে চেষ্টার ত্রুটি করেননি মোটেও।
এক রাতে জামাল সরাসরি প্রশ্ন করেন, “রোকসানা, তুমি কি আমাকে কখনো ভালোবাসতে পারবে না, আমার কি সে যোগ্যতা নেই?”
রোকসানা নিজের পায়ের দিকে তাকিয়ে চুপ করেছিল।
প্রতি রাতে ঘুমোতে যাবার আগে সে ছাদের উপরে যে ছোট্ট বাগানটি করা হয়েছে তার কিনারায় দাঁড়িয়ে আনমনে আকাশের তারা দেখতো। দেখে মনে হতো কোথাও মূল্যবান কিছু ফেলে এসেছে সে। নিয়মিতভাবেই, ডাঃ জামাল ছাদে উঠে তাকে হাত ধরে নিচে নিয়ে আসতেন।
প্রবীরের সঙ্গে তার যোগাযোগ বন্ধ হয়নি। ফোন, ইমেইল, ফেসবুকের ইনবক্স, সবই সমানে ব্যবহার করে সে। এভাবে তারা দুজন দুজনের সমগ্র সত্তা জুড়ে লেপ্টে থাকে, মুহূর্তের জন্যও আলাদা হয়না। এ যেন বড়ো সংসারের হৈহল্লায় দুজনের আরেক ছোট সংসার।
এমনই সময়ে ডিভি ভিসার লটারিতে সুযোগ পেয়ে প্রবীর আমেরিকা চলে যায়। ভিসা হাতে পাওয়ার দিনই সে ফোন করে রোকসানাকে। খানিক নীরব থেকে রোকসানা শুধু বলে, 'ভালো থেকো সবসময়।'
৩.
আমেরিকায় গিয়ে প্রবীর শুরু করে নতুন এক জীবন। বাংলাদেশের পড়াশোনা কাজে লাগিয়ে সরাসরি একই পেশায় কাজ পাওয়া আমেরিকায় একপ্রকার অসম্ভব। বলতে গেলে অচেনা সে দেশে নিজেকে নতুন করে ঢেলে সাজাতে হয়।
শুরুতে একটা মুদি দোকানে ক্যাশিয়ারের কাজ করে কিছু অর্থ সঞ্চয় করে প্রবীর। তারপর ধীরে ধীরে খণ্ডকালীন কাজ করে একটি কলেজে পড়াশোনা করে। কলেজের ডিপ্লোমা সফলভাবে সম্পন্ন করে একসময় তার মতো নতুন যারা আমেরিকায় গেছে (ইমিগ্র্যান্ট) তাদের ইংরেজি শেখানোর শিক্ষক হবার যোগ্যতা অর্জন করে। ভালো ফল করায় দ্রুত এক কলেজে ইন্সট্রাক্টর পদে চাকুরিও পেয়ে যায়।
পরিশ্রমী মানুষ প্রবীর। নতুন চাকুরী হবার পরও সে আগের চাকুরিটি পুরোপুরি ছেড়ে দেয়নি। ওই মুদি দোকানে ছুটির দিনগুলোতে ক্যাশিয়ার হিসেবেও কাজ চালিয়ে যেতে থাকে।
কাজ আর কাজে ডুবে থাকা তার দীর্ঘদিনের অভ্যাস। তবে, রাত হলে একাকীত্ব তাকে পেয়ে বসতো। রোকসানার কথা মনে পড়ে তার, তাকে ভীষণ মিস করে। রোকসানার বিবাহ, দূরত্ব, কোনোকিছুই তার প্রতি প্রবীরের ভালোবাসা বিন্দুমাত্র কমাতে পারেনি, বরং, গভীর থেকে গভীরতর হয়েছে অনুভূতি।
একদিন ট্যুরিস্ট ভিসা নিয়ে আমেরিকা যাবার সুযোগ হয়ে যায় রোকসানার। অতি গোপনে পরিবারকে না জানিয়েই সে ছুটে যায় সুদূর আমেরিকা। এয়ারপোর্টে প্রবীরের সাথে দেখা হতেই যেন ঘড়ির কাঁটা কিছুক্ষণের জন্য থেমে যায়।
সম্বিৎ ফিরে পেয়ে রোকসানা প্রবীরকে বলে, 'বিশ্বাস করো, আমি আর এই জীবনটা টেনে নিতে পারছিলাম না।'
প্রবীর তাকে জড়িয়ে ধরে বলে, 'আমিও কি পেরেছি?'
রোকসানা সোজা গিয়ে প্রবীরের বাসায় ওঠে।
এরই মাঝে স্টুডেন্ট ভিসার আবেদন করে রোকসানা তার আমেরিকায় অবস্থান দীর্ঘ করে।
পড়াশোনার পাশাপাশি দুজনে দুজনার হয়ে স্বপ্ন পূরণের আনন্দে মিলেমিশে একাকার হয়। এভাবে কয়েক মাস যেতেই রোকসানা ডাঃ জামালকে ডিভোর্স দেয়। রোকসানার এ কঠিন সিদ্ধান্তে পরিবার, তথা সমাজ প্রশ্ন তোলে, নিকটজনেরা মুখ ফিরিয়ে নেয়, কিন্তু ডাঃ জামাল, মানে রোকসানার স্বামী, এ ঘটনায় তেমন অবাক হননা। কারন, রোকসানার সংসারে অনাসক্তি, চালচলন, আর গোপনে দেশত্যাগের ঘটনা হতে তিনি তেমন বার্তা একপ্রকার পেয়েই গিয়েছিলেন।
অবশেষে প্রবীরকে বিয়ে করে রোকসানা আমেরিকায় স্থায়ী হয়। আমেরিকার বিখ্যাত মায়ো ক্লিনিকে ল্যাব এসিস্টেন্টের চাকুরিও জুটিয়ে ফেলে সে।
৪.
প্রবীরের সাথে বিবাহের প্রথম কয়েকটা বছর কেটে যায় স্বপ্নের মতো। ধীরে ধীরে তাদের ঘরে আসে দুই ছেলে, শান্ত এবং শিমুল। এক শব্দের নাম তাদের, মানে, লাস্ট নেইম বলে কিছু নেই। রোকসানার পরামর্শে প্রবীর তেমন নাম রাখতে একমত হয়, যাতে হিন্দু-মুসলমান, কোন ধরনের পরিচয় তাদের নামে না থাকে। স্বামী-স্ত্রী একমত হয় যে তারা কখনো তাদের সন্তানদের ইসলাম বা সনাতন ধর্ম চর্চায় বাধ্য করবে না; বড়ো হয়ে তারা নিজেরাই নিজেদের ধর্ম নির্বাচন করবে। সেভাবেই চলছে তাদের সংসার জীবন। দুই ছেলেও ধর্ম নিরপেক্ষ মনন-মানসিকতা নিয়ে জীবনের প্রথম দশক পার করে ফেলে।
প্রবীরের বাবা বছর দুয়েক আগে পরলোকগমন করলে তার মা, সত্যভামা দেবী, অনেকটা একা হয়ে যান। প্রবীর তার জন্য আমেরিকার গ্রিনকার্ডের আবেদন করলে তার অনুমোদন পাওয়া যায়। সেভাবেই তিনি ছেলের কাছে, অর্থাৎ, আমেরিকায় এসেছেন কয়েকমাস হলো। তিনি নাতিদের প্রাণভরে ভালোবাসতেন, এবং চাইতেন তারাও ধর্মকর্ম পালন করতে শিখুক। পুরোনোদিনের রক্ষণশীল মানুষ তিনি।
সত্যভামা প্রতিদিন খুব ভোরে শয্যাত্যাগ করে সূর্যোদয়ের আগে রাম নাম জপ করেন, স্নানশেষে ঠাকুরের নাম নিয়ে করজোড়ে সূর্যকে প্রণাম করেন; কৃষ্ণ, গণেশ কিংবা দূর্গা মায়ের পুজো দেন। ঘিয়ের আগুনে প্রদীপ জ্বালিয়ে, ধুপ আর পুষ্প অর্পণ করে স্তোত্র পাঠ করেন নিয়মিত। পাশাপাশি রামায়ণের অন্তত একটি অধ্যায়, বা ভগবতের কিছু শ্লোক তো পড়বেনই। তাঁর পূজায় আড়ম্বরের চেয়ে ভক্তি বেশি। তাঁর কাছে প্রতিটি ভোর মানেই নাম, নিয়ম, নিঃশব্দ প্রার্থনা আর অগাধ মঙ্গলকামনা, নিজের এবং পরিবারের সকলের জন্য। প্রতি সন্ধ্যায়ও চলে অনুরূপ প্রার্থনা। বলা চলে, তাঁর বেশিরভাগ সময় কাটে পুজো-প্রার্থনায়। হরে কৃষ্ণ কীর্তন আর নিয়মিত উপবাস তো আছেই।
আমেরিকার জীবনে খাওয়া দাওয়া, যত্ন আত্তি, চিকিৎসা, কোনোকিছুতেই বিন্দুমাত্র অভাববোধ না করলেও দুই নাতির ধর্মচর্চার আলামত না দেখে তার মন খারাপ থাকে সদাসর্বদা। এক সময় তিনি নিজেই তাদের ধর্মীয় শিক্ষাদীক্ষা দেবার উদ্যোগ নিলেন। প্রবীরকে ডেকে বললেন বাচ্চাদের নিয়ে সে যেন মাঝে মাঝে মন্দিরে যায়। ধর্ম ছাড়া মানুষ আর পশুতে বিশেষ পার্থক্য নেই বলেও তিনি দুই নাতিকে সময়সুযোগমত বুঝাতে চেষ্টা করেন, শেখাতে থাকেন সনাতন ধর্মের নিয়মনীতি, আচার-আচরণ।
একসময় শান্ত আর শিমুলও তাদের ঠাকুরমার সাথে সকাল-সন্ধ্যার প্রার্থনায় যোগ দিতে শুরু করে। কিন্তু, তাদের ইসলাম ধর্মাবলম্বী মা, রোকসানা, বিষয়টা সহজভাবে মেনে নিতে পারেনা।
রোকসানা প্রথমটায় চুপ ছিল। ভেবেছিল, আমেরিকায় বেড়ে ওঠা ছেলেরা দাদির কথা আমলে নেবে না। কিন্তু, পরিস্থিতি বেগতিক দেখে ভেতরে এক ধরনের চাপ অনুভব করতে শুরু করেছিল সে। মুসলমান ঘরের মেয়ে হিসেবে সে তার নিজ গর্ভের সন্তানদের সনাতন ধর্মে দীক্ষিত হবার বিষয় কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছিলো না।
এক রাতে রোকসানা স্বপ্ন দেখে, তার সদ্য মৃত বাবা তাকে বলছেন, 'তোর বাচ্চাগুলো শেষতক হিন্দু বানিয়ে ফেললি কেন বলতো মা, আমার যে এদিকে কবর আযাব হচ্ছে রে?'
সে জবাব দেয়, 'কি বলো বাবা, আমার জীবন থাকতে তা কোনোদিনও হবে না, প্রয়োজনে জীবন দিয়ে হলেও আমি তা ঠেকাবো?'
বাবা-মেয়ের বাদানুবাদে ঘুম ভেঙে গেলে রোকসানা বুঝতে পারে সে আসলে স্বপ্ন দেখছিল। তারপরও বাবার কথা মনে করে সে অঝোরে কেঁদেছিল।
স্বপ্নের কথা প্রবীরকে সে জানায়। সে প্রবীরকে বলে, 'দেখো প্রবীর, আমি বিষয়টা মেনে নিতে পারছিনা; তুমি মাকে বুঝাও।'
প্রবীর দ্বিধাগ্রস্থ স্বরে বলে, 'দেখ, মা আবেগে এসব করছে। একটু সময় দাও, সব ঠিক হয়ে যাবে।'
দিন যায়, সপ্তাহ যায়, মাসের পর মাস যায়, কিন্তু, সমস্যা গভীর হতে গভীরতর হতে থাকে। বাচ্চারা আজকাল ঠাকুরমার অনুরোধ ছাড়াই দেবদেবীর পুজো করে, ধুপ দেয়, হরে কৃষ্ণ কীর্তন করে।
পরিবর্তিত পরিবেশে সংসারে অশান্তি বাড়তেই থাকে। ছোট ছোট কথায় ঝগড়া, দীর্ঘ নীরবতা, আজকাল নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে তাদের এক সময়ের সুখের নীড়ে।
রোকসানা মানসিক অবসাদে ভোগে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আজকাল নিজেকে চিনতেও তার কষ্ট হয়। প্রবীরও বিষয়টা আঁচ করতে পারে। এভাবেই চলছে তাদের জীবন।
৫.
রোকসানা একদিন প্রবীরকে বলে, “আমি দেশে যাবো। কিছুদিন থাকবো সেখানে। তুমি বাচ্চাদের নিয়ে থাকো আপাততঃ। এসব আর আমি নিতে পারছি না, আমাকে কিছুকাল একা থাকতে দাও।”
প্রবীর বাধা দেয়নি, কারণ, সে ভালোভাবেই বুঝে রোকসানার মানসিক অবস্থা। তাছাড়া, সে নিজেও মনে করে তার স্ত্রীর কিছুদিনের বিশ্রাম দরকার।
দুমাসের রিটার্ন টিকেট নিয়ে রোকসানা দেশে গেল, কিন্তু, চার মাসেও সে ফিরে আসেনা। এ অবস্থা দুই সন্তান, প্রবীর এবং সত্যভামাকে অস্থির করে তোলে। প্রবীরের শত অনুরোধেও রোকসানা আমেরিকায় ফিরে যেতে নারাজ। শিমুল, শান্তরাও আকস্মিক মাকে হারিয়ে কেঁদেকেটে দিশেহারা।
ঢাকায় ফিরে রোকসানা নিয়মিতভাবেই মাঝরাতে বাবার পুরোনো বাড়ির ছাদে দাঁড়িয়ে আকাশের ছুটে চলা মেঘ আর মিটমিট করা তারা দেখে, ভাবে, তার এ জীবনের গন্তব্য কোথায়? নানা এলোমেলো প্রশ্ন তার মাথায় ভর করে। মাঝেমাঝে ডাঃ জামালকেও তার মনে পড়ে, আর ভাবে, এই সজ্জন, নিরেট ভদ্রলোকটির প্রতি ঢের অন্যায় হয়েছে, তিনি তাকে ক্ষমা করেছেন তো?
৬.
সত্যভামা তাঁর ছেলে প্রবীর, বৌমা রোকসানা, আর নাতিদের ভীষণ ভালোবাসেন। বিশেষতঃ, তাঁর বৌমা ভিন ধর্মের মেয়ে হলেও শ্বাশুড়ির সেবাযত্নে যে বিন্দুমাত্রও অবহেলা করেনি তা তিনি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেন। মুসলিম ঘরের মেয়ে হয়েও পুজোর ঘর সাজাতে রোকসানা তাকে যেভাবে আন্তরিক সহায়তা দিয়েছিল তা তিনি ভুলতেই পারেন না। তাছাড়া, কিছুদিনের এই প্রবাস জীবনে তিনি সচক্ষে দেখেছেন তাঁর পুত্র আর পুত্রবধূর ভালোবাসা কতটা গভীর। এতকিছুর পরও তাঁর দুই নাতির কোনো ধর্ম পরিচয় থাকবে না, এ বিষয়টি রক্ষণশীল সত্যভামা মানতে নারাজ। সবদিক বিবেচনায় তিনি প্রবীরকে এক সন্ধ্যায় ডেকে বলেন যে তিনি আর আমেরিকায় থাকবেন না, দেশে ফিরে যেতে চান।
পরিস্থিতি বিবেচনায় মায়ের ফিরে যাবার কারণ বুঝতে প্রবীরের বেগ পেতে হয় না, তাও সে মায়ের মুখে তা শুনতে চায়। মা তাকে বুকে জড়িয়ে অঝোরে কেঁদে বলেন, আমি চাই না আমার কারণে তোর সুখের সংসার ছারখার হয়ে যাক। তোদের জন্য আমার আশীর্বাদের কমতি কোনোদিনও ছিল না, কমতি হবেও না, তবে সে আশীর্বাদ আমি দূরে থেকেই বর্ষণ করতে চাই। যত দ্রুত পারিস আমাকে দেশে পৌঁছে দিয়ে বউমাকে নিয়ে আয় বাবা, আমার নাতিদের কান্না আমি আর সইতে পারি না।
আমার আরো অনেক লেখা এই লিংকে পাবেন: https://bangla.bdnews24.com/author/em-el-gni-2
©somewhere in net ltd.