নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

জানতে চাই

মাহবুব আলী

মাহবুব আলী_প্রভাষক (ফ্রিল্যান্স কলামিস্ট)

মাহবুব আলী › বিস্তারিত পোস্টঃ

পাটাশ (শেষাংশ)

১৫ ই আগস্ট, ২০১৯ সন্ধ্যা ৭:১৯



এই তো তিন দশক আগের কথা। ঘরের পশ্চিম দেয়াল সীমানা ঘেষে সাড়ে তিন ফুটের প্রশস্ত গলি। সে গলি উত্তর থেকে শুরু হয়ে চলে গেছে দক্ষিণে। তারপর বাঁক শেষে একেবারে পুবে। তারামনি অনেক সকালে গলিতে ঢোকে। তিন কোণায় তিন বাড়ির তিনটি সার্ভিস ল্যাট্রিন। সে-সবের কোনোটিতে জাহাজ মার্কা সরিষা তেলের লম্বা টিন আর কোনোটির নিচে মাটির তৈরি বড় বড় চাড়ি। বাড়ির লোকজন সেগুলো ব্যবহার করে। তারামনির হাতে বড় বালতি, সেটির গা ঘেষে কত বর্ণালি রংধনু। হলুদ খয়েরি লাল কালো মিলেমিশে একাকার ভূ-ভাগের মানচিত্র। আমাদের দ্রুত জানালা বন্ধ করতে হয়। তারামনি অন্য বালতি রেখে গেছে উত্তরের সীমানা প্রাচীরের কাছে। সেখানে ভন ভন করে শত কিসিমের মাছি উড়ে, উড়তে থাকে; বসতে থাকে রংধনুর চারপাশে। তারামনি গলিতে খালি বালতি নিয়ে যায়। টিন আর চাড়ির সবটুকু জমা ঢেলে টাপুর-টুপুর ভরপুর ফিরে আসে। গলির বাতাসে ধীরে ধীরে আবার চম্পা-বেলির মৌতাত ছড়াতে ছড়াতে রাস্তায় গিয়ে দাঁড়ায়। সেখানে এক মহিষ-টানা ড্রাম-গাড়ি। একজন কিশোর আর সেই মহিষ একাডেমি স্কুলের গলিতে উঁচু মাথা নির্বাক দাঁড়িয়ে থাকে। সেই নির্বোধ প্রাণির দুচোখ ভারি অসহায় আর করুণ! কোনোদিন খড় বা আখের ছোবড়া চিবোয়, মুখ দিয়ে ফেনা ঝরে, কোনোদিন নির্নিমেষ অসহায় চাহনি; বলো কী অপরাধ হে মানব সকল? কেন আমায় টেনে নিতে হয় তোমাদের পাপ-বর্জ্য? তাকে দেখে কষ্ট বাজে। মনে হয়, ঈশ্বরের মতো অসম্ভব ধৈর্যের ধ্যান-গম্ভীর কোনো চেহারা তার মুখে সেঁটে আছে। কখনো ভুল হয়ে যায় ইতিহাসপূর্ব কোনো সময়ের দিনকাল ভেবে। আহা কি জীবন! কি সভ্যতা! দেখতে দেখতে কত আদিম দাহকাল আর পেরোতে হবে? এখন পূর্ণ বাবু আর মুসা ভাইয়েরা দু-হাতে ব্যাগ ঝুলিয়ে বাজারে যায়। ঘরে ফিরে আসে নানান বাজার নিয়ে। সেই ব্যাগ কখনো তারামনির বালতি হয়ে যায়। ঘরের গৃহিণীরা উপুড় করে ঢেলে দেখে ব্যাগ-ভর্তি পুরীষ। তাদের পকেট-ভর্তি টাকা...ব্যাগ ভর্তি গু। তারা খালি হাতে অফিসে যায়...ফিরে আসে পকেট ভর্তি করে।

মোকসেদকে গু খাওয়ার টাকা দিতে হলো। অসম্ভব যন্ত্রণা। থুতুর সঙ্গে রক্ত বেরোয়। কত মানুষের রক্তের বিনিময়ে স্বাধীন দেশ। এখন কার দোষ? কর্মদোষে দোষী মানুষ খোদারে দোষী বানাও, চিন্তা করে দেখ মানুষ কেন এমন হয়? এ দায় নিজের। পৃথিবীর সবখানে ফাঁদ পাতা। সর্বত্র সুচালো ফাঁদ মুখিয়ে আছে। উদোম ম্যানহোল। ‘এ্যয় ভাই জারা দেখকে চলো, আগে পিছে আর বাঁয়ে ভি...।’ সে আপনার চোখ, এক অথবা দুই আর তৃতীয় নয়ন। তারপরও দৃষ্টিতে ভ্রম হয়ে যায়। মানুষ বড় বিচিত্র আর ক্যামলিয়নের মতো রূপ বদলিয়ে ফেলে।
লোকটি টাকা নিল। যন্ত্রণা শুধু নিজের। সেই ছোটবেলা থেকে দেখছি তাকে। ফায়ার ব্রিগ্রেডের সামনে পুব রাস্তায় চার পাঁচটি দোকানঘর। তার একটিতে কাজ শিখছেন-কাজ করছেন খবিরুদ্দিন। সেলুনে ছোট ছেলেদের চুল কাটার জন্য যেমন উঁচু চেয়ার, তার সামনে সেখানে এক লোক বসে আছে। খবিরুদ্দিন কখনো হ্যান্ডপিস হাতে নেন, কখনো ট্রুইজারের আগায় সাদা বা গোলাপি তুলো; লোকটি রাবণের মতো মুখ হাঁ করে আছে। খবিরুদ্দিনের আঙুল সেখানে সহজে গতায়াত করে। তারপর আর কি কি ম্যাজিক হয়? পায়ের জুতো হাতে ঝুলিয়ে নিয়েছি। উৎসুক দৃষ্টি। জুতোর ভেতরে মোজা, সে দুটোর সাদা রং ঘোলা হয়ে গেছে। পায়ে মোজা পরে রাস্তায় হাঁটা যায় না। জুতো জোড়া বড় যন্ত্রণা। দু-পায়ের বুড়ো আঙুল কড়ে আঙুল আর পেছনে ফোস্কায় জ্বলছে। হাফ কিলোমিটার দূরের স্কুল, রাস্তায় রিকশা ট্রাক মটরবাইক, হাঁটার পথ বড় সংকীর্ণ। সেভাবেই আসা...যাওয়া। সেদিন কেন মাঝে মধ্যে আর পারা যায় না। পায়ের জুতোয় ফোস্কা পড়ে। ফেটে ফুটে দামা-দাম-মাসকালান্দার।

মনসুর চাচার রেডিও মেকানিক্স দোকানে মাইক বাজে। সামনে চার ফুট প্রশস্ত বারান্দা। সেখানে নীল রঙের ঢাউস লাউডস্পিকার থরথর কেঁপে যায়। পশ্চিম রাস্তা থেকে পূর্ব-পশ্চিম-উত্তর-দক্ষিণ আদিগন্ত ধুমধাম সুর-তাল ছড়িয়ে পড়ে। লোকজনের ভিড়। বিয়ে বাড়ির জন্য কলেরগান আর মাইক ভাড়া চাই।
‘গানের রেকর্ড কতগুলো? নবাব সিরাজদৌলা নাটক আছে তো?’
‘হলুদ বাটো মেন্দি বাটো, বাটো ফুলের মউ থাকতে হবে।’
‘এ ছাড়া দামা-দাম-মাসকালান্দার? সে গান না হলে চলবে না, আছে তো?’
‘আছে আছে সব গান আছে। আর কি কি চাই?’
‘ও রসিক রাজা, আর চাই কী তোমার বুঝিয়ে বলো না।’
‘তুমি আসবে বলে ভালবাসবে বলে।’
‘মাসকালান্দার আছে তো?’
‘আছে আছে, আব্বাস উদ্দিন থেকে আহমাদ রুশদি সব আছে।’
গান শোনা পাবলিক। গান শোনে...মাথা দোলায়। ভাষণ শোনা মানুষ। লগি-বইঠা হাতে তুলে নেয়। মিছিল করে। রক্ত ঢালে। প্রাণ দেয়। তারপর সেই আবার যেই সে মহৎজন। রাজা যায় রাজা আসে। বেকুবের দল স্বপ্নে বাতাসা চাটে।
খবিরুদ্দিন উঁচু চেয়ারে বসে থাকা বৃদ্ধের মুখের সামনে অ্যালুমিনিয়ামের গ্লাস এগিয়ে ধরেন। তারপর চিলমচি। বুড়োর গালে ইধার-উধার সমুদ্রের ঢেউ, তারপর পচাৎ করে কুলকুচার পানি ফেলে চিলমচিতে। মুখভর্তি পচা পানি। রক্তের সঙ্গে সঙ্গে দুর্গন্ধ। অনেক বছরের ব্যামো। পচে গলে একেবারে সার্ভিস ল্যাট্রিন। সেই দেশ বিভাগের সময় কত হই-হল্লা করে আমগাছের ডগায় সবুজ সাদা কাপড়ের চাঁদতারা পতাকা উড়িয়েছিল, এখন সেই কাপড়ের মতো ঝলসে গেছে সব। দুর্গন্ধের সঙ্গে রক্ত। রক্তের রং লাল। সব মুসলমান ভাই ভাই। তুমি খাবে চারআনা আমি না হয় দশআনা দেব। তারপর কেটে গেল আরও কয়েক বছর। পঁচিশে গিয়ে ঠেকল। রক্ত উদ্দাম বাতাস। উঁচু চেয়ারে লোক বসে থাকে। খবিরুদ্দিনের পরনে সেমি-টেডি প্যান্ট। ওয়াহিদ মুরাদ চুলের বাহার।
একদিন পশ্চিম দেয়ালের পেছন ঘেষে যে গলি, সেখানের জানালা খুলে দিই। তারামনি সকালে এসে কাজ করে গেছে। এখন একটু সুবাতাসে তাকলা মরু অভিযানের কাহিনী টানছে। রান্নাঘর থেকে ভেসে আসে গরুর মাংস কষানোর ক্ষিদে লাগা সুগন্ধ। রমজান মাস। আমার কোনো রোজা নেই। দিনের বেলা আহারের যে রুটিন রাতে শিফট করা গেল না। উপরি হিসেবে বুন্দিয়া জিলেপি পেঁয়াজু আলু চপ বেগুন চপ আর তেলে চপচপ ঘুগনি সবকিছুই প্রতিদিন আযানের সঙ্গে সঙ্গে খাওয়া চলছে। রোজা থাকতে চাই। অনুমতি নেই। বন্ধ শেষে বার্ষিক পরীক্ষা। অতএব তাকলা মরু পথে পানির পিপাসায় আকণ্ঠ কাতর সেদিন কষানো মাংস খেয়ে চলি। আমকাঠের দুর্বল জানালা খুলে পাল্লায় এক-পা তুলে ফোল্ডিং চেয়ারে কোনো কল্পনার রাজ্যে হারিয়ে যাই। যেতে থাকি দূর অনেক দূর। অসম্ভব কল্পনায় ফ্লাইং সসারের ছবি দেখতে দেখতে মঙ্গল গ্রহের লাল ভূপৃষ্ঠে হাঁটি। তখন বিপত্তি ঘটে গেল। মাংসের একচিলতে আঁশ গেঁথে গেল দাঁতের ফাঁকে। খবিরুদ্দিনের কথা মনে পড়ে যায়। ওই পর্যন্ত। আমরা কত সহজে পায়ে কাঁটা নিয়ে ল্যাংচাতে থাকি।

প্রায় সতেরো আঠারো বছরের কথা। একটি সুঁই খুঁজে নিয়ে কিংবা ট্রিট ব্লেডের চোখা কোণা, হয়তো সহজে স্বাভাবিক হয়ে যাবে; চেষ্টা চলে। আসলে কিছু হয় না, হয়ে যায় না; মাঝখান থেকে মনের মধ্যে কাঁটা জায়গা করে নেয়। সে ক্ষত কখনো যন্ত্রণায় মাথা উঁচু করে দাঁড়ায়। ওলটপালট কেয়ামত। তখন একটি সুঁই খুঁজে রক্তপাত আর অসহ্য যন্ত্রণা। অবশেষে পেইনকিলার। এভাবে কেটে গেল কয়েকটি বছর। নতুন দেশ নতুন জীবন। এরমধ্যে মিলা এসে গেল। নতুন বউ নির্বাক দেখে দেখে একদিন মুখ খোলে। কথায় কথায় মালা গাঁথে। সে মালার প্রতি ফুলে ফুলে আবেগ আর গতিবেগ। অধৈর্যের বহিপ্রকাশ।
‘তুলে ফেলো না কেন?
‘তা হলে খাব কী করে?’
‘আর এতদিন যন্ত্রণা টেনে নিয়ে চলেছ, তার চেয়ে...।’
‘এবার তুলে ফেলব। ঠিক তুলে ফেলব।’
চাইলেই সবকিছু আপরুটেড করা যায় না। যন্ত্রণা থেকে বের হয়ে আসার মধ্যেও যন্ত্রণা থাকে। এ জিনিস সকলের বুকে আছে। কারও চেহারা ছবিতে কারও ভাবনায় বুকের একান্তে। কেউ দেখতে পায় কেউ পারে না। কেউ দেখিয়ে করুণা মাগে কেউ গোপন করে। আমার যন্ত্রণা বুকের মধ্যে থাক। এখন একটি সুঁই খুঁজে বের করতে চাই। খাতা সেলাই করার জন্য বড় মোটা আর শক্ত মজবুত। তারপর খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে রক্তাক্ত পীড়ন-অবিনাশী দহন। চকচকে মজবুত একটি সুঁই।
বারো নম্বর আসেনি। আমি সাতাশ থেকে বারো। তেরো নম্বরে মোটাসোটা বিউটিকুইন, লাল রঙের চেয়ারে গ্যাঁট হয়ে বসে আছেন। চেয়ারের চারটি পা কঠোর স্টিফ, ঝুনা বাঁশের মতো শক্ত; তবু বাঁকা হয়ে গেছে। একপাশে জবাফুল নির্মোহ দৃষ্টিতে দেয়ালে তাকিয়ে। সেখানে মুখ-গহ্বরের পেশিতন্ত্র। তার পাশে মানব শরীরের রক্ত সঞ্চালন আর পরিপাক প্রক্রিয়ার খুঁটিনাটি রঙিন তথ্য। বিপরীত দেয়ালে মানুষের বিশাল চোয়াল। তার সামনে ব্রাম স্টোকারের ড্রাকুলা আর তার ছেদন দন্ত। কীভাবে যত্ন করবেন। ব্রাশিং পদ্ধতি। উপর থেকে নিচ...নিচ থেকে উপর। কোনোকিছু বাকি নেই। অবশিষ্ট থাকে না।

খবিরুদ্দিন হ্যান্ডপিস অন করেন। বাতাসে মৃদু ঘর্ঘর শব্দ। বারের আগায় রাউন্ড স্কেলার। মুখ আর মাথার মধ্যে ভূমিকম্প ঢেউ। মুখের সকল খনিজ পদার্থ বের হয়ে আসছে। এশিয়া এনার্জি। কয়লা চাই না...আগে শহর রক্ষা করো বাবা।
‘শেষ করে ফেলেছেন তো!’
‘তেমন সমস্যা নেই। সেই কলেজে পড়ার সময় ব্লেডের একচিলতে টুকরো আটকে গিয়েছিল। কিছুতেই বেরোল না। এখন চারপাশে কালচে রং ধরেছে।’
‘মরচে পড়েছে। কোন্ কলেজে পড়তেন? কোন্ বছর?’
‘সরকারি। পচাত্তরে বিএ থার্ড ডিভিশন।’
‘অনেক বছর! এখন কি ব্যথা আছে? কোনো যন্ত্রণা?...তারপর কী করা হয়?’
‘থার্ড ডিভিশনের কোনো খাওয়া নাই, চাকুরি হয়নি; মেধাহীন জঞ্জাল।’
‘কিছু তো করেন?’
‘চুক্তিভিত্তিক কাজ, যখন যেখানে যা জোটে।’
‘ও।’
মন অসম্ভব বিষিয়ে গেছে। যত্ন করে কত বায়োডাটা লিখেছি! কোনো কাজে আসেনি। অথচ অনেক অঘা-মঘা বড় বড় পদে চাকুরি করছে। তারা মুক্তিযোদ্ধা কোটা মাইনরিটি কোটা মামার টেলিফোন আর টাকায় অনেক কাজের অনেক দক্ষ রিসোর্স। যার কেউ নেই কিছু নেই। অর্থহীন অথর্ব জীবন। তার আবার ব্যথা...তার আবার যন্ত্রণা!
খবিরুদ্দিন পরিত্যক্ত আয়নার টুকরো কাচে একচিমটি জিংক অক্সাইড রাখেন। তার সঙ্গে ক্লোভ অয়েল ইউজিনাল। রিফাইন্ড মোবিলের মতো হালকা সোনালি রং। তারপর ভোতা সার্জিকাল নাইফ দিয়ে ঘেটে ঘেটে পেস্ট তৈরি করতে থাকেন। নাইফটি জম্পেস, বড় হাতলের সামনে ছোট ব্লেড; বাইরের আলোয় চক চক করতে থাকে। তখন কত ছবি ঝিলমিল করে ওঠে!
পশ্চিমে জেলরোডের মসজিদ। তার পুবে রাস্তা। সেটি পেরিয়ে সামনে হরেক রকমের মনিহারি দোকান। সেখানে চাকু কিনতে গেছি। কয়েকদিন ধরে টিফিনের পয়সা বাঁচিয়ে সাধের একটি চাকু। তারপর ফায়ার ব্রিগেডের আমবাগান। ছোট ছোট আম...পকেটে চাকু আর লবণ লঙ্কার গুড়ো। আমরা তখন কেউ ক্যাপ্টেন মার্ভেল...কেউ আলাউদ্দিন। আকাশে উড়ে বেড়াই...ভেসে ভেসে স্বপ্ন দেখি...কোহকাফের পর্বত। প্রদীপ ঘষে জ্বিন ডেকে স্বপ্নের প্রাসাদ গড়ি। সে-সব গল্প আতা আর সোনালু গাছের ডালে ডালে দাপাদাপি আর নেচে বেড়ানো এক-একটি বাঁদর করে রাখে। তবু দিন ভালো ছিল। আমাদের হাতে কোনো সেলফোন এমপিথ্রি আর মেমরি কার্ড নেই। ছিল না কোনো নিষিদ্ধ দুনিয়া।

খবিরুদ্দিন স্টিলের গ্লাসে পানি এগিয়ে ধরেন। সেদিনের সেলুন মার্কা উঁচু চেয়ার এখন হাউড্রোলিক। পরনের সেমি-টেডি প্যান্টের সঙ্গে গায়ে বাহারি কোট। একাত্তর কত সহজে কত চেহারা বদলে দিল! রাস্তায় রাস্তায় ঘরে ঘরে লাশ পড়ে আছে। তারা লাশ উলটে পালটে দেখে। সোনার চেইন কানের দুল নাকফুল কত কি খুলে নেয়। তাদের শরীরে কোনো গন্ধ হলো না। তারা আলমারি ভাঙে। বের করে আনে বিবিধ জিনিসপত্র মালামাল। লাশের উন্মুক্ত বড় বড় চোখে অবিশ্বাসী ছায়া। এরা যে কত বিশ্বাসের প্রতিবেশি...আজ তাদের চেনা যায় না। অচেনা অজানা। ভয় করে। এরা যুদ্ধ করে কাদের জন্য? আস্তিনের তলায় কবে থেকে রেখেছিল খঞ্জর? যুদ্ধ এদের আশীর্বাদ। যে মানুষ টঙে বসে দুই পয়সার পান বেচত, তার এখন চারতলা আলিশান ভবন। টিভি-মটরসাইকেলের বিশাল দোকান। সেই শো’রুমের বারান্দায় উঠতে সাধারণের প্রাণ কাঁপে। সে লোকের ভারতেও বাড়ি। তার পরনের পোশাক থেকে...শরীরের ভেতর থেকে কত বাহারি সুগন্ধ বাতাসে মেশে! যারা কোনোকিছু লুট করতে পারল না, কেড়ে নিতে শেখেনি; অনিবার্য পথের ফকির। একসন্ধ্যা খাওয়া শেষে পরের কথা ভেবে ভেবে আয়ু কমিয়ে ফেলে।
‘কুলি করেন।’
হাইড্রোলিক চেয়ারে আধশোয়া থেকে মাথা উঁচিয়ে কুলকুচা করতে হয়। পায়ের কাছে ফ্যাকাশে সবুজ বালতি। চিলমচির জায়গায় এই পরিবর্তন। বালতি না বড় মগ কে জানে। সেটির কোনো হ্যান্ডেল নেই। গ্লাস মুখে নিতেই থুতুর গন্ধ। বিবমিষাময় বিকার। এ কথা তো বলা যায় না। আলগোছে একদলা পানি মুখের মধ্যে নিয়ে ফেলে দিতে হয়। বালতির ভেতরে লাল থেকে বর্ণিল, তারপর ধূসর; অবশেষে বিকট কোনো ঢেউ হয়ে থিতিয়ে পড়ে। দৃষ্টিতে খবিরুদ্দিন। যুবা খবিরুদ্দিন কৃশ টিংটিঙে শুকনো...এখন বয়স্ক শেভহীন গালভর্তি সাদা দাড়ি। চিলমচি আর বালতি। বালতি নাকি মগ? ফ্যাকাশে সবুজ, থুতু মেশানো কুলকুচা; কখনো কপিশ কখনো লাল।
খবিরুদ্দিন ঘষে ঘষে পেস্ট নরম করতে থাকেন। কাচের উপর সার্জিকাল নাইফের পট পট শব্দ ওঠে। শব্দের ঢেউ তারপর আকস্মিক পাটাশ। যুবা খবিরুদ্দিন পাকিস্তান...বয়স্ক স্বাধীন বাংলাদেশ। চিলমচি থেকে বালতি। চল্লিশ বছরের পরিবর্তন। কত বদলে গেছে সবকিছু! হোটেলের মেচিয়ার এখন হোটেলের মালিক। সকলে নিজেকে সাজিয়ে নিল। ছোট থেকে বড় হলো। চুরি করা বিদ্যায় পিএইচ.ডি. ইউনিভার্সিটির প্রফেসর। আমার কিছু হলো না। একাত্তরের ফার্স্ট ডিভিশন? দুরো সে তো চেয়ার-টেবিল পাস! বুকের মধ্যে এ যন্ত্রণা কোনো হাইড্রোলিক চেয়ারে বসে সিল করা যায় না। মুখের ছবিতে এনে দাঁড় করাতে হয় কৃত্রিম মুখোশ। তারপর কোনো কোনো রাত কিংবা দিন, যন্ত্রণার শুরু; গাল মুখ ফুলে-ফেঁপে ঢোল। পেইনকিলার অ্যান্টিবায়োটিক পাকস্থলির কোণায় হজম হতে শুরু করে দেয়। তবু ব্যথা যন্ত্রণা। ধীরে ধীরে উৎস থেকে মাথা আর মস্তিষ্কের কোষে কোষে ছড়িয়ে যায়। একদিন মিলা বলে উঠে, -
‘তোমার তো কোনো সমস্যা ছিল না, সিল করাতে গেলে কেন? এখন খামোখা কষ্ট!’
কোনো কোনো দিন মিশন স্কুলের সামনে দিয়ে একটি ভ্যান হেঁটে যায় উত্তরের দিকে। আঠারো কি কুড়ি বছরের লোক, হাতে হ্যান্ড-স্পিকার। ‘অবাক কাণ্ড/কানা ফুটা বন্ধ/টিন দিয়ে পানি পড়ে টিপ টিপ টিপ। রাতে ঘুমাতে পারেন না/মগের ফুটা জগের ফুটা বন্ধ করে/আসল পুডিং লাগান। ভ্যানের কাছে আসুন। প্রতি প্যাকেট দশটাকা। স্পিকারের বাণী আকাশে বাতাসে প্রতিধ্বনিত হয়ে আমোঘ কোরাস। সমস্বরের উচ্চ স্তবগান। কে কোথায় কোন্ ফুটা বন্ধ করে!
তখন আকস্মিক রূপকথার গল্প মনে পড়ে যায়। গ্রামের পাশে শাল-সেগুনের বন। বনের মধ্যখানে বড় দিঘি। তার জল কাকচক্ষুর মতো গভীর আর হিমশীতল। সামনের ঝোপ-জঙ্গল পেরিয়ে সেখানে যেতে হয়। সেই জঙ্গলে আরও নানারকম গাছগাছালি ঝোপঝাড় ফার্ণের ছড়াছড়ি। কয়েকটি বিশাল শাল সেগুন মাথা উঁচু করে, দু-তিনটি বট আর পাঁকুড় নিজেদের জড়িয়ে স্থায়ী আসন করে নিয়েছে। সেই জঙ্গলের গভীরে অশ্বত্থতলায় কোনো এক সাধু-দরবেশ ধ্যানমগ্ন থাকেন। সৎ মা আর বোনের অত্যাচার নির্যাতনে পিতৃহারা কিশোরী সারাদিনের কাজ শেষে বিকেলে দিঘিতে যায়। শীতল জলে নেমে মন শান্ত করার আগে খুব কাঁদে। সে কান্না একান্ত আপন গোপন আর অতীত-সে কান্না তার বর্তমান। মায়ের কথা ভেবে বাবার স্মৃতি হাতড়ে সে কান্নার নীরব সুর বাতাসে ঢেউ খেলে খেলে তরঙ্গ তুলে তুলে সাধু-দরবেশের কানে গিয়ে আঘাত করে। ধ্যান ভেঙে যায়। তিনি একদিন তাকে ডেকে বলেন, -
‘মা জননী দুঃখ করিস না, একদিন সব দুঃখের অবসান আছে।’
‘তার শেষ কবে বাবা?’
‘সেই শেষের শুরু কবে, কারও জানা থাকে না মা; মানুষ শুধু গল্পের শুরু জানে। তুই কাঁদিস কেন? একদিন তারও যে শেষ আছে।’
‘আমার জীবন অন্ধকার গোলকধাঁধা বাবা। এ থেকে কবে মুক্তি? তার সূচনা কি শুরু হয়েছে?’
‘এ এক জটিল প্রশ্ন মা জননী। যা তুই দিঘির জলে একডুব দিয়ে সে প্রশ্নের ইতি করে আয়।’
মেয়েটি তাই করে। তখন রূপের আলোয় গাছের শাখায় শাখায় গোধূলি চমকে ওঠে। কে এই স্বার্থহীন স্বচ্ছ মনের মানুষ? তার সৌন্দর্য গ্রাম থেকে গ্রামে বাতাসের আগে আগে ছড়িয়ে যেতে ব্যস্ত হয়। সে বোঝে প্রত্যাশিত সমাপ্তির শুরু হয়ে গেছে। দুঃখের দিনশেষে আসছে আনন্দের নতুন দিনকাল। এই গোপন তথ্য জেনে নিয়ে সৎ বোন দিঘিতে আসে। একটি ডুব দেয়। আহা কি মজা! এ দিঘির শীতল জলে এত জাদু মায়া! সে আর একটি ডুব দেয়; আরও মজা। তারপর আর একটি। অতি লোভে তাঁত নষ্ট। একটি কালো কোলা ব্যাঙ তার কপালে স্থায়ী হয়ে ঝুলে পড়ে। ঘর্ঘর নিনাদে ভরে যায় বাতাস। আমাদের সেই সুদিন কবে? আমাদের বুকে যে গগনবিদারী নিনাদ নীরবে হা-হুতাশ করে চলে?

মোকসেদ দরজার সামনে সবুজ প্লাস্টিকের টুলে বসে ঝিমোয়। ব্রয়লার মুর্গির মতো থলথলে থুতনি, ঝুলে পড়া চোয়াল; সে থেকে থেকে লাফ মেরে তালিকার নাম ধরে হাঁক দেয়। জবাফুল এগারো। অনেক অপেক্ষায় থেকে এবার ভেতরে গেছে। এরপর বারো, অরিজিনাল আসেনি; এই ফাঁকে যদি হয়ে যায়। মোকসেদের দিকে দৃষ্টি ফেলে এইটুকু বুঝি সময় হয়ে এসেছে।
অনেক বড় পরিসরের শীতল ঘর। অদ্ভুত নিশ্চুপ শান্ত দিঘির পাড়। কখনো কোনো কৃত্রিম আবহমণ্ডল ভেবে ভুল হয়ে যায়। গ্রীন হাউস অ্যাফেক্ট। এখানে হাইড্রোলিক নেই। ইলেকট্রিক্যাল দুটো চেয়ার। সুইচ টিপে দিয়ে কাউকে কত অ্যাঙ্গেলে ঘোরাতে হয় সবকিছু জ্যামিতিক। একটি চেয়ারে বসি। দেবদূতের মতো লাগে নুরুল ইসলামকে। তার অ্যাসিস্ট্যান্ট দু-জন আজ্ঞাবহ দাস।
‘বলুন তো সমস্যা কোথায়?’
মুখ হাঁ করে সমস্যা দেখাতে হয়। যে সমস্যার সৃষ্টি আমার নিজের একার। সেখানে কারও দায় বা ওজর থাকে কি? আজ সমস্যার জটসুদ্ধ তুলে ফেলতে চাই। কষ্টের মূলোৎপাটন চাই। কি কি কষ্ট, কোথায় কোথায়; তার তালিকা অনেক দীর্ঘ। মিথ্যে প্রতিশ্রুতি অন্যায় শঠতা দুর্নীতি সন্ত্রাস লুটপাট আর কত কি! অনেক যুগ ধরে অনেক কষ্টে কেটে গেল কাল; এবার একটু নির্মল হতে চাই। বড় সাধ হাজার বছরের বাঙালির শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে আসি।
‘এটা তো প্রাইম টিথ। এটা না থাকলে খাবেন কী করে? এ হলো চর্বন দন্ত। তুলে ফেললে কিছু খেতে পারবেন না।’
‘মাঝে মধ্যে খুব যন্ত্রণা, ভার ভার লাগে। সারাদিন চিনচিনে ব্যথা!’

অন্তর্দাহ-দংশনের কথা তো বলা যায় না। দেখানো যায় না। সে তো বিবেকের যন্ত্রণা। আর সে দায় নিজেরই বা কেন? কেননা চালাক আর ধূর্তরা চিরকাল গাছের উপরের আর তলার সবকিছু খায়, আরও খাবে, খেতে থাকবে; তোমার জন্য পড়ে থাকবে শুধুমাত্র ছোবড়া। তোমাকে বহন করতে হবে তার সকল দায়। তারা বুদ্ধিমান...তারা শুধু পাটাশ করবে আর তুমি জীবনের ঘানি টেনে টেনে কোনো অলীক সৃষ্টিকর্তার কাছে কখনো নালিশ, কখনো প্রার্থনা করে যাবে স্বর্গসুখের; অন্যকোনো গ্রহে সুনির্মল জীবনের। এ সকলই কল্পনা আর গল্পে বর্ণিত রহস্যকথা। আপাতত যা উপড়ে তুলে ফেলবার করে ফেলো।
‘কত চিকিৎসা আছে! রুট ক্যানেল করা যায়, না হলে ডেন্টিকিউর। গোড়া নড়ে নাকি? কোনো পেরিওডেন্টাইটিস?’
‘বুঝলাম না।’
‘মাঢ়ি থেকে রক্ত পড়ে? এটা হলে মুখে দুর্গন্ধ হয়।’
তারপর কী হলো কিছু বোঝা গেল না তেমন। লাল পিঁপড়ের চিমটি। লোকাল অ্যানেসে'শিয়া। তখন তাকলা মরুর দুর্গম বালুময় পাথার, মাথার উপর উদ্দীপ্ত সূর্যের তেজ আর মরীচিকা ঝিলমিল মরূদ্যান ভেসে উঠতে থাকে। চোয়াল ভারী হতে হতে নাই হয়ে যায়। আমার দাঁত নেই। মাঢ়ি নেই। মাথা নেই। মাথাভার মাথার অস্তিত্ব জানিয়ে দেয়, তুমি মরো নাই; দেরি আছে বাছা। দেবদূত গেয়ে চলে কি সব স্তব। তার কোনোটি কানে আসে কোনোটি দৃষ্টি ঝাপসা।
‘প্রথমে টেম্পরারি ফিলিং। সপ্তাহখানেক পর দেখে-শুনে সে ফিলিং তুলে ফেলে রুট ক্যানেল করা হবে। সেই ফিলিং হবে পার্মানেন্ট। সহজ ব্যাপার। বুঝেছেন? রিমাল ফাইল দিয়ে এক্সট্রাক্ট করে দেয়া হবে।’
আমার কণ্ঠস্বর আছে কি না জানি না। মুখ হাঁ করে শীতল ঘরের হিম খেতে থাকি। তারপর বাকি পথটুকু কীভাবে জানি না, ফিরে এসে শুনি অনন্ত এক জিজ্ঞাসা। সেই দুটি চোখ আকুল-ব্যাকুল। মিলা জিজ্ঞেস করে, -
‘হয়ে গেল?’
এ প্রশ্নের জবাব নেই। হায় সকল জিজ্ঞাসার যদি উত্তর জানা থাকত! তবে এই চুয়ান্ন বছরে বারবার দীর্ঘশ্বাস বেরোত না। তেপান্তরের শেষপ্রান্তে এসে মন ফিরে দেখতে চাইত না কি কি করে গেলাম, কি কি আছে রাখার; ফেলে যাবার। প্রত্যাশার চেয়ে প্রাপ্তি কতটুকু। শূন্য আর বঞ্চনার কতটুকু ভার বহন করে এলাম। মধ্যরাতে বিধ্বস্ত যন্ত্রণা শুরু হলে অ্যানেসে'শিয়া আর যা যা স্বপ্ন-মায়া কঠিন বাস্তব বুঝিয়ে ছাড়ে। পুনরায় ফিরে আসে চাপ চাপ মাথাভার অনুভূতিহীন কষ্ট; সহ্য করা মৃত্যুর মতো অন্ধ-বধির। যেভাবে ঘুরে আসে নিত্যদিনের তিক্ত অভিজ্ঞতা। আমরা কি চাই, কি পেয়েছি আর কিইবা লালন করে চলি। আজ রন্ধ্রে-রন্ধ্রে অনু-পরমাণুতে বাসা বেঁধেছে শূকরের দল। ফরমালিন কসমেটিক্সে সবুজ চেহারার পুরীষভোজী গু-খোর নষ্টরা। এদের আর রাখা যায় না। অসহনীয় যন্ত্রণা দিয়ে চলেছে। তাদের উপড়ে তুলে ফেলতে হবে। একটি সুঁই দরকার। এমন একটি সুঁই বা অস্ত্র, শক্ত মজবুত আর সুতীক্ষ্ণ ফলা। সেটি দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে রক্তাক্ত করতে হবে। আবর্জনায় ছুড়ে দিতে হবে সকল দুষ্টক্ষত। অনায়াসে ফাটিয়ে দেয়া দরকার গু-খোর শূকরের বর্ণালি মুখোশ। নতুন জগতের স্বপ্ন দেখতে চাই। পাটাশ!
(সমাপ্ত)

মন্তব্য ৪ টি রেটিং +১/-০

মন্তব্য (৪) মন্তব্য লিখুন

১| ১৫ ই আগস্ট, ২০১৯ রাত ৮:০৩

রাজীব নুর বলেছেন: চমৎকার লিখেছেন।
সহজ সরল ভাষা। জীবনের চরম সত্য লেখা। আবেগ আছে, ভালোবাসা আছে, পাওয়া না পাওয়া আছে।

২| ১৫ ই আগস্ট, ২০১৯ রাত ৮:০৮

রাজীব নুর বলেছেন: মোকসেদ, খবির উদ্দিন, আলাউদ্দিন, মনসুর চাচা সবাই যেন আমার পরিচিত।

১৬ ই আগস্ট, ২০১৯ সকাল ১১:২৫

মাহবুব আলী বলেছেন: অনেক ধন্যবাদ আপনাকে। গল্পটি ''অযোগ্যতার সংজ্ঞা' বইয়ে রেখেছি। শেয়ার করার জন্য দিলাম। আপনি ঠিকই বলেছেন, আমাদের চারপাশের চেনা মানুষগুলোই এখানে আছে। শুভকামনা।

৩| ১৬ ই আগস্ট, ২০১৯ সকাল ১১:৩৬

রাজীব নুর বলেছেন: আমার মন্তব্যের উত্তর দেওয়ার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.