নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

জানতে চাই

মাহবুব আলী

মাহবুব আলী_প্রভাষক (ফ্রিল্যান্স কলামিস্ট)

মাহবুব আলী › বিস্তারিত পোস্টঃ

ফেরা না ফেরা

২৯ শে জুলাই, ২০১৯ বিকাল ৪:৫৯



খুকু ফিরে আসছে। দুপুরের মধ্যেই চলে আসবে গ্রামে। নিজ গ্রাম। নিজ বাড়ির আঙিনায়। এ খবর এখন সকলের মুখে মুখে। অনেক দূর দেশ থেকে প্রত্যাবর্তন। আকলিমা কত দিন পর মেয়ের মুখ দেখতে পাবে। হতভাগি মেয়ে। কপালপোড়া। জীবনে কোনো সুখ পায়নি। দু-বেলা ভালোমতো খাবার পর্যন্ত না। একটু ভালো খেতে কত না চেষ্টা। একটুকরো মাছ কিংবা মাংসের ঝোল। কোনোদিন হয় কোনোদিন হয় না। একটু সুখের জন্য মেয়ে তার কত দূর দেশে চলে গেল। মায়ের মন বারণ করে। কীভাবে কাটাবে দিনরাত? খুকু শোনেনি।
আকলিমার কষ্ট হয়। স্কুল শেষ করে কলেজে পা রাখতে না রাখতেই বিয়ের প্রস্তাব। মেয়েরও পছন্দ। অতএব ‘না’ বলেনি। একদিন তো মেয়েকে পরের বাড়ি যেতে হয়। জন্ম থেকে চেনা জানা ঘরদোর মানুষজন নিবিড় বন্ধন সকলকিছু ছেড়ে পরকে আপন করতে হয়। মেয়ের কম চেষ্টা ছিল না। এক-দেড় বছর ভালোই চলে যায়। কিন্তু...।

ঘরের সঙ্গে লাগোয়া আঙিনায় কয়েকটি গাছ। বড় বড় আর উঁচু। ফলন্ত। বিক্রি করা হলো। খুকুর বাবার হাতে লাগানো আম-কাঁঠাল গাছ। মুকুল এসেছিল। কি সুন্দর স্বাদু ফল! দুটো মেহগনি। একটি নারিকেল গাছ। চমৎকার ফল এসেছিল। সবুজ প্রকৃতি। শ্যামল ছায়া। চেনা-অচেনা পাখির কলকাকলি। সব ত্যাগ করতে হয়। বিসর্জন। আকলিমার দুচোখে ছায়া নেমে আসে। মামুনেরও। আট বছরের ছেলে। দৃষ্টি ঘোলা করে বলে, -

‘মা সব গাছ কাটবা?’
‘হ বাজান। তুর দুলাভাইয়ের টাকা লাগব। দোকান দিতে চায়।’
‘নারকোলগুলা পাকুক। পনেরো-বিশদিন গেলে ঝুনা হইব।’
‘আইচ্ছা নাড়ুর জন্যি বাজার থেইক্যা কিন্যা আনুম।’

মামুনের চোখ-মুখ শুকনো। গাছগুলোকে বড় ভালবাসে। ওর বাবার মতো। আকলিমা গাছ বিক্রির সোয়া-লাখ টাকা নিজে গিয়ে হাতে তুলে দিল। মেয়ে তার সুখে থাক। ছেলেমেয়ের সুখ-শান্তি ছাড়া আর কি চাওয়া আছে? সেই আঙিনায় আবার গাছ লাগানো যাবে। মেয়ের চেহারায় আনন্দ-ছায়া। আকলিমা বলে, -

‘জামাই টাকা গুইন্যা লও। এর বেশি দিতে পারতাম না বাবা।’
‘গোনা লাগব না মা। আপনে তো গুনছেন। তবে ছেঁড়া-ফাটা দেইখ্যা লই।’

শরিফুল বারবার গোনে। এক-দুই-তিন-চার। আকলিমার বুকে শঙ্কা। ঠিকমতো আছে তো? বাসে করে এসেছে। কেউ টেনে নেয়নি তো আবার? না ঠিক আছে। এক লক্ষ পঁচিশ হাজার।
এতকিছুর পরও ঘর টিকল না মেয়ের। দেড় বছরের মাথায় ফিরে এলো। আঙিনায় তখন বিকেলের পাণ্ডুর মেঘ। আগে গাছগাছালি ছিল। ভরা ভরা লাগত। এখন ফাঁকা ফাঁকা। বুক শূন্য করে দাঁড়ায় খুকু। চারদিকে খাঁ-খাঁ করে। মেয়ের গাল-মুখ-গলা-পিঠে কালশিটে দাগ। কোনো জায়গা বাদ রাখেনি। মানুষ না অমানুষ? মানুষ চিনতে ভুল হয়েছে। মানুষ চেনা বড় শক্ত কাজ। খুকুরানি ভুল করেছে। ক্ষমার অযোগ্য। কি শাস্তি দেবে? বড় আদরের মেয়ে তার। অবোধ...নির্বোধ।

দিন ভাবনা-দুর্ভাবনায় যেতে যেতে একদিন দীর্ঘ অন্ধকার রাত শেষ হয়। ভোরের আলোয় সকাল আসে। আলোয় আলোয় উজ্জ্বল হয় দিন। দুঃখেরও যবনিকাপাত অবশ্যম্ভাবী। আকলিমার বিশ্বাস। এমনি এক সকালে খুব ভালো কথা হয়। সুখবর আসে। খুকু চাকুরি পেয়েছে। সুখদেবপুর থেকে এক-দেড় কিলো দূরে সয়েটার কারখানা। সেখানে সুপারভাইজারের পদ। সকাল নয়টা থেকে বিকেল সাড়ে চার-পাঁচ পর্যন্ত কাজ। মাস গেলে সতেরো শত টাকা। অনেক কপাল মেয়ের। অনেক আনন্দ মায়ের। এবার অন্তত কাজের মধ্যে ব্যস্ত থেকে পুরোনো দিন ভোলার অবকাশ এলো। সব ভুলে যাবে। মুছে ফেলতে পারবে শরিফুলের মুখছবি। স্মৃতি। সে সুখ কিংবা কষ্টের। মেয়ের মুখের দিকে তাকানো যায় না। মুখচাপা। বুকের কষ্ট কাউকে দেখায় না। সবসময় মুখ-চোখ শুকনো। কখনো কোথাও আনমনে তাকিয়ে থাকে। মায়ের চোখ ফাঁকি দেয়া যায়?
আকলিমা ভোরে ওঠে। ফজরের জায়নামাজে বসে দোয়া। স্বামীর জন্য জান্নাত। ছেলেমেয়ের জন্য সুখ-শান্তি। সংসারের কল্যাণ। নিজের জন্য কোনো চাওয়া নেই। দরকার পড়ে না। তার নিজের জান্নাত না কি জাহান্নাম সব আল্লাহ্‌র ইচ্ছে। এই পৃথিবীর জীবন দোজখ। হাবিয়া। মানুষজন কম কষ্ট দেয়নি। মামুনের বাপ লঞ্চে ডুবে মরল। ঢাকা থেকে ফেরার কথা। রমজানের শেষ সপ্তাহ। রোজার আর তিনটি দিন। অফিস থেকে আগাম ছুটি। মনে খুব সাধ, অন্তত এ বছর পরিবার নিয়ে ঈদ করে। কিন্ত...।
আকলিমা খবর শুনে দৌড়। নদীর পাড়ে শত শত মানুষ। মানুষ আর মানুষ। মৃত্যু না কি তামাশা? পিঁপড়ের মতো দাঁড়িয়ে আছে। চোখে কৌতূহল। কথার গুঞ্জন। তার মধ্যে কান্নার কররোল। চিৎকার। আদেশ-নির্দেশ। ডুবুরি নদীতে নামে। ডুব দেয়। নদীর তলায় শক্ত বালি-পলিমাটি। আটকে থাকা লঞ্চ। নড়ে না। তারা মানুষ তুলে আনে। মরা মানুষ। ডাঙায় সারিবদ্ধ রং-বেরঙের মানুষ। সরকারের মানুষজন। বিবর্ণ-সাদা ব্যাগে মরা মানুষ ভরে রাখে। সে যাকে খোঁজে, হাতে একটি ছবি, সাদা-কালো; সেই ব্যাগের স্তূপে নেই। পানির গভীরে নেই। ডুবুরির বিশাল জালে নেই। লঞ্চের কোনো কোণায় আটকে নেই তো? কে জানে। তবে আশা আছে। আশা ধরে রাখা ভালো। সে মানুষ এড়িয়ে মানুষের কাছে যায়। হাত উঁচু করে ছবি তুলে ধরে।

‘ভাই এ্যাই মানুষডা? ’
‘কী নাম? কে হয়? বয়স কত?’
‘জামিল উদ্‌দিন। স্বামী। বয়স...বয়স?’
‘ছবি ধরে রাখ। আচ্ছা ব্যাগ দেখ। ব্যাগ দেখ।’
‘দেখছি ভাই। ভাই মানুষটাকে আইন্যা দেন।’
‘কি জ্বালা! যান ওই আবার লাশ উঠছে। দেখ গিয়া তোমার মানুষ কি না।’

সে মানুষ আর ফিরে এলো না। একসঙ্গে আনন্দ ঈদ নেই। কত মানুষ কত টাকা পায়। ক্ষতিপূরণের টাকা। সে কিছু পেল না। সে ক্ষতি তো টাকা দিয়ে পূরণ হওয়ার নয়। তার মানুষ লঞ্চে ছিল না। লোকটি তবে গেল কোথায়? এ প্রশ্ন দিগন্ত আকাশে রংধনু হয়ে জেগে থাকে সারা জীবন। তারপর একসময় মিশে যায়। জীবন থেমে থাকে না। তার শূন্য বুকে হাহাকারের সঙ্গে মিলেমিশে যায় নদীপাড়ের বাতাসে ভেসে থাকা আগরবাতি আর কর্পূরের গন্ধ। মানুষ পচে যাওয়ার দুর্গন্ধ। এসব নিয়েই কষ্টের মধ্যে একা একা আবার পথচলা। উঠে দাঁড়ানোর একদিন।
কোনো কোনোদিন এসব ভাবতে ভাবতে হারানো ছবি দেখতে দেখতে রান্না হয়। মেয়ের জন্য টিফিন-বক্স সাজিয়ে রাখে। এভাবেই সেই কষ্টদিন আর দুর্ভাবনা রংধনু আকাশে মিশে যায়। সবকিছু মানিয়ে নেয়ার স্বস্তি আসে। একার কষ্ট হলেও ছেলেমেয়েকে মানুষ করেছে। সেই সংগ্রাম চলছে এখনো। সে পেরেছে...বাকি পথটুকুও পারবে। কখনো লোভী মানুষের মুখ ভেসে ওঠে। দুর্ভাগা মানুষ। বাগানের সব গাছ বিক্রি করে টাকা দিল। নিজের জন্য পাঁচটি টাকা রাখেনি। খুকু কি না করেছে! মেয়ে তার অনেক পড়তে চেয়েছিল। সেই মানুষের জন্য ছেড়ে দেয়। বিয়েতে বসে। এক-দেড় বছর। তারপর...ঘর টিকল না।

‘ও মা কি হইল তুমার? চুপ কইরা বইসা আছো? টিফিন সাজায়া দাও। সমায় নাই তো।’
‘দিই মা দিই।’
‘তুমি ওই শয়তানটার কথা ভাবতাছো? কুত্তা...কুত্তা মানুষ।’
‘কারও বুদ্ধি পাইছে মা। যাউক কপালে নাই...নাই। আমি তুর আবার বিয়া দিতাম। তুর মমিন চাচারে কইছি।’
‘কও কি! আমারে জিগাবা না? আমি আর বিয়া বইতাম না গো মা। অনেক হইছে। হাউস মিইট্টা গেছে।’
‘না মা...মাইয়া মানুষের পুরুষ সঙ্গী লাগে। নিশ্চিন্ত থাকন যায়।’
‘শোনো মা, এগুলা এ্যাহন থাক। আমি দ্যাশে থাকতাম না। ফিইরা আইস্যা ভাবুম নে।’
‘মানে? কস কি? কই যাবি তুই?’
‘তুমার মনে আছে কামাল ভাইয়ের কথা? ওই যে আমারে চাকরি দিল। সে আরব দ্যাশে যাইতে কয়।’
‘কোনহানে...কোন্‌ দ্যাশ?’
‘ওমান। আরব দ্যাশ। রাজা বাদশাহ্‌র দ্যাশ গো। ওইহানে মাসে বিশ হাজার টাকা বেতন। দু-তিন বচ্ছর কাজ করলে লাখ টাকা জমব। মামুন ভালা ইসকুলে পড়তে পারব। জহির চাচার কাছে বন্ধকি জমিটাও ফেরত নেয়া যায়। আমাগো দুইবেলা মাছ-গোস্ত-ভাত হয়।’
‘কাজটা কী?’
‘ওই তুমি যে কাজ কইরা আমাগো পালছ। বাসাবাড়ির রান্ধন-বাড়ন দেখাশুনা এইসব আর কি।’
‘না মা তুর যাওয়া দরকার নাই। এ বছর তুর বিয়া দিতাম। নতুন কইরা ঘর বসুক।’
‘সেইটা আর হইত না গো মা জননী। আমি যাইতাসি।’

তারপর একদিন আকাশে উড়াল দেয় খুকুরানি। বিশাল ডানার পাখি আকাশে উঠে চড়ুইয়ের মতো ছোট হতে হতে অদৃশ্য হয়ে যায়। তার বুকে রেখে যায় অসম্ভব বিবর্ণ শূন্যতা। সেখানে কোনো জমি নেই। নদী নেই। কোনোকিছু আছে কি না আছে কোনো বোধ নেই। সে ছেলের হাত ধরে গ্রামে ফিরে এলো। কয়েকদিন পর আবার সেই একচিলতে আঙিনায় গাছ লাগানো শুরু করে। আম-জাম-কাঁঠাল চারার সঙ্গে বাতাসে দোল খায় ফুলগাছের ডালপালা। মামুনের কাজ। সে যত্ন নেয়। প্রতিদিন সকাল-বিকাল পানি দেয়। আগাছা পরিষ্কার করে। রাতে মায়ের কোলে শুয়ে গল্প।

‘মা গো বুজির কথা মনে আসে। ক্যামুন আছে বুজি?’
‘ভালো আছে বাজান। ভালো। মনে কুচিন্তা করিস না।’

আকলিমা অন্ধকার রাতের দেয়ালে চোখ মোছে। মন তড়পায়। কী করে সে? বাপ-মরা মেয়ে কত দূর দেশে আছে। আল্লাহ্‌-নবীর দেশ। খোদার নবী সেই মরুভূমিতে আমিনা মায়ের কোলে এসেছেন। বড় পবিত্র দেশ। মানুষ হজ্বে যায়। হাজী হয়ে ফেরে। তাদের কাছে কত গল্প শোনা। আরব দেশের খেজুর খেয়ে প্রাণ জুড়োয়। জমজমের শীতল পানি। তার ভাগ্য কোথায় সেই দেশে যায়। মেয়ে তার সেখানে আছে। আল্লাহ্‌র কোলে নিরাপদ সুখে শান্তিতে আছে। আছে তো? অচেনা অজানা কোনো দেশের ছবি বারবার ভেসে ওঠে। জেগে ওঠে দৃশ্যকল্প।
সেই দেশ মরুভূমি। চারদিকে বালু আর বালু। পাথরের পাহাড়। উড়োজাহাজ নামার মতো প্রশস্ত-মসৃণ রাস্তা। ঝকঝকে পরিষ্কার। সকল মানুষ নামাজ পড়ে। আযান হলেই দোকানপাটে কেনাবেচা বন্ধ। আগে আল্লাহ্‌র ডাক। নামাজ পড়তে হবে। সেই খোলা দোকানে কেউ চুরি করে না। এসব গল্প হাজীদের মুখে শোনা। সে বিমুগ্ধ হয়ে শোনে। সেই দেশে খুকুরানি। বড় ভাগ্যবতী মেয়ে তার। এমন কপাল কয়জনের হয়? তারপরও মেয়ের ঘর-সংসার দরকার। আগে ফিরে আসুক। কোনো কথা আর শুনছে না। কোনো বাধা মানবে না। ভালো ছেলে দেখে বিয়ে দেবে। একটি-দুটি বছর। তিন-চার লাখ টাকা হয়ে যাবে। টাকায় কিনে নেবে জামাই।

খুকু ফোন করে। মনে শান্তি। আনন্দ-হাসির কথা হয়। বেদনা বিরহের সময়কাল চোখ ভিজিয়ে দেয়। তারপর স্বপ্ন...স্বপ্নবুননের আলোচনা। পরিকল্পনা। টাকা আসে। এত টাকা একসঙ্গে কোনোদিন নিজের করে হয়নি। মনে সাহস বাড়ে। এভাবে চলে যায় একটি-দুটি করে কতগুলো মাস। একদিন আকস্মিক করুণ-স্বর। সবকিছুর ছন্দপতন। উদ্‌বেগ-উৎকণ্ঠার তীব্র সূচনা। ফোন বাজে।

‘মা গো তুমরা ভালা আছো?’
‘হ মা...তুই ক্যামুন আছিস মা? একবার ছুটি নিয়া আয়। কতদিন তুরে দেখি না। মন কান্দে গো বেটি।’

উত্তর নেই। নিশ্চুপ বাতাসে বুঝি মরুভূমির ঢেউ ভেসে আসে। কোনো দীর্ঘশ্বাস? আজকাল কি হয়েছে...বুকের মধ্যে থেকে থেকে করুণ সুর বাজে। ফাল্গুন মাস। উদাস হয়ে থাকে মন-প্রাণ। কখনো ধুলোঝড় ওঠে। আরবের দেশে এমন হয়? সেখানে কি ঝড় হয় না? হয় তো। সেখানেও বালুতে ঝড় ওঠে। সে ঝড় তার বুকের মতো প্রচণ্ড তাণ্ডব ধরে রাখে না। জীবন নদীর পাড় ভেঙে দেয় না। তার বুকে ঝড়।

‘মা মামুন ক্যামুন আছে? ইসকুলে দিছো?’
‘আছে মা আছে। ইসকুল যায়। সকাল-সন্ধ্যা বই নিয়া পড়ে। তুর মতো।’

আবার কি ধুলোঝড়ের ঢেউ বাতাসে ভেসে আসে? কানে তেমন বাজে কেন? বুক শূন্য খাঁ-খাঁ লাগে যে!

‘হ্যাঁ মা তুর কথা ক। যে বাসায় থাকস, লোকজন ভালা তো? আগের বাসার মানুষ গো থাইক্যা ভালা? ওইহানে কি কাজ করোস মা?’

এবার সত্যি সত্যি দীর্ঘশ্বাস চেনা যায়। কখন থেকে বুকের মধ্যে লুকোচুরি খেলে...ধরতে পারেনি। প্রলম্বিত দীর্ঘশ্বাস। অস্ফুট কান্না। বিনম্র কুহকী শব্দ। তার সকল বোধ স্থবির। অনুভূতিহীন। বালুচরের শূন্য বুকে উল্কাঝড় আছড়ে পড়ে। ভয়ংকর নিশ্চুপ নিনাদ। তীব্র কেঁপে যায়। বুক ছটফট করে।

‘মা গো খুকু...খুকুরানি, কী হইছে মা? কথা ক...কথা ক মা?’

আকলিমা ফোনের শ্রুতিতে কান্নার ধ্বনি শোনে, না কি ঈশ্বরের কোনো অমিয়বাণীর স্তব-কোরাস; আকাশে বাতাসে মিলেমিশে প্রচণ্ড বালুঝড় হয়ে চারপাশ অন্ধকার-কালো করে দেয়। বিক্ষুদ্ধ শব্দমালা স্তব্ধ করে রাখে সময়। মন ব্যাকুল-উদভ্রান্ত। অস্থির শ্রুতি। মেয়ে কথা বলে না কেন? কী হয়েছে তার? কী কষ্ট? কেমন করে? আহা মেয়ে তার কত মাস দূরে আছে! কেমন আছে কিছু জানে না। দেখে না। সত্যমিথ্যে কিছু বোঝে না। বালু আর পাথরের দেশে মন পাথর। পাথর মনে কথা নেই। তার মনও যে পাথর হয়ে যায়। পাথর গলে পড়ে। ফেটে ফেটে চৌচির ছড়িয়ে যায় আদিগন্ত। জেগে ওঠে নোনাজলের সাগর। অস্বচ্ছ আঠালো হয়ে যায় বাড়ির আঙিনা। ফুলের বাগান।

‘মা গো আমি আর পারি না। আমারে লইয়া যাও। লইয়া যাও গো মা।’

আকলিমা আর কী বলে? কী করে? কোথায় যায়? কার কাছে? মরুভূমির বাতাস-ধুলোঝড় নিস্তব্ধ হতে থাকে। গাছের পাখি থেমে যায়। আকাশ বিবর্ণ পাণ্ডুর। সবকিছু স্থির অথবা অস্থির কেঁপে কেঁপে ওঠে।
তারপর যেভাবে পিতৃহারা দুটি শিশু বুকে আগলিয়ে দিনরাত এক করে গেছে, স্বামীর শোক ভুলে যেতে শত প্রয়াস; মনে সাহস জাগে। দৃঢ়-স্থির-নিষ্কম্প মনে উঠে দাঁড়ায়। পাথর-পাষাণ হয়ে শোনে বাকিসব কথা। গল্প-কাহিনি। আহা তার ফুলের মতো মেয়ে...খুকু...খুকুরানি। হায়!

অবশেষে মেয়ে আসছে। ফিরে আসছে। সকল ভাবনা-দুর্ভাবনা-উদ্‌বেগ-উৎকন্ঠার ইতি ঘটিয়ে ফিরে আসছে। সেদিন ফোনে কথা হওয়ার পর একমুহূর্ত বসে থাকেনি। নিঃশ্বাস নেয়নি। ঘুমোয়নি। পারেনি। কেউ পারে না। পাগলের মতো এখানে-ওখানে ছুটে গেছে। একে-ওকে বলে বলে খুঁজে খুঁজে সয়েটার কারখানা। তেমনভাবে কামাল। মেম্বার-চেয়ারম্যান-থানা-পুলিশ। কোনোকিছু বাদ রাখেনি। যে যখন যা বলেছে...ছুটে গেছে। সে যে মা। মা কি পারে না? সব পারে।
সারাদিন ছোটাছুটি শেষে ঘরে ফেরে। মেয়ে তার কবে ফিরবে? ক্লান্ত-অবসন্ন-জীর্ণ শরীর ভেঙে পড়ে। মন বলে যায় কত কথা। সব কথার কোনো অর্থ নেই...শুধু নিশ্চুপ কান্না। সকল কথা শোনা যায় না। আনন্দ বিষাদ হয়ে গেলে কোনো কথা থাকে না। রাত জাগে। রাতের দেয়ালে ভেসে ওঠে হাজার ছবি। দৃশ্যপট। পুরোনো দিনকাল। মেয়ে তার বড় হয়েছে। কতকিছু মেয়েকে শেখাতে হয়। জানাতে হয়। গোপন-অগোপন। মেয়ে স্কুলে যায়। পড়ালেখা শেখে। বিয়ে। সয়েটার কারখানায় চাকুরি। ভোরে ঘুম থেকে উঠে টিফিন তৈরি। কারখানার মানুষেরা ভালো ভালো খায়। সে তেমন পারে না। অল্প কয়েকটি টাকা। সংসারে হাজার খরচ। খুকু টাকার পেছনে ছুটে গেল। সকলের জন্য সুখ কিনে আনতে চায়। টাকায় যে সুখ পাওয়া যায় না মা। মায়ের দুচোখ ভিজে আসে। আলোছায়া দেয়ালে সবকিছু ঝাপসা। মন পোড়ে। প্রাণ তড়পায়। মামুন বিছানায় এপাশ-ওপাশ অস্থির। ঘুম আসে না। আসে না ঘুম। বলি বলি করে অবশেষে বলে ফেলে।

‘মা তুমি কাইন্দো না...কাইন্দো না তুমি। বুজি ফিইরা আইব। ফিইরা আইব।’
‘হ বাজান তুর বুজি ফিইরা আইব। খুকু ফিইরা আইব।’

আঙিনায় সেই বাগান নেই। কতগুলো ছোট ছোট গাছ বাতাসে দোল খায়। ফুল ফোটে। বাতাসে সুবাস ভাসে। ওপাশে জঙ্গল। ঝোপঝাড়। অনেকরাতে দু-একটি তক্ষক হেঁটে বেড়ায়। পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়। আকলিমার স্বস্তি নেই। কলিজায় ধড়ফড়। নিস্তব্ধ নিজঝুম রাত। ক্লান্তিতে শরীর ভেঙে যায়। চোখে নেমে আসে তন্দ্রা-ঘুমঘোর। ওই বুঝি খুকু আসে। পায়ের শব্দ শোনা যায়। সে ঘর থেকে বাইরে বেরোয়।
আকাশে প্রকাণ্ড চাঁদ। চারিদিকে রুপোলি জোছনা। আরবের দেশে আলোর এমন মায়াজাল আছে? মরুভূমির আকাশে সেই চাঁদ সবকিছু দেখতে পায়? সাত-আকাশের উপর যিনি? জোছনায় মন ভেসে যায়। ফাল্গুনের রাতে হিম ফুরোয় না। শীত শীত করে। একলা অন্ধকার কোণায় বসে ভাবনার সময়। মেয়ে তার চাঁদ ভালবাসে। চাঁদের আলো। জোছনায় ডুবে ডুবে কত গান কত গল্প। এই তো সেদিন। সেই মেয়ে কেমন আছে? আয় মা ঘরে আয়...ফিরে আয় মা। জোছনার হিম-কুয়াশা-ভেজা বাতাসে দুচোখের জল মিলেমিশে একাকার।
শেষ-দুপুরে ফিরে আসে খুকু। সমাজদরদী মানুষ কাজ করেছেন। তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। অবশ্য সঞ্চয়ের সব টাকা খরচ হয়ে শেষ। পৃথিবীতে টাকা ছাড়া কোনো কাজ হয়? নতজানু মন তাই তাদের জুতোয় চুমো খেতেও রাজী। সব তাদের কল্যাণে হয়। তাদের দয়া। মেয়ে তার ফিরে আসছে। বালু আর পাথরের দেশ থেকে। নবী-রসুলের দেশ। পবিত্র মানুষজন।
আঙিনায় মানুষের ভিড়। সকলেই ফিরে আসা মানুষকে দেখতে চায়। শুনতে চায় কেচ্ছা-কাহিনি। কত অভিজ্ঞতা! সুখ-দুঃখের গল্প। তাদের কাছেই জানা যায়, কত টাকা সেই দেশে। সোনা আর সোনালি তেল। আরব্য রজনীর রূপকথা ভূমি। সিন্দবাদের সাত সমুদ্র অভিযান। খুকু তার অভিযানের গল্প বলে যায়।
আজকেও চাঁদ জেগে আছে। ঝকঝকে আকাশে নিঃসঙ্গ একলা। অকাতরে আলো ঢেলে ধুয়ে দেয় চারিদিক। দিতে থাকে অকৃপণ। মানুষের ভিড় বাড়ে। আঙিনায় অদ্ভুত দীর্ঘ ছায়ারা নেমে আসে। সন্ধের বাতাসে থেকে থেকে হিম ঢেউ। চেনা-অচেনা সৌরভে ভরে যায় আশপাশ। সেই নদীর ঘাটের মতো? যেখানে একদা লঞ্চ ডুবে গিয়েছিল। মানুষ তলিয়ে যায়। সেই...সেই আগরবাতি-কর্পূরের তীব্র প্রত্নতাত্ত্বিক সুবাস? অন্ধকারে কোথাও কোনো বিষাদ-গান বাজে। বেজে চলে। কে সে? আলোকিত বিষণ্ন কোনো মুখছবি কফিনে শুয়ে শুয়ে নিষ্পলক চাঁদ দেখে যায়।

খুকু ফিরে এসেছে।

(গল্পটি ভারতের 'গল্পদেশ' পত্রিকায় প্রকাশিত। বন্ধুদের সাথে শেয়ার করা জন্য পোস্ট করলাম।)

মন্তব্য ১৪ টি রেটিং +৪/-০

মন্তব্য (১৪) মন্তব্য লিখুন

১| ২৯ শে জুলাই, ২০১৯ বিকাল ৫:১২

রাজীব নুর বলেছেন: খুব সুন্দর গল্প।
খুকুর জন্য খুব মায়া লাগছে।
টাকার জন্য গাছ কাটা হয় সবচেয়ে বেশি।

৩০ শে জুলাই, ২০১৯ সকাল ১১:৫৯

মাহবুব আলী বলেছেন: অনেক ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য অনুপ্রাণিত করল। গাছকাটার বিষয়ে আপনার মতামতের সাথে একমত। শুভেচ্ছা রইল।

২| ২৯ শে জুলাই, ২০১৯ বিকাল ৫:৩০

চাঁদগাজী বলেছেন:


প্লটটা চলমান বাংলার বাস্তব ছবি; লেখার ষ্টাইল সুন্দর নয়।

৩০ শে জুলাই, ২০১৯ দুপুর ১২:০১

মাহবুব আলী বলেছেন: অনেক কৃতজ্ঞতা চমৎকার মন্তব্যের জন্য। এটা আর সংশোধন করা সম্ভব নয়। কেননা 'ভয়' বইয়ের আট নম্বর বা শেষ গল্প হিসেবে চলে গেছে। ভালো থাকবেন।

৩| ২৯ শে জুলাই, ২০১৯ বিকাল ৫:৫০

আপেক্ষিক মানুষ বলেছেন: আমি দোকান দিব আর সেই টাকা দিবে আমার শশুর বাড়ির লোক এটা কেন?

৩০ শে জুলাই, ২০১৯ দুপুর ১২:০৩

মাহবুব আলী বলেছেন: এটা আমিয়ো বুঝি না। আমি হোন্ডা চালাব, কিনে দেবে শ্বশুর। কেন? কিন্তু এই জগদ্দল সমস্যা সমাজের মধ্যে রয়ে গেছে। আসুন এর বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তুলি।

৪| ২৯ শে জুলাই, ২০১৯ রাত ৮:৫১

আনমোনা বলেছেন: ভালো লাগলো।

৩১ শে জুলাই, ২০১৯ সকাল ১০:৫৩

মাহবুব আলী বলেছেন: শুভেচ্ছা জানবেন।

৫| ৩০ শে জুলাই, ২০১৯ দুপুর ১২:২৭

দৃষ্টিসীমানা বলেছেন: ভাল উপস্থাপন , গল্পে ভাল লাগা রইল ।

৩১ শে জুলাই, ২০১৯ সকাল ১০:৫৩

মাহবুব আলী বলেছেন: ধন্যবাদ আপনাকে।

৬| ৩০ শে জুলাই, ২০১৯ রাত ৯:১৭

মাহমুদুর রহমান সুজন বলেছেন: ভাস্তবতার নিরিখে গল্পের প্লটটি সত্যি একটি সময়সময়কার দুর্দশাগ্রস্থ জীবন যাপনের চিত্র ফোটাতে সক্ষম হয়েছেন। এমন অবস্থায় পতিত প্রতিটি মানুষের জন্য কষ্ট লাগে। সবাইক সুন্দর জীবন যাপন করুক। আপনাকে ধন্যবাদ গল্পটি পড়ার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য। আপনি অনেক সুন্দর লিখেন।

৩১ শে জুলাই, ২০১৯ সকাল ১০:৫২

মাহবুব আলী বলেছেন: অনেক ধন্যবাদ মনযোগি পাঠের জন্য। গল্প তো সময়কাল ধরে রাখে। চেষ্টা করেছি। অন্য গল্পগুলো পড়ার আমন্ত্রণ। শুভকামনা।

৭| ০১ লা আগস্ট, ২০১৯ বিকাল ৫:৫১

অন্তরা রহমান বলেছেন: দারুন গল্প। এই ধরনের গল্প এখন আর লেখে কয়জন। অসাধারণ লাগলো তাই। আপনার হাত দুর্দান্ত।

০১ লা আগস্ট, ২০১৯ রাত ৮:৪৮

মাহবুব আলী বলেছেন: অনেক অনুপ্রাণিত হলাম। শুভকামনা রইল।

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.