| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
গত দু’মাস ধরে ধর্ম রক্ষার ধুঁয়া তুলে যে গোষ্ঠী মাঠ গরম করার চেষ্টা করে যাচ্ছে এবার তারা মুখোশ খুলে স্বরুপ প্রকাশ করেছে। এরা নতুন কেউ নয়, আমাদের অতি পরিচিত ‘স্বনামধন্য’ ‘মজলিসে তাহাফ্ফুজে খতমে নবুওয়ত’ ওরফে খতম পার্টি। এই গোষ্ঠীই বিএনপি-জামায়াত সরকারের আমলে তারেক জিয়ার এবং তখনকার গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সক্রিয় সহযোগিতায় তথাকথিত ‘কাদিয়ানী’-বিরোধী আন্দোলন পরিচালনা করে। এর নেতৃত্বে ছিলেন রহিম মেটাল জামে’ মসজিদের খতিব মাওলানা মাহমুদুল হাসান মুমতাজী, সংগঠনের নায়েবে আমীর মুফতি নূর হোসেন নূরানী, মাওলানা নজমুল হক প্রমূখ। প্রায় সাড়ে ছয় বছর ঘাপটি মেরে বসে থাকার পর এবার এই চক্র নেমেছে ধর্ম রক্ষার সার্বিক দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে। নিজেদের নাম দিয়েছে ‘হিফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ’। গতকাল ‘হিফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ, তেজগাঁও শিল্প অঞ্চল জোন’-এর পক্ষ থেকে প্রাপ্ত একটি প্রচার পত্রে ঘোষণা করা হয়েছে, উক্ত সংগঠনটি আগামী শুক্রবার, ৩রা মে, ২০১৩ তারিখে জুমা’র পর নাবিস্কো মোড়ে হিফাজতের তের দফা আদায়ের লক্ষ্যে শানে রিসালাত মহা-মহাসমাবেশ করবে। উক্ত সভায় সভাপতিত্ব করবেন মাওলানা জুনায়েদ বাবুনগরী আর অন্যান্যদের মাঝে বক্তব্য রাখবেন মাওলানা মাহমুদুল হাসান মমতাজী। উল্লেখ্য, এই মোড় থেকেই পূর্বে কয়েকবার এই সংগঠনটি খতমে নবুওয়তের ব্যানারে নিকটস্থ নাখালপাড়া আহমদীয়া মসজিদে আক্রমণ চালিয়েছিল।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবি যখন তুঙ্গে ঠিক তখনই এরা আবার ঈমান রক্ষার দাবিতে ও ধর্ম অবমাননার শাস্তির দাবীতে মাঠ গরম করার পায়তারা কষছে। এরা এখন সরকারকে হুমকি দিচ্ছে। একজন সাধারণ পর্যবেক্ষকের পক্ষেও একথা বুঝতে অসুবিধা হয় না, কারা কার স্বার্থে এসব আন্দোলন রচনার অপচেষ্টা তারা করছে।
এ চিহিৃত শ্রেণীর ১৩টি দাবির কোন একটিও ইসলাম সম্মত নয়। তাদের ১৩ দফা দাবির পূর্বে গত ১৯শে ফেব্রুয়ারি ২০১৩ তারিখে কয়েকটি দৈনিকের প্রথম পৃষ্ঠায় কিছু কথা বিজ্ঞাপন আকারে প্রকাশ করেছিলেন। এদের কথা হলো, ২০১০ সালের জুলাই মাসে কোথাকার কোন ব্লগার তার লেখায় মহানবী (সা.)-কে অবমাননা করেছিল তাই সব ব্লগারই ইসলাম বিরোধী, নাস্তিক ও শাস্তিযোগ্য অপরাধী।
এ বিষয়ে ‘ধর্মরক্ষার্থী’দের উদ্দেশ্যে প্রথম কথা হলো, মহানবী (সা.)-কে যদি ২০১০ সালের জুলাই মাসে সত্যিই কোন হতভাগা অবমাননা করেই থাকে তাহলে তখন কোথায় ছিল আপনাদের ধর্মীয় অনুভূতি আর কোথায় ছিল আপনাদের রসূল-প্রেম? আজ যখন স্বাধীনতা-বিরোধী চক্রকে জাতি কোনঠাসা করে ফেলেছে তখন হঠাৎ করে উথলে উঠেছে আপনাদের ধর্মীয় অনুভূতি ও রসূল-প্রেম, তাই না? আপনারা যদি সত্যিই রসূল অবমাননার কারণে উদ্বেলিত হতেন তাহলে ২০১০ সালে আগষ্ট মাসের মধ্যেই আপনারা এসব অভাগার অযৌক্তিক ও অসত্য কথনের যৌক্তিক ও হৃদয়গ্রাহী সদুত্তর প্রদান করতেন। এরপরও এই গুটিকতক তথাকথিত সন্দেহবাদীরা যদি আপনাদের প্রদানকৃত উত্তরের কোন পাল্টা যুক্তি দাঁড় করাতো, আপনারা নির্ভীক জ্ঞান তাপস হিসেবে সেগুলোরও অকাট্য খন্ডন প্রকাশ করে দিতেন। কিন্তু না; আপনারা আলেম-আল্লামা নামধারী হওয়া সত্ত্বেও এ কাজ করেন নি। অঘটন ঘটার তিন বছর পর যখন রাজনৈতিক ও আইনগতভাবে একদল যুদ্ধাপরাধী জালে আটকে গেছে তখন আপনারা নিরীহ ধর্মপ্রাণ ছাত্র ও জনগণকে ধর্মীয় অনুভূতিতে সুড়সুড়ি দিয়ে তাদেরকে মাঠে নামানোর অপচেষ্টা করছেন। ঝোপ বুঝে কোপ মারা আর কাকে বলে!
এ প্রসঙ্গে দ্বিতীয় কথা ধর্মপ্রাণ নিরীহ জনগণকে বলতে চাই, ‘চিলে কান নিল, কান নিল- চীৎকার শুনলেই কি দিক-বিদিক জ্ঞানশূণ্য হয়ে চিলের খোঁজে ছুটতে হয়? বুদ্ধিমানদের মত একবার কানে হাত দিয়ে দেখতে হয় না? সত্যিই কি ধর্ম অবমাননা বা রসূল (সা.) অবমাননা করা সম্ভব? বাংলায় প্রচলিত একটি প্রবাদ আছে। তা হলো, চাঁদে থুথু দিলে সে থুথু নিজের মুখেই পড়ে, চাঁদে ফেলা যায় না। তাই যদি হয়, তাহলে সবচেয়ে সম্মানিত রসূল হযরত মুহাম্মদ (সা.) বা পবিত্র ইসলামের বিরুদ্ধে আজে বাজে কথা বললে এতে ইসলামে কী ক্ষতি হতে পারে? আমাদের ধর্ম কি এতই ঠুনকো যে, মানুষের মুখের কথায় তা নষ্ট হয়ে যাবে? যে ধর্ম শত-সহ¯্র বাধা-বিপত্তি ডিঙ্গিয়ে ১৪‘শ বছর পার করে টিকে গেছে সেটি সামান্য দু’একজন হতভাগা মানুষের কথায় ধ্বংস হয়ে যায় কীভাবে? মহানবী (সা.)-কে প্রথমে মক্কায় এবং পরবর্তীতে মদীনায় কত কটু-কথা, কত অপমান সহ্য করতে হয়েছে। এ কারণে কি তিনি কাউকে শাস্তি দিয়েছেন? কক্ষনো না। আমরা কি কখনও ভেবে দেখেছি, ধর্ম জগতের সবচেয়ে বড় অপরাধ হচ্ছে শিরক বা খোদার সাথে কাউকে সমকক্ষ হিসেবে দাঁড় করানোর বিষয়টি। কিন্তু এ সত্ত্বেও শিরকের কারণে কোন জাগতিক শাস্তি প্রদানের বিধান নেই। কেন? কারণ হলো, আল্লাহ স্বয়ং এর বিচার করবেন, বান্দা করবে না। বরং মুশরিকরা যেসব জিনিষ বা মানুষকে আল্লাহর সমকক্ষ দাঁড় করায় তাদেরকেও মন্দ নামে ডাকতে খোদা তায়ালা নিষেধ করেছেন (সূরা আনআম ঃ আয়াত, ১০৮)। যদি সবচেয়ে বড় গর্হিত ধর্মীয় অপরাধ শিরকেরই কোন জাগতিক শাস্তি না থাকে তাহলে অন্যান্য অপকর্মের ক্ষেত্রে আমাদের এত বাড়াবাড়ি কেন? আমরা কি তবে নৈরাজ্য সৃষ্টির কাজে লিপ্ত হচ্ছি! অথচ আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, নৈরাজ্য সৃষ্টি হত্যার চেয়েও গর্হিত অপরাধ! আল ফিতনাতু আশাদ্দু মিনাল কাত্লি (সূরা বাকারা ঃ আয়াত, ১৯১)। অ-ইসলামী বা ইসলাম বিরোধী পন্থায় আর যাই হোক ইসলাম প্রতিষ্ঠা করা যায় না।
©somewhere in net ltd.